পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসটি বিখ্যাত দুটি কারণে। প্রথমত এর বিষয়বস্তু, যা তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে একেবারেই অভিনব। দ্বিতীয়ত লেখকের দৃষ্টিকোণ। যাকে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন ‘কঠোরতর বস্তুনিষ্ঠা ও মর্মভেদী তীক্ষ্ণতা (উত্তরাধিকার : ৫০৩)’। এই বস্তুনিষ্ঠারই অন্য নাম বাস্তববাদ—যা ছিল ‘কল্লোল’ পত্রিকার ঘোষিত ইশতেহার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যক্ষভাবে কল্লোলগোষ্ঠীর লেখক না হলেও তাঁরই রচনায় এর সার্থক প্রয়োগ ঘটেছিল। এর আগে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎ বা বিভূতির লেখায় আমরা যে বাস্তববাদের পরিচয় পাই তাতে ছিল কল্পনা ও রোমান্সের মিশেল, আইডিয়া ও রূপকের আশ্রয়। কিন্তু মানিক আইডিয়া ও রূপকের চৌকাঠ পার হয়ে বাস্তবতাকে পাঠ করেছেন মার্ক্সীয় সমাজবীক্ষা তথা শ্রেণিসচেতন মন নিয়ে এবং মানুষের চরিত্রকে উদ্ঘাটন করেছেন ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণের আতশকাচে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি দ্বন্দ্ব এখানে উপস্থিত হয়। তত্ত্বীয় কাঠামোর মধ্যে জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততা কতটা বিধৃত হতে পারে—প্রশ্ন এটাই। এই রচনায় আমরা বুঝতে চেষ্টা করব তত্ত্ব এবং জীবনের দ্বন্দ্বকে কিভাবে মোকাবেলা করেছেন ঔপন্যাসিক।
পদ্মাতীরবর্তী সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাংলা সাহিত্যে প্রথম আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পে। তাদের সেই উপস্থিতি কিছুটা যেন আমাদেরই সাজে—যেন তারা লেখকের হাতে গড়া মানুষের মূর্তি। তাই আমাদেরই ভাষা শুনি তাদের মুখে। পক্ষান্তরে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে আমরা—বাংলা সাহিত্যের পাঠক—যেন নিজেরাই গিয়ে উপস্থিত হলাম ঐসব মানুষের ঘর-মন-জানালার পাশে, তাদের বেড়া-ভাঙা আঙিনায়। এই প্রথম তারা নিজের ভাষায় কথা বলে উঠল : চুপ কর মাঝি, বেবাকে শুনব। যাইবা যাও, কী আর কমু তোমারে...
ইতঃপূর্বে দরিদ্র গ্রামবাংলার অনুমপ আলেখ্য উঠে এসেছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী (১৯২৯) উপন্যাসে। কিন্তু তা ঠিক একটি নির্দিষ্ট জনপদের জীবনচিত্র নয়। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও একটি দশক। বিশেষত চারটি উপন্যাসের কথা বলতে হয় : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু (১৯৪৮), সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোঁড়াই চরিতমানস (১৯৪৯), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলীবাঁকের উপকথা (১৯৫১) এবং অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৫৬)।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেট আর্টিস্ট। কিন্তু তিনি তো বামুনের পোলা। জাউলাদের জীবনসংসার তিনি কতটুকু বুঝবেন? আমি জাউলার পোলা
পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে ধীবরপল্লি বা জেলেজীবনের চিত্র বাস্তবানুগ হয়েছে কিনা তা নিয়ে মানিকের জীবদ্দশাতেই তর্ক তুলেছিলেন স্বয়ং অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন : ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেট আর্টিস্ট। কিন্তু তিনি তো বামুনের পোলা। জাউলাদের জীবনসংসার তিনি কতটুকু বুঝবেন? আমি জাউলার পোলা (কালি ও কলম)’। এই সমস্ত অভিযোগের মূলে আছে দুটি জিনিশ। এক, মানিকের নিজস্ব লিখনপদ্ধতি। দুই, উপন্যাসে বর্ণিত ময়না