হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্দারসনের ‘লিটল মারমেইড’-এর দুঃখকথা কিন্তু আজও ভুলি নাই। মানুষকে ভালোবাসলে কী পরিমাণ মূল্য জলের প্রাণীদের (ঠিক প্রাণী নয়, এখানে পড়তে হবে তাবৎ নারীদের) দিতে হয়, সেসব ভেবে আজও অশ্রু-ভারাক্রান্ত হয়ে উঠি।
হালআমলের ক্রেজ-মুভি ‘হাওয়া'র গান ‘কালাপাখি’ রিলিজ হওয়া মাত্রই মন টেনে নিয়েছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল বসন্তকালের অনেক অব্যক্ত কথামালা। অর্থাৎ সুর ও বাণীর মালা দিয়েই সে আমারে (শুধু আমারে নয়, বহুজনকেই) ছুঁইয়া ফেলেছিল! এরই মাঝে এক প্রাচীনতমা বন্ধুনির সঙ্গে জোট হয়, সপুত্রক ও আর আমি মিলে একদিন বৈকালিক হাওয়ার আনন্দভ্রমণে বেরিয়ে পড়ব। কিন্তু আমার টেলিপ্যাথি বরাবরই তীব্র বিধায় পূর্বেই আঁচ করে ফেলি যে, এইরকম তেল-চিটচিটে দাবদাহে আমি কিছুতেই বাহির-পানে চোখ মেলিতে পারিব না। এবং তাই-ই হয়। ইদানীং ত্রিশের অধিক তাপমাত্রা হলেই সব কী রকম অসহনীয় হয়ে ওঠে (এজ ফ্যাক্টর!)। ঘর হইতে দুইপা (বাসা থেকে হেঁটে গেলে সাকুল্যে লাগে সাত মিনিট) ফেলিলেই স্টার সিনেপ্লেক্সের ঝাঁ-চকচকে জেল্লা , পপকর্নের পুষ্পিত ফুটে ওঠা—মাত্র শ-পাঁচেক টাকাতেই এসব অনায়াসে আয়ত্ত করা যায়।
সবই অনুকূল থাকলেও এই ছবি দেখার পূর্বে বিপত্তি ঘটে যায় টিকিট নিয়ে। বুধবারে অনলাইনে বহুবার সার্চ করেও শুক্র ও শনিবারের কোনো টিকিট শো করে না। অগত্যা রবিবার। আমি লেইটরাইজার বিধায় সুবাহ সুবাহ কোথাও যাওয়ার কথা শুনলেই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে দেহে। সুতরাং দুইফর বেলা, যহন ভূতে মারে ঢেলা…
এবং এই দুইফর-কালে সিনেপ্লেক্সে গিয়া মনে হইল—আনন্দধার বহিছে ভুবনে…
লোকজন ভদ্রভাবে লাইন দিয়ে সিনেমা দেখার অপেক্ষায়, যেন সেই আশি বা নব্বইয়ের দশক। যখন সিনেমার টিকিটও কালোবাজারি হয়, কালোবাজারে পাওয়া যায়! চোখের সম্মুখে ফুলের মতো ফুটছে পপকর্ন। কফির ম ম ঘ্রাণে আচ্ছন্ন সিনেপ্লেক্সের তামাম আঙিনা।
কে বা কারা আসে নাই এই মুভি দেখতে? নওল কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, হিজাবি ও টুপি, শার্ট-প্যান্ট-ফতুয়া-স্কার্ট-শাড়িতে উপচে পড়ছে পুরো হল। আমি একলা মানুষ, আরও একলা হয়ে একটি কোণে চুপটি করে বসি। আমার পাশে দুইটা কাপল। ওদের হাতে ধরে রাখা ট্রে থেকে শিমুল তুলার মতো উড়তে থাকে পপকর্ন। ছলকে পড়ে কফি। আর শুনি মৃদু ফিসফিস।
কাঙ্ক্ষিত ‘হাওয়া’ বইতে শুরু করলেই ক্রমশ স্তিমিত হতে শুরু করে পপকর্নের তীব্র কুড়মুড় শব্দ। এবং স্তিমিত হতে হতে একেবারে মিলিয়ে যায়। এইবার আমার বিস্মিত হওয়ার পালা। প্রায়ই সিনেপ্লেক্সে থ্রি-ডি, টু-ডি মুভি দেখার অভিজ্ঞতা থেকে একেবারেই আলাদা এই পিন-ড্রপ সাইলেন্স! টানটান উত্তেজনায় দর্শক খেতে ভুলে গেছে! আমার পাশের কাপলের মেয়েটি বলে—'আন্টি, আপনি একটু নেন। আমার আর খেতে ভালো লাগছে না।' আমি ডান-বাম, সামনে-পিছে তাকাই—একটা সিটও কোথাও খালি পড়ে নাই! নীল দরিয়ার কুহকে খাবি খাচ্ছে বেশুমার মানুষ।
কী আছে এই মুভিতে?
