১. গেটে দাঁড়াতেই ক্রিং ক্রিং শব্দে সামনে এসে ব্রেক কষল ছেলেটা, ‘মামা ওডেন।’ দরাজ গলার সাথে তার উদার হাসিও আহ্বান জানায়। তানিয়া যাবে আবাসিক হলে; জানে সে। ভাড়ার কথা বলতে হয় না এখানে। রেটভাড়া। রিকশা, অটোরিকশা, সিএনজি ভাড়া থেকে শুরু করে ফটোকপি কিংবা স্পাইরাল বাইন্ডিংও এখানে ছক-কাটা।
রিকশায় উঠে বসে তানিয়া। আজ রোদ উঠেছে চড়া। হুড দিতে মন চায় না, দমবন্ধ-দমবন্ধ লাগে। কিন্তু রোদের আঁচে বাধ্য হয়ে হুড তুলতে যায় সে। ব্যাপারটা তার সাথে প্রায়ই ঘটে, চালককে বলার আলসিতে নিজেই হুড ওঠাতে যায়, আংটাটা শক্তির অভাবে পুরো চাপতে পারে না বলে হুডটা লাগে না ঠিকমতো; পড়ে যাওয়ার ভয় দেখাতে থাকে বারবার। চালক টের পেলে নেমে এসে ঠিক করে দিলে স্বস্তি, নয়তো এই বেহাল হুড সামলাতে গিয়ে অস্থির থাকতে হয় তাকে। আজকের চালক অবশ্য দারুণ স্মার্ট! তানিয়া হুড তুলতে চাচ্ছে টের পেয়ে শুরুতেই নেমে এসে হুড তুলে দেয়। ভালো লাগে তানিয়ার। রোদের সাথে আজ বাতাসও আছে, রিকশার উল্টোগতিতে গায়ে এসে মোলায়েম ধাক্কা দিতে থাকে। হুড ফেলে দিতে মন চায় তার। খোলা চুল উড়িয়ে গাইতে ইচ্ছে করে, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে...’। হুড তোলা অবস্থাতেই অবশ্য সে গুনগুন করতে শুরু করে দিয়েছে অস্পষ্ট সুরে। কিন্তু উশখুশ রিকশাওয়ালার তাতেও বুঝি আপত্তি। ‘পাগল আমার মন’-এ নিজের নাকটা সেঁধিয়ে দেয় সে।
—সুপ্তি মামায় আমারে তার গাওয়া দুইটা গান দিছে শেয়ারইটে...
সম্বিত ফিরে তানিয়ার। ভার্সিটি স্টুডেন্টের সাথে রিকশাওয়ালার গান বিনিময় হচ্ছে শেয়ার ইটে! তাও আবার যে সে না, সুপ্তির সাথে! আমরা তাহলে সত্যিই প্রগতিশীলতার পথে হাঁটছি! পরপরই নিজের কথা ভাবে সে। আল্লা বাঁচাইছে! জোরে গায় নাই। ছেলেটার কানে তার গলা পৌঁছালে নিশ্চয়ই হেসে খুন হতো। কোথায় সুপ্তির গলা আর কোথায় তার! আগরতলার সাথে চকির তলাও নয়, একেবারে পায়াভাঙা বেঞ্চের তলা।
—ভালো তো।
উদাস গলায় উত্তর দেয় তানিয়া।
—আমিই চাইছিলাম। হেইদিন জামতলার অনুষ্ঠানে গান গাইল না আফায়, হেইগুলা।
— ও, আচ্ছা ...
কে সিরাজ, কে ক্লাইভ তা নির্ধারিত হয় নি কখনও; কিন্তু উভয়পক্ষে মীরজাফরের সংখ্যা যে একাধিক; এটা নিশ্চিত।
প্রেসার দিয়ে গলার নিষ্প্রভতা মুছতে চায় তানিয়া। কিন্তু দুপুরে পেটে কিছু পড়ে নি বলেই কি, শক্তি পায় না তেমন। আকরাম স্যারের ক্লাস আজ কাহিল করে দিয়েছে, একদিনেই যেন সমস্ত সিলেবাসের শেষ করতে হবে! ক্লাসের সবাই মনে মনে গোষ্ঠী উদ্ধার করেছে স্যারের। তাদের ব্যাচের অনেকেই যুক্তি করে প্রায়ই, স্যার-ম্যামদের বলবে, পরীক্ষার আগে হুড়াহুড়ি না করে আগ থেকেই যেন সব একটু একটু করে শেষ করা হয়। টানা ক্লাস মনোটোনাস লাগে, শেষ পর্যন্ত মাথায় কিছুই থাকে না। রিকশাওয়ালা এইবার বলে, ‘সুপ্তি মামায় কি টেলিভিশনেও গান গায়?’
—আমি ঠিক জানি না। তুমি সুপ্তিরেই জিজ্ঞাসা কইরো, মামা!
একটু কি ঝাঁজ উঠে গেল গলায়? তানিয়া শঙ্কিত হয়। ‘উঠলে উঠুক। এত চিন্তা করার টাইম নাই।’ নিজেকে শোনায় যেন। যাত্রীর অনাগ্রহ টের পায় রিকশাওয়ালা; তাদের কথা আর এগোয় না।
রিকশাওয়ালার নাম আজহার। প্রথম যোগাযোগেই নামটা জানতে পেরেছিল তানিয়া। ধমকে বলেছিল, 'কী নাম তোমার?'
থতমত খাওয়া উত্তর, ‘আজহার।’
‘শোনো আজহার, বেশি বাড়াবাড়ি কইরো না। এক্কেবারে কমপ্লেন করে দেবো প্রক্টর অফিসে!’
ব্যাপার তেমন কিছু না, কোনও এক প্যাসেঞ্জারের কাছ থেকে রেটভাড়ার বাইরে বেশি ভাড়া নিচ্ছে সে, এমন ভেবে ধমকটা দিয়েছিল তানিয়া। রিকশাওয়ালা, চায়ের দোকানিদের ক্যাম্পাসের অন্যান্যদের মতো তানিয়াও মামা ডাকে, কিন্তু সেদিন আজহারের নাম জানতে চেয়েছিল কেবল তাকে ভড়কে দেবার জন্য। যদিও ভুল তানিয়ারই ছিল কিন্তু তখন সেটা তার মাথায় ছিল না। এদিকে রিকশাওয়ালাও নিজের দোষহীনতায় ওয়াকিবহাল থাকলেও, তানিয়ার চাপার জোর আর কনফিডেন্সের তীব্রতায় খানিক কনফিউজড হয়ে গিয়েছিল। ভয় না পেলেও কথা বাড়ায় নি আর। পরদিনই কিন্তু তানিয়া নিজের ভুল টের পেয়েছিল; আজহার বেশি নেয় নি, দূরত্বের হিশেব কষতে সে-ই গণ্ডগোল করে ফেলেছিল। এই নিয়ে কিছুদিন গ্লানিতে ভুগে ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিল তানিয়া। বহুদিন পর আজহারের রিকশায় উঠলে আজহারই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ‘আমারে চিনছেন নি মামা? ওই যে হেইদিন ধমক মারছিলেন!’
চকিতেই ঘটনা মনে পড়ে যায় তানিয়ার। দ্রুত বলতে থাকে, 'সরি মামা, সরি! তুমিই ঠিক ছিলা সেইদিন। রুমে গিয়ে মনে পড়ছিল পরে। যেই টাকাটা লস হইছে সেইটা দিয়া দিই?'
এতটা বোধহয় আশা করে নাই আজহার; এবারও খানিক কনফিউজডই হয় সে।
রিকশা কিংবা অটোরিকশায় উঠলে মাঝেমাঝে টের পাওয়া যায়, কোনও কোনও চালক কথা বলতে চায়। না বলতে পারলে ঢ্যামনামো করে। অস্বাভাবিক লাগে না তানিয়ার। ক্যাম্পাসের প্রথম সারির নৃত্যশিল্পী সে। মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠান সবার জন্যই উন্মুক্ত, তার উপর সে দেখতেও নেহায়েত মন্দ না । তাই তার ক্ষেত্রে কিংবা তার মতো ক্যাম্পাসের অন্য ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এমন হওয়া নতুন নয়। সিনিয়র-জুনিয়র অনেক বড়ভাই-ছোটভাই থেকে শুরু করে ফটোকপির দোকানের অপারেটরও তাদের চেনে; কেউ কেউ আগবাড়িয়ে বিগলিত ভঙ্গি করে। পাত্তা না পেয়ে কেউ আবার দুর্নাম রটায়। আগে এমন আলগা খাতিরে আত্মপ্রসাদ লাভ করত তানিয়া, দুর্নামেও মন খারাপ হতো। কিন্তু ইদানীং এগুলোর কোনও কিছুই তার মানসিকতায় রেখাপাত করে না তেমন, কেবল সুপ্তির ব্যাপারটা ছাড়া।
সুপ্তি আর তানিয়া একই বিভাগেরই নয় শুধু, একই ব্যাচেরও। ক্যাম্পাসে তাদের চতুর্থ বছর চললেও দুজনের মধ্যে ভাব হয় নি আজও, ভবিষ্যতে হবে এমন সম্ভাবনাও দুর্বল। ভর্তি হওয়ার পর থেকে ততদিন পর্যন্ত তারা দুজন একটা বাক্যও বিনিময় করে নি যতদিন না বিভাগের নবীন বরণের উদ্যোগ শুরু হলো। এর আগ পর্যন্ত তানিয়া সুপ্তি একই ক্লাসে ক্লাস করেছে, কখনও কখনও পাশাপাশি বসেছেও বোধহয়, কিন্তু আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যায় নি কেউ। তাদের মধ্যে অবন্ধুত্বের অপ্রয়োজনীয় মাংসপিণ্ডটা দৃষ্টিকটু হলেও ব্যথাহীন নির্বিষ টিউমার হিশেবেই শোভা পাচ্ছিল এতদিন। কিন্তু নবীনবরণ উপলক্ষ্যে বিভাগের মঞ্চনাটকের জন্য টুকটাক কথা বলতে বাধ্য হতে হলে ধীরে ধীরে যন্ত্রণাদায়ক কর্কটরোগে রূপ নিতে শুরু করে সেটা। সুপ্তি দেখতে সুন্দর, চমৎকার তার গানের গলা। টুকটাক নাচতে পারে, অভিনয়টাও দারুণ জানে। কিন্তু শুধু নাচের পারদর্শিতার জন্যেই 'চণ্ডালিকা'র কেন্দ্রীয় চরিত্র পেয়ে গেছে তানিয়া, এই সত্য মানতে নারাজ সুপ্তি নাটক ছেড়ে দিতে গেলে নির্দেশক মাহমুদা ম্যামের ধমক খেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। কিন্তু সুপ্তির সুপ্ত রোষ রিহার্সালেই অবমুক্ত হচ্ছিল বিভিন্ন ফর্মে। ‘ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছি! ও যে চণ্ডালেরও ঝি!’ লাইনদুটোতে চণ্ডালিনীরূপী তানিয়াকে উদ্দেশ করে সুপ্তির অভিনয় পারঙ্গমতাতেই ঝলকে উঠছিল তানিয়ার প্রতি তার বিদ্বেষ। প্রতিদিন রিহার্সাল শেষে মনটা বিষিয়ে উঠতে শুরু করে তানিয়ার। ইচ্ছে করত ম্যামকে গিয়ে বলে, চরিত্রটা যেন সুপ্তিকেই দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু পরক্ষণেই কী যেন ঝাট করে উঠত মগজে, ‘কেন দেবে! সে কি চেয়েচিন্তে চণ্ডালিনী হয়েছে?’
