আমার একলা পথের সাথি : ৪৯

  পর্ব-৪৮

পর্ব-৪৯

ছাইপাঁশ দু’কলম লিখতে এসে একজীবনে কত যে গোপন-বেদনায় ব্যথিত হয়েছি—কতবার ভেবেছি ধুরছাই, ছেড়ে দেই এইসব লেখালেখি। কী হবে আর না-লিখলে? কত অজস্র-অশ্রুজলে প্লাবিত হতে হতে সমুখে খুলে রাখা বইয়ের পৃষ্ঠা ধোঁয়াশা ঠেকেছে! হাতে ধরে রাখা কলম থেমে যেতে চেয়েছে! অথচ আশ্চর্যের বিষয়—হয়তো পরক্ষণেই পেয়েছি কোনো আনন্দ-বারতা। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, একজন লেখকের জন্য প্রাপ্তি বেশি না অপ্রাপ্তি? আমি বলব একেবারে সমানে সমান। সত্যি একেবারে সমানে সমান এই আনন্দ-বেদনারাশি।


নিজের বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে সদাই শরমিন্দিত—সেই আমি কিনা সহসা পেয়ে যাই পাশের দেশের আরেক লেখকের গোপনপত্র!


এই যে আমি কোন অখ্যাত, কুলাঙ্গার লেখক! জন্মেছি বাংলাদেশের কোনো এক পাড়াগাঁয়ে। সম্বল বলতে দুই-চারিখানি কিতাব। যোগ্যতা বলতে নাম-দস্তখতের বিদ্যা। কিন্তু হৃদয়খানি বড় নির্মল! বড় প্রশস্ত। কিন্তু হৃদয়ের মূল্য কে দেবে মশায়? আহা! একখানা চন্দ্রমল্লিকার মূল্যেই তো হৃদয়খানি বিকানো যেত!

নিজের বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে সদাই শরমিন্দিত—সেই আমি কিনা সহসা পেয়ে যাই পাশের দেশের আরেক লেখকের গোপনপত্র! কী লেখা ছিল তাতে? লেখক আমায় লিখেছেন, আমার নির্বাচিত গল্প কিতাবখানি উনার হস্তগত হয়েছে। গল্পগুলি পড়ে উনি যারপরনাই মুগ্ধ ও বিস্মিত!

আমি সূত্র খুঁজে খুঁজে হয়রান প্রায়। ইনাকে চিনি না আমি! নামও শুনি নি কোনোদিন!

এণাক্ষী রায় তখন নিজেই জানান—

কবি গৌতম চৌধুরী তাঁকে কিতাবখানা দিয়ে বলেছেন—

দেখুন , বাংলাদেশে গল্পে কত ভালো ভালো কাজ হচ্ছে। পড়ে দেখুন। কত উন্নতমানের গল্প!

এণাক্ষীর কথা শুনে স্মৃতির-মেঘ ফুঁড়ে আমি এক আঁজলা জল তুলে আনি। কলকাতায় ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ আনতে যাওয়ার প্রাক্কালে আমি চারখানা কিতাব সঙ্গে নিতে পেরেছিলাম। তন্মধ্যে একটা পৌঁছে দিয়েছিলাম কবি গৌতম চৌধুরীর করকমলে। গৌতমদাই বইটা এই গদ্যকারকে দিয়েছেন।

ফেসবুকের মেসেঞ্জারের সবুজ আলোর আভায় পাশের দেশের এই অচেনা গদ্যকারের সঙ্গে আমার অসম-বয়সের বন্ধুত্বের সুতা প্রায় জড়াজড়ি করে পেঁচিয়ে যেতে থাকে।

কিন্তু আমার জন্য বহু-বিস্ময় তখনো বাকি ছিল। আমি যখন শান্তি নিকেতনের ‘বসন্ত উৎসব’ উদ্‌যাপন শেষে ফেরার পথে পুনরায় কলকাতা গেলাম, তখন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও সাহিত্যের সত্যিকার সমঝদার এই বন্ধুটির সাথে আমার প্রথম দৃষ্টি বিনিময় হলো। আর আমাদের মনের কারবারখানি বহু আগেই সারা ছিল। দুই কলম ছাইপাঁশ লিখবার সুবাদে সে আমাকে যা দিল, তা ছিল আমার কল্পনারও-অতীত। এই যে আমি, নিজ-পরিবারে, নিজ-সমাজে, নিজ-দেশে—বহু জায়গায়, বহুভাবে অবহেলিত ও অপমানিত, ভীনদেশি কোনো বন্ধুর কাছ থেকে একেবারে ‘জীবন পাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান। তুমি জান নাই ,তুমি জান নাই, তুমি জান নাই তার মূল্যেরও পরিমাণ’… এরকম কিছু পেলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কী-ইবা করতে পারি?