সমুদ্দুরে মাছধরা জেলেদের প্রায় নিখুঁত চেহারাছবি, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথাবার্তা না থাকলেও আছে নোনা-ধরা একটা ফিশিং-বোট, ঝাঁ-চকচকে নয়। টাইটানিকের রূপের কাছে এ বোট নস্যি। কিন্তু তবুও সে আছে—একদম সগৌরবে মাথা উঁচু করে থাকবার মতন এই থাকা। আর আছে মাছ ধরার বিশাল জাল। মেশিন ঘরের এত্ত-জঞ্জালের মাঝে বাস করা সুদেহের অতি-সুদর্শন এক যুবক। নাচাগানা কিচ্ছু নাই এই ছবিতে। গান বলতে শুধু ওই কালাপাখি, মানে কোকিল। বসন্তকালে যে ডাকতে পারে নাই। কিন্তু নাচগানহীন একটা সিনেমা দেখার জন্য দর্শকদের মাঝে এমন টানটান উত্তেজনা—অবাকই লাগে আমার।
এই মুভির শুরুতেই আছে এক ক্যানভাসার, যে কিনা বলেই দিয়েছে : সমুদ্দুর কোনো সাইন্স মানে না…
শুরু হইল কালাজাদুর ছবি—কালো চঞ্চল, কালো তুষি, কুচকুচে কালো রাজ, কালো নাসিরউদ্দিন—সকলেই কালো। এই সকল কালোদের অভিনয় প্রায় নিখুঁত। আর এই যে নতুন বেদেনি, সে নির্ঘাৎ জানে তুকতাক আর বশীকরণ—বাংলাদেশের সিনেমা বহুদিন বাদে এক নায়িকা উপহার দিল দর্শকদের। আহা! কী অপরূপাই না মেয়েটি! কী গীতল ওর বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ! ওর কালো চোখের কালো কালো তারা দুটিই হয়তো কালাজাদুর সমস্ত রহস্যময়তাকে ধারণ করে আছে!
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককেই বলতে দেখেছি, এই ছবিতে কাহিনি নাই, বাস্তবতা নাই। আমি বলি কি, ব্রাদারসিস্টারগণ—কাহিনি নাই, বাস্তবতা নাই, তারপরেও এমন সাসপেন্সে থাকে কী করে দর্শক? টানটান উত্তেজনায় চোখের পলক ফেলতেও ভুলে যায় তারা।
সিনেমা জুড়ে যা-ই ঘটনা ঘটল, ঘটেছিল—সবই মোটামুটি সহনীয় ছিল। কিন্তু শেষের দিকে সাপ নাকি দেবী-মনসার আমদানি হলে খানিকটা অস্বস্তি হয়।
তাইলে না-থাকুক কাহিনি, না-থাকুক বাস্তবতা (বাস্তবেই তো থাকেন সারাক্ষণ, খানিক না হয় জাদুতে থাকুন)। ধরে নিলাম ইহা একটি হিন্দি ‘নাগিন’ ছবির বাংলা ভার্শন। তবুও দর্শককুল স্থির বসেই রইল? বসে রইল—যাকে বলে একেবারে তব্দা খেয়ে?
আজ একটা বিষয় খেয়াল করলাম, আমাদের বাংলাদেশিদের অবদমন এমন পর্যায়ের যে, চঞ্চল যখন বাহুমূলের অবাঞ্ছিত কেশরাজি কর্তন করে, তখন সিটি বেজে ওঠে। বা গুলতি যখন নাগুর জায়গা মতো লাথি মারে, সে জায়গার পেইন প্রশমনের জন্য নাগু বরফখণ্ড হাতে নিল, তখনো বাজে সিটি। ভাই রে, এইগুলা তো ন্যাচারাল জিনিসপত্র, এইসব দেখে সিটি মারার দরকার কী?
