বিকেল।
গাছে গাছে পড়ন্ত আলোর
কাগজ বিছানো।
সৃজনের সবুজ পাতায়
ছায়ার অক্ষর। মৌন, বিষণ্ন অপার।
স্মৃতিও জাগ্রত কাঠ-পেন্সিল। আঁকতে ভালোবাসে।
মানস সান্যাল
কোথায় আছেন? কোন গ্রহতলে?
বহুদিন বহু তপস্যার
আগুনে পুড়েছি।
বুকভরা শিল্প-সোনাদিয়া,
ভাবের বদ্বীপ।
কথার কলোনি শুধু অনুজে অনুজে
অকাতরে বিলাবার।
আপনি কি সাধনার চাকু?
শিল্পের ঘাতক?
ওৎপাতা কানামাছি
কলিঙ্গ-স্বদেশ নিয়ে আপন ডেরায়?
আপনাকে খুঁজছি। খুঁজতে গিয়ে আমাকে পেয়েছি
করুণ সঙ্কেতভরা নিজের গৃহেই।
আমিও কি বিদীর্ণ রাষ্ট্রের আদিবাসী?
সময় মুখ্যত যন্ত্রণার; তাকে
সংহার করেছি এই একাকী দানব?
রেস্তোরার পুরনো টেবিল
আমাদের নিজস্ব ভূগোল।
স্বপ্নস্থ আলাপগুলো ফুলেশ্বরী ঢেউ;
গরম চায়ের কাপে আছড়ে পড়েছে
নিরত কাব্যের কোলাহল।
অনেক উদ্ধত সিগারেট
ঠোঁটের ওপর নম্র, বসে বসে আগুনে খেয়েছে।
সময় বইয়ে দিয়ে হাতি পরিমাণ
রাতের উদর গিলে হজম হয়েছি।
বিবর্ণ পিরিচে রাখা পানি ও প্রণয়
উষ্ণতায় সমকামী। বসন্তে দুর্মর।
আমরা ভেবেছি, জলো উদ্দীপনা কবির সহায়।
চামচের টুংটাং সময়ের নতুন থ্রিলার।
কেননা চামচ মৃতদের
চোখের কোটর।
অবতল পৃষ্ঠাসহ মানুষ তাকেও
হাতে হাতে নাড়ে।
পাখি ও রক্ষিতা এক সঙ্গে উড়ে যায়..
অমর প্রেমের দাবানলে
কে পারে ভিজতে কবি ছাড়া?
দুরন্ত হাসির মধ্যে খুন হতে চেয়ে
আমরাও পৃথিবীতে বৃষ্টি এনেছি। তুমুল বর্ষা ছাড়া
বিরহ জমে না। সেই অপূর্ব কল্পনাকাল একটি মুখের
ওপর থেমেছে। তিনি মোহনা, মোহনা শারমিন।
চোখভর্তি ভাষার কাজল
যদি মুছে দিই, দৃশ্য হারাবে জৌলুস।
বুকভর্তি কিচির মিচির।
ঝাঁকি দিলে লাখ লাখ পাখি
পালক ফেলবে; শুধু কুড়িয়ে নেবার
সাধ্য নেই কারো।
মুুগ্ধতা বিভিন্ন নামে ভুবন মাতায়।
অন্ধ সন্নিকটে রূপমাধুরী বোঝে না;
সে বোঝে যা-কিছু তুঙ্গ তার অনুভব।
সেই হাসি সৌরশঙ্খ, প্রাচীন গুহায়
যার ধ্বনি ওঠে; প্রত্ন রাতের লুণ্ঠন
জমে পিছু পিছু।
আমরা গভীরে ঢুকে লাফিয়ে এসেছি;
তাকে ছুঁয়ে দেখি নি; কেননা
কারো কারো হাসিও দেয়াল;
ডিঙিয়ে গেলেই ভালো,
যদি ভাঙি, বিপর্যয় হবে।
স্পর্শই পর্বত, তবু
সব চূড়া নিয়ন্তা হবে তা ভালো নয়।
পিছনে জব্বার আলি কমপ্লেক্স; নীতি ও নতুন
শিখর ধনীর জন্য; আমরা পারি নি
পদপৃষ্ঠে ওপরে উঠতে।
নগর-কৃষ্ণরা আসে এখানে ঘুমাতে।
বিন্যস্ত নিদ্রায় ঘুরে ঘুরে
মোহনা ছড়িয়ে থাকে সবার ভিতর।
যা কিছু উদ্বৃত্ত তাকে সুন্দর বলে না
কেউ; তবু ছুড়ে দিলে আবর্জনাও
সার হয়ে ফেরে;
গোলাপ ঘরের গন্ধ পেতে
বিপন্ন কাঁটার পরিবেশ
মোহ রেখে যায়..