আমি কলকাতা পৌঁছানোর আগে থেকেই এণাক্ষীর সাথে চলছিল যোগাযোগ। আমরা কবে কোথায় যাচ্ছি, কোথায় থাকছি, কবে ফিরছি—সমস্ত প্রোগ্রামের চক-আউট পৌঁছে গিয়েছিল ওর কাছে। এণাক্ষী চেয়েছিল পুরো একটা দিন যেন আমি ওর সাথে কাটাই। আমিও সানন্দে রাজি। নির্দিষ্ট দিনে গেস্ট হাউসের ব্যালকনি থেকে দাঁড়িয়ে দেখি লাল-টুকটুকে এক গাড়ি থেকে নামছেন এক লাল মেমসাহেব—এণাক্ষী রায়,  আমার বন্ধু—এইসময়ে কলকাতার কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।

কিছুক্ষণ দুই জনের কঠিন ‘হাগ’-এর পরে আমরা চললাম সাইট সিয়িংয়ে। কিন্তু লাল মেমসাহেব কিনা আমাকে নিয়ে কলকাতার বদ্ধ হাওয়ার ঘুরবেন না। মেমসাহেবের লাগবে তেপান্তরের-মাঠ, খোলা প্রান্তর। নদীর লিলুয়া বাতাস আর সবুজ ধানের খেত। মেমসাহেবের লাগবে—

বৃষ্টি পড়ে এখানে বারমাস এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস [শক্তি চট্টোপাধ্যায়

ফলে লাল মেমসাহেবের লাল ঘোড়া আমাদের নিয়ে ছুটল ইছামতির তীরে, টাকিতে।

সে এক  অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। আমি এণাক্ষীকে জিজ্ঞেস করলাম—

এত জায়গা থাকতে তুমি এখানে আমায় নিয়ে এলে কেন?

এণাক্ষী চমৎকার উচ্চারণে জানাল—

তোমার লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে এখানে এলে তোমার ভালো লাগবে।


কেন এই বিবাদ-বিসংবাদ? কেন এই ব্যবধান আর কাঁটাতারের রেষারেষি?


ওর কথা শুনে চোখে জল ভরে এলেও আমি চশমার কাচের আড়ালে তা লুকিয়ে ফেললাম। হায়! আমার লেখালেখি! এই লেখার জন্যই কত না লাঞ্চনা-গঞ্জনা! কত না অপমান আর অবহেলা! আর এই লেখার জন্য কতই না ভালোবাসা, শ্রদ্ধা! কতই না প্রাপ্তি, মর্যাদা আর অমর্যাদা? জীবন নাট্যশালায় কখন যে কোন সিন দেখা যাবে—তা আগেভাগে বলা একেবারেই মুশকিল!

টাকি মানেই ইছামতি নদী! ঈষৎ ঘোলাজল নিয়ে বয়ে যাচ্ছে নিরবধি! ভেসে যাচ্ছে অজস্র জলযান আর জলের ফড়িং। দুই-এক স্তূপ কচুরিপানার বেগুনি ফুল নেচে যাচ্ছে জলের ওপর! এপার থেকে ওপারের বাংলাদেশ স্পষ্ট দেখা যায়। ওপারের গাভী নাকমুখ চুবিয়ে খেয়ে নিচ্ছে পানি আর এপারের গাভী খায় জল। ওপার থেকে কোনো ছাগলের মৃতদেহ ভেসে এসে ঠেকে এপারের ঘাটে! আর এপারের বাছুরের শবদেহ ভেসে যায় কিনা ওইপারে! আমি চেয়ে চেয়ে এইসব দেখি আর ভাবি—হায়! জীবন! কেন এত হানাহানি আর মারামারি! কেন এত লোভ আর লালসা? কেন এই বিবাদ-বিসংবাদ? কেন এই ব্যবধান আর কাঁটাতারের রেষারেষি?