কেবল নাটক নয়, টার্ম আর ফাইনালের রেজাল্টেও সুপ্তি-তানিয়ার উনিশবিশ অবস্থা তাদের রণপ্রস্তুতি শনৈশনৈ শানিয়ে তুলছিল। টানা চার বছর ধরে বিভাগে আর ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রোগ্রামে তানিয়া-সুপ্তির টেক্কা-তুরুপ লড়াই চলছে তো চলছেই। এমনিতে পরস্পরকে নিয়ে ক্যাম্পাসের চটুল ব্যাপারগুলোয় তারা আহ্লাদে গদগদ হতো মনে মনে। বিশেষ করে ফেসবুকের কনফেশন পেজে তাদের দুজনকে উদ্দেশ করে শতেক নাগরের প্রেম নিবেদনে মজা নিত তারা, কাউন্ট করত কে কার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু যে-ই দুই ব্যাচমেটের একজন আরেকজনের প্রতিপক্ষ হয়ে আবির্ভাব হতো, তখনই ঘটত বিপত্তি। মোবাইল ফোন হাতে আবাসিক হলের অলস বিছানাগুলো তখন পলাশির আম্রকানন। যদিও কে সিরাজ, কে ক্লাইভ তা নির্ধারিত হয় নি কখনও; কিন্তু উভয়পক্ষে মীরজাফরের সংখ্যা যে একাধিক; এটা নিশ্চিত।
মোবাইলটাই যত নষ্টের গোড়া। কেন এত খবর বয়ে আনে! আছাড় মেরে সমস্ত সংবাদের সমাপ্তি টানতে মন চাইত তাদের। বিষক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়েছিল তখন, যখন ফেসবুকের স্ট্যাটাসে তানিয়াকে লক্ষ করে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গের আভাস দিয়েছিল সুপ্তি। সেবার তানিয়া মহুয়া হয়েছিল। নদের চাঁদরূপী ছেলেটা বিভাগেরই দুই বছরের জুনিয়র ফাহমিন। বহু কসরত স্বীকারের পর ফাহমিন লাইনে এসেছিল। শক্ত হয়ে দাঁড়াতে বললে, লতার মতো দোল খায়। আর যেখানে তাকে কলাপাতার মতো হিন্দোল তুলতে বলা হয় সেখানে সে মরাকাঠ। এইসব কারণে রিহার্সেলে প্রচুর সময় লাগছিল তাদের দুজনের। কখনও কখনও বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্তও ক্লাসরুমে ঝঙ্কার তুলেছে তানিয়ার নূপুর। এই নিয়েই স্ট্যাটাসে খোঁচাটা মেরেছিল সুপ্তি। ‘রহিম রূপবান’। দুটি মাত্র শব্দ। কিন্তু তা-ও নজর এড়ায় নি অনেকের। এর মর্মার্থ বোঝার ঘিলুও তাদের কম নয়। নিজেরা বুঝেছে; দায়িত্ব মনে করে কেউ কেউ বুঝিয়ে দিয়েছে তানিয়াকেও। যদিও সেটার প্রয়োজন ছিল না, ফেসবুকে গেলেই তানিয়া নিজেই দেখতে পেত সব। কিন্তু ডিপার্টমেন্টের ওপেন সিক্রেট তানিয়া-সুপ্তিকাণ্ড। দুজনেরই প্রিয়-অপ্রিয় পাত্র-পাত্রী আছে। এরা তাদের কর্তব্য পালনে কোনও প্রকার আলস্য রাখে না। তানিয়ার কানে যখন ঘটনা তোলা হলো তখন সে ‘মরুক গা! আমারে এসব বলতে আসবি না’ বললেও চুপিচুপি সুপ্তির প্রোফাইলে গিয়ে সরেজমিনে সব দেখে নিয়েছে। কোনও কমেন্ট নেই। লাইক আছে কিছু, তারও বেশি হা-হা রিঅ্যাক্ট। তানিয়া চিনেছে এই নোটিশকারীদের। এরা সবাই সুপ্তির সখাসখীর দল; কলসি কাঁখে ওর পেছন পেছন চলাই জীবনমঞ্চে এদের প্রধান ভূমিকা। তবে হ্যাঁ, সুপ্তি দারুণ প্রাণোচ্ছল, একসাথে পাঁচটা তানিয়ার এনার্জিও হার মানবে সুপ্তির কাছে। স্যার-ম্যামরাও তার ছেলেমানুষি আহ্লাদকে ব্যাপক প্রশ্রয় দেন। অনার্সের ফাইনাল ইয়ারে এসেও এমন শৈশববিভোর থাকতে পারাটা চাট্টিখানি কথা নয়। এই শিশুসুলভ অস্থিরতার কারণে যার-তার উপর যখন-তখন রাগ ঝেড়ে ফেলে বলে সুপ্তির সুনাম আর দুর্নাম দুই-ই আছে। এতদিন এর দুর্নামটুকুতেই উপশম খুঁজত তানিয়া, নিজ থেকে অস্ত্র তাক করতে এগিয়ে যেত না। কেবল বিউগল বাজানোর মধ্যেই সে যুদ্ধের সব প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ রেখেছিল, অস্ত্রের ঝনঝননি ছিল না সেখানে। কিন্তু সুপ্তির এই স্ট্যাটাসে তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল অবশেষে। পাল্টা স্ট্যাটাসের কামান দাগতে সময় নিয়েছিল মাত্র তিন ঘণ্টা। গোলাটা ছুড়তে পেরে তাৎক্ষণিক সেই লেভেলের আরাম পেয়েছিল সে!
দুই ব্যাচমেটের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হলো কিছুদিন। কিন্তু দুজনেরই প্রযোজিত কার্যক্রম চলছিল আড়ালে-আবডালে। এ-তার নামে কুৎসা রটায় তো, সে ওগুলোকে আরও ডালপালা গজিয়ে প্রতিপক্ষের নামে চালান করে দেয়। বাণ-মারা আর বাণ-খাওয়ার এই ভয়ংকর খেলার আরাম-ব্যারামে ক্লান্ত হয়ে তানিয়া পরে ভেবেছে এইবার বুদ্ধের শরণ নিতে হবে। সুপ্তি-কাঁটা থেকে মুক্তির জন্য নির্বাণ লাভ ছাড়া গত্যন্তর নেই। নির্বাণের একমাত্র উপায়, তার আশেপাশে এই নামে কেউ আছে এটা বেমালুম ভুলে যাওয়া। সেই মতোই কাজ করা শুরু করেছিল সে। সবার আগে ফেসবুকে সুপ্তিকে আনফলো করে সে; অন্যদের কড়া স্বরে জানিয়ে দেয়, সুপ্তির কোনও খবর যেন তার কানে তোলা না হয়। সেই থেকে বন্ধুরা চুপ মেরেছে বটে; তবে ওদের টক ঢেঁকুর লুকানোর চেষ্টা টের পায় তানিয়া। সুপ্তি-তানিয়া তাহলে এক সার্কাসে পরিণত হয়েছিল এদের কাছে! রাগে গজগজ করতে করতে অ্যাসাইনমেন্টে মন দেয় তানিয়া। ‘এইসব আজেবাজে চিন্তায় পড়ালেখার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে’ এমন ভেবে লিকেজ মেরামতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এমন কসরত বুঝি সুপ্তিও করে, বহুদিন তার কোনও পোস্টে সুপ্তির খোঁচা টের পায় না তানিয়া, আগে যেমনটি তানিয়াও করত মাঝেসাঝে।
সুপ্তিকে নিয়ে কানভাঙানি মোটামুটি বন্ধ হলে জীবন কিছুটা স্বস্তির হয় তানিয়ার। কিন্তু সম্পর্কের এই অলস বিষনাগেরা শীতঘুমে গেলেও তাদের সাক্ষাতে সেগুলো আড়মোড়া ভাঙে প্রতিবার। একটা রাজ-গোখরা হলে অন্যটা কালকেউটে। যদিও লালাবাই শুনিয়ে তাদের ঘুম পাড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রত্যেকে। তবু কথা বলার নিষ্প্রাণ ভঙ্গি আর ‘তুমি’ সম্বোধন তাদের দুজনের নোমান্সল্যান্ডে কাঁটাতারের বেড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই অবস্থায় রিকশাওয়ালা মামা যখন কথা বলার বিষয় হিশেবে সুপ্তিকে বেছে নেয় তখন তানিয়ার অস্বস্তিকে দোষ দেওয়া যায় না। অথচ তানিয়া এমন নয়; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীর মতোই স্বভাব তার। সামাজিকতায় কোনও প্রেজুডিস নাই। প্রায়ই সে চালকদের সাথে কথা বলে। মাঝেমাঝে আগ্রহ নিয়ে নিজে থেকেই বলে। কাজের খোঁজে একেক জায়গা থেকে একেকজনের আগমন ঘটেছে এই মফস্বলে। কত কিছু জানা যায় এইসব আলাপ-সালাপে।
ছেলেগুলা এমন বদ ক্যান? মেয়েদের যেসব গুণ তাদের আকৃষ্ট করে, সেগুলোই প্রেম চলাকালীন এমন বিষ হয়ে যায় ক্যান!’