সিনেমা জুড়ে যা-ই ঘটনা ঘটল, ঘটেছিল—সবই মোটামুটি সহনীয় ছিল। কিন্তু শেষের দিকে সাপ নাকি দেবী-মনসার আমদানি হলে খানিকটা অস্বস্তি হয়। এ সিনেমায় শেষ দৃশ্যে সাপ আর রাজের জড়াজড়ি না থাকলেও তেমন কিছু অসম্পূর্ণ মনে হতো না। রাজের মৃতদেহ এতদিন রেখে দেয়াও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। হতে পারে , এসবই হয়তো কালাজাদুর কারবার। আরেকটি কথা, লাস্ট সিনে তুষি আর রাজকে সমুদ্দুর থেকে আসমানে না উঠালেই কি হতো না? আমরা ধরে নিতাম, দরিয়ারাজের ‘লিটল মারমেইডের’ সেই ছোট্ট মেয়েটির মতো গুলতি নামক বেদেনিও সমুদ্দুরের ফেনা হয়ে ঢেউয়ের সাথে মিশে গেল! অমর হয়ে গেল অমন ক্ষুরধার চেহারার মোহনীয় নারীটি। আর গুলতির বাবার হত্যার কাহিনি না আনলেও শুধুমাত্র মনসা দেবীর মায়ার গুণে দর্শক বিহ্ববলই থাকত। কারণ খোদ মনসা দেবী নিজেই যখন চান সওদাগরের ডিঙায় চড়াও হয়েছেন!
এই পৃথিবীর যা কিছু মানুষের অধীন নয়, যা কিছু করায়ত্ত করতে পারে নাই মানুষ—তাতেই লেগেছে ‘মায়া’র (কুহক) কাজল, আর জন্ম নিয়েছে ‘মিথ’। সমুদ্দুর আজও মানুষের অধীন নয়, ফলত সেখানে কালাজাদু বা মিথ—কত কিছুই না জন্ম লাভ করতে পারে।
এই মুভির সিনেমাটোগ্রাফি এককথায় অসাধারণ। এটা যে বাংলাদেশেরই কোনো মুভি—ভেবে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। কিছু কিছু দৃশ্যের কথা না বললেই নয়। রাতের আলোআঁধারির আবছায়াতে চিকচিকে-সমুদ্র, অকুল দরিয়ার মাঝে একাকী এক ফিশিং বোটের ভেসে থাকা। ব্যাকগ্রাউন্ডে সমুদ্র রেখে গুলতির কঠিন মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা, নোঙর ফেলার সময় জলের গভীরে ক্যামেরা ইন, মুভির শেষ দিকে একের পর এক মৃত্যুতে উদভ্রান্ত যুবকের জাহাজ দেখার বিভ্রম ও জলে ঝাঁপিয়ে পড়া, খানিক বাদেই অন্যজনের ঝাঁপ (এদের দুইজনের নাম ভুলে গেছি)—এসব দৃশ্যের কথা বিস্মৃত হওয়ার নয়।
‘হাওয়া’ দেখার পর বহুদিন আগে শোনা এক সত্য ঘটনা মনে পড়ে গেল। টাঙ্গাইলের মধুপুরের এক যুবক কোনো এক নাগ কিংবা নাগিনীকে মেরে ফেলেছিল (আমার বড় ফুপুর শ্বশুরকুলের আত্মীয় ছিল সে)। দিন কয়েক বাদে যুবকটি যখন ঘুমে ডুবে আছে (সাপটি মারার পর থেকে সে আতঙ্কিত হয়ে অনেকের মাঝে শুয়ে ঘুমাত), লোকজন ডিঙিয়ে এক সাপ শুধু তাকেই দংশন করে গেল। পরদিন মৃত পাওয়া গেল সেই যুবককে, সাপ-দংশনের চিহ্নসহ। জীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ে কত কিছুই না আমাদের বিস্মিত করে, ভাবনায় ফেলে দেয়। আমরা কত কিছুরই কার্যকারণ জানি কিংবা জানি না। হতে পারে সেসব ‘মায়া’ বা ‘মিথ’ বা হয়তো এসবের কিছুই না। কিন্তু এতে করে কিছুই কারো যায় বা আসে না। জীবন চলে যায় জীবনের নিয়ম মেনে।
‘হাওয়া’ ছবির কালোজাদুর ঘোর দর্শককে বহুদিন আচ্ছন্ন রাখবে। এ ছবির সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভকামনা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন করে দখিন-হাওয়া বইয়ে দেবার জন্য নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনকে জানাই হার্দিক অভিনন্দন।