১
যদিও অভিজ্ঞতার প্রতিফলনকেই আমরা নানান ইঙ্গিতে ও ভঙ্গিতে সাহিত্যে স্বাগত জানাই, তারপরও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ধার করা অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখাও অবাঞ্ছিত নয়। সাহিত্যিক তার অভিজ্ঞতার আলোয় লেখাকে যেমন পরিপুষ্ট করতে পারেন, তেমনই অন্যের অভিজ্ঞতার বয়ানেও লেখা অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। এই 'অন্যের অভিজ্ঞতা' দুই রকমের, প্রথমত অন্যের থেকে শোনা কোনো ঘটনা বা বিষয়ের নিরিখে লেখা, দ্বিতীয়ত কোনো বিষয়ের উপর দখল না থাকলেও অন্যের সাহায্য নিয়ে সেটি আয়ত্তে এনে তার উপর ভিত্তি করে লেখা। যেমন কারও লেখায় ফুটবল খেলার কথা এসেছে, কিন্তু লেখকের এই সম্পর্কে বিশদ ধারণা নেই। তিনি যদি লেখার প্রয়োজনে কোনো ফুটবলপ্রেমীর কাছ থেকে এর খুঁটিনাটি জেনে তার লেখায় কাজে লাগান, তাহলে সেটি অন্যায় হবে না।
অভিজ্ঞতাযোগে রচিত রচনাগুলোই এ যাবৎকাল নন্দিত হয়েছে। পূর্বমেঘ-এর প্রকৃতি বর্ণনার নেপথ্য কারণ নির্ণয়ে যেমন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কন্যা প্রভাবতীর সাথে দাক্ষিণাত্যের বাকাটক রাজ্যের অধিপতি রুদ্রসেনের বিয়ে এবং সেই সূত্রে সম্রাটের সভাকবি হিসেবে কালিদাসের একাধিকবার পশ্চিম মালব হতে উজ্জয়নীর পথে নর্মদাতীরবর্তী বাকাটক রাজ্যের রাজধানী নন্দিবর্ধন পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথপরিক্রমার মিথের অনুসন্ধান করা হয়, তেমনই হালের গাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেসের রচনার রাজনীতির অন্তরালে ল্যাটিন আমেরিকায় সংঘটিত বিপ্লব এবং রাজনৈতিক উত্থানপতনেরই খোঁজ নিই আমরা। সাক্ষাৎকারে এইসব অভিজ্ঞতার কথা গার্সিয়া মার্কেস যদি নাও বলতেন, তবুও লেখার সাথে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা মেলাতে পাঠকের তেমন বেগ পেতে হতো না, তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে তাদের আগ্রহের দরুন।
২
অভিজাত পরিবারের সন্তান হলেও জমিদারি তদারকির কারণেই প্রথম যৌবন থেকে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ছিল পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের সাথে। যদিও তা সবিশেষ অন্তরঙ্গ নয়, তবুও রবীন্দ্রপ্রতিভা বিকাশের জন্য সেই অভিজ্ঞতাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শাহাজাদপুর ও শিলাইদহে তিনি যে গ্রামীণ জীবন দেখেছেন, সেই অভিজ্ঞতার নির্যাসেই নির্মিত হয়েছে তাঁর এই পর্বের গল্পগুলো। পদ্মার বুকে বজরায় ভেসে পাড়ের জীবন-অবলোকনের প্রতিচ্ছবি যেমন এইসব গল্পে পাওয়া যায়, তেমনই গ্রাম পরিভ্রমণকালে পথচারীর নজরে তিনি গ্রামকে যেভাবে দেখেছেন সেটিকেও এড়িয়ে যান নি। শিলাইদহ পর্বে তার গল্পের চরিত্র গ্রামীণ; তাদের সমস্যা সাধারণ, কখনো কখনো চিরন্তন। রবীন্দ্রনাথ সেই সমস্যাগুলোর সাথে একাত্মবোধ করেছেন বলে চরিত্রগুলোর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সাথে নিজের মানসিকতাকে একাকার করে দিয়েছেন। 'শাস্তি' গল্পে ছিদামের ক্রাইসিসের সহমর্মী তিনি, স্ত্রীর প্রতি ছিদামের ভালোবাসা যেমন টের পান, তেমনই ছিদামের বাস্তবতা সম্পর্কেও সচেতন থাকেন বলে ভাইকে বাঁচানোর দায় এড়াতে পারে না ছিদাম। হৃদয় এবং পরিস্থিতি এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব নিরসনে স্ত্রীকে ভাইয়ের বউয়ের হত্যার দায় কাঁধে নিতে বললেও, তাকে ছাড়িয়ে আনবে বলে কথা দেয় ছিদাম। এদিকে পরিস্থিতির বিপর্যাসে খুনের দায় ছিদাম নিজের ঘাড়ে নেওয়ার পর দুখিরামও আত্মপক্ষ সমর্থন করে; নিজের দোষ স্বীকার করে নেয়। এই দুই ভাইয়ের অনুশোচনার সাথে রবীন্দ্রনাথ একাত্ম বলেই তাদের এই স্বীকারোক্তি। অথচ অভিমানের কারণে চন্দরার জবানবন্দি পরিবর্তন না করার জেদটাও যেন রবীন্দ্রনাথেরই। অনুশোচনা, অভিমান এবং ক্ষোভের জায়গা থেকে দুখিরাম, ছিদাম ও চন্দরা রবীন্দ্রমানসের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
এই বাড়ির বর্ণনায়ও তিনি আঙ্গিনা ডিঙিয়ে অন্দর-অভিমুখ হন নি। অথচ আঙ্গিনার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়ালঘর আছে, গোয়ালঘরের পেছনে ডোবা, এবং ডোবার মধ্যকার ব্যাঙের ডাকও স্বমহিমায় উচ্চারিত।
কিন্তু এই তিনজনের সাথে রবীন্দ্রনাথের রিয়েলেটির ডিসট্যান্স ব্যাপক। আর তাই তাদের মতো করে তাদের কষ্ট অনুধাবন করতে পারলেও তাদের বঞ্চনার চিত্র তিনি ততটুকুই এঁকেছেন যতটুকু তিনি বাস্তবে দেখেছেন। গল্পপাঠে এই দুই ভাইয়ের দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে জানা যায়, জমিদারের কাজ করলেও তারা ঠিকমতো পারিশ্রমিক পায় না; বরঞ্চ জমিদারের কর্মচারীর কটূকথা শুনতে হয়। এই পর্যন্ত এই দুই ভাইয়ের সাথে রবীন্দ্রনাথের রিয়েলিটির ডিস্ট্যান্স নেই। এটি অনায়াসেই তিনি লিখতে পারেন, লিখেছেনও। একই কারণে গল্পে কুরিদের কলহও স্থান পেয়েছে। কিন্তু ভাত চেয়ে না পেয়ে ক্রোধে উন্মত্ত দুখিরামকে স্ত্রীর গলায় কোপ দেওয়ানোর জন্য লেখক তাকে ঘরে নিয়ে যান নি। উঠোন পর্যন্ত রেখেছেন, 'দুই ভাই যখন প্রাঙ্গণে প্রবেশ করিল দেখিল, উলঙ্গ শিশু প্রাঙ্গণের একপার্শ্বে চিৎ হইয়া পড়িয়া ঘুমাইয়া আছে। ক্ষুধিত দুখিরাম আর কাল বিলম্ব না করিয়া বলিল, 'ভাত দে।' এই বাড়ির বর্ণনায়ও তিনি আঙ্গিনা ডিঙিয়ে অন্দর-অভিমুখ হন নি। অথচ আঙ্গিনার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়ালঘর আছে, গোয়ালঘরের পেছনে ডোবা, এবং ডোবার মধ্যকার ব্যাঙের ডাকও স্বমহিমায় উচ্চারিত। কারণ, বাস্তবে এর সাথে রবীন্দ্রনাথ সম্পৃক্ত। গ্রাম পরিদর্শনকালে কুরিদের কলহ শোনা তার পক্ষে যেমন স্বাভাবিক ছিল, তেমনই অস্বাভাবিক ছিল না এমন দরিদ্র কোনো গৃহের আঙ্গিনা-দর্শনও। কিন্তু সেই ঘরের ভেতরে যাওয়া? অসম্ভব! রিয়েলিটির এই ব্যবধানের কারণেই পোস্টমাস্টার পুকুরে নয়, নদী থেকে সংগ্রহ করা পানিতে গোসল সারে। জমিদারপুত্র রবীন্দ্রনাথের কাছে পুকুরে ডুব দিয়ে গোসলের চেয়ে তোলা-পানিতে গোসল অনেক বেশি বাস্তব, সেই সাথে সাস্থ্যসম্মতও।
২.১
'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন'-এ খোকাবাবুর মৃত্যুর পর হরিহর চাকরিচ্যুত হয়ে গ্রামে ফিরে যায়। সেখানে একটি সন্তানের জন্ম, তার বেড়ে ওঠা, সন্তানকে নিয়ে কলকাতায় গমন—সব জায়গায় হরিহরের ঘর অনুপস্থিত। ঘর বলতে চৌকাঠ এসেছে, দুটি শিশুই হামাগুড়ি দিয়ে চৌকাঠ পেরোচ্ছে—এর বাইরে আর কোনো বর্ণনা নেই। অথচ বর্ষার কদম কিংবা উন্মত্ত পদ্মার বর্ণনায় লেখক অকৃত্রিম। এই পর্বের 'মেঘ ও রৌদ্র' থেকে:
