পর্ব-৪৭
পর্ব-৪৮
বাঙলার মুখ আমি দেখিয়াছি, সেই সাথে বাঙালি-ললনার মুখ! দেখিয়াছি তাঁদের শান্ত-স্নিগ্ধ-শ্রী। আটপৌরে-লাবণ্য! এ-সমস্তই দেখার ফাঁকতালে আমি আরো অন্যকিছুও দেখিয়াছি। দেখিয়াছি তাঁদের পরিপাটি-পোশাকের আড়ালে, জ্ঞান-বিদ্যার দেয়ালটির ওপাশে লুকিয়ে রাখা অসূয়া আর পরশ্রীকাতরতার দাঁত-নখ ! এসব দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল কয়েকবার তাঁদের সাথে দল বেঁধে এদিকসেদিক ঘোরাঘুরি বা পাশের দেশে ভ্রমণ করতে যাওয়ার সুবাদে। প্রবাদে বলে—মানুষ চিনতে চাইলে তার সাথে ভ্রমণে যাও, রাত্রি যাপন করো।
আহা! রাত! রাত মানে নিশি, নিশুতি—ঘোরঘুট্টি-আন্ধার! রাত মানে পা-ওয়ালা-হাওয়া। রাত হইলে হাওয়ারা সেই পা দিয়া দাপিয়ে বেড়ায়! যত না দাপিয়ে বেড়ায়, তার চাইতেও অধিক তারা মুখোশ খুলে দেয়। মানুষের মুখে কৌশলে সেঁটে থাকা মুখোশ! মানুষের অজান্তেই সেসব খুলে পড়ে! খুলে ফেলা মুখোশ ডানায় বেঁধে নিয়ে হাওয়ারা দেয় উড়াল! উড়াল দিতে দিতে রাতের গাঢ়-অন্ধকারকে ফিকে করে তোলে!
কী দরকার পাতার-আড়ালটুকু উন্মোচিত করে দিয়ে অন্যদের নাঙা করে তোলার?
এত অজস্র মুখোশ-খুলে-পড়া মুখ দেখে দেখে অন্তহীন-ক্লান্তি এসে ভর করে কিনা আমারই দেহ-মনে। ক্লান্তির ভরে একেবারে চলৎশক্তিহীন হয়ে মুখথুবড়ে মাটিতে পড়ে থাকা ছাড়া তখন আর কীইবা করার থাকে?
মেকি-হাসি, মেকি-প্রেম, মেকি-জ্ঞান, মেকি-উদারতা, মেকি-ভদ্রতা দেখতে দেখতে ক্লান্তি আর বুঝি ক্ষমাও করতে পারে না কাউকে!
কিছু কিছু নারীরা যত না লেখে, তার চাইতে অধিক জোটায় নিজেদের স্তাবক! যত না পড়াশোনা করে, তার চাইতে অধিক আগ্রহী হয় পরশ্রীকাতরতায়। নারীর গুণের চাইতে রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখদের অগ্রাধিকার থাকে প্রায় সবখানেই। এবং আমি এই চুনোপুঁটি এক লেখক কি-না এঁদের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বারংবার পিছিয়েই পড়ি! নিজের ব্যাকডেটেড চিন্তাভাবনা নিয়ে ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকি এক ফোঁটার মতন! লেখালেখির ক্ষেত্রে আরও একটা ব্যাপার রয়েছে—এঁদের বেশির ভাগেরই এক জন বা দুই জন করে ‘গডপ্রেমিক’ থাকে, থাকেই। যে প্রেমিক কাম গডেরা এঁদের সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। ‘গডপ্রেমিক’ লেখা সম্পাদনা করে দেয়া থেকে শুরু করে হয়ে ওঠে বহু কাজের কাজি। এরকম গডপ্রেমিকদের বহু উদাহরণ দেয়া যায় বা দিতে পারি, কিন্তু সংগত কারণেই তা দিচ্ছি না বা দেবো না। কী দরকার পাতার-আড়ালটুকু উন্মোচিত করে দিয়ে অন্যদের নাঙা করে তোলার? তার চাইতে বরং চলছে গাড়ি, বোয়াল মারি—চলুক। যে-যেভাবে পারে চলুক বা চালাক। অন্তত কিছু একটা ‘করে-কেটে-খাক’। [ধারণা করি, গডপ্রেমিকদের মতো কারো কারো গডপ্রেমিকাও আছে নিশ্চয়ই? যারা হয়তো তাঁদের অনুরাগীদের জন্য সত্যিকার অর্থেই দেবীর ভূমিকাটিই পালন করে যাচ্ছেন। এরকমটি আছে কিনা তার কোনো সাক্ষী-প্রমাণ আপাতত আমার সম্মুখে নাই। কিন্তু এরকমটি যদি হয়ে থাকে, তাহলে এটা হবে আমার জন্য সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত সুসংবাদ
দুই-এক কলম ছাইপাঁশ লেখালেখির সুবাদে পাশের দেশে খানিকটা পরিচিতি আমি পেয়েছি গত শতকের শেষ দিক থেকেই। ফলত কলকাতাতে আমার কিছু শুভার্থী রয়েছে। প্রথম যেবার সার্ক লিটফেস্টে দিল্লি যাই, আমাদের দলটিতে ছিল নানা বয়সের লেখকেরা। এর মাঝে অগ্রজ নারীলেখকেরা ছিলেন দুই-তিনজন। এঁদের মাঝে একজন তো ভীষণ-রকম পুলিশ! তিনি নাকি নিজের বাসায় থাকেন ‘রানির-হালতে’! এবং তিনি তার ‘রানির হালত’ সবখানেই অ্যাপ্লাই করে থাকেন। দুই-চার জন অতি-পাওয়ারফুল-লেখক বাদ দিয়ে উনি সকলকেই প্রজা-দাসদাসী ঠাওরান। আর আমরাও বেশ সন্তুষ্ট-চিত্তে উনার প্রজা বা দাসদাসীর কাজগুলি করে দিয়ে থাকি। এদিকে সমস্যা আরও আছে, দলের প্রতিটি পুরুষের কাছ থেকে উনি চান অতি-মনোযোগ। এর সামান্য অন্যথা হলে রাগে উনার নাকের পাটা ফুলে উঠতে উঠতে নিম্নচাপ তৈরি করে ফেলে। [সম্প্রতি এক অনুজ নারীকবি ফেসবুকে আক্ষেপ করে লিখেছেন, ওই লেখকের দুর্ব্যবহার ও পুলিশি-খবরদারির কথা। লিখেছেন, তাঁর ছবি তোলার বাতিকগ্রস্ততার কথা। ছবি তুলে না-দিলেই উনি ভয়ানক রাগান্বিত হয়ে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করেন। এবং তা স্থানকালপাত্রের বিচারবিবেচনা না-করেই।
এসব খবরদারি বা পুলিশগিরি করতে করতেই হয়তো এঁরা নিজেদের ভালো লিখবার সম্ভাবনাটুকুও নস্যাৎ করে ফেলে।
ধান ভানতে এসে এতসব শিবের গীতের দরকার কী?—যা বলছিলাম, আমি গিয়েছি কলকাতা, সেখানে রয়েছেন আমার বেশ কিছু সুহৃদ—যারা চাচ্ছিলেন আমি তাদের সাথে কোথাও গিয়ে কিছুক্ষণ বসি। স্থান স্থির হলো ‘কফি হাউস’। [কলকাতায় যাব, আর কফি হাউসে ঢুঁ না-মেরে আসব, তাই কি হয় নাকি? এক্ষণে আমি কী করি? আমার দলে রয়েছেন আরও তিনচার জন ভ্রমণসঙ্গী, তাঁদের ফেলে আমি কী করে একা একা যাই? কোন প্রাণেই-বা তাঁদের ফেলে যাই? ফলত স্থির করি তাঁদের সঙ্গে নিয়েই যাব। কিন্তু তাঁরা দোনোমনো করেন, যাবেন কী যাবেন না? কারণ তাঁরা একেক জন নিজেদের বাংলাসাহিত্যের দিকপাল মনে করেন। [আহারে, নিজের লেখাপত্র যদি তারা নিউট্রাল-ভিউ নিয়ে দেখতেন কোনোদিন! যদি দেখতেন! তাহলে কী আর এত আকাল থাকে বঙ্গদেশের ভালো সাহিত্যের? তাঁরা হয়তো মনে মনে ভাবেন, এই চুনোপুঁটিরে নিয়া লাফায় কেন ভিনদেশি-লোকজন? আমরা সব বাঘ-সিংহ বসে আছি কেশর ফুলিয়ে, আমাদের নেমতন্ন না-জানিয়ে এই পড়ে-পাওয়া-চৌদ্দ আনা নিয়ে কেন এত আগ্রহ ইনাদের?
