অমৃতা প্রীতমের কবিতা

অমৃতা প্রীতম তাঁর জীবনীগ্রন্থ ডাক টিকিট-এর ভূমিকায় নিজের রচনাগুলোকে তিনি অবৈধ সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। লিখেছেন, 'জগতের সত্য তাঁর স্বপ্নের সঙ্গে যে প্রেমের সম্পর্ক গড়েছিল, সেই সম্পর্কের অবৈধ সন্তানগুলোই হলো তাঁর সমস্ত রচনা। আর সেই রচনাগুলোই নাকি সাহিত্যিক সমাজের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।' আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যে অমৃতা প্রীতম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি নাম। তাঁর বৈপ্লবিক চেতনা ও দৃঢ়তায় তিনি সমাজকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর বিদ্রোহী মনোভাবের কারণে নিজেই বিধ্বস্ত হয়েছেন। কোনোরকম আড়াল না করে নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করেছেন, অকপটে সত্যকে স্বীকার করেছেন। আর এটাই হলো তার সাহিত্যিক জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য। নানা সময়ে বিতর্কিত হয়েও ভারতীয় সাহিত্যে তিনি আজও অসম্ভব জনপ্রিয়।

অবিভক্ত পাঞ্জাবের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৯ সালের ৩১ আগস্টে জন্ম নেওয়া অমৃতা প্রীতম সাহিত্যের সব শাখায় সমানভাবে বিচরণ করলেও তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে কবিতাই। আজ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় কুড়িটি। ১৯৩৬ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ অমৃত লেহরেঁ প্রকাশিত হয়। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর তিনি লাহোর থেকে ভারতে চলে আসেন। শুনেহুরে বা সংবেদন কাব্যগ্রন্থের জন্যে তিনি ১৯৫৬ সালে আকাদামি পুরস্কার পান। ১৯৫৭ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান কাগজতে ক্যানভাস বা কাগজ ও ক্যানভাস কাব্যগ্রন্থের জন্যে। এছাড়াও তিনি যেসব আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন, তা প্রায় সবই কবিতার জন্যে।

২০১৯ সালে বাংলাট্রিবিউনের সাহিত্য সাময়িকীতে হিন্দি কবিতা আর্কাইভ 'কবিতা কোষ' থেকে চয়ন ও অনূদিত ৮ টি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। কবির ১০২তম জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে পরস্পরের পাঠকদের জন্য রইল হিন্দি থেকে নতুন পাঁচটি কবিতার অনুবাদ।


টুকরো রোদ

সেদিনের কথা মনে আছে—
যখন রোদের এক টুকরো সূর্যের আঙুলে করে
অন্ধকারের মেলা দেখতে গিয়ে
ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল।

ভাবছি ভয় আর একাকিত্ব যেন
কোথাও এক সুতোয় গাঁথা
আমি তাদের কিছুই নই অথচ
সেই ছোট বাচ্চাটি আমার হাত ধরে আছে।

তুমি কোথাও নেই
কিন্তু আমার হাতকে স্পর্শ করছে যেন
একটা কোমল উষ্ণ নিশ্বাস
না ঠিকমতো হাত চেপে ধরছে, না ছেড়ে দিচ্ছে।

অন্ধকারের কোনো কিনারা নেই
মেলার শোরগোলেও যেন নিস্তব্ধতার ছায়া
আর তোমার স্মৃতি এমন যেন
অন্ধকারে এক টুকরো রোদ।


দুর্ঘটনা

একটা অন্তহীন করাত হাসছে
ঘটনাগুলোর দাঁত সূচাল ছিল
হঠাৎ আকাশের চৌকি থেকে
একটা পায়া ভেঙে গেল
কাচের সূর্য পিছলে গেল

চোখে পাথর ঝরে পড়ছে
আর দৃষ্টি রক্তাক্ত হতে লাগল
কিছুই দেখা যাচ্ছিল না
পৃথিবী হয়তো এখনো একটা বস্তি


সিগারেট

এটা আগুনের গল্প তুমিই শুনিয়েছিলে
এটা জীবনের গল্প যেটা তুমিই জ্বালিয়েছিলে

আগুন তুমি দিয়েছ হৃদয় এখনো পুড়ছে
সময় কলম ধরে কোনো হিসাব যেন লিখছে

চৌদ্দ মিনিট হলো এর শেষ তো দ্যাখো
চৌদ্দ বছর হলো এই কলমকে জিজ্ঞেস করো

আমার শরীরে তোমার নিশ্বাস বইছে
পৃথিবী সাক্ষ্য দেবে ধোঁয়া এখনো উঠছে

বয়সের সিগারেট জ্বলে গেল
আমার প্রেমের সুবাস
কিছুটা তোমার নিশ্বাসে
কিছুটা হাওয়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল,

দ্যাখো এটা শেষ টুকরো
আঙুল থেকে দাও ফেলে
যদি আমার প্রেমের শিখা
তোমার আঙুল না ছুঁয়ে ফেলে


আত্মমিলন

আমার বিছানা প্রস্তুত
জুতো আর জামার মতো
তুমি তোমার শরীরও খুলে ফেল
ওদিকটায় টেবিলের উপরে রাখো
বিশেষ কিছু না—
নিজ নিজ দেশের রীতি!


খালি জায়গা

শুধু দুটো দরজা ছিল
একটা আমাকে আর তাঁকে
উচ্ছেদ করেছে
আর দ্বিতীয়টাকে আমরা
ছেড়ে এসেছি

নগ্ন আকাশের নিচে আমি যতক্ষণ
শরীরের প্রেমে ভিজে যাচ্ছিলাম
সে ঠিক ততক্ষণ
শরীরের প্রেমে গলে যাচ্ছিল।

তারপর পুরো বছরের নেশা
বিষের মতো পান করে
সে কম্পিত হাতে
আমার হাত চেপে ধরল
চলো! সময়ের মাথা
নুইয়ে দিয়ে আমাকে বলল
ঐ দ্যাখো—ঐখানে
সত্য আর মিথ্যের মাঝখানে
কিছু খালি জায়গা পড়ে আছে

 

অজিত দাশ

অজিত দাশ

কবি ও অনুবাদক। জন্ম ১৯৮৯, কুমিল্লা। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা...বিস্তারিত