...সেখানে গ্রামের পথের ধারে একটি বাড়ি দেখা যাইতেছে।বাহিরের একটিমাত্র ঘর পাকা, এবং সেই ঘরের দুইপার্শ্ব দিয়া জীর্ণপ্রায় ইষ্টকের প্রাচীর গুটিকতক মাটির ঘর বেষ্টন করিয়া আছে। পথ হইতে গরাদের জানলা দিয়া দেখা যাইতেছে, একটি যুবাপুরুষ খালি গায়ে তক্তপোষে বসিয়া বামহস্তে ক্ষণে ক্ষণে তালপাতার পাখা লইয়া গ্রীষ্ম এবং মশক দূর করিবার চেষ্টা করিতেছেন এবং দক্ষিণহস্তে বই লইয়া পাঠে নিবিষ্ট আছেন।
এই গল্পে অন্দরমহলের কথা নেই, বাহির হতে ঘরদর্শন হয়েছে কেবল। রবীন্দ্রনাথ অভিজ্ঞতার বাইরে যেতে চাননি বলেই হয়তো অন্দরমহল প্রসঙ্গে তাঁর এমন অনীহা। আবার 'রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা'তে গুরুচরণের মৃত্যু ঘটেছে ঘরে, অন্তিম মুহূর্তে তার পাশে ছোটো ভাই রামকানাইকে বসিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু ঘরের বর্ণনা অনুপস্থিত। অবশ্য সম্পত্তি বিষয়ক জটিলতা আর মামলা মোকদ্দমাকে কেন্দ্রে রাখার জন্য ঘরের বর্ণনার ফুরসত কোথায়? সেই ইচ্ছেও রবীন্দ্রনাথের নেই, অথচ গুরুচরণের মৃত্যুর সময় তার দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রীর ঘাড়ে চাপা অপবাদ খণ্ডাতে গিয়ে তিনি জানান:
যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেতুল, কাঁচা লঙ্কা এবং চিংড়ি মাছের ঝাল-চচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তা ভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল তখন স্তূপাকৃত চর্বিত ডাঁটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, 'দুটো পান্তা ভাত যে মুখে দেব তারও সময় পাওয়া যায় না।
এই বর্ণনা দিয়েই গল্পের সূচনা। গুরুচরণের প্রতি তার স্ত্রী বরদাসুন্দরীর ঔদাসীন্য এবং বরদাসুন্দরীর চরিত্র বোঝানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ এই সরস গদ্যের আশ্রয় নিয়েছেন। এই দৃশ্যটির এমন অনুপুঙ্খ বর্ণনা না দিয়েও রবীন্দ্রনাথ রসিকতাটুকু বজায় রাখতে পারতেন। কিন্তু সম্ভবত এই দৃশ্যের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকার কারণে প্রয়োজনমতো একে ব্যবহারের লোভ তিনি সংবরণ করতে পারেন নি।
২.২
ঘরের বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথের অনিচ্ছাকে রবীন্দ্র-অভিজ্ঞতার নিক্তিকে যাচাই করা যাক এইবার। 'ছুটি' গল্পের শুরুতেই দেখা যায় মাস্তুল তৈরির জন্য শালগাছের গুঁড়ি নিয়ে মজার ও অভিনব খেলার অনুসন্ধানী বালকদিগের খেলায় বাগড়া দিতে তাদের সর্দার ফটিকের ছোটভাই মাখনলালের আবির্ভাব এবং গম্ভীরমুখে শালকাষ্ঠে উপবেশন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য থেকেই জানা যায় এই গল্পভাবনার মূলে কিভাবে ক্রিয়াশীল ছিল তার বাস্তব অভিজ্ঞতা। নদীর ঘাটে বজরা নোঙ্গর করানো হলে তিনি সেখান থেকে তীরে ক্রীড়ারত একদল কিশোর দেখতে পান। তাদের কাণ্ডকারখানাই 'ছুটি' গল্পের শুরুতে বর্ণিত, কেবল বাস্তবে মাখনলালের জায়গায় ছিল ছোট্ট একটি মেয়ে। (শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ, জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুলিপি, ১৩১৬ ব.)