আজহারের রিকশা, রিকশা তো না, নাসার রকেট; পেছনে এইমাত্র আগুন ধরিয়ে দিয়েছে যেন কেউ। তানিয়া যাবে বান্ধবীর মেসে, গ্রুপ স্ট্যাডি করতে। তার আগেই এই মামা তাকে নিয়ে খাদে পড়ে কি না, ভয় পায় সে। এদিকের রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে আজ ছয় মাস যাবৎ। একটু পরপরই বিশাল সব গহ্বর তাদের ছয় মাসের ক্ষুধা নিয়ে হাঁ করে আছে। একটু এদিক-সেদিক হলেই গিলে নেবে। রিকশার গতির সাথে তাল মিলিয়ে রিকশাওয়ালার মুখও আজ অপ্রতিরোধ্য।
—হেইদিন সুপ্তি মামায় গান গাইল না, অনুষ্ঠানে!
—হুম।
অনিচ্ছায় উত্তর দেয় তানিয়া।
—গলা হুনছেন নি!
‘এত দুঃখ দিলি বন্ধুরে, ও বন্ধু, আমি তোর প্রেমেরই দেওয়ানারে দেওয়ানা মন জানে আর কেহ জানে না...’
আজহার গেয়েই ফেলে লাইনদুটো।
—আহা, সুরেই কান্দন চইলা আসে।
স্বগতোক্তি করে সে।
যদিও সেদিনের সুপ্তির কণ্ঠের সাথে তুলনীয় নয়, তারপরও ভালো লাগে তানিয়ার। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে, প্রসঙ্গ সুপ্তি। ভেংচি কাটে সে মনে মনে, ‘ভালো তো, ডাক ছাইড়া কান্দো। মানা করছে কেডায়!’ মুখে অবশ্য হ্যাঁ-হুঁ চালিয়ে যায়। যাত্রীর অনীহা টের পেয়ে চুপ মেরে যায় রিকশাওয়ালা।
২. কিছুদিন আগে সুপ্তির ব্রেকাপ হয়েছে এক ব্যাচ সিনিয়র ফিজিক্সের মাহিনের সাথে। ব্রেকাপের কারণ মারাত্মক! মাহিন যে ভয়ংকরভাবে বাবায় আসক্ত সেটা জানত না সে। ইয়াবার লোকাল নাম বাবা। ছেলেদের হলগুলোর কোনও কোনও রুম যেন মাদকের আখড়া! মাঝে প্রশাসন একটা উদ্যোগ নিয়েছিল ‘মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স’-এ নিজেদেরও অবদান রাখতে। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল নিয়ন্ত্রণ করবে এই সাধ্যি কার, ধৈর্যও বুঝি নাই। কিছুদিন অবশ্য লোকাল পত্রিকা আর ফেসবুক সরগরম ছিল প্রশাসনের উদ্যোগে। প্রক্টর অফিসেও চাঞ্চল্য ছিল বেশ। আবাসিক হল থেকে কিছু ছাত্রকে বহিষ্কার কর্মযজ্ঞের ফটোসেশন চলল পরপর কয়েক সপ্তাহ। তারপর যেইকে সেই। এখানকার এখনকার ক্রেজ ইয়াবা আর আদিবাসীদের তৈরি বাংলা মদ। গাঁজার চাহিদা অবশ্য আগাগোড়া সমান। মাহিন ইয়াবায় আসক্ত ছিল। মাহিনের নেশা করার ব্যাপারটা টের পেতেই বেশ সময় লেগে যায় সুপ্তির। এরপর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে সে বয়ফ্রেন্ডের নেশা ছাড়াতে। এজন্য হল ছাড়িয়ে শহরের মেসেও তুলেছিল তাকে। কিন্তু শহরের মামাত ভাইয়েরা যেন কোল পেতে বসে ছিল ফুফাত ভাইয়ের অপেক্ষায়। মাহিন যেতেই গালিচা পেতে দেয়া হয় সেখানে। অতএব ফলাফল শূন্য। প্রেমিকের নেশা ছোটাতে ব্যর্থ হয়ে সুপ্তি যখন নিজের গেরো আলগা করতে শুরু করে মাহিনের তখন মরিয়া দশা! নেশার দমকে আবেগের সুরাপাত্র টইটুম্বুর হয়ে উঠলে সুপ্তির জন্য জান কোরবান করতে এক পায়ে খাড়া হয়ে যায় সে। আল্লা-খোদা, চন্দ্র-সূর্য, মা-বাবা এমনকি মাহিন-সুপ্তির সম্পর্ককে সাক্ষী রেখে মাদক ছাড়বার কঠিন শপথ গ্রহণ করে শেষবারের মতো সুযোগ চায়। কিন্তু সকালের প্রতিজ্ঞা নেশার টকের কাছে বিকেলেই ফিকে পড়ে গেলে মোক্ষম বুদ্ধি বাতলায় মাহিন। আম-ছালা দুটোই ঠিক রাখতে ’কনভিন্স এবং সারেন্ডার’ দুই ভঙ্গিকেই গুলে নিয়ে শেষমেশ সুপ্তিকে আশ্বাসের অমোঘবাণী শোনায়, ‘তুমি আমার সামনে থাকলে যতটা না তোমারে পাই, বাবা খাইলে তোমারে তারচেও বেশি পাই।’
কী মর্মন্তুদ ডায়লগ! না, চিড়ে আর ভেজে নি তবুও। তাছাড়া নেশা ছাড়াও দুই বছর ধরে মাহিন-সুপ্তির প্রেম সম্পর্কের খুঁটিনাটিও সুপ্তিকে হুঁশিয়ার করেছে। সুপ্তির গান নিয়ে মাহিনের খোঁচাখুঁচিও অসহ্য লাগতে শুরু করে তার। সুপ্তির গানে অডিয়েন্স জমে যাচ্ছে, ব্যাপারটা একাবারে চক্ষুশূল ছিল মাহিনের। সুপ্তির একদিনের জমানো স্টেজ পারফরম্যান্স, মাহিনের তিরিশ দিনের গুতানোর সাবজেক্ট। কানে তালা দেওয়ারও উপায় নাই! অথচ, ভাবতে অবাক লাগে! মুক্তমঞ্চে তানিয়ার গান শুনেই প্রেমে পড়েছিল মাহিন। ‘আচ্ছা, ছেলেগুলা এমন বদ ক্যান? মেয়েদের যেসব গুণ তাদের আকৃষ্ট করে, সেগুলোই প্রেম চলাকালীন এমন বিষ হয়ে যায় ক্যান!’
সব দিক বিবেচনা করে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তেই স্বস্তি মিলেছিল সুপ্তির।
কিন্তু সুপ্তির স্বস্তিতে মাহিনের স্বস্তি মিললে তো! শুধু কথায় চিড়ে না ভিজলে, চিড়ে জোর করে ভেজাতে গিয়ে তালগোল পাকাবার সিদ্ধান্ত নেয় মাহিন। তেমনই একদিন বিকালে সুপ্তি আর্টস ফ্যাকাল্টির বাগান থেকে ছেঁড়া সূর্যমুখী কানে গুঁজতে গুঁজতে হলে ঢুকতে গিয়ে দেখে গেটে মাহিন দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই সাথে থাকা রোমানা আর নীতু সুযোগ বুঝে চম্পট দিয়েছে। পরে বলবে, ‘তোদের ব্যাপার। আমরা কী করব!’
‘ফাজিলের দল!’ মনে মনে গজগজ করতে করতে ওপরে তাকায় সুপ্তি। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়, নয়তো দোতলার বারান্দা থেকে সিনেমা ক্লাইমেক্স দেখার জন্য আধ-ডজন সখীসহ গলা বাড়িয়ে থাকবে কেন তানিয়া? এমন মাগনা সিনেমা দেখার সুযোগ ক্যাম্পাসে হরহামেশা পাওয়া গেলেও দর্শকের উৎসাহের কমতি থাকে না, তার উপর সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র যদি হয় চিরশত্রু তাহলে মজা না দেখে থাকে কে! সামলে রাখা কালকেউটেটাকে আলগোছে ছেড়ে দেয় তানিয়া, ‘খা খা খা বখখিলারে খা!’ ঠোঁট একটু কেঁপে উঠল কি সুপ্তির! তানিয়ার মনে তৃপ্তির ময়ূর পেখম নাচাতে থাকে ক্ষণে ক্ষণে। ‘আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে...!’ চোখাচোখি হতেই সুপ্তির দিকে ‘আজ জমবে দারুণ মজা!’ মার্কা নিষ্ঠুর হাসি ছুড়ে দেয় তানিয়া।
সুপ্তি-মাহিন প্রেমকাহিনি ভার্সিটির হট টপিক। গল্পের গরু ছাত্রছাত্রীদের মেসে মেসে গিয়ে গোবর ছড়িয়ে আসছে প্রতিদিন। কাহিনি আর সংবাদ মিলেমিশে খিচুড়ি; গন্ধ নাকি শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। ‘মাহিন নেশা ছাড়ল কি!’ ‘সুপ্তি নাকি চড় মেরেছে মাহিনকে!’ ‘মাহিন যে ডেঞ্জারাস ছেলে, সুপ্তি এবার শেষ! অ্যাসিড মারবে বুঝি! নেশাখোররা সব করতে পারে।’ ‘আচ্ছা সুপ্তি কি প্রেগন্যান্ট! সেদিন বেসিনের সামনে “ওয়াক-ওয়াক” করল, শুনলি না!’ বলবে না বলবে না করেও এইসব খবর তানিয়া নিজেই রসিয়ে রসিয়ে বলেছে অনেককে। বলতে পেরে দারুণ মজা লেগেছে তার। সুপ্তি-মাহিনকে নিয়ে ঈর্ষান্বিত ছিল কি সে? ‘তার কেন মাহিনের মতো এমন জবরদস্ত হ্যান্ডসাম কেউ জুটল না’ নিজের মাঝে এমন কোনও হাহাকারও টের পেয়েছিল কি তানিয়া? না তো! সে কখনোই মাহিনকে স্পেশালি ভাবে নি। ইনফ্যাক্ট সুপ্তি মাহিনের প্রেমের আগে মাহিনকে সে খেয়ালই করে নি!
মাহিনকে সে প্রথম দেখে মেয়েদের নতুন হলের সামনে, সুপ্তির সাথে। দেখতে পুরাই তামিল হিরো। দুটোতে যেন রাজযোটক! নীলচে-কালো দাড়ির ভেতর থেকে বিদ্রূপভরা হাসি ছুড়ে দিয়েছিল মাহিন তাকে লক্ষ করে। সুপ্তির ফুশমন্তর ছাড়া এই বাঁকাহাসির মানে কী! টং হওয়া মেজাজ নিয়েই নজর গিয়েছিল সুপ্তির দিকে, নায়িকার হাস্য-পরিহাস যেন আড়েদিঘে নায়কের হাসির চেয়েও লম্বাচওড়া। তানিয়ার সামনে বৃন্দাবনের এই সুখময়তা উপস্থাপন করতে পেরে সুপ্তির চেহারা তিনশো ওয়াটের এলইডির মতো জ্বলে উঠেছিল যেন। সেই হাসিটাই সেদিন দোতলা থেকে ফেরত দিয়েছে তানিয়া, রাজযোটকের গা মাড়িয়ে সিন্ধুঘোটকের পালিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে।
জোর পায়ে এগিয়ে এসে মাহিন পথ আগলে ধরে সুপ্তির। যেন দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা হচ্ছে। মরিয়া হয়ে পাশ কাটাতে চায় সুপ্তি। ‘এত সাজ কেন রঙিলা বিবির!’ কী কুৎসিত ভঙ্গি মাহিনের! গা রিরি করে ওঠে সুপ্তির। কিছু বলতে যাওয়ার আগেই মাহিন এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ‘এর মধ্যেই নতুন নাগর জুইট্যা গেছে!’ মাহিনের অশ্লীল ইঙ্গিত আর দোতলার অডিয়েন্সের উপস্থিতির মিথস্ক্রিয়ার লজ্জায় মাথা ভন ভন করে সুপ্তির। জানে, না দেখার ভান করেও উপর থেকে তানিয়ারা তাড়িয়ে তাড়িয়ে বায়োস্কোপ দেখছে। সুপ্তির কান্না আসতে চায়। ‘ধ্যাৎ! কেন যেন আজ চুলে ফুল পরতে গেছিল সে!’ সূর্যমুখীসজ্জিত কেশবিন্যাস আর পরিপাটি পোশাক পরিহিত ছিমছাম শরীরটাকে ভীষণ ভারী, বেঢপ আর অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকে নিজের কাছে। ‘ইশ, ঠিক এই মুহূর্তে যদি ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া যেত, যদি পায়ের নিচের মাটি দু’ভাগ হয়ে তাকে লুকিয়ে ফেলত !’ হলের দারোয়ান পুতুলের মতো দণ্ডায়মান। মাহিন তো মাহিন, ভার্সিটির কোনও গোবেচারা ছাত্রকেও ঘাঁটানোর সাহস এদের নাই। এক ছুটে হলে ঢুকে রুমের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায় সে, কিন্তু মাহিন গেট আগলে দাঁড়িয়ে আছে, ওকে এড়িয়ে হলে ঢোকা অসম্ভব। হঠাৎ কী মনে করে ঘুরে দাঁড়ায় সুপ্তি। সামনে দিয়ে যাচ্ছিল একটা খালি রিকশা। মাহিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাত ইশারায় রিকশাটা দাঁড় করায়, পড়িমরি করে উঠে বসে তাতে,
—মামা, চালাও
গন্তব্য জানতে চায় না রিকশাওয়ালা, জোরে টান মারে। পেছন থেকে তেড়ে আসে মাহিন, শাসানি শোনা যায় তার। সুপ্তি উৎকণ্ঠা নিয়ে আবার বলে,
—আরও জোরে চালাও!
৩. খুব এক চোট বৃষ্টি হয়ে গেল আজ। পুরো বাজার ভিজে চুপসে আছে। প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাধ্য হয়েই বের হয়েছিল তানিয়া। এমন দিনে বাজারও জমে না। সব কেমন ফাঁকা-ফাঁকা। কাজ শেষ করে হলে ফিরবে তানিয়া। সামনেই পড়ল আজহারের রিকশা। মুখে পুরোনো সেই একগাল হাসি। সিট থেকে নেমে এসে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা তুলে নিয়ে রাখে রিকশার পা-দানিতে। তানিয়াও উঠে যায় রিকশায়। আজহার আজ চুপ। কিন্তু ঝড়ের গতিতে রিকশা ছুটছে তার। তানিয়া উঠলেই কি রিকশা এমন গতি পায়, নাকি এই মামার গতিই এমন দুর্গতি?
—আরে, আমার কি ট্রেন ছুটে যাচ্ছে নাকি! আস্তে চালাও। অ্যাক্সিডেন্ট করবা তো!
—মামায় যে কী কন!
পেছন থেকেও যেন তার বত্রিশ দাঁতের ঝলকানি দেখা যায়, গতি কিছুটা কমেছে।
—হেইদিন সুপ্তি মামারে তুইলা এর ডাবল জোরে টান দিছিলাম! পাঁচ মিনিটে হল থেইকা এক লম্বর গেইটে।
তানিয়া স্পষ্ট বুঝতে পারে কোন দিনের কথা বলছে আজহার। তারপরও না বোঝার ভান করে,
—কোনদিন?
—ওই যে হেইদিন, যেইদিন মাহিন ভাই সিনক্রিয়েট করতে চাইছিল।
ছেলেটার মুখে সিনক্রিয়েট শব্দটা শুনে হাসতে গিয়েও হাসে না সে।
—তুমি মাহিন ভাইকে চিনো নাকি!
—কী কন আফা! হেরে কে না চেনে! পলিটিস করে না হ্যায়!
—আচ্ছা।
—পোলাপাইনরে ধইরা মাইর লাগায়, নেশাপানি করে।
নিচুস্বরে বলে সে। বলতে পেরে একটু আরাম লাগে বুঝি তার। তানিয়ার খুব জানতে ইচ্ছে করে সেইদিন কী কী ঘটেছিল। কিন্তু কথাটা কিভাবে তুলবে বুঝতে পারে না। আজহার বুঝতে পেরেই যেন প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে যায়।
—হেইদিন সুপ্তি মামায় খুব কান্দছে। কই যাইব বুঝতাছিল না। শ্যাষে আমি কইছি, আমার লগে চলেন।
—তোমার সাথে?
—হ। আমগো বাসাত লইয়া গেছি হেরে।
—তোমার বাসায়!
অবাক হয় তানিয়া। খারাপও লাগতে থাকে সুপ্তির জন্য, ‘বেচারি!’
—আমার আম্মার লগে হের ভাব হইছে খুব। সাতটা পর্যন্ত ছিল আমগো বাসাত। হেরপর হলে নামাইয়া দিয়া গেছি আমি।
সুপ্তি আর তানিয়ার দলও আজ দলছুট। ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে তাদের দুজনের মোলাকাত হয়ে গেল ক্যাম্পাস গেটে।
৪. দুদিন নাকি টানা জ্বরে ভুগেছে সুপ্তি, কথাটা কানে এসেছিল তানিয়ার। সে দোতলায় থাকে, সুপ্তি তিনতলায়। ওপরে গিয়ে তাকে দেখতে যাওয়ার ভদ্রতাটুকু করবে কি করবে না এই ভাবতে ভাবতেই সুপ্তির বাবা মেয়েকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে হাঁফ ছাড়ায়। এটেন্ডেন্স, প্রেজেনটেশন, মিডটার্মের খড়গ মাথায় উপর খাড়া থাকলেও সেবার অনেকদিন বাড়িতে ছিল সুপ্তি। এই সময়টায় একবার আজহারের রিকশায় উঠলে আজহার সুপ্তির কথা জানতে চায় তানিয়ার কাছে।
—সুপ্তি মামারে দেখি না ক্যান? উনার কি পড়া শ্যাষ?
—না। আমরা একই ব্যাচের। আমার শেষ হইলে তারও হবে। সুপ্তি অসুস্থ। বাড়ি গেছে, তাই দেখো না।
অনিচ্ছায় জবাব দেয় তানিয়া।
—কী অসুখ হইছে?
বিরক্ত লাগতে থাকে তানিয়ার। ছেলেটা ভালোই বাচাল। ‘তোর দরকার কী ব্যাটা! তোর কাজ রিকশা চালানো, ওইটাই মনোযোগ দিয়া কর!' মনে মনে কথা কটা বললেও মুখে বলে,
—টাইফয়েড-মাইফয়েড কিছু হবে আর কী!
—আহারে!
—সুপ্তির বাড়ি তো খুব একটা দূরে না। তুমি চাইলে গিয়া দেইখা আসতে পারো। ঠিকানা জোগাড় করে দেবো?
তানিয়ার কণ্ঠে কী যেন ছিল, কিছুটা ফিউজ হয়ে যায় আজহার, মিনমিনে গলায় বলে,
—সুপ্তিমামার বাড়ি আমি চিনি। গতবছর ভার্সিটিত গণ্ডগোল লাগলে কোনও সিএনজি না পাইয়া মামায় আমার রিকশাতই বাইত গেছিল।
ওরে খাইছে! এইবার ফিউজ হওয়ার পালা যেন তানিয়ার।
৫. সপ্তাহ দুই পর ক্যাম্পাসে ফেরে সুপ্তি। কিন্তু আগের মতো সরব উপস্থিতি নেই আর। কেমন যেন অদৃশ্য হয়ে থাকার চেষ্টা। কক্ষচ্যুত তারকা সে এখন। তারকার সেই দীপ্তিও মুছে গেছে মুখশ্রী থেকে; রোগা হয়ে গেছে বেশ। তানিয়াও ঘাঁটানো বন্ধ করে দিয়েছে তাকে। যেন আর কোনও প্রতিযোগিতা নাই তাদের মধ্যে। খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড়ে কচ্ছপের জিত হয়েছে। এতেই তানিয়া খুশি। তারপরও অস্বস্তি যায় না। একে অন্যকে এড়িয়েই চলে।
কিন্তু সেদিনই হলে ফেরার পথে দুজনই একলা থেকে দোকলা হয়ে গেল। কোনও ক্লাস হয়নি, টিচারদের মিটিং ছিল আজ। আগে জানা থাকলে আসত না ফ্যাকাল্টিতে। এমন অযথা আসায় ক্যাম্পাসে যারা থাকে তাদের অতটা গায়ে লাগে না, কিন্তু ফাইনাল ইয়ারে উঠেও ক্যাম্পাসে এমন বেহুদা আসতে হলে গজগজ করে শহরের বাসিন্দারা। যেতে-আসতে দুই ঘণ্টার মামলা। এসে যদি দেখে চিচিং ফাঁক, কার টেম্পার ঠিক থাকে! আশেপাশে যারা তারা অনেকেই এদিকসেদিক ঘুরেফিরে যার-যার পথ ধরেছিল। শহরের বাসিন্দারা অপেক্ষা করছে শিডিউলড বাসের।
সুপ্তি আর তানিয়ার দলও আজ দলছুট। ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে তাদের দুজনের মোলাকাত হয়ে গেল ক্যাম্পাস গেটে। তানিয়া খানিক এগিয়ে ছিল। তাকে দেখে অনেকদিন বাদে সেই আদিম আর দুর্দান্ত গতিতে ছুটে এল আজহার,
—ওডেন মামা, হলে নামাই দিয়া আহি।
স্মিত হেসে তানিয়া জবাব দেয়,
—আমি যাব বাজারে। তুমি বরং সুপ্তিরেই হলে দিয়া আসো, মামা।
—সুপ্তি তো হলেই যাবা, তাই না?
সুপ্তির দিকে ফিরে নিশ্চিত হতে চায় সে।
ডানে-বামে মাথা নাড়ায় সুপ্তি। আড়ষ্টকণ্ঠে জানায়, সেও বাজারে যাবে।
—ওডেন তাইলে দুইজনেই। এক জাগাতেই যাইবেন যহন।
রিকশাওয়ালা এমন বলবে কল্পনাও করেনি দুই ব্যাচমেট। কে যেন ভীমের গদা দিয়ে দুই ঘা বসিয়ে দিল দুইজনের চান্দি বরাবর। এদিকে সুপরামর্শ দেওয়া হয়েছে ভেবে আজহারের বত্রিশ দাঁতে কোলগেটের বিজ্ঞাপন ঝলকায়। আমেরিকা আর রাশিয়ার মাঝে কোল্ড ওয়ার বেঁধে গেলে এমন নির্মল হাসতে পারে বুঝি কেবল জাতিসংঘের মহাসচিবই। সুপ্তি-তানিয়া এমন অগ্নিপরীক্ষায় পড়বে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। ঘটনার ভয়াবহতা আন্দাজ করে তারা দুজনেই যার-যার চুল ছিঁড়তে থাকে মনেমনে। 'কেন বাজারে যাওয়ার কথা বলল' এই আক্ষেপ আগামী কতকাল তাদের ভোগাবে, এই নিয়ে তারা ভাবতেও ভুলে যায়। কিন্তু আজহারের ছুঁড়ে দেওয়া তির এমন জায়গায় গেঁথে দিয়েছে তাদেরকে, সেখান থেকে একা মুক্তি পাওয়ার উপায়ও নেই। এখন কোনও উছিলায় যদি কেউ বলতে পারত, 'জরুরি কাজ মনে পড়েছে, আমাকে হলে ফিরতে হবে।' তা-ও বাঁচা যেত, কিন্তু কারা যেন কুলুপ এঁটে দিয়েছে দুজনের মুখেই। আজহার এইবার হাঁক দেয়,
—কই, মামারা ওডেন না! ভাড়া শেয়ারেই দিয়েন।
রিকশাওয়ালাকে কষে একটা ধমক মারতে ইচ্ছে করে তানিয়ার। বইয়ে পড়া আয়রনির এমন বাস্তব উদাহরণে একেবারে হতবিহ্বল দশা যদিও, কিন্তু নিয়তির কাছে সমর্পিত হতেই যেন হালছাড়া ভঙ্গিতে রিকশায় উঠে বসে সে। তারপর সুপ্তির দিকে ফিরে বলে,
—চলো একসাথেই যাই, সমস্যা না থাকলে।
সুপ্তি এতক্ষণ জড়ভরত হয়ে ছিল। তানিয়ার ডাকে সম্বিত ফিরে পায়, সামাজিকতার খাতিরে শুকনো গলায় বলে,
—সমস্যা আর কী!
হালকা পায়ে এগিয়ে আসে সুপ্তি। অসুখ সুপ্তিকে কেমন নিস্তেজ করে দিয়েছে, তানিয়া ভাবে। অবশ্য এই অবস্থা বেশি দিন থাকবে না, এটাও বোঝে সে। সুযোগ পেলেই সুপ্তির লালিত সুপ্ত সাপ গ্যালন-গ্যালন বিষ ঢালবে তাকে ছোবল মারার সময়, জানে সে। গ্যালন-গ্যালন বিষ অবশ্য তানিয়ার সাপেরও আছে। রিকশাওয়ালাব্যাটা প্রায়ই সেটা টের পাইয়ে দিত। কিন্তু সে কথা থাক, বাজারে গিয়ে যার-যার রাস্তা ধরলেই হলো। একসাথের এই রিকশাভ্রমণ কী করে এনজয় করবে দুজনে, সেই দুর্ভাবনা আপাতত উধাও। সুপ্তি ওঠে রিকশায়। একটু সরতে গিয়ে গা ছেড়েই বসে তানিয়া। ধমক মারে নিজেকে, ‘সুপ্তি রিকশায় তো কী হইছে? ও তো তারই ব্যাচমেট। তাছাড়া ফাইনালের কাল। দুদিন পর দুজনকেই বিদায় নিতে হবে, কী লাভ রাগ পুষে!’ এমন ভাবনা বুঝি সুপ্তিও ভাবে। রিকশায় উঠেই তানিয়াকে উদ্দেশ করে বলে,
—দেখছ, মনে হচ্ছে পঙ্খিরাজ ঘোড়া ছুটাইছে। অ্যাক্সিডেন্ট না করলেই হয়!