ইছামতির তীরের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার লাল মেমসাহেব এণাক্ষী রায় বলে—

বুঝলে পাপড়িদি, পুজোর সময় এইপারে প্রতিমা বিসর্জন হয়, ওইপারেও ঠিক ওই জায়গাটাতে। দুই দেশের প্রতিমা একই সাথে বিসর্জিত হয়। আর প্রতিমাদের মাটির দেহ গলেগলে মিশে যায় এই ইছামতির জলধারায়। পুজোতে যদি আসো, দেখবে যে ইছামতির জলে তখন শুধু রং আর রং। রং-গোলানো-জল ঢেউ হয়ে ভেসে যায় কত দূর কে জানে?

এণাক্ষীর পূর্বপুরুষ তো বাংলাদেশেরই মানুষ ছিলেন। আমার লাল মেমসাহেবের আমার দেশের মাটির প্রতি টানটা আমি যেন স্পষ্ট অনুভব করতে পারি।

নদী ইছামতি লাগোয়া মিউনিসিপ্যালেটির গেস্ট হাউসে এণাক্ষী পূর্বেই আমাদের জন্য লাঞ্চ অর্ডার করে রেখেছিল। কুপন নিয়ে আমরা বসে যাই থালি নিয়ে। আহা! কী যে স্বাদ গরমগরম খাবারের! বেগুন ভাজার সাথে পাতে এক চামচ গাঁওয়া-ঘি। যেন-বা অমৃত!

ইছামতির তীরের খানিকটা জুড়ে সুন্দরবন রয়েছে। ম্যানগ্রোভ গাছপালায় সয়লাব জায়গাটা। গোলপাতার ছায়াতে ঢাকা একটা দীর্ঘ-ব্রিজ দিয়ে হেঁটে আরও জঙ্গলাকীর্ণ অরণ্যে পৌঁছানো যায়। কেমন একটা গা শিরশিরে অনুভূতি হয় আমার! কারণ এই প্রথমবার আমি এত কাছ থেকে সুন্দরবন দেখছি! দেখছিও ঠিক না, যেন স্পর্শ করছি! গোলপাতা, সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া আর কেওড়া বৃক্ষরা জড়াজড়ি করে আছে। ব্রিজ পেরিয়ে ইছামতির কাদা-থক-থক পারে গিয়ে নামি আমরা। গাছপালার শ্বাসমূলে জলের দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। যখন জোয়ার আসে তখন এরা চলে যায় জলের-পুরীতে। জল চলে গেলে জলচিহ্ন নিয়ে ফের তারা হেসে উঠে এই পৃথিবীর আলো-হাওয়ার।

ইছামতির জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমরা ক্যামেরা চালাতে থাকি। সূর্যের চোখেমুখে লালিমা প্রগাঢ় হয়ে আছে। যেন সে কোনো গভীর-গোপন কোনো দুঃখে কেঁদেকেটে নাক-চোখ লাল করে ফেলেছে!

বনের সৌরভ গায়ে মেখে আমরা হাঁটতে থাকি তীর ধরে। ইছামতির ঢেউয়ের ওপর বন্দুকধারীদের ট্রলার ভেসে যেতে দেখি।