দ্বীপ ও হোসেন মিয়া চরিত্র। মানিকের প্রায় সমস্ত রচনা শুরু হয় তত্ত্বীয় প্রত্যয় থেকে, শেষ হয় গিয়ে জীবনের সত্য উদ্ঘাটনে। অসামান্য কল্পনাপ্রতিভা ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণশক্তির ফলেই তার চরিত্রগুলি কাঠামোবদ্ধ হয়েও প্রাণস্ফূর্তি লাভ করে। যে কারণে পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসেই প্রথম আমরা দেখি বিচিত্র গৌণ চরিত্রের সরব ও সপ্রাণ উপস্থিতি। শীতল-গণেশ-হাসু-রাসু-মালা-আইনুদ্দি সবাই তাদের স্বরূপ ও সম্ভাবনা নিয়ে হাজির। এমনটা এর আগে ঘটে নি বাংলা উপন্যাসে।
যে লিবিডো তত্ত্বে ভর করে তিনি কুবের ও কপিলার মনস্তত্ত্ব, তাদের অচিরতার্থতাকে আবিষ্কার করেন, তার অনিবার্য পরিণতি হলো জেলেপাড়া থেকে পলায়ন। মনে হতে পারে, এই পলায়ন বা প্রস্থানকে সফল করতেই লেখক ময়না দ্বীপের অবতারণা করেছেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ময়না দ্বীপ একটি সংকেত। কিন্তু তা বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত নয়। বরং আমরা বলব, তা এক নতুন বাস্তবতার ইশারাদাত্রী। সেই ইশারা ব্যাখ্যার মধ্যেই রয়ে গেছে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য, অর্থাৎ তত্ত্ব ও জীবনসত্যের সহজ পরিণয়।
নির্মম হলেও সত্য, আমাদের অগ্রজ প্রাজ্ঞ অনেক সমালোচকই পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের ভুল বাখ্যা করেছেন। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজ দত্ত থেকে অরুণ বসু সকল মহারথীই ময়না দ্বীপ ও হোসেন মিয়াকে জীবনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা বলে রায় দিয়েছেন নয়তো রহস্যময় গোঁজামিল বলে হাল ছেড়ে দিয়েছেন (‘হোসেন মিয়া, ময়না দ্বীপ ও লেখকের ইঙ্গিত’)। এমনকি অনেক অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পরও আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রশ্নহীনভাবে অনুসরণ করেছেন পূর্বসূরিদের (‘পদ্মানদীর দ্বিতীয় মাঝি’)। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য বইটি যিনি সম্পাদনা করেছেন, তিনি হোসেন মিয়ার চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এক জায়গায় বলেছেন :
নোয়াখালি সন্দ্বীপ থেকে সুদূর পূর্ব-দক্ষিণে সমুদ্রের বুকে হোসেন মিয়া একটি দ্বীপের পত্তনি নিয়েছিল। এসব এলাকার দরিদ্র মানুষদের নানা উপকারের মধ্য দিয়ে সে এই এলাকা থেকে লোকজন নিয়ে ময়না দ্বীপে লোকবসতি গড়ে তুলেছিল। সত্যি, লোকটার উদ্যম ও কর্মশক্তির প্রশংসা না করে পারা যায় না। এই ময়না দ্বীপকে ঘিরেই হোসেনের স্বপ্নকল্পনার বেসাতি। এটাই যেন তার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। সেখানে সে একটা জনসমাজ গড়ে তুলতে চায়, সেখানে দলমত ও ধর্মমত নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ একটা মানবীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গড়ে তুলবে। মনুষ্যত্ব ও মানবতাই হবে সে সমাজের ভিত্তি।এই উপন্যাসে হোসেন মিয়ার চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক যেন তার সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সাকার করে তুলেছেন। সব কিছু বিবেচনা করে বলা যায় যে, হোসেন মিয়া শুধু এই উপন্যাসের নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের একটি অভিনব চরিত্র।
এই সম্পাদক হোসেন মিয়ার মতো একটি উঠতি বুর্জোয়া চরিত্রকে কমরেড ঠাউরে শুধু ভুলই করেন নি, রীতিমতো গুনার কাজ করেছেন।
এই সম্পাদক হোসেন মিয়ার মতো একটি উঠতি বুর্জোয়া চরিত্রকে কমরেড ঠাউরে শুধু ভুলই করেন নি, রীতিমতো গুনার কাজ করেছেন। কেননা তার এই ভুল অজস্র শিক্ষার্থীর মনে বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হবে। সবকিছু বাদ দিয়ে উপন্যাসের কয়েকটি চরিত্র যদি আমরা বুঝতে চেষ্টা করি এবং মেলাতে চাই আজকের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, আমাদের চারপাশের মানুষের সঙ্গে, তাহলেও হয়তো লেখকের চিন্তার মূলসূত্রটি ধরা সম্ভব।
পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে একটি দীর্ঘ নৌযাত্রার প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠেছে প্রধান বিষয়। আর এই নৌযাত্রায় মূল চালকের আসনে যে রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে, সে হলো হোসেন মিয়া। ফলে এ সংশয় পাঠকের মনে জাগতে বাধ্য, উপন্যাসের নায়ক আসলে হোসেন মিয়া নাকি কুবের। কিন্তু নায়ক যেই হোক, কেতুপুর গ্রাম থেকে কিছু অসহায় জেলে-জেলেনীর ময়না দ্বীপে চলে যাওয়ার কথা বলাটাই যে লেখকের মূল উদ্দেশ্য, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। কেতুপুর গ্রামের যে প্রেক্ষাপট আমরা জানতে পারি, তাতে বোঝা যায়, এ সমাজ সামন্ততন্ত্রের শেষ দশায় উপনীত। সেখানে তখনও জমিদার-প্রথা প্রচলিত—সে তথ্য লেখক আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু পাশাপাশি এ দৃশ্যও তুলে ধরেছেন, জমিদারের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়েছে হোসেন মিয়ার মতো কাঁচা পয়সাঅলা মানুষদের দাপটে। হোসেন মিয়ার কারবার সম্পর্কে যে রহস্য ও অস্পষ্টতা, সেই সঙ্গে তার চরিত্রের সততা সম্পর্কে যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে পদ্মাতীরবর্তী অঞ্চলের জেলেদের মনে, তা খুবই স্বাভাবিক। যেমন স্বাভাবিক আজকের পুঁজিপতিদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা। এদের আয়ের উৎস জানবার উপায় নেই কারো। যেন এদের টাকা জোগায় ভূতে। আমাদের সমাজ বা আইনের চোখে তারা বড় জোর হতে পারে ঋণখেলাপি। শেষাবধি সে অভিধাও তাদের আভিজাত্যকেই নির্দেশ করে।
বাস্তবিক পক্ষে, বংশ-মর্যাদার দোহাই পেড়ে ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো তার বুদ্ধিমত্তা, কর্মশক্তি ও কৌশল। হোসেন মিয়া এসব গুণ বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিল। কোনো বংশপরিচয় বা পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়ে সে আমাদের সামনে উপস্থিত হয় নি। সাধারণ মানুষের কাতার ভেঙে বেরিয়ে আসা এক অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিপুরুষরূপে দেখা দিয়েছে হোসেন মিয়া। সে নিজে গান বাঁধে, আবার চোরাচালান ও মাদকের ব্যবসার সঙ্গেও সে জড়িত। তাই সকলের সমীহ তার প্রাপ্য। তাকে নিয়ে প্রশ্ন আছে প্রত্যেকের মনে, কিন্তু সে প্রশ্ন উত্থাপনের সাহস নেই কারো।
সামন্ততন্ত্র থেকে বুর্জোয়াতন্ত্রে সমাজের এই রূপান্তর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। যে আশাবাদ ও আলো নিয়ে বুর্জোয়া সভ্যতার বিকাশ ঘটে, তার সীমাবদ্ধতা ও নির্মমতাকে অনেকখানি তুলে ধরে ময়না দ্বীপ।
পুঁজিঅলাদের মূলধন লগ্নি করার পর প্রয়োজন হয় শ্রমিকের। কেননা তার মূল উদ্দেশ্য এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ধনবৃদ্ধি। এক্ষেত্রে অনেকের শ্রমকে স্বল্পমূল্যে কিনতে পারাটাই সার্থকতা। এখানে ধর্মবিশ্বাস বা মানবিক মূল্যবোধ শিশুভোলানো ছড়াগানের মতো। ধরা যাক একটা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির কথা। মালিক সব সময়ই চাইবেন অল্প বেতনে কাজ চালিয়