‘
আমিও শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়েশুটিয়ে নিয়ে একেবারে টেবিলের তলার অন্ধকারে নিজেকে নিক্ষেপ করতে চাইছি।
কফি হাউসে’ অপেক্ষমাণ আছেন কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে সোনালি ডানার চিল নামক উপন্যাসের লেখক ও পশ্চিমবঙ্গ আকাদেমি প্রাপ্ত সুরঞ্জন প্রামাণিক। অপেক্ষমাণ আছেন লেখক ও সম্পাদক আইজ্যাক সাহা। এবং আরও অনেক নবীন-প্রবীণ লেখক—এতদিনে বাদে যাঁদের নাম বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছে। এবং আমার সৌভাগ্য, ওইদিনই কিনা আমার সাক্ষাৎ ঘটেছিল কবি উৎপলকুমার বসুর সঙ্গে। এবং কবি গৌতম চৌধুরীর সঙ্গেও।
আইজ্যাক সাহা, সুরঞ্জন প্রামাণিকসহ অন্যদের খুব ইচ্ছে কফি হাউসেই আমাদের ডিনার করিয়ে দেবার। এদিকে আমাদের দলের নারীলেখকেরা আরও কিছু রবাহূত লেখকদের জুটিয়ে এনেছেন। আমি তো মরমে মরতে মরতে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছি—চার জনের বদলে আট জনের খানাখাদ্যের ব্যবস্থা আমার কলকাতার সুহৃদদের করতে হবে বলে! কিন্তু আমার ভ্রমণসঙ্গীরা এতটাই মীন গোত্রীয় প্রাণী [চোখের পাতাহীন ছ্যাঁচড়া-টাইপ যে—কোনো কিছুতেই তাদের কিছুই যায় আসে না! তাঁরা ভাবছেন, যারা আমাদের নেমন্তন্ন জানিয়েছেন, বোধকরি তাঁরাই এতে খানিকটা বর্তে গিয়েছেন!
প্রবীণ-নবীন প্রায় সকল লেখকরাই আমার জন্য কষ্ট করে স্তূপ বই-পত্রিকা বয়ে এনেছেন। এসব দেখেশুনে আমার অগ্রজ দুই-একজনের ক্রোধে নাকের-পাটা ফুলতে ফুলতে বেলুনাকৃতিতে পৌঁছাতে চাইছে। আর তাদের এতসব কাণ্ডকীর্তি দেখেশুনে আমিও মরমে মরতে মরতে ভ্যানিশ হয়ে যেতে চাইছি। তাঁদের রাগান্বিত হওয়ার কারণ—ভিনদেশিরা আমার মতো ভুসিলেখককে নিয়ে অত মাতামাতি কেন করছেন?
ফলত আমিও শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়েশুটিয়ে নিয়ে একেবারে টেবিলের তলার অন্ধকারে নিজেকে নিক্ষেপ করতে চাইছি। বাবারে! মাফ কর আমারে। আমি লেখকফেখক কিচ্ছুটি নই। হতেও চাই না।
রবাহূতদের দেখে আমার সুহৃদদেরও অস্বস্তিতে পড়তে দেখলাম। তাঁদের অবস্থা যেন শাঁখের করাতের অনুরূপ। তাঁরা বলতেও পারছে না, এসব উটকো-লেখকদের আমরা জোটালাম কী করে? আবার এঁদের তেমন করে তাঁরা গ্রহণও করতে পারছেন না!
এই বঙ্গদেশের কিছু কিছু ভাই-বহিনেরা কাঁটাতার পেরুবার পরপরই দেখিয়ে দেন কৃপণতা কাকে বলে? কারো ব্যাগেই যেন হাত ঢুকতে চায় না। কিভাবে নিজেদের তহবিল সহিসালামতে রেখে অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি করা যায়, সেই তালে থেকে থেকে ভ্রমণের আনন্দ এঁরা মাটি করে ফেলেন। এঁদের কর্মকাণ্ডের নানাকিছুই শুনেও এসেছি বহুবার। যেমন, আমাদের দেশেরই একজন স্বনামধন্য লেখক কোনো এক সম্মাননা আনতে গিয়েছেন মাত্র ১০০ ডলার পকেটে নিয়ে। দিন পনেরো স্বপরিবারে থেকে, দেদার পান করেটরে যখন ফিরে এসেছেন, তখনও নাকি তাঁর সেই ১০০ ডলার আমানতই ছিল! আরেক সম্মাননা প্রাপ্ত লেখক নাকি স্বপরিবারে এতই পান-ভোজন করেছেন যে, উদ্যোক্তাদের সাত দিনের বিল গুনতে হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার রুপি!
