আশ্চর্য এই বই

আশ্চর্য এই বই তাপস পাঠিয়েছিল গত বছরের মাঝামাঝি
বছর তিরিশ আগে প্রকাশিত এই বই এখনও নবীনা।
পাড়াগাঁর নারায়ণ-দম্পতি বিরচিত এই গ্রন্থ দেশি ও বিদেশি
বহু পাঠকের হাত ঘুরে ঘুরে এখন সে আমার প্রেমিক করপুটে।
বুনো গন্ধ, গোলাকার লালাভ আভায় ঘেরা আদিমপ্রবণ
শব্দের নিরবধি ইশারায় ঠাসা ছিল প্রচ্ছদ তার,
কিন্তু পটে সবুজের অবিরল ঢেউ যেন উড়ে যেতে চায় নীলিমায়;
ঢেউ যেন অস্ফুট ডানা, আর ডানার ভিতরে আঁকা অসীমের ঘ্রাণ।
স্পর্শমাত্র এই কুহকী গ্রন্থ থেকে ভেসে এল কামনার তিলককামোদ,
পুরাণের সাইরেন নিয়ে যেতে চায় তার অতলের শষ্পময় মায়াবী গুহায়।
পাতায় পাতায় ভাসে ডেকামেরনের হাওয়া, সাদের সুরভি
সহস্র আরব্য রজনীর মানচিত্র পাতার প্রহর জুড়ে ঢেউ তুলে যায়।

কোথাও কোথাও মহাবিশ্বের সংকেত টেনে নিয়ে যায় তার অন্য পাতায়,
আমাকে চিনিয়ে দেয় কৃষ্ণবিবর, তার নিকটাত্মীয় যমজ গোলক
সকল গ্রন্থের তুমি তবে কি জননী—উম্মুল কিতাব?
জগদ্ধাত্রী তুমি আকাশের মতো উবু জড়িয়ে ধরেছ আজ শায়িত আমায়?
কেউ কেউ হয়তো বা নেড়েচেড়ে দেখে গেছে, কিংবা হয়তো কেউ
পাঠ করে দেখেছে খানিক;
কিন্তু কেউ পুরোপুরি পাঠ করে ওঠে নি কখনো এই বই।
কেননা গ্রন্থোত্থিত জাদুকরী অক্ষরের ঘূর্ণির মাঝে
পাঠকের দিশাগুলো পিচ্ছিল অন্ধকারে লুপ্ত হতে থাকে।
তাই তারা পালিয়েছে গোলকধাঁধায় পথ হারাবার ভয়ে।
কিন্তু আমি বেপরোয়া প্রেমের নাছোড় অধিকারে
প্রবেশ করেছি পাঠে। ফেরোমন রসায়ন প্রতিটি পাতায় মায়াময়
কামনা ছড়ায়। যেন প্রাণ উৎক্ষিপ্ত, অতলে ঝরনা বয়ে যায়।
পাঠের সঙ্গমে আমি বহুবার মিলিত হয়েছি এই কেতাবের সাথে।
সুনীল আগুনেভরা এ বইয়ের প্রতি অধ্যায় যেন শাখা-প্রশাখায়
মেলে ধরে কামনার অথৈ প্লাবন; প্রাণ পায় পাঠের ঈশ্বর।
বইয়ের ঊরুর ফাঁকে গড়ে ওঠে রচনা ও পাঠকের কোমল যোজন,
ওইখানে জীবনের অন্য এক স্নান; জ্ঞানময় প্রেমে আমি হয়েছি স্নাতক।

এই গ্রন্থে সূচিপত্র প্রত্যেক পাতায়-শিরায়—
ছড়ানো রয়েছে ভুলভুলাইয়ার মতো
স্পর্শমাত্র তার শব্দরা ফুলে ওঠে কেশরের রক্তিমাভায়;
মেলে ধরে মর্মের সুমিষ্ট গোলক,
যেন এই মহাবিশ্ব মথিত হয়েছে আজ আমারই পাঠের প্রণয়ে
বিশ্বময়ী, ছিলে তুমি গোপন কিতাব হয়ে লওহে মাহফুজে—ঈশ্বরের ঊরুর রেহেলে?
এসেছ আমার কাছে, কিংবা আমিই যেন নাজেল হয়েছি কালো আয়াতের গাঢ় বাৎসায়নে?
যখন তোমাকে ছুঁই, মনে হয় এতকাল-অনাবিষ্কৃত-কোন-আমাকেই ছুঁই;
তোমার ভেতরে আমি আর তুমি আমার ভেতরে
পাঠের লীলায় দুয়ে এক হয়ে বুঝেছি জীবন
বহুদূর বিস্তৃত: পাহাড়ে, সাগরে আর প্রকৃতির আদিম উদ্ভাসে।

কিন্তু জায়া, ঈর্ষাময়ী, আমার এই গ্রন্থের একান্ত সতীন
বহুবার হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে সে ক্রোধের আগুনে,
কিন্তু আমি বারবার সঙ্গোপনে তুলে নেই আমার হৃদয়ে।

একদিন আরো বেশি ক্রোধে আর হুংকারে গোটা বইটিকে
ছিন্নভিন্ন করে ঊর্ধ্বে ছুড়ে দিয়ে বলে, আর কোনোদিন যেন এ-হাতে না দেখি।

প্রবল প্রভঞ্জনে কিতাবের পৃষ্ঠাগুলো একে একে পরিযায়ী পাখির মতন
মিলিয়ে গিয়েছে দূরে নিবিড় নিসর্গে—অভিমানে;
শুধু তার ছায়া আর শব্দের ঘ্রাণ
হানা দেয় কারণে ও কিছুটা গভীর অকারণে।

 

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা