Everything around me is evaporating. My whole life, my memories, my imagination and its contents, my personality - it's all evaporating. I continuously feel that I was someone else, that I felt something else, that I thought something else. What I'm attending here is a show with another set. And the show I'm attending is myself.
― Fernando Pessoa, The Book of Disquiet
১৯৯৮ সালে যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি হোসে সারামাগো। এই পরিচিত সাধারণ তথ্যটি কেন আমি উল্লেখ করছি লেখাটির শুরুতে? আমি কি ধরেই নিয়েছি যে এই তথ্যটি পাঠকরা জানেন না? না, তা নয়। সব পাঠকই এই তথ্য জানেন। তবু এই বাক্যটি দিয়ে শুরু করার কারণ হচ্ছে এই যে যদি সারামাগো সেবার পুরস্কারটি না পেতেন তাহলে এই লেখকের পরিচিতি বহু বহু বছর হয়তো ইউরোপ এবং আমেরিকার নিতান্ত বিদগ্ধ কিছু পাঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেত। কথাটা যে মিথ্যে নয় তার একটা উদাহরণ আমি ঐ সারামাগোর ভাষা থেকেই দিতে পারি এই মুহূর্তে। উদাহরণ সাহেবের নাম কবি ফার্নান্দো পেসোয়া। যে পেসোয়া সারামাগোর দ্য ইয়ার অব দ্য ডেথ অব রিকার্দো রেইস-এর একটি চরিত্র। আমি নিশ্চিত ইংরেজ কবি এলিয়টের নাম, আমাদের দেশেই শুধু নয়, গোটা পৃথিবীতেই যে ক’জন জানেন, তাদের সিকিসংখ্যক পাঠকও পেসোয়ার নামটি কখনো শোনেন নি। অথচ দু’জনেরই জন্ম একই বছরে অর্থাৎ ১৮৮৮ সালে। লেখক হিসেবে পেসোয়া এলিয়টের চেয়ে অনেক বেশি মহৎ এবং আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বসাহিত্যে পরিচয়ের বিস্তৃতি এলিয়টেরই বেশি। এর কারণ ইংরেজি ভাষার বিশ্বব্যাপী আধিপত্য অবশ্যই, তবে পেসোয়ার নিভৃতিপ্রিয়তাও ছিল একটি মুখ্য কারণ। লেখায় তিনি যতটা মগ্ন ছিলেন, ততটাই নিরুৎসাহ ছিলেন আত্মপ্রকাশে, প্রচারে এবং প্রসারে। ১৯১৫ সালে এক লেখায় তিনি গভীর আস্থার সাথে এই নিরুৎসাহের কথা জানিয়ে দিয়েছেন এভাবে: “ÒFortune, if it so wishes, may come and find me. I know all too well that my greatest efforts will never meet with the success that others enjoy.”। ফলে জীবদ্দশায় ইংরেজিতে Antinous এবং 35 Sonnets নামে দুটো চটি কাব্যগ্রন্থ এবং মৃত্যুর এক বছর আগে মাতৃভাষায় Mensagem নামে একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ বের হয়। যদিও মৃত্যুর অনেক বছর পর আবি®কৃত হয়েছে তার বিপুল রচনারাশি, প্রায় তিরিশ হাজারের মতো হাতে লেখা পৃষ্ঠা। ইতোমধ্যে তার গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, দার্শনিক প্রবন্ধ ও কবিতাসহ মোট বারোটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে এবং আরও বেশ কিছু লেখা রয়েছে প্রকাশের অপেক্ষায়। অর্থাৎ মৃত্যুর প্রায় ৬৪ বছর পরও তার সমস্ত রচনা গ্রন্থাকারে এখনও প্রকাশিতই হয় নি।
পর্তুগিজ ভাষায় ‘পেসোয়া’ মানে ব্যক্তি, কিন্তু ফার্নান্দো পেসোয়া কেবল একক ‘ব্যক্তি’তেই সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাই একাধিক ব্যক্তিকে আবিষ্কার করতে হয়েছে রচনার বৈচিত্র্যের তাগিদে। হেরোনিমো পিসাররো এবং পাত্রিসিও’র সাম্প্রতিক অনুসন্ধান থেকে জানা যাচ্ছে তিনি মোট ১৩৬টা নামে লিখেছেন এবং তাদের প্রত্যেকের জন্যই তিনি তৈরি করেছিলেন আলাদা আলাদা জীবনবৃত্তান্ত। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো তাদের প্রত্যেকের প্রবণতাও আলাদা। তবে পাঁচটি ভিন্ন নামেই তার প্রধান ও বেশির ভাগ রচনা প্রকাশিত হয়েছে।
পৃথিবীর অনেক লেখকই নানা কারণে বিভিন্ন সময় ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন ঠিকই, কিন্তু বিভিন্ন ধারার রচনা অনুযায়ী রচনাকার তৈরি এবং সেই রচনাকারদের জীবনী ও পেশাগত পরিচয় নির্মাণ—এমন নজির বোধহয় পেসোয়ার আগে কেউই রাখেন নি। তাছাড়া, এ কেবল নিছক ব্যক্তি সৃষ্টির কোনো সাহিত্যিক খেলা ছিল না তার কাছে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি হিসেবে অস্তিত্বশীল থাকাতেই তার কোনো আস্থা ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন: “I created various personalities within myself. I create them constantly. Every dream, as soon as it is dreamed, is immediately embodied by another person who dreams it instead of me. In order to create, I destroyed myself; I have externalized so much of my inner life that even inside I now exist only externally.”
সুতরাং এটা পরিষ্কার যে ওই নামগুলো তথাকথিত ‘ছদ্মনাম’ নয়। ছদ্মনামে কোনো লেখক যখন কিছু লেখেন সেই লেখাগুলো তার আসল নামে লেখার মেজাজের চেয়ে খুব একটা ভিন্ন হয় না। কেবল নামটাই শুধু ভিন্ন। কিন্তু Heteroymic বা অপর নামে রচিত লেখাগুলো হবে এমন এক লেখকের যার ব্যক্তিত্বের সাথে এবং কাজের মেজাজের সঙ্গে অন্য নামের ব্যক্তিটির কাজের কোনো সাযুজ্য থাকবে না। সে হবে একেবারেই ভিন্ন এক মেজাজের ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব। যেমন জেরার দ্য নেভাল লিখতেন জেরার ল্যাবরুই ছদ্মনামে, কিন্তু ছদ্মনাম হলেও কাজ এবং মানুষটি তো একই। ঠিক এই অর্থে পেসোয়ার আবিষ্কৃত আলবের্তো কাইরো ব্যক্তিটি তাঁর অপর নাম, ছদ্মনাম নয় মোটেই। কারণ তাঁদের দুজনকে গুলিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। যেমন ধরুন, স্পেনিশ কবি আন্তোনিও মাচাদো একাধিক নামে লেখালেখি করতেন: সত্য বটে, আবেল মার্তিন এবং হুয়ান দে মাইরেনা পুরোপুরি কবি আন্তোনিও মাচাদো নয়। তাঁরা মাচাদোর মুখোশ, তবে স্বচ্ছ মুখোশ, তাই মাচাদোর লেখা মাইরেনার লেখা থেকে খুব একটা আলাদা নয়। তাছাড়া তিনি তো তাঁর কল্পিত সত্তাটির দ্বারা অধিকৃত নন, কিংবা পরস্পরের সাথে সম্পর্কটা বিরোধের বা অস্বীকৃতিরও নয়। পেসোয়ার সাথে তাঁর কল্পিত ‘অপর-নামিক’ লেখক বা কবিদের সম্পর্কটা ছিল বিরোধের ও অস্বীকৃতির, কখনোবা তর্কাতর্কির। আমরা যথাস্থানে সেই বিষয়গুলো আরও বিস্তৃতভাবে দেখানোর চেষ্টা করবো। এখন কেবল এইটুকু মনে রাখলেই হবে যে মাচাদো, নের্ভাল বা আগে বা পরে যারা ছদ্মনামে লিখতেন তাদের মতো ছিলেন না পেসোয়া। তাঁর উদ্ভাবনার চমৎকারিত্ব আরও গভীর ও তাৎপর্যময়।
বলা হয়ে থাকে যে পেসোয়ার যদি জন্ম না হতো তা হলে আর্হেন্তিনীয় লেখক হোর্সে লুইস বোর্হেস তার মতো একজন লেখকের কল্পনা করতেন। বোর্হেসের লেখায় এ রকম চরিত্রের সম্ভাব্যতা মোটেই উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। অন্তত যারা বোর্হেস পড়েছেন তারা একথা অস্বীকার করতে পারেন না। আর বোর্হেসের কল্পনার সম্ভাব্যতাও যে কত খাঁটি এবং বাস্তব হতে পারে তার নজির দেবার জন্যই যেন বাস্তবে জন্ম নিয়েছিলেন আমাদের এই কবি ফার্নান্দো পেসোয়া।
পেসোয়া জন্মেছিলেন ১৩ জুন ১৮৮৮ সালে। বাবা ছিলেন সিভিল সার্ভেন্ট এবং সঙ্গীত সমালোচক। তাদের এক পূর্বপুরুষ সাংকো পেসোয়া দে কুনহা ছিলেন ইহুদি। ইহুদিদের জন্য ইউরোপ তখনও সহনশীল হয়ে ওঠে নি। ফলে অচিরেই অর্থাৎ ১৭০৬ সালে গোঁড়া মৌলবাদী খ্রিষ্টানদের ফতোয়ায় প্রাণ হারাতে হয় বেচারা সাংকো পেসোয়াকে। তাদের পারিবারিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় কবিতার নীল রক্তধারা পেসোয়া হঠাৎই পেয়ে যান নি, তার পিতামহও ছিলেন কবি, লিখতেন যদিও হালকা কবিতা। তবে নীল রক্তের পাশাপাশি কিছু রোগব্যাধিও ছিল ঐ পরিবারে। পেসোয়ার পূর্বপুরুষদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছিলেন যক্ষ্মায় আর তার মাতামহ, যিনি লিসবন শহরে এক বিরাট বাড়িতে থাকতেন তাদের সাথে, তিনি ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যান।
পেসোয়ার জন্মের ছয় বছরের গোড়াতেই মারা যান তার বাবা। বছর দুই পরে মা আবারও বিয়ে করেন। তার নতুন স্বামী ডারবান-এ পর্তুগালের টেম্পোরারি কনসাল। এই নতুন স্বামীর সংসারে যোগ দিতে ছেলে পেসোয়াকে নিয়ে ডারবানের উদ্দেশে রওনা হয় ১৮৯৬ সালে। সেখানকারই এক স্কুলে ভর্তি করা হলো পেসোয়াকে। সি. পি. কাভাফি এবং বোর্হেসের মতো পেসোয়ার জীবনেও ইংরেজি ভাষা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই ভাষাটি তাদের আয় রোজগারের পথটিকে যেমন খানিকটা সুগম করেছিল তেমনি এই ভাষার সাহিত্য তাদের সাহিত্যিক রুচিকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পালন করেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি ভাষায়ও ছিল অধিকার। ছাত্র হিসেবে পেসোয়া ছিলেন খুবই মেধাবী। ছাত্রাবস্থায় ১৯০৩ সালে প্রায় ৯শ’ প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্য থেকে তিনি জয় করেন নেন কুইন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এ্যাসে প্রাইজ। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবাই ছিল ইংরেজ ছাত্রছাত্রী। বছর দুয়েক পরে এই মেধাবী ছাত্রটি ফিরে আসেন মাতৃভূমি লিসবনে। বয়স তখন সতের। দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি এত বছর কাটালেও সেখানকার স্মৃতি কিংবা বন্ধুত্ব কোনো কিছুই তার সাথে ছিল না। পরম বন্ধুর মতো কেবল ইংরেজি ভাষাটিই এসেছিল তার সাথে।
ইংরেজির সাথে তাঁর বন্ধুত্ব এতটাই প্রগাঢ় ছিল যে তিনি প্রথম যে কবিতাগুলো লিখেছিলেন ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ সালে তা মূলত ইংরেজিতেই লেখা। এবং ওই সময় তিনি পড়ছিলেন মিল্টন, শেলি, কিটস্, অ্যাডগার এলেন পো। ইংরেজি থেকে তিনি নাথানিয়েল হথর্ন-এর The Scarlet Letter, ও হেনরির গল্পগুচ্ছ এবং এলেন পোর কবিতাগুচ্ছ অনুবাদ করেছিলেন। এঁদের পর তিনি আবিষ্কার করেন বোদলেয়ারকে। পর্তুগিজ কবিদের কাছে তিনি ফিরে আসেন একটু দেরিতে। তবে মাতৃভাষার কাছে ফিরে এলেও ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি তাঁর বন্ধ হয়ে যায় নি একেবারে।
মাতৃভূমিতে ফিরে অল্প কিছুদিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও তা অচিরেই ছেড়ে দেন। শুরু করেন প্রকাশনার ব্যবসা, কিন্তু তা সাফল্যের মুখ দেখতে পারে নি। একটিও বই বের না করে এই ব্যবসাটি এক বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর লিসবনের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোয় কমার্শিয়াল ট্রান্সলেটরের পেশাটাই বেছে নেন তিনি। মাঝে মধ্যে তার জন্য কোনো একাডেমির বা সাহিত্য বিষয়ক কোনো পদমর্যাদার প্রস্তাব এলেও মূলত কমার্শিয়াল ট্রান্সলেটরের পেশাটাই ছিল তার আজীবনের সঙ্গী।
তার এই পেশার বাইরে লেখালেখির কাজও চলছিল ভালোভাবেই। স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে লিখছিলেন প্রবন্ধ এবং কবিতা। লিসবনের অগ্রসর চেতনার লেখক ও পাঠকদের কাছে তিনি পরিচিতও ছিলেন বেশ খানিকটা। সে সময় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু—মেধাবী কিন্তু অস্থিরচিত্ত তরুণ কবি মারিও দে সা-কারনেইরো—পেসোয়ার প্রতিভাকে বুঝেছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই। এই বন্ধুটি পরে প্যারিসে আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু পেসোয়া তাকে ভোলেন নি। আমরা পরবর্তীকালে দেখতে পাব যে সা-কারনেইরো নামটিই পেসোয়ার কল্পিত কবি আলবার্তো কাইরো নামটির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। জীবনের কিছু সময় পেসোয়া পরিবারের সাথে থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন একাকী। সিগারেট খেতেন অতিমাত্রায়, দিনে প্রায় আশিটির মতো। মদ্যপানও অতিমাত্রায়, কিন্তু মাতাল অবস্থায় কেউ দেখেছে—এমনটি শোনা যায় নি কখনো। পেসোয়া নামটি ছাড়াও অন্য আরও ৭২টি নামে লেখালেখি করেছেন। পরিকল্পনা করেছিলেন কিংবা হয়তো লিখেছেনও বেশ কিছু থ্রিলার এবং শেক্সপিয়রের জীবন সম্পর্কে একটি বই। আরও মজার ব্যাপার হলো তিনি নাকি এস্ট্রলজি পার্লার খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই নিছক উপার্জনের কথা ভেবেই।
তিনি যে ফার্ম-এ কাজ করতেন সেই ফার্মের এক মেয়ের সাথে ১৯২০ সালের দিকে অল্পদিনের জন্য সম্পর্ক গড়ে উঠলেও তা খুব বেশি দিন টেকে নি। কয়েক মাস পরে তিনি এক চিঠিতে ঐ মেয়েকে লিখলেন: “আমার নিয়তি অন্য এক নিয়মে বাঁধা, ওফেলিয়া, তুমি সেই নিয়মটির কথা ভাবতেও পারবে না, আর সেই নিয়তি এমনই সব প্রভুর অধীন যে, না পারে এটা মেনে নিতে, না পারে ক্ষমা করতে।” জীবদ্দশায় ১৯৩৪ সালে বেরোয় পর্তুগিজ ভাষায় তার প্রথম এবং একমাত্র কাব্যগ্রন্থ। তবে এর আগে ইংরেজিতে লেখা ১৯১৮ এবং ১৯২১ সালে দুটো চটি কাব্যগ্রন্থও বেরিয়েছিল, যা আগেই বলেছি। এরপর যদিও তিনি পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার, কিন্তু তার আগেই হেপাটাইটিস তাকে ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে মৃত্যুর হিম কারাগারে বন্দি করে ফেলে চিরকালের জন্য।
সংক্ষেপে মোটামুটি এই হচ্ছে তার জীবনপঞ্জি। না, তেমন নাটকীয়তা নেই তার জীবনে, যেমন রয়েছে র্যাবো, ভ্যান গঘ, পুশকিন, দস্তয়েভস্কি কিংবা আরও কারো কারো জীবনে। কিন্তু জীবনে নাটকীয়তা না থাকলেও নাটকীয়তাপূর্ণ ছিল তার কাব্যজগতের ইতিহাসটি। ১৯৩৫ সালের ১৩ জানুয়ারিতে আদোলফো কাসাইস মোন্তেইরোকে এক চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন: “আজ আমার জীবনে একটি প্রধান পরিবর্তন কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” কী এই পরিবর্তন? পরিবর্তনটি হচ্ছে তার নামের ক্ষেত্রে। এবং এই পরিবর্তনের কথা তার মনে এল এই কারণে যে তিনি নানা ধরনের উৎসারণ লক্ষ্য করছেন নিজের মধ্যে। এ ছাড়া ছোটবেলা থেকেই ছিলেন কল্পনাপ্রবণ, ফলে লেখালেখির ক্ষেত্রে সেই ‘কল্পনা মনীষা’র প্রভাব যে পড়বে তাতে আর আশ্চর্য কী! কাসাইস মন্তেইরোকে এক চিঠিতে তিনি তার অন্যসব নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বলেছেন:
১৯১২ সালের দিকে, আমার বিশ্বাস, প্যাগান বৈশিষ্ট্যের কিছু কবিতা লেখার ধারণাটি আমি পেয়েছিলাম। সেই ভাবনায় মুক্তক ছন্দে আমি কিছু খসড়াও করেছিলাম। পরে ঐ প্রকল্পটি আমি ছেড়ে দেই। কিন্তু আমি মৃদু সংশয়ের মধ্যে যে-ব্যক্তিটি লিখছে তার একটি অস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করি। (আমার অজান্তেই ঠিক তখন জন্ম নিল রিকার্দো রেইস)। দু’ এক বছর পর, একদিন জটিল ধরনের এক মেঠো কবিকে উদ্ভাবন এবং তাকে হাজির করার মাধ্যমে সাকারনেইরোর চ্যালেঞ্জটা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। এই কাল্পনিক কবিকে সৃষ্টি করতে আমার কয়েকদিন গেল। কিন্তু ওর মধ্যে প্রাণসঞ্চারে ব্যর্থ হলাম। শেষ পর্যন্ত যেদিন প্রকল্পটির ভাবনা বাদ দেই সেদিন—১৯১৪ সালের ৮ মার্চ—উঁচু টেবিলের সামনে গিয়ে একটা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে লিখতে শুরু করলাম, যেমনটি আমি সব সময়ই করি। এক ধরনের অবর্ণনীয় ভাবাবেশে একের পর এক আমি তিরিশটির মতো কবিতা লিখলাম। এটা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি দিন; ও রকম দিন আমি আর কখনোই পাব না। ‘রাখাল’—এই শিরোনামে শুরু করলাম। এরপর যে মানুষটির মুখাবয়ব আমার ভেতর দেখা দিল আমি তার নাম দিলাম আলবের্তো কাইরো। প্রকাশভঙ্গির অস্বাভাবিকতার জন্য ক্ষমা চাই, কিন্তু আমার মধ্যে আবির্ভূত হলেন আমার গুরু। ওটাই ছিল আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। দ্রুত ঐ তিরিশটি কবিতা লেখা হওয়ার পর আমি তৎক্ষণাৎ আবার কাগজ নিয়ে একের পর এক ‘তির্যক বৃষ্টি’ নামে ফার্নান্দো পেসোয়ার ছয়টি কবিতা লিখলাম... এই ছিল ফার্নান্দো পেসোয়ার/আলবের্তো কাইরো থেকে ফার্নান্দো পেসোয়ায় প্রত্যাবর্তন। কিংবা বলা ভালো, এ ছিলো অস্তিত্বহীন আলবের্তো কাইরোর প্রতি ফার্নান্দো পেসোয়ার প্রতিক্রিয়া।
কাব্যিক নাটকীয়তার শেষ কিন্তু এখানেই নয়, পেসোয়া আমাদের বিস্ময়ের বাড়তি খোরাক হিসেবে সরবরাহ করেছেন কল্পিত এই লেখকদের একটি করে পূর্ণাঙ্গ জীবনপঞ্জি, তাদের মানসিক গঠনকাঠামো এবং কাব্যিক ব্যক্তিত্বের ধরন-ধারণ সম্পর্কে খুঁটিনাটি। ঐ একই চিঠিতে তিনি এ সম্পর্কে আরও কিছু জানাতে গিয়ে বলছেন যে, রিকোর্দো রেইস-এর জন্ম ১৮৮৭ সালে ওপোর্তো অঞ্চলে, পেশায় তিনি ডাক্তার আর বর্তমানে তিনি ব্রাজিলে আছেন। আর আলবের্তো কাইরো? হ্যাঁ, তিনিও অবিশ্বাস্য চরিত্র নন। পেসোয়ার কাব্যনাট্যে তিনি একটি বাস্তব ভিত্তি পাওয়ার জন্য উদ্বাহু। ফলে তাকেও জন্মগ্রহণ করতে হয়। তার জন্ম ১৮৮৯ সালে এবং অল্প বয়সেই ইন্তেকাল করেন, ১৯১৫ সালে। তিনিও পেসোয়ার মতোই জন্মগ্রহণ করেছিলেন লিসবনে এবং প্রায় সারা জীবনই তিনি দেশের মাটিতেই কাটিয়েছেন। তার ছিল না কোনো পেশাগত পরিচয় এবং কোনো ধরনের শিক্ষাদীক্ষা। তারপর থাকছে আরেক কবি, তিনি আলভারো দে কামপোস। তার জন্ম তাভিরায় ১৮৯০ সালের ১৫ অক্টোবরে, রাত ১টা তিরিশ মিনিটে। এবং এই তথ্যটা যে সত্য (!) সেটা তিনি বুঝতে পারলেন ফেররেইরা গোমেজ নামের এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে এবং আমাদের কবিবর এই তথ্যটি যাচাই (!) করেছেন বলেও জানিয়েছেন। অন্য দু’জনের তুলনায় কামপোস বেশ শিক্ষিত। গ্লাসগোতে তিনি ছিলেন নৌ প্রকৌশলী, তবে বর্তমানে তিনি লিসবনেই আছেন, যদিও বেকার। কিন্তু এরা দেখতে কে কেমন? হ্যাঁ, তাদের দৈহিক গড়নের বর্ণনাও দিতে ভোলেন নি পেসোয়া। কাইরো ছিলেন মাঝারি উচ্চতার। রিকার্দো রেইস ছিলেন খানিকটা—যদিও খুব সামান্যই—খাটো, বেশ বলিষ্ঠ, তবে ধূর্ত প্রকৃতির। কামপোস লম্বা গড়নের, ১.৭৫ মিটার লম্বা, অর্থাৎ পেসোয়ার তুলনায় দুই সেন্টিমিটার লম্বা। হালকা পাতলা শরীর। সামনের দিকে সামান্য বাঁকানো। এই তিনজনের শারীরিক গড়নে অমিল থাকলেও তিনজনেরই কিন্তু দাড়ি কামানো। কাইরো একটু বিষণ্ন ধরনের, রংহীন, নীল চোখ, রেইস-এর রং হালকা বাদামি, কামপোস সাদা-কালোর মাঝামাঝি, কিছুটা পর্তুগিজ ইহুদি ধরনের, মসৃণ চুল পেছন দিকে আঁচড়ানো। পেসোয়ার মতো তিনিও চশমা পরেন। আর ‘কাইরো’, পেসোয়ার ভাষায়, ‘আগেই বলেছি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ছাড়া উল্লেখ করার মতো আর কোনো শিক্ষাদীক্ষা ছিল না। অল্প বয়সেই তার বাবা-মা মারা গিয়েছে, থাকতেন বাড়িতেই, সম্পত্তির সামান্য আয়ের ওপরই ছিল তার জীবনধারণ। মায়ের দিক থেকে সম্পর্কে এক খালার সাথে থাকতেন তিনি। রিকার্দো, আগেই বলেছি, একজন ডাক্তার, ১৯১৯ সাল থেকেই তিনি ব্রাজিলে রয়েছেন।’ এবং তা রাজনৈতিক কারণে। এই তিনজন ছাড়াও আরও একজন আছেন, তিনি বের্নার্দো সোয়ারেস। ইনি অন্য তিন জনের চেয়ে একটু ভিন্ন। ভিন্ন এই অর্থে যে, অন্যদের মতো তিনি কেবল কবিতাই লেখেন না, গদ্যও লেখেন। তার চর্চার মূল ক্ষেত্র দার্শনিক প্রবন্ধ। এই ভদ্রলোকের মানসিক কাঠামোর পরিচয় দিতে গিয়ে পেসোয়া বলেছেন যে, সোয়ারেস পেসোয়ার চেয়ে ভিন্ন কেউ নন, বরং তার ব্যক্তিত্বেরই সামান্য অপভ্রংশ।
এছাড়া কবিত্রয়ের ভাষারীতি সম্পর্কেও পেসোয়া ধারণা দিয়েছেন। কাইরোর ভাষা ছিল বেশ বাজে, কামপোস মোটামুটি, রেইস পেসোয়ার চেয়ে ভালো। ওহহো, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা তো বলাই হয় নি। কাইরো ছাড়া অন্য যে দু’জন কবি রয়েছেন তারা কিন্তু কাইরোর শিষ্য। এমনকি পেসোয়াও কাইরোর শিষ্য। যেমন ‘আলবের্তো কাইরো, দ্য মাস্টার’ শিরোনামে রিকার্দো রেইস লিখেছেন গুরুর কবিতার ভূমিকা কিংবা ‘আলবের্তো কাইরো, ট্রান্সলেটরস প্রিফেস’ নামে লিখেছেন মুখবন্ধ। অন্যদিকে কামপোস লিখেছেন, ‘নোটস অন্য দ্য মেমোরি অব মাই মাস্টার কাইরো’ নামে স্মৃতিকথা। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে কামপোস ও রেইস-এর মধ্যে আলাপচারিতার একটি অংশবিশেষও নমুনা হিসেবে হাজির করেছেন পেসোয়া। তাতে কবিতা, বিশেষভাবে কবিতার স্বভাব-প্রকৃতি নিয়ে রয়েছে গুরুগম্ভীর আলোচনা। আরেকটি কথা, কল্পিত এই লেখকরা ছাড়াও আরও দুজন অপ্রধান লেখক হচ্ছেন আলেকজান্ডার সার্চ এবং রবার্ট অ্যানোন। এ দু’জন পেসোয়ার একেবারে প্রথম জীবনে, অর্থাৎ ১৯০৩/ ১৯০৪ সালের দিকে মূলত ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন। সুতরাং এই দুজনকে গোনায় ধরলে পেসায়া সপ্তানন। তবে আগেই বলেছি, সব মিলিয়ে পোসায়ার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মোটা ৭২ জন লেখক। এক অর্থে তিনি ভারতীয় পুরাণের দশানন বা গ্রিক পুরাণের গেন শতচক্ষু আর্গাসের মতোই এক চরিত্র।
পেসোয়ার কাল্পনিক লেখকদের শারীরিক ও মানসিক বর্ণনা, নাটকীয় এই কাণ্ডকারখানার সারাৎসার—সংক্ষেপে—পেসোয়া তার এক লেখায়, বলা যাক আত্ম-প্রতিকৃতিধর্র্মী এক লেখায় বলেছেন এভাবে:
I am like a room with innumerable
fantastic mirrors that distort into false
reflections a unique previous reality;
which is not in any and is in all of them.
অন্য আরেক জায়গায় তিনি তার এই নাটকীয়তার একটি অধিবিদ্যক কারণ হিসেবে বলেছেন ‘God has no unity/ How am I to be one?’ যে কোনো পাঠকই ভাবতে পারেন যে এ কি শুধুই কথার চাতুরি? কিংবা বাকচাতুর্য দিয়ে অবাস্তবকে বিশ্বাসযোগ্য করার কৌশল? না, তা নয় মোটেই। কবি হিসেবে পেসোয়া যা বলেছেন বা উপলব্ধি করেছেন তা অবাস্তব ‘ব্যক্তি’ত্বের প্রতি উড়াল দেয়া নয়, বরং নিজের বহুমাত্রিক সত্তাকে আবিষ্কারের অভিযান তার সমগ্র রচনাকর্মে ছড়িয়ে আছে। তিনি নিজেকে কেবল একখণ্ড সাদা কাচের টুকরো হিসেবে দেখেন নি। কারণ তিনি সে রকম ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রিজমের মতোই বহুবর্ণিল সত্তার অধিকারী। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, বিশ্বজগতের সাথে মানুষের সম্পর্ক, পরিচয়ের সংকট এবং অস্তিত্বের রহস্যকে আবিষ্কার কেবল একমাত্রিক ব্যক্তিত্ব দিয়ে সম্ভব নয়। নৈর্ব্যক্তিকায়নের (Depersonalize) পথেই তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছিলো অন্তর্নিহিত সত্যকে আবিষ্কারের জন্য। পেসোয়া নিজেই এক জায়গায় এই অবস্থার একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে: To know oneself is to make a mistake... consciously not knowing yourself; that is the right road. No knowing yourself conscientiously is the active expercise of irony.
আমরা যদি পেসোয়ার কল্পিত লেখক বের্নার্দো সোয়ারেস-এর The Book of Disquiet-এর দিকে তাকাই তাহলে সেখানেও তার এই নাটকীয় কাব্যচরিত্রের কারণটি খুঁজে পাব। সোয়ারেস-এর ভাষায়: “যখন আমি ছদ্মবেশী তখন আমি প্রকৃত আমি। আহ, অন্য যে-মানুষটি আমি হতে পারতাম তার জন্যেই আমার এই স্মৃতিকাতরতা। যে মানুষটি আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এবং যে আমাকে সন্ত্রস্ত করে। আমি আমার কাল্পনিক সত্তার দিকে ফিরে যাই।”
লেখাটির শুরুর দিকে আলোচনা প্রসঙ্গে বোর্হেসের লেখায় পেসোয়ার মতো ব্যক্তিত্বের সম্ভাব্যতার কথা উল্লেখ করেছিলাম। এখন আরেকটু বিশদ করে বলা যায় যে, শুধু সম্ভাব্যতাই নয়, এই দু’জনের ব্যক্তিত্বের মধ্যে গোপন মিল এতটাই যে, তা আমাদের কাছে ভিন্ন এক আনন্দের খোরাক হয়ে উঠতে পারে। অথচ দু’জনের কেউই পরস্পরের অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না মোটেই। বোর্হেসের একাধিক গল্পে এবং অনুগল্পে পেসোয়ার ভাবনার জগতের নৈকট্য আমাদেরকে চমকিত না করে পারে না। সোয়ারেস মারফত আমরা পেসোয়ার যে চিন্তার স্পর্শটি এই মুহূর্তে পেলাম তার সাথে বিস্ময়কর মিলটি আমরা খুঁজে পাব বোর্হেসের ছোট্ট একটি গল্পে। গল্পটির নাম ‘বোর্হেস এবং আমি’। ছোট্ট বলেই আমি গল্পটি পুরো উদ্ধৃত করছি:
যা কিছু ঘটে; সে অন্য কেউ, অন্য এক বোর্হেসের জীবনে ঘটে। আমি বুয়েনস আইরিস-এর রাস্তা দিয়ে হাঁটি, হয়তো মুহূর্তের জন্য দাঁড়াই কখনো। তাকিয়ে দেখি হলঘরে প্রবেশপথের খিলানের দিকে আর গ্রিল করা দরজার দিকে। চিঠিপত্রে খবর পাই বোর্হেসের আর তাকে দেখতে পাই অধ্যাপকদের নামের তালিকায় অথবা কোনো জীবনী অভিধানে। ভালোবাসি বালি-ঘড়ি, মানচিত্র, অষ্টাদশ শতকের মুদ্রণরীতি, কফির স্বাদ আর স্টিভেনসনের গদ্য; অন্যজনও আমার সাথে এইসব পছন্দ করে, কিন্তু তা এতটা চটুলভাবে করে যে নাটুকে বলে মনে হয়। এটা বলা অত্যুক্তি যে আমাদের সম্পর্ক দ্বন্দ্বময়; আমি বাঁচি, বেঁচে থাকতে হয় যাতে বোর্হেস সাহিত্য রচনা করতে পারে। আর এই সাহিত্যই আমার অস্তিত্বের যৌক্তিকতা তুলে ধরে। বলতে দ্বিধা নেই যে, ইতোমধ্যে সে মূল্যবান কয়েকটি পৃষ্ঠা লিখেছে। কিন্তু তা আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। সম্ভবত এই কারণে যে, যা কিছু ভালো তা কারোর নয়, এমনকি অন্যজনেরও নয়। বরং তা স্পেনিশ ভাষা ও ঐতিহ্যের। তাছাড়া, বিলুপ্ত হওয়াই আমার নিয়তি, আর আমার জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত অন্যজনের মধ্যে টিকে থাকবে। ধীরে ধীরে আমি তার কাছে সবকিছু তুলে দিচ্ছি। যদিও তার বানিয়ে এবং বাড়িয়ে বলার বিশ্রী অভ্যেস সম্পর্কে আমি বেশ সজাগ। স্পিনোজা মনে করতেন যে সবকিছুই তাদের নিজের স্বভাব অক্ষুণ্ন রাখার অপেক্ষা করে। পাথর চিরকালই পাথর হতে চায়। আর বাঘ চায় বাঘ হতে। কিন্তু আমি বেঁচে থাকব বোর্হেসের মধ্যে। নিজের মধ্যে নয়—যদি আমি আসলেই কেউ হয়ে থাকি—যদিও আমি নিজেকে অন্যদের মধ্যে কিংবা গিটারের পরিশ্রমী বাজনায় যতটা খুঁজে পাই তার চেয়ে কম পাই তার বইগুলোয়। কয়েক বছর আগে আমি নিজেকে তার হাত থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছিলাম এবং নিম্নমধ্যবিত্তের পুরাণসমূহ থেকে গিয়েছিলাম সময় ও অনন্তের সাথে খেলতে, কিন্তু ঐ খেলাগুলো এখন বোর্হেসের, আর আমাকে এখন অন্যকিছু নিয়ে ভাবতে হবে। এইভাবে আমার জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমি সবই হারিয়ে ফেলছি। আর সবই বিস্মৃতির কিংবা অন্যজনের।
জানি না আমাদের মধ্যে কে এই পৃষ্ঠাটি লিখছে।
এই গল্পটিতে বোর্হেস পেসোয়ার মতোই তৈরি করেছেন তার অন্য আরেকটি সত্তা, যে সত্তা একই সাথে কাল্পনিক আবার বাস্তবও। পেসোয়া এই ‘অপর’ সত্তাগুলোর জন্য ‘কাতর’ এবং তাদের দিকে—‘ফিরে যাওয়ার’ জন্য এত ব্যাকুল। ‘অন্য যে মানুষটি আমি হতে পারতাম তার জন্যই আমার এই স্মৃতিকারতা’—পেসোয়া এই কাতরতাকে রাচনিক (Textual), রূপ দিয়েছিলেন শৈল্পিক উপায়ে তার অন্যসব ব্যক্তিদের আড়ালে। আর The Book of Disquiet শুধু অন্যসব ব্যক্তিই নয়, একই সাথে তা পেসোয়া এবং সোয়ারেসেরও মনোজগৎ ও শিল্পকাঠামোর ভূমিকা ও ভাষ্যরূপ।
এটা বেশ লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার যে পেসোয়া তার লেখালেখির ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে, বিশেষ করে সাহিত্যিক প্রবন্ধ লিখে। তার সেইসব প্রবন্ধের একটির শিরোনাম ছিল ‘বিচ্ছেদের অরণ্যে’, তার মানে সেই সময় থেকেই তিনি নিজের মধ্যে ‘অপর’ প্রবণতাগুলোর আন্দাজ করছিলেন। আর সেটা ভেবেই কি ‘বিচ্ছেদের অরণ্যে’ হারিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন তিনি? পরবর্তীকালে আনন্দময় অরণ্য কিংবা বিমূর্ত শহরে আত্মানুসন্ধানই প্রমাণ করে ওই শিরোনামটি নিছক খেয়ালের বশে ব্যবহার করেন নি। এটা তার রচনাবলির সারাৎসার হিসেবে আজ অনায়াসেই প্রযুক্ত হতে পারে। যাই হোক, তার ‘অপর’ লেখকের আলোচ্য প্রবন্ধের বইটিতে ফিরে আসা যাক।
আগেই বলেছি যে The Book of Disquiet হচ্ছে সোয়ারেস-এর প্রবন্ধের বই। কিংবা পেসোয়ার ভাষায় এ হচ্ছে ‘জীবনহীন এক ইতিহাস’, ‘নিজের সঙ্গে আলাপচারিতা।’ তবে এই আলাপচারিতার মধ্যে জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন ও সংশয়গুলো প্রকাশিত হয়েছে প্রাঞ্জল ভাষায়। নিজের অস্তিত্বের স্বরূপ প্রকাশ করতে গিয়ে ধাঁধাঁপূর্ণ এক বাক্যে সোয়ারেস বলেছেন: “আমি হচ্ছি অস্তিত্বহীন এক শহরের শহরতলি, অলিখিত এক গ্রন্থের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ভাষ্য।” নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বলেছেন: “আমি হচ্ছি সেই প্রজন্মের লোক যে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসে অবিশ্বাস করে এবং যা অন্যসব বিশ্বাসকে অবিশ্বাস করে।” কখনো কখনো সামান্য বিষয়ে কথাবার্তার ছুতোয় তিনি প্রবেশ করেন দার্শনিক উপলব্ধির দিকে। কখনোবা সরাসরি কোনো দার্শনিকের উক্তি ধরেই নিজের ধারণাকে ব্যক্ত করেছেন। যেমন সক্রেটিস বলেছেন, “আমি জানি যে আমি জানি না।” এই উক্তির সূত্র ধরে সোয়ারেস দেকার্তের পর্তুগিজ পূর্বসূরি সাঞ্চেজ-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে, “আমি জানিই না যে আমি জানি না।” এই উপলব্ধির সামনে সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ নীতিবাক্যটি অর্থহীন হয়ে যায়। জীবন, অস্তিত্ব, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে এ ধরনের অসংখ্য মুখরোচক কিন্তু গভীর উপলব্ধিতে আকর্ষণীয় সোয়ারেস-এর (The Book of Disquiet) বইটি। কিন্তু সোয়ারেস ছাড়া পেসোয়ার অন্য যে কাল্পনিক লেখকরা রয়েছেন কেমন তাদের কাব্যচরিত্র? না, তারাও পোসোয়া কিংবা সোয়ারেসের চেয়ে কম নন বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বলতায় ও বর্ণময়তায়।
“আলবের্তো কাইরো আমার গুরু।”—পেসোয়ার সমগ্র রচনার মূলসূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে এই ঘোষণার মধ্যে। কাইরো হচ্ছে তার রচনার সৌরমন্ডলের কেন্দ্রবিন্দু আর রেইস হচ্ছে তাকে কেন্দ্র করে ঘুর্ণ্যমান একটি গ্রন্থের মতো। কামপোস এবং স্বয়ং পেসোয়াও তাই। তাদের সমগ্র রচনাই হচ্ছে নেতিকরণ এবং অবাস্তবতার পরমাণুসমূহ। রেইস বিশ্বাস করে আঙ্গিকে, কামপোস-এর বিশ্বাস উত্তেজনায় আর পেসোয়ার বিশ্বাস প্রতীকে। কাইরো কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করে না; তার বিশ্বাস অস্তিত্বে।
দার্শনিক বিচারে কাইরোর বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা যেতে পারে অস্তিত্ববাদী প্যাগানইজমের সাথে। তার লেখায় এবং ব্যক্তিত্বের মধ্যে রয়েছে প্রাচ্যীয় শান্ততা ও বিচক্ষণতা। অন্যদিকে কাইরোর সাথে কামপোসের পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কাইরোর যদি প্রশ্ন হয়: আমি কী, তাহলে কামপোসের প্রশ্ন হচ্ছে: আমি কে? পেসোয়ার কল্পিত কবিদের মধ্যে রিকার্দো রেইস হচ্ছে একটু জটিল ধরনের। রেইস নিভৃতচারী; ভালোবাসে এপ্রিগ্রাম, এলিজি এবং ওড-এর মতো নব্য ধ্রুপদি বিষয়।
এদের প্রত্যেকের কবিতা নিয়ে আলোচনার আগে আমি দান্তের সাথে পেসোয়ার একটি সামান্য সাদৃশ্যের কথা জানানোর লোভ সামলাতে পারছি না। মনে আছে নিশ্চয়ই যে আদোস্ফা কাসাইস মন্তেইরোকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে পেসোয়া এক জায়গায় লিখেছেন যে, “আমার মধ্যে আবির্ভূত হলেন আমার গুরু (In me had appeared my master)।” পেসোয়ার এই প্রতিধ্বনি হয়তো ইচ্ছাকৃত বা সচেতন নাও হতে পারে, কিন্তু এর সাথে দান্তের সাদৃশ্য রয়েছে পুরোপুরি। দান্তে তার Vita Nova বা নবজীবন-এর শুরুতে বিয়াত্রিচকে দেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখেছেন যে বিয়াত্রিচ তার জীবনকে চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছিল। দান্তে লিখেছেন:
She appeared to me dressed in a very noble, modest and proper crimson colour, belted and bejewelled in a manner suited to her great youth. At this point I say truthfully that the spirit of life which dwells in the most secret chamber of the heart began to tremble so violently that it was readfully apparent in my slightest pulse; and trembling in spoke these words : Ecce deus Itior me, qui veniens dominabitur mihi.
এর পরপরই দান্তের গুরুত্বপূর্ণ উক্তি হচ্ছে ‘From then on I say that love ruled my soul, which was instantly subjected to him, and began to have such ascendancy and dominion over me through the power my imagination perceived in him, that I had no choice but to submit completely to his every whim.’
দান্তের ক্ষেত্রে বিয়াত্রিচ যেমন, পেসোয়ার জীবনে ‘গুরু’র (master) আবির্ভাবও একই প্রভাব ফেলেছিল। বদলে দিয়েছিল পেসোয়ার কবিতার ধরন। শুধু পেসোয়ারই নয়, পর্তুগিজ, এমনকি ইউরোপেই কবিতার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা ঘটেছিল ১৯১৪ সালের ৮ মার্চের সেই রাতে। মন্তেইরোর কাছে লেখা ঐ চিঠিতে পেসোয়া জানাচ্ছেন যে আলবের্তো কাইরোর আবির্ভাবের সাথে সাথেই পরিবর্তনের সূচনা। আগেই বলেছি কাইরো কেবল পেসোয়ারই ‘প্রভু’ বা গুরু নন, তিনি কামপোস ও রেইস-এরও গুরু। কিন্তু কেমন ছিলেন এই কাইরো এবং কেমন ছিল তার কবিতার ধরন? আত্মপরিচয় জানাতে গিয়ে কাইরো এক জায়গায় লিখেছেন যে, “চিন্তা করা মানেই বুঝতে পারার ব্যর্থতা”, “আমার দর্শন নেই : আমার আছে বোধ।” “আমার মরমিবাদ (mysticism) নয় জানতে চাওয়া।” কাইরোর এক কবিতার কিছু চরণ হচ্ছে এ রকম:
ধন্যবাদ ঈশ্বরকে, পাথরেরা শুধুই পাথর,
আর নদীগুলো নদী ছাড়া অন্য কিছু নয়,
আর ফুলগুলো কেবলই শুধু ফুল।
লক্ষণীয় যে পাথর, নদী এবং ফুল—এরা কোনো কিছুরই রূপক বা নিহিত অর্থ হিসেবে এখানে উপস্থিত হয় নি। কিংবা উল্লিখিত বস্তুর অতিরিক্ত কোনো ব্যঞ্জনা সৃষ্টিরও বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয় নি এই কবিতায়। বস্তু যা ঠিক সেভাবেই তাকে হাজির করা হয়েছে। কাইরো/পেসোয়ার আগে কবিরা বস্তু বা প্রকৃতিকে কতভাবেই না অর্থময় এবং মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেছেন। রোমান্টিক কাব্যিক ভাবালুতা থেকে কাইরো তার এই কবিতাকে পুরোপুরি দূরে রেখেছেন। I don’t bother with rhymes (১৪ নং) নামক এক কবিতায় তিনি লিখছেন:
আমি দেখি আর আলোড়িত হই
যেভাবে ঢালুতে গড়িয়ে যাওয়ার সময় জল আলোড়িত হয়।
বাতাসের উত্থানের মতোই প্রাকৃতিক আমার কবিতা।
ওয়ালেস স্টিভেন্স-এর মতো কাইরো কেবল তাৎক্ষণিক বাস্তবতার বাইরে যাওয়ারই প্রয়োজন বোধ করছেন না, তিনি বস্তু যা তাকে সেভাবেই দেখার চেষ্টা করেন:
বস্তুদের নিহিতার্থ এইই
তাদের মোটেই কোনো নিহিতার্থ নেই
বস্তুরাই কেবল বস্তুর নিহিতার্থ।
তার অন্য এক কবিতায় বলেছেন:
আমি যে ধুলো হয়ে মিশে গেছি
আমার কবরে
ঐ ঘাসকে হতে দিও তার চিহ্ন
প্রকৃতি মনে রাখে না তাই সে এত অপরূপ।
কাব্যিক ভাবালুতা নয়, এক ধরনের শুষ্কতা কাইরোর কবিতাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে রেখেছে। হয়তো মানবিকতা-বর্জিতও বলা যায় একে। রোমান্টিক চেতনার বাইরে গিয়ে কাইরো জীবনের মহিমান্বিত রূপ এবং মনের মাধুরী আরোপ না করে প্রকৃতিকে তার আসল রূপে দেখার প্রথারিরোধী ধারণাটি হাজির করেছেন এই কবিতায়। আমাদের মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথের সেই বহুল-উদ্ধৃত ‘আমি’ কবিতাটি, যার শুরুতেই তিনি বলেছেন :
আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখে মেললুম আকাশে—
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’—
সুন্দর হল সে।
তুমি বলবে এ যে তত্ত্বকথা, এ কবির বাণী নয়।
আমি বলব এ সত্য
তাই এ কাব্য।
কাইরোর কাছে এটা ‘সত্য’ও নয়, ‘কাব্য’ও নয়। কাইরো কবিতার এই রোমান্টিক ধারাটিকেই অস্বীকার করেছেন পুরোপুরি।
কাইরোর পর এবার আসা যাক রিকার্দো রেইস-এর কাছে। ইনিও কাইরোর চেয়ে কম নন কোনো অংশে। পেসোয়ার অপর কবি কামপোস যেমন ভবঘুরে, অন্যদিকে রিকার্দো রেইস হচ্ছেন খানিকটা নিভৃতচারী। তার দর্শন হচ্ছে নির্বিকারবাদ আর ভোগবাদের এক মিশ্ররূপ। রেইস-এর কবিতার বিষয়বস্তু: আনন্দ, ক্ষণস্থায়িত্ব, লিডিয়ার গোলাপগুচ্ছ, মানুষের বিভ্রমময় স্বাধীনতা কিংবা দেবতাদের অহংকার। রেইস বাস করেন কালাতীত এক সময়ের মধ্যে। কোনো প্রকরণ বা দর্শন তাকে রক্ষা করে না, তাকে রক্ষা করে ভূতুড়ে এক বাস্তবতা। মজার ব্যাপার হচ্ছে রেইস মনে করেন তার আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। তার এক কবিতায় লিখেছেন:
I do not know from whom
I recall my past
I was another nor do I know myself
When with my soul I feel
That alien I remember as I feel.
From one day to the next, we forsake ourselves.
Nothing that’s certain binds us to ourselves,
We are who we are and it is
Something inwardly perceived the thing we were.
নির্লিপ্ততা, জীবনের প্রতি নিরাবেগ দৃষ্টিভঙ্গি রেইস-এর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
জীবনকে দেখ দূর থেকে।
কোনো প্রশ্ন করো না একে।
এ তোমায় বলবে না কিছু
দেবতারাও জানে না উত্তর।
এই পঙ্ক্তিগুলোতেই বোধহয় রেইস-এর দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। আমরা কেন আশপাশের বাস্তবতায় পরিতৃপ্ত হতে পারি না? কারণ আমরা আমাদের মতো করে একে দেখতে চাই এবং পেতে চাই। কিন্তু প্রকৃতি বা বাস্তবতা তো আমাদের আকাঙ্ক্ষার উৎসারণ নয়। তাহলে কেন আমরা বাস্তবকে তার নিজস্ব আদলে দেখতে পারব না? আর কেনইবা অন্য কিছুর জন্য বা মুক্তির জন্য আমাদের সবসময়ই একটা কিছু খুঁজতে হবে? প্রেমের অনুভূতির ক্ষেত্রেও রেইস-এর ব্যতিক্রম চোখে পড়ার মতো। লক্ষ করুন এই পঙ্ক্তিগুলো:
এসো, লিডিয়া, পাশে বসো
এসো, লিডিয়া, নদীতীরে আমার পাশে এসে বসো।
চলো দেখি চুপচাপ এর গতিবেগ, আর কিভাবে জীবন
বয়ে যায়, আর আমরা পরস্পর হাত ধরছি না।
(এসো হাত ধরি।)
এসো তবে বয়স্ক শিশুর মতন হয়ে যাই
এ জীবন বহমান, দাঁড়ায় না সে কোনোখানে, রাখে না কিছুই, ফেরে না কখনো;
বহুদূর সমুদ্রে চলে যায়, নিজের নিয়তি বরাবর,
দেবতার চেয়ে আরও দূরে।
আমরা আর হাত ধরব না: নিজেদের ক্লান্ত করা কেন?
আমাদের আনন্দ ও বেদনার জন্য নদীর মতন বয়ে যাই।
খুব বেশি অস্থিরতা ছাড়া
নীরবে সময় পার করতে জানাটাই বরং অনেক বেশি ভালো।
না প্রেম না ঘৃণা কিংবা আবেগ উচ্চকিত করে না তাদের স্বর,
কিংবা অসূয়া অবিরাম ঘুরাবে না চোখ,
যদি জানত পাত্তা দেয়া তবে নদী বইত না ধীরে,
তারপরও নদী ঠিকই অবশেষে সাগরে মিলায়।
এসো তবে শান্তভাবে পরস্পরকে বাসি ভালো—এই ভেবে যেন আমরা পারি,
ইচ্ছে হলে চুমু খাব, করব শৃঙ্গার আর
আলিঙ্গনে জড়াব দু’জন,
নদীর প্রবাহ দেখে দেখে
আর তার শব্দ শুনে শুনে আমরা পাশাপাশি বসে
এই কাজ ভালোভাবেই করে যেতে পারি।
এসো ফুল জড়ো করি, আর তুমি তার কিছু নাও আর
কিছু তুমি কোলে রাখো, তাদের সুবাস ভরে দিক মিষ্টতায় মুহূর্তকে—
এই সেই মুহূর্ত যখন আমরা বিশ্বাস করি না কিছুই,
অবক্ষয়ের নিষ্পাপ প্যাগান মানব।
অন্তত আমি হই ছায়া প্রথমত, তারপর করবে তুমি স্মরণ আমাকে,
যদিবা স্মরণে আসে, তোমাকে দেব না ব্যাথা, জ্বালাব না, করব না বিরক্ত মোটেই,
যেহেতু ধরি না হাত কিংবা চুমু দেই নি কখনো,
কিংবা হয় নি কভু শিশুদের চেয়ে বেশি কিছু।
আর আমার আগেই যদি বিষণ্ণ মাঝির কাছে কড়ি নিয়ে যাও
তাতে আমি কষ্ট পাব না যখন তোমার কথা মনে পড়বে।
আমার স্মৃতিতে তুমি মধুর হয়ে রবে যদি কোনোদিন
মনে পড়ে তোমাকে এভাবে : নদীর তীরে, এক বেদনাময়ী
প্যাগান যুবতী, কোলে তার ফুলরাশি।
প্রেমের এই অনুভূতিকে মনে হতে পার অবাস্তব; কড়ি, বিষণ্ন মাঝি এবং অন্য যা কিছু আছে তা বাস্তব জীবনের চেয়ে বরং এক ধরনের বানানো জীবনের দৃশ্যপট বলেই মনে হবে। কিন্তু এর স্বাতন্ত্র্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন বোধহয় তোলা সম্ভব নয়। রেইস-এর কবিতায় লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে-কোনো কিছুর প্রতি এক ধরনের প্রত্যক্ষতা এবং দার্শনিক উপলব্ধির অভিব্যক্তি।
তৃতীয় অপর কবি আলভারো দে কামপোস সম্পর্কে আমরা আগেই কিছুটা আভাস পেলেও তার কাব্যবৈশিষ্ট্যকে হাতেনাতে পরখ করার অবকাশ হয় নি। তার আগে বলি, কাগজপত্রে তিনি ‘আধুনিক’ কবি হিসেবেই পরিচিত। কামপোসের কবিতার নমুনা দেখবার আগে তার সম্পর্কে সামান্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা খোঁজ-খবর নিলে তাকে বুঝতে একটু সুবিধা হবে। ১৯১৪ সালে চিত্রশিল্পী সান্তা রিতা প্যারিস থেকে যখন লিসবনে ফিরে আসেন তখন মারিনেত্তির ফিউচারিস্ট মেনিফেস্টোর একটা কপি সাথে নিয়ে এসেছিলেন। ঐ বছরই ‘অর্ফিউ’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন লিসবনে আত্মপ্রকাশ করে এবং প্রথম সংখ্যাতেই ছিল সা-কারনেইরো আর আলভারো দে কামপোসের কবিতা। যেহেতু তাদের কবিতা ছিল অদ্ভুত রকমের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত তাই সমকালীন এবং পূর্ববর্তী অনেকেরই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছিলে এই তাদের কবিতাগুলো। কোনো কোনো সমালোচক ঐ পত্রিকার কবিদের উন্মাদ বলতেও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তাদের কবিতাকে মনে হয়েছিল গদ্যতুল্য, যেহেতু তা ছিল না প্রচলিত আবেগের বা প্রথাগত আঙ্গিকের। বরং তা ছিল অনেকটা হুইটম্যান এবং মারিনেত্তির পর্তুগিজ সংস্করণ।
কাইরো ছিল প্রাণী ও শিশুদের মতোই কালাতীত এক সময়ের বাসিন্দা, কিন্তু আলভারো দে কামপোস বাস করেন বর্তমানে। তবে দুজনের মধ্যে একটা ঐক্য হচ্ছে, দুজনই ফ্রিভার্স লিখেছেন, পর্তুগিজ ভাষাকে খানিকটা মুচড়ে দিয়েছেন তাদের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি এবং শৈলীর মাধ্যমে; কবিতাকে তারা করে তুলেছেন গদ্যময়। তারা পছন্দ করেন নিরেট বাস্তবতা।
পর্তুগিজ কাব্যধারায় কামপোসের ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী এবং অপরিচিত। শুধুমাত্র বিষয়ের দিক থেকেই নয়, কাব্য-প্রকরণের দিক থেকেও তিনি ছিলেন তৎকালীন পর্তুগিজ কাব্যধারায় এক অভিনব দৃষ্টান্ত। এমনকি কামপোসের Tabacaria কবিতাটিও আমাদেরকে অভিভূত করে তার বিষয়গত উচ্চাশা, কল্পনার মননশীল চেহারা এবং গভীর দার্শনিক উপলব্ধি। কবিতাটির শুরু হয়েছে এভাবে:
নেপলিয়ন যতখানি অর্জন করেছিল আমি তারও চেয়ে বেশি স্বপ্ন দেখেছি।
যিশুর চেয়েও আমি বহু বেশি মানবতা আঁকড়ে ধরেছি আমার এই ভাবুক হৃদয়ে,
গোপনে এমন কিছু দর্শন ভালোবেসেছি কান্ট যা লেখে নি কোনোদিন।
কিন্তু আমি যেখানেই থাকি না কেন,
হয়তোবা চিরকালই নিভৃতে রব;
সর্বদাই আমি হব তাই ছিল না যে লক্ষ্যে এই জন্মগ্রহণ
---
সর্বদাই আমি হব সেই একজন অপেক্ষা যে করে যাবে তার
দরজাবিহীন এক দেয়ালে যে খুলে দেবে দ্বার,
মুরগির খাঁচায় যে গেয়েছিল অসীমের গান,
আর বদ্ধ জলাশয়ে শুনেছিল বিধাতার স্বর।
নিজেতে আস্থা? না, কোনো কিছুতেই নেই...
কবিতাটিতে বক্তা নিজের কক্ষ থেকে লক্ষ করছে রাস্তার গাড়িঘোড়া, পথচারী কুকুর এবং যাবতীয় বাস্তব ও অবাস্তব এবং নিকট ও দূরবর্তী সবকিছু। ফিউচারিস্ট কবি হিসেবে কামপোস এই দৃঢ়চেতনা দিয়ে শুরু করছেন যে কেবল বাস্তবতাই হচ্ছে উত্তেজনা। কয়েক বছর পরে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন এই বলে যে তিনি আদৌ বাস্তব কিনা।
গুরুভার এই দার্শনিক উপলব্ধির বাইরেও কিন্তু কামপোসের অন্য ধরনের কবিতাও আছে। ১৯৩৫ সালের জানুয়ারিতে লেখা এক কবিতায় আমরা যে wit এবং irony-র মুখোমুখি হই তা কেবল কামপোসই নয়, পেসোয়ার অন্যসব ‘ব্যক্তি'দের কাছেও অপরিচিত। যদিও কবিতাটি পেসোয়া লিখেছিলেন কামপোস-এর নামেই। কবিতাটির শুরু এইভাবে:
প্রাচীন কবির দল কাব্যদেবীকে জানাত আবাহন।
আর আজ দেখ আমাদের সহায় শুধু আমরাই।
সত্যি কি দেবী তুমি
নামতে কখনো—মর্ত্যের পাণ্ডুলিপি ছুয়ে?
আনত আশীর্বাদে, স্মিত মুদ্রায়।
কে সই বাণীর বরপুত্র? কোন মন্ত্রোচ্চারণে ডাকে সে দেবীকে?
নিভৃতে নিগূঢ়ে
তার ওপরে নির্ভর করে দেবীর আবির্ভাব।
তবে আমি এতটা নিশ্চিত নই এ ব্যাপারে।
দেবীর সেইসব আগমনে বিশ্বাসী
হবো না হয়তো কোনোদিন। আমি তো বিশ্বাসীও নই
হবও না হয়তো কোনোদিন
তবে একটি ব্যাপারে আমি বিশ্বাসী চিরকাল।
আমাদের আবাহনে আমরা আসি নি কখনো নেমে
কবিতায়, পঙ্ক্তিতে হৃদয়ে কাব্যে কোনোকালে।
দীর্ঘদিন দীর্ঘরাত্রি বহুবার বারবার
আমি কাটিয়েছি কাল ডেকে ডেকে আমাকে
আমার গভীর শোণিত বেয়ে সেই রক্তচিৎকার
মিশে গেছে কুয়োর দেয়ালে
নেই নেই কেউ নেই। প্রতিধ্বনি? সেও নেই।
শুধু এক প্রতারক আলো খেলা করে অথই কুয়োর জলে
আর এক মুখ মৃতের মতো যার রূপ
এই আছে এই নেই
খেলা করে।
কেইবা সে হবে আমি ছাড়া?
মৃতের মতো যার রূপ
মৃত প্রতিবিম্ব এক পড়ে থাকে জলে।
নির্বাক।
নেই নেই কেউ নেই প্রতিধ্বনি? সেও নেই।
তার দিকে চেয়ে
সে আমার দিকে
কাটিয়েছিল কাল
আমার আবাহনে আমি আসি নি কখনো নেমে
কবিতায় পঙ্ক্তিতে হৃদয়ে কাব্যে কোনোদিন।
পুরো কবিতাটিতে রয়েছে এক ভিন্ন অবলোকনের দৃষ্টান্ত। এতে নেই বিষণ্ন মনের প্রতিফলন কিংবা নেই সেই সারল্য, যা কামপোস কিংবা কল্পিত অন্য দুই কবির প্রায় অভিন্ন বৈশিষ্ট্য, বরং আমরা দেখতে পাব তীক্ষ্ণ, কিছুটা হিউমারাস আর শীতল স্বভাবের ছায়া। পেসোয়া কেন কবিতাটি কামপোসের বচনার অন্তর্গত করেছিলেন সে সম্পর্কে আমাদের মনে কিছুটা কৌতূহলের উদ্রেক করে। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে পেসোয়া তার জীবনের শেষ পাঁচ বছর যে ধরনের কবিতা লিখেছিলেন এটি অনেকটা সেই বৈশিষ্ট্যেরই বলা যেতে পারে। তবে কি এই ধারণায় আমরা পৌঁছুব যে, তিনি আসলে অন্য নামের আড়ালে তাঁর নিজস্ব স্বরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অনুসন্ধানের লক্ষ্যেই কবিতাগুলো লিখছিলেন? তাহলে অন্য স্বরগুলো কার বলে ধরে নেব?
এটা তা ঠিক যে, একেবারে শুরু থেকেই পেসোয়ার কবিতা জড়িয়ে পড়েছিল অবভাস ও বাস্তবের রহস্যের সাথে, আত্মজ্ঞানবাদের সাথে এবং মানুষের এমন এক কূটাভাস (Paradox)-এর সাথে যেখানে কেউ একজন স্বপ্নে নিজেকে একটি প্রজাপতি হিসেবে দেখতে পায় এবং এই প্রজাপতি নিজেকে মানুষরূপে স্বপ্নে দেখার পর জেগে ওঠে: স্বপ্নে দেখলাম আমি ঘুমিয়ে ছিলাম না, আমি আমার স্বপ্নকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম। 'আলেকজান্ডার' সার্চ নামে পেসোয়া ইংরেজি এক সনেটের শুরুতে লিখেছিলেন:
The world is woven all of dream and error
and but one sureness in our truth may lie—
We know it not by knowing it thereby.
১৯১৪ সালে পর্তুগিজ ভাষায় লেখা পেসোয়ার একাধিক কবিতায় এই বিষয়টি ঘুরেফিরে এসেছে, কখনো কখনো একেবারে তীব্রভাবেই এসেছে, যেমন—‘স্টেশন অব দ্য ক্রস’ কবিতায় আমরা দেখতে পাব :
I come from afar and bear in my profile,
If only in remote and misty form,
The Profile of another being, at variance
With this base and human silhouette now mine.
Perhaps in former times I was, not Boabdil,
But merely his last look from the road
At the face of granada he was leaving
A cold Silhouette beneath the unbroken blue...
তবে বেশিরভাগ সময়ই কৌশলগুলো প্রায় একই রকমের: কবিতার পর কবিতায় কেবলই আলাপচারিতা হাজির হয়েছে অপর, সময় ও অস্তিত্বের কূটাভাস (Paradox) সম্পর্কে। আর ঠিক এইখানটায়ই আমরা লক্ষ করব পেসোয়ার আত্মবিকাশের ক্ষেত্রে তার অন্য নামগুলোর ব্যবহারের গুরুত্ব এবং এই গুরুত্বের প্রকাশ। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই যে, রেইস, কাইরো এবং কামপোসের লেখাগুলো মূলত রোমান্টিক কবিতার তীব্র প্রলোভন থেকে দূরে সরে আসার এক উজ্জ্বল দুঃসাহসী নমুনা। পেসোয়ার সমগ্র রচনাকর্ম আসলে কল্পনা-মনীষার এক কাব্যিক পরিভ্রমণ। ভাষা, সাহিত্য, নন্দনতত্ত্ব, দর্শন, ধর্ম ও বিশ্বদৃষ্টির মধ্যদিয়ে পরিভ্রমণ করেছেন তার অপর কাব্যব্যক্তিদের নিয়ে। এ প্রসঙ্গে আত্মজৈবনিক 'Autophsychography' কবিতাটির দিকে তাকালে আমরা তার ব্যক্তিত্বের গোপন গড়নটি অনেকটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারব :
The poet is a fake.
His faking seems so real
That he will fake the ache
Which he can really feel.
And those who read his cries
Feel in the paper tears
Not two aches that are his
But one that is not theirs
And so round in its ring
Giving the mind a game
Goes this train on a string
and the heart is its name.
কবিতাটিতে কবির চিন্তা এবং অনুভূতির কথাই কেবল বলা হয় নি, উপরন্তু এতে চিত্রিত হয়েছে আত্মবিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতাগুলো এবং ‘নিজ’ ও ‘অপর’-এর মধ্যে সাক্ষাতের জায়গাটুকুও। কবিতার শেষ স্তবকে দেখা যাচ্ছে খেলনা ট্রেনটি ছোট্ট ট্র্যাকে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এই ট্রেনটি কেবল বিশেষ একটি মানসিক পরিস্থিতিরই প্রতিনিধিত্ব করছে না, একই সাথে তা কবিতারও প্রতিনিধিত্ব করছে : শব্দরা কেন্দ্রের (হৃদয়ের) চারপাশে ট্রেনের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং কখনোই তা কেন্দ্রের কাছাকাছি আসতে পারছে না। কবিতা কি তাহলে যান্ত্রিক খেলনার মতো? না, পেসোয়া তা বলতে চান নি। খেলনা ট্রেনের উপমায় তিনি কবিতার অন্তর্জগতের ভূদৃশ্যটিকেই কেবল চিত্রিত করতে চেয়েছেন। এটা তো ঠিক যে, কবিতা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত যে ধারণা এবং প্রচলিত কবিতায় অবগাহনের যে অভিজ্ঞতা তা আমাদেরকে ওভাবে চিন্তা করতে বা ভাবতে মোটেই উৎসাহিত করবে না। কারণ ওই ধারণা এতটাই গদ্যময়, বস্তুময় এবং ভাবালুতাবর্জিত যে, আমরা কোনোভাবেই এই ধারণাকে প্রচলিত কাব্যবোধের সাথে মেলাতে পারি না। এই কবিতাটি লেখার বছর দুয়েক পরে তিনি ‘এই’ বলে আরেকটি কবিতা লিখেছিলেন, যাতে তিনি বলেছেন:
তারা বলে তারা বরাবর বলে মিথ্যে নও তুমি
নও ভান, অন্য কিছু হতে পার
কত কিছু কে জানে, কেই বা তা জানে।
হৃদয়কে রুদ্ধ করে আমার কাজ আমি করি
অনুভব নয়, কল্পনা আমার সহচরী।
একটি বিশাল ছাদ আমি।
জীবন, স্বপ্ন, অপূর্ণতা
এইসব ধারণ করে আছি।
ছাদ থেকে দেখা যায়
একটি জগৎ লেখার জগৎ সুন্দর!
আমার লেখার জগৎ
আমি ও লেখার জগৎ
দুইজন পাশাপাশি থাকি
অনুভব নির্বাসিত করি
আমি কি কেবল দর্শক?
লেখক কি দর্শক হয়?
লেখকই আসলে দর্শক
অনুভব করে যারা—
তারা তো পাঠক।
আত্মবিশ্লেষণমূলক এই কবিতাটির নিজের কূটাভাস (paradox) সম্পর্কে তেমন কিছু বলছে না, বরং ওই জাতীয় সব কূটাভাসের কারণগুলো তুলে ধরেছে। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে যে-রোমান্টিক চেতনা কল্পনা-মনীষার ঘনিষ্ঠতা ছাড়া অচল ও অবশ, পেসোয়া এই কবিতায় সেই কল্পনাকে বাদ দেন নি, যদিও তা ইংরেজি কবিতার রোমান্টিক প্রলোভন থেকে অনেক দূরে।
পেসোয়ার সমগ্র রচনাকর্মের দিকে তাকালে আমাদের স্বাভাবিকভাবেই ফরাসি কবি আর্তুর র্যাবোর কথা মনে না এসে পারে না, যিনি সুশৃঙ্খলভাবে তার অনুভূতি বা বোধগুলোকে (senses) বিশৃঙ্খল ও কেন্দ্রীয় ‘আমি’-কে পরিত্যাগের মাধ্যমে অহং (ego)-এর ক্ষুদ্র, তুচ্ছ ও রক্ষণশীল দাবিগুলোকে অগ্রাহ্য করতে চেয়েছিলেন। তিনি যে বলেছিলেন ‘ও’ বা 'আমি অন্য কেউ'—তা কেবল কবির বিষয়ী সত্তারই বিলোপ ঘটায় নি বরং এই বিলোপের মাধ্যমে তিনি মুক্ত করতে চেয়েছিলেন তার ভেতরের বহুমুখী সত্তাগুলোর। পেসোয়া এই ‘বিলোপ’ ও ‘মুক্তির’ চর্চাই করেছিলেন আজীবন, কিন্তু তা র্যাবো থেকে অনেক ভিন্ন উপায়ে এবং আলাদা পথে।
গ্রিক পুরানের সেই অর্ফিয়ুস-এর কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। অর্ফিয়ুস যখন জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে তখন একদিন রুক্ষ নারীবেশিনী একদল মীনাস তাদের সাথে নাচতে বললে অর্ফিয়ুস তাতে রাজি না হওয়ায় ওরা তার দেহটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। তার সেই ছিন্নভিন্ন দেহের প্রতিটি খণ্ড গান গাইতে গাইতে নদীপথে ভেসে যেতে থাকে সমুদ্রের দিকে। পেসোয়াও যেন একইভাবে, তার দেহের না হলেও, রুক্ষ বাস্তবতা ও মানব-ইতিহাসের মীনাস কর্তৃক ছিন্নভিন্ন হওয়া তার ব্যক্তিত্বের অন্যসব খণ্ডসহ (রিকার্দো রেইস, আলবের্তো কাইরো, আলভারো দে কামপোস, বার্নাদো সোয়ারেস, আরেকজান্ডার সার্চ, রবার্ট আনোন এবং অন্যসব সত্তা) অপূর্ব স্বরে ও সুরে কল্লোলিত কণ্ঠে সমকালের নদীপথ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন মহাকালের সমুদ্রের দিকে।