আরেক কবি নাকি কলকাতা কিনতে কিনতে টাকা-পয়সা ফুরিয়ে ফেলে কাতর কণ্ঠে বলেছেন—
আমি তো শাড়ি কিনে সব টাকা খরচ করে ফেলেছি, এখন ধার না-দিলে কিছুতেই দেশে ফিরে যেতে পারব না!
যাঁদের কাছ থেকে এইসব শুনি, তাঁদের দিকে আমি লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারি না। কেন এরকম করে প্রায় সবাই? পাশের দেশে গিয়েই ‘আত্মসম্মান’ বলে একটা শব্দ আছে তা কি প্রায় সকলেই ভুলে যান?
সারাক্ষণই অন্য পুরুষদের মনোযোগ কাড়তে চাওয়া অই অগ্রজ নারীলেখকের এক কবিবন্ধু এলেন একদিন। এক্ষণে তিনি শঙ্কিত হয়ে উঠলেন আমাকে নিয়ে! আমি তো মনে মনে হাসতে হাসতে একশেষ! অন্যের বন্ধুর দিকে নজর দেয়ার মতো মানুষ তো আমি নই! অগ্রজ লেখক খানিক বাদে বাদেই আমার ওড়না হাত দিয়ে ঠিক করে বুক ঢেকে দিচ্ছিলেন। কিন্তু দামাল-হাওয়া তাঁর শাসন মানবে কেন? সেও দ্রুত বইতে লাগল আর আমার ওড়নাও সরতে লাগল। কী এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! [আহারে! আপনা মাংসে হরিণা বৈরী! বুকের ওড়না সরিয়ে দিয়ে কাউকে কোনোদিন কব্জা করতে হয় নাই। আল্লাহ আমারে বাঁচাইছেন!
ওই কবি বন্ধু আমাদের নিয়ে চললেন শহর দেখাতে। আমরাও চললাম উনার পিছুপিছু। অলিগলি-রাজপথ ঘুরতে ঘুরতে আমাদের নিয়া উঠালেন ট্রামে! আমি উঠতে চাইছিলাম না। [কারণ আমার মনে মনে পণ ছিল—যে ট্রামের নিচে আহত হয়ে এত বড় একজন কবির প্রস্থান হয়, সেই ট্রামে আমি কোনোদিনই চড়ব না।
চলন্ত ট্রামের তলায় পড়ে আমার দেহটিই যেন ক্রমে থেতলে যাচ্ছে!
এখন ট্রাম চলতে শুরু করল। উনারা দুই জন বসেছেন পাশাপাশি। আমি উনাদের সামনের আসনে। হাওয়ার টানে ভেসে আসতে লাগল উনাদের প্রগাঢ়-কণ্ঠস্বর।
এই শুনেছ [অমুক, এই ট্রামের নিচে পড়ে না একজন কবি মারা গেছে।
তাই নাকি। কী বল এসব অনির্বাণ?
হ্যাঁ গা, সত্যি বলি। তুমি জানো না?
না। না তো। সত্যি জানি না।
বলেই উনি মাথার এলো খোঁপাটা এলিয়ে দেন কবির কাঁধে।
[ইনি কিন্তু সব্যসাচী লেখক! গদ্যেপদ্যে ইনার নাকি সমান দখল! বাংলাদেশের বড় কবি ইনি, সার্ক লিটফেস্ট অ্যাটেন্ড করে ফিরেছেন!
ট্রামে গতি হঠাৎ যেন বৃদ্ধি পায়। আমি আর শুনতে চাই না। নাকি তীব্র বাতাসের ঝাপটা আমাকে কিছুই শুনতে দেয় না!
আমার বোধ হতে থাকে, চলন্ত ট্রামের তলায় পড়ে আমার দেহটিই যেন ক্রমে থেতলে যাচ্ছে!
অতঃপর সার্ক লিস্টফেস্টে যাওয়া থেকে আমি বিরত থাকি। অজিত কৌরজির কোনো মেইলেরই আর রিপ্লাই করি না। কারণ যাঁদের সাথে যেতে হবে, তাঁদের হীন-আচরণ, স্বার্থপরতা, ভয়ানক কৃপণতা, উদারতার নামে অশ্লীলতা দেখবার কোনো সদিচ্ছাই আমার নাই! আমি সব ধরনের অসুস্থতা থেকে পালিয়ে বেড়াতে চাই। পালিয়ে বেড়াতে চাই…!