এরপর রিকশাওয়ালার উদ্দেশে বলে,
—আস্তে চালাও, মামা!
‘রোগ ভালোই কাহিল করেছে গানের পাখিকে, গলায় আগের সেই জোর নেই।’ প্রিয় পঙ্খিরাজ ঘোড়াও এনজয় করতে পারছে না আজকাল। ভাবনাটা এক ধরনের আনন্দ দেয় তানিয়াকে। কিছুক্ষণ নীরবতা। রিকশা ছোটে, গতি শ্লথ। আজ অবশ্য রিকশাওয়ালাও চুপচাপ। নীরবতা ভাঙতে হঠাৎ মনে-পড়ার ভঙ্গিতে তানিয়া বলে ওঠে, রিকশাওয়ালার কানে যাওয়ার মতো গলায়,
—তোমার অসুখের সময় এই মামা অনেক খোঁজ নিছে তোমার।
—তাই নাকি!
অবাক হয় সুপ্তি,
—কার কাছে?
—আমারেই জিজ্ঞেস করছে।
—কী বলে! ও আমারে চেনে!
—তুমি এত সুন্দর গান করো, ওর রিকশায় নিয়মিত ওঠো, তোমাকে না চেনার কী আছে!
গানের প্রশংসায় উৎফুল্লতা দেখা যায় সুপ্তির মাঝে,
—দেখি মামা, তাকাও তো এইদিকে!
সুন্দর মুখটাকে পেঁচার মতো করে পেছন ফেরে আজহার।
—কই চিনতেছি না তো তোমারে!
না চিনলে তার কী করার আছে, এমন ভঙ্গি করে আজহার চুপ থাকে।
—কে জানে!
শ্রাগ করে সুপ্তি, কত রিকশাতেই তো ওঠা হয়, কজনার কথা মনে থাকে।
কিন্তু এবার অবাক হওয়ার পালা তানিয়ার,
—তুমি তারে শেয়ার ইটে গান দাও...
কথা শেষ করতে পারে না তানিয়া।
—আমি! শেয়ার ইটে গান দিছি!
হাঁ হয়ে গেছে সুপ্তি, 'কবে? কখন!' ভানহীন অত্যাশ্চর্য ভঙ্গি তার।
—কী বলে! চিনতেছ না ওরে!
লতাপাতা ছেড়ে মূলে টান দেওয়ার আনন্দে সুঁইয়ের আগায় ঘি ঢেলে মোক্ষম খোঁচাটা মারে এবার,
—আরে এই মামাই তো সেইদিন তোমারে উদ্ধার করে নিয়ে গেছিল হল থেকে।
—কোনদিন...!
অনেক দূরে এখন বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে আজহারকে। দৌড়ে পৃথিবী পার হয়ে যাবে যেন।
বলেই সুপ্তি বুঝতে পারে কোনদিনের কথা বোঝাতে চেয়েছে তানিয়া। মুহূর্তেই আরও নিষ্প্রভ হয়ে যায় সে। ওর শরীরের সাথে ছোঁয়া না লাগলেও তানিয়া স্পষ্ট অনুভব করে পরাজিত গোখরোর মতো সুপ্তি কুণ্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছে ওয়েটলেস জর্জেট কামিজের ভেতর। এবং প্রায় একই সাথে টের পায় সুপ্তির এই হার মেনে নেয়া আচরণে নিজের কালকেউটেটা ঝাঁপি খুলে বের হয়ে এসেছে ফণা তুলে। তানিয়া সর্বশক্তি এক করেও থামাতে পারে না তাকে।
—তোমাকে তো ও হিরোর মতো সেইফ করছিল সেইদিন। ওর বাসায় নিয়ে গেছে; চা খাওয়াইছে, ওর আম্মার সাথে নাকি আলাপ করাইয়া দিছে...। তোমার মনে নাই !
না চাইলেও কথার ভঙ্গিতে এক পরত বাড়তি রং আপনি-আপনিই চড়ে যায় হয়তো। সুপ্তির শাদাকালো নিষ্প্রাণ মুখ মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে ওঠে।
—মানে!
সুপ্তির ‘মানে’ বলে চিৎকার করে উঠার ধরনে একটু টেনশনে পড়ে যায় তানিয়া।
—ও-ই তো আমারে বলছে! জিজ্ঞেস করো!
নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায় সুপ্তি,
—কী মামা! তোমার বাড়ি গেছি মানে! কখন গেছি তোমার বাড়ি?
বলতে বলতেই সুপ্তির গলার পর্দা কয়েক ধাপ ওপরে উঠে আসে।
আমতা আমতা করে আজহার বলে,
—ওই যে হেইদিন আপনেরে হলে দিয়ে আসলাম পরে, মনে নাই!
—তোমার বাড়িত গেছি আমি। ইয়ার্কি মারার জায়গা পাও না মিয়া! থাবড়াইয়া গালের দাঁত ফালাইয়া দিব!
রিকশায় চাক্কায় এখন কপ্টার লেগেছে, শাঁইশাঁই বাতাসে আজহারের কানে বুঝি আর কিছুই ঢুকছে না।
তানিয়া একটু অবাক হয়। বুঝে উঠতে পারছে না যে কী ঘটছে! কেউ একজন কি তবে মিথ্যা বলছে এদের মধ্যে! এত দেখি ডাবল লেয়ার চকলেটের মতো! মজার ভেতর মজা! সত্যটা আবিষ্কারে মনোযোগী হয়ে ওঠে সে।
—যাও নাই তুমি!
—তোমার কি মাথা খারাপ! ওর বাসায় ক্যান যাব আমি! আজকের আগে তো ওরে খেয়ালই করি নাই কোনোদিন!
তোমারে নাকি তোমার বাড়িতে পর্যন্ত দিয়ে আসছে হললিভের সময়।
এবার পুরোই কনফিউজ তানিয়া।
সুপ্তি চিৎকার করে উঠে এইবার। রাগে তার চোখে পানি জমে গেছে।
—এই শুয়োরের বাচ্চা, আমার বাড়ি কই বল! এই, রিকশা থামা। বাইঞ্চোদ!
সুপ্তির এই পরিবর্তিত আচরণে তানিয়াও একটু ভয় খেয়ে যায় ভেতরে ভেতরে। চালে ভুল হয়ে গেল বুঝি শেষমেশ! সুপ্তির আহত গোখরো মরণ ফণা তুলেছে। বিষে নীল করে দিবে যেন জগৎসংসার।
অনেক দূরে এখন বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে আজহারকে। দৌড়ে পৃথিবী পার হয়ে যাবে যেন। এদিকে সুপ্তির রাগ কান্না হয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে তানিয়ার কাঁধ।