আড্ডার স্মরণকলা
আজ বড় ব্যথার নন্দন!
আড্ডা মানে কথার বাজার।
কথার মুদ্রায় কিনে আনি
আরেক কথার ঝনঝন।
জনতা বিশ্বস্ত নয়; তাদের আলাপ
কানে, উল্টো পৃষ্ঠায় কখনো
পালক বানিয়ে গুঁজে রাখি।
প্রয়োজনে শ্রবণকুহরে খোঁচা দেই।
চা’স্টলে নিভৃত সত্য আগের মতোই।
থানাঘাটে বিমলদা এখনো বসেন।
বিক্রিবাট্টা যাই হোক, মন স্বপ্নতরু;
ডালপালা গজিয়ে উঠছে, পাতা ঝরছে মড়কে।
আর তিনি যুদ্ধাহত চোখের উঠোন
ঝাঁড় দিয়ে চেতনা গুছিয়ে রাখছেন;
অনন্য সাধের এই বাংলাদেশ
কবে গোছাবেন বিমলদা?
শুধুু চুন্নু মিয়ার হোটেলে
গোপন ঘুপচি-ঘরে উচ্ছ্বসিত
আমাদের তত্ত্ব, গাল-গল্পের বিচূর্ণ ফোয়ারায়
প্রশ্নের হিজলপাতা ছিঁড়ে যেতে চায়।
ব্যাধিগ্রস্ত ব্রহ্মপুত্রে আয়ত সবুজ
গিলে খায় মহামারি কাল।
পাখিভর্তি নদীর সকাল
নিজের মুঠোয় নিয়ে
যান্ত্রিক নৌকায় চিরে ফেলি
সুললিত জল; পরা প্রেম ভেসে গেলে
ভট ভট শব্দের করাল অনিয়মে
আমাদের যাপন-যমুনা কেন
মুগ্ধ বলি হয়?
সম্পর্ক সংশয়গামী;
জমাট হয় না, বহুলাংশে গলে পড়ে।
ফ্রয়েড মথিত ক'রে, মানস সান্যাল, আমরা কি
বরফ শীতল এক বিপথে রয়েছি?
এইযে দেখুন এই হাতের নাগাল
পৃথিবী ছুঁয়েছে; জলঘন
রয়েছে হৃদয়, তবু প্রশস্ত বিচ্ছেদে
মনের জাহাজ ডুবো ডুবো;
মালগুদামের জীর্ণ দোকান মিন্টুর।
সেই কবে সিদ্ধির আগুনে
জোয়ার এনেছে; আর আমরা ভেসেছি।
ভাসতে ভাসতে পুড়ে গেছি;
পুড়তে পুড়তে
শুধু বেঁচে থাকার আসন্ন মাদকতা
বিরল বুঝেছি বলে জীবন এখনো ভালো লাগে।
উজান স্রোতের এই দুরূহ সংসারে
কোথায় লুকিয়ে আছি নিষ্পন্ন দু’জন?
নিকটেই পার্টির অফিস; তর্কতাড়া, পাঠচক্র;
শুধু সাম্য-সৈকত, সমুদ্র নেই কোনো।
কাচারি ঘাটের নদী বিধৌত সুঘ্রাণ
স্মৃতির গম্বুজ; তবু মিনার মলিন।
সময় নিমগ্ন মসজিদ; কেউ আজান দিচ্ছে না।