রবীন্দ্রনাথ সেই ঘটনার অনুপুঙ্খসমেত আলোচ্য গল্পে প্রকাশ করেছেন, আর তাই 'মারো ঠেলা হেঁইয়ো, সাবাস জোয়ান হেঁইয়ো' অব্দি অবলীলায় ব্যবহৃত হয়েছে গল্পে। কিন্তু গল্পে ফটিকের মা, মামা, মামি কিংবা মামাতো ভাইবোনদের প্রসঙ্গ এলেও রবীন্দ্রনাথের বর্ণনা নদীর ঘাট, উঠোন আর স্টিমার পর্যন্ত ছিল, ঘর অনুপস্থিত।
রবীন্দ্রনাথ ততটুকুই লিখেছেন, যতটুকু তার পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল।
রবীন্দ্রনাথ ততটুকুই লিখেছেন, যতটুকু তার পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল। অথচ চরিত্রসৃষ্টি কিংবা অতিপ্রাকৃতের বর্ণনায় তিনি কল্পনার ঘোড়াকে বল্গাহীন করতে পিছু হটেন নি। 'ছিন্নপত্র'-এর ১০৬ নম্বর চিঠি থেকে জানা যায় যে আগের দিনের চঞ্চল মেঘ ও রৌদ্রের পরস্পর শিকারের খেলায় তিনি কিভাবে গিরিবালা নাম্নী এক বালিকার চিত্র কল্পনা করছন এবং বৃষ্টিভেজা পথ ধরে তার আগমনের ছবি কেমন করে মানসপটে আঁকছেন। অথচ গিরিবালার ('মেঘ ও রৌদ্র') মতো কোনো কিশোরীর সাক্ষাৎ তিনি বাস্তবে পান নি। প্রকৃতির কল্পনায় এবং বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথ যেমন অকৃপণ, তেমনই কখনো কখনো চরিত্রসৃষ্টিতেও তিনি ভীষণভাবে কল্পনাপ্রবণ। সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে যেমন মিনি (কাবুলিওয়ালা), ফটিক (ছুটি), মৃন্ময়ী (সমাপ্তি), বোষ্টমী (বোষ্টমী), কল্যাণী (অপরিচিতা), পোস্টমাস্টার (পোস্টমাস্টার), চারুলতার (নষ্টনীড়) আগমন ঘটেছে, তেমনই গিরিবালা (মেঘ ও রৌদ্র), সুরবালা (একরাত্রি), মেহের আলী (ক্ষুদিত পাষাণ), জুলিখা ও আলিয়া (দালিয়া), কাদম্বিনী (জীবিত ও মৃত) চরিত্রগুলো সাজাতে তিনি ফ্যান্টাসিতে আক্রান্ত হয়েছেন। এবং কখনো কখনো সেই ফ্যান্টাসির কারণে নিম্নবিত্তের ঘরের চিত্রাঙ্কনের রিস্কও তিনি নিয়েছেন (পোস্টমাস্টার)।
২.৩
তার দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ নাগরিক ভাবকল্পনার বিশেষত্বে রচিত গল্পগুলোয় প্রায় সময়েই তিনি মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের কথা বলেছেন, কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ সময়েই তিনি অন্দরে প্রবেশ করেন নি, অর্থাৎ অন্দরের বর্ণনা এই গল্পগুলোয় নেই। অথচ পোস্টমাস্টার আর রতনের সম্পর্কের মধুরিমা প্রকাশের জন্য তিনি ঘরের বর্ণনায় গেছেন; হেঁশেল থেকে শুরু করে তক্তপোশ এমনকি 'মিটমিটে প্রদীপের আলোয় ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপর টপটপ করিয়া বৃষ্টির জল' গড়িয়ে দিয়েছেন। দারিদ্র্য প্রকাশে এমন বর্ণনা পাওয়া যায় তার 'যক্ষ্মারোগী' গল্পেও, যদিও তা একেবারেই নগণ্য, স্কেচধর্মী, তারপরও কবি-কল্পনার বিস্তারে তাকে শিল্পিত করেছেন। কিন্তু যেখানেই তিনি তার মানসচক্ষু দিয়ে অপার পৃথিবীর রহস্যময়তাকে উপলব্ধি করার অবকাশ পেয়েছেন, সেখানেই তিনি বনর্ণাধর্মী চিত্তের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। প্রকৃতি ও মানবজীবনের যে অভূতপূর্ব রসায়ন তিনি দেখিয়েছেন তার সবটাই তার নিজস্ব নিসর্গচেতনা। রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার প্রকৃতি থেকে যে সম্পদ আহরণ করেছেন তা উজাড় করে দিয়েছেন ছুটি, অতিথি, সুভা, একরাত্রি, মেঘ ও রৌদ্র, বোষ্টমীসহ এই পর্বের বারোটি গল্পে। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কলকাতা কিংবা নগরের প্রেক্ষাপটে রচিত গল্পগুলোয় তিনি বর্ণনার দিকে নজর দেন নি, পরিস্থিতি ও ঘটনার দিকে মন দিয়েছেন। যদিও কাহিনিপ্রধান গল্পে পরিস্থিতিকে বোঝানোর জন্য বর্ণনার আবশ্যকতা নেই, তারপরও এর অভাব তার কোনো কোনো বৃহদায়তন গল্পে অনুভূত হয়। চরিত্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক ও মানসিক দ্বন্দ্ব বোঝাতে তিনি এইসব গল্পে প্রচুর সংলাপ ব্যবহার করেছেন। কোনো কোনো গল্প যেন বিকশিতই হয়েছে সংলাপের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা এই একটানা সংলাপ একঘেয়েমির সৃষ্টি করে; মনে হয় রবীন্দ্রনাথ একটু স্পেস নিতে পারতেন, যেহেতু পাত্র-পাত্রী কথা বলছে ঘরের মধ্যেই, তিনি পাঠকের নজর অল্পসময়ের জন্য হলেও ঘরের দিকে নিতে পারতেন (রবিবার, নষ্টনীড়)। তবে এই পর্বের 'ল্যাবরেটরি' গল্পটি ব্যতিক্রম, 'ড্রয়িংরুমে সোফায় পা দুটো তুলে কুশনে হেলান দিয়ে নীলা।' সংলাপ এই গল্পেও কম নেই, গল্পের উৎকর্ষ বিচারে সেই সংলাপের একঘেয়েমিকে স্বীকার করে নিলেও এই বর্ণনার কারণে পাওয়া প্রশান্তিটাও যে কতটা জরুরি তা গল্পপাঠেই টের পাওয়া যায়।
নাগরিক প্রেক্ষাপটেও ঘর গরহাজির, কারণ ততদিনে তিনি বিষয়বস্তুতে এতটাই মগ্ন যে ঘরের প্রয়োজনীয়তাই আর অনুভব করেন নি।
৩
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গল্পে জীবনকে শিল্পিত করেছেন জীবনশিল্পীর সততা দিয়ে। বাস্তবতাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি অতিক্রম করে যান নি যতক্ষণ পর্যন্ত না ফ্যান্টাসি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, এবং তাও খুবই সামান্য। এবং অন্যায় না হলেও ধার করা অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লেখেন নি, সেই প্রয়োজনও বোধ করেন নি। প্রথম পর্ব অর্থাৎ শিলাইদহ পর্বে প্রকৃতি বর্ণনায় তিনি দারুণ কল্পনাবিলাসী। দ্বিতীয় পর্যায়ের গল্পে নাগরিক ভাবকল্পনা, আধুনিকতা আর তত্ত্বপ্রাধান্যের কারণে কল্পনায় রাশ টেনেছেন এমন বলা যায় বৈকি, তবে এটি অনুধাবন করতে অসুবিধা হয় না যে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির সান্নিধ্যেই প্রগল্ভ। তাই শিলাইদহ পর্বে সুযোগ পেলেই তিনি প্রকৃতি-বর্ণনায় মুখর। রবীন্দ্রগল্পের যতটুকু বর্ণনা এসেছে তার অনেকটাই প্রথম পর্বে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে বিষয়বস্তুকেই তিনি ভরকেন্দ্রে রেখে গল্প এগিয়ে নিয়েছেন। বর্ণনা কিছু এসেছে বটে, কিন্তু সেটা পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করতে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই। এই পর্বের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অনেকাংশেই ঘরের মধ্যেই সংগঠিত হয়েছে। পাত্রপাত্রীর কথোপকথন ঘরের মধ্যেই, কিন্তু ঘরের বর্ণনা নেই বললেই চলে। অথচ শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ বাইরে থেকেও ঘরে উঁকি দিয়েছিলেন, অভিজ্ঞতার অভাবে এগোন নি। নাগরিক প্রেক্ষাপটেও ঘর গরহাজির, কারণ ততদিনে তিনি বিষয়বস্তুতে এতটাই মগ্ন যে ঘরের প্রয়োজনীয়তাই আর অনুভব করেন নি।