সুন্দরবন থেকে বেরিয়ে এলে টোটোওয়ালা আমাদের নিয়ে যায় এক ঝরাপাতার বনে। মাথার উপরে ন্যাড়া-বৃক্ষদের বেদনা-ক্লিষ্ট হাসি। যেন তাদের জীবনে আর কেউ নাই! কিছু নাই! নাই, নাই নিয়ে তারা যেন কোনোমতে বেঁচে আছে! বৃক্ষদের তলায় ঝরে পড়েছে অজস্র-শুকনোপাতা। সেই এন্তার-শুকনোপাতা বিছিয়ে থাকা পথ ধরে আমি আর আমার লাল মেমসাহেব হেঁটে বেড়াই দীর্ঘক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই এক জীর্ণ-কুটিরের সামনে। যে-কুটিরের প্রতিটা দেয়ালে শ্যাওলা জমে সবুজাভ হয়ে আছে। কুটিরে উঠবার সিঁড়িগুলি প্যাচপ্যাচে জল-শ্যাওলায় পিচ্ছিল। সামান্য বেখেয়াল হলেই পা-ভাঙার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আর দরজায় ঝুলছে একটা জং-ধরা মস্ত তালা। এই কুটিরের ভিতরে কী আছে? কেনই বা ঝুলছে অমন তালা? কোন যক্ষের ধন লুকানো রয়েছে ওই পলেস্তরা খসে পড়া দালানের ভিতর?

আমাদের চমকে দিয়ে টোটোওয়ালা বলে ওঠে—

দিদিমণি, ঘরটা চিনতে পেরেচেন?

আমরা অবাক হয়ে তাকাই। এটা কোন ঘর? এটাই কি সেই বেহুলার বাসরঘর? এই ঘরেই কি ঢুকেছিল সেই সুতানলি সাপ? আর দংশন করেছিল লখিন্দরকে?

টোটোওয়ালা বলে—

এই ঘরেই তো জয়াদি এয়েচিল।

কোন জয়া? ঝটিতি মনে পড়ে যায়—জয়া আহসান! আর আবির চ্যাটার্জি!

আমার লাল মেমসাহেব বলে—ওহো ‘বিজয়া’ ছবির শুটিং হয়েছিল এই ঘরেই তো!


লাল মেমসাহেব, আবার আমরা কবে মিলব? নাকি জয়ার মতো স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব ভোরের আন্ধারে?


কৌশিক গাঙ্গুলির ‘বিজয়া’। আরে এই তো সেই ঘর। হাড়জিরজিরে পড়ো-দালান! বিধবা জয়ার মাথা গুঁজার ঠাঁই। এই ঘরেই একবার মাত্র মিলনের সুযোগ হয়েছিল আবির আর জয়ার। আহা! কী অলৌকিক সেই মিলন!

সেই ঘরের সামনেই কিনা আমরা দুজন দাঁড়িয়ে আছি! দাঁড়িয়ে আছি সিঁড়ির প্রান্তে!

আবিরের নৌকা ছেড়ে যাচ্ছে ভোরের আন্ধার থাকতে থাকতে। ক্রমশ চলে যাচ্ছে দৃষ্টির আড়ালে আবির! শাদাথান পরে জয়া দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মতো!

খানিক বাদেই লাল মেমসাহেবের লাল গাড়িখানা আমাদের নিয়ে কলকাতা অভিমুখে ছুটে চলে। আকাশ জুড়ে ঘনায়মান কালো মেঘ। জোর হাওয়া দিয়ে শুরু হয় মুষল-বাদল। এণাক্ষী রায় আমাদের গেস্ট হাউসে নামিয়ে দিয়ে নিজের ডেরায় ফিরে যাবে। আমিও ফিরে যাব আগামীকাল দুপুরের ফ্লাইটে বাংলাদেশে। সহসা আমার মন দুলে ওঠে! চোখ ঝাপসা হয়। ফের কবে আমাদের দেখা হবে, এণাক্ষী? ফের কবে দেখা হবে?

দারুণ সুন্দর একটা দিন উপহার দিয়ে তুমি আমার হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছ।

লাল মেমসাহেব, আবার আমরা কবে মিলব? নাকি জয়ার মতো স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব ভোরের আন্ধারে?

গাড়ির জানালার কাচ বেয়ে বৃষ্টি পতন দেখতে দেখতে কানে ভেসে আসে—

‘বন্ধু, তোর লাইগ্যারে, আমার তনু জড়জড়, মনে লয় ছাড়িয়া যাইতে থুইয়া বাড়িঘর…’

আবির অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কুয়াশার আড়ালে। আর জয়া, পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাটি—বিষাদিত মুখে তাকিয়ে আছে চলে যাওয়া নদীটির দিকে। জয়াকে দেখে বোঝা যায় না, তার দেহে প্রাণ আছে কি নেই…!


শেষ পর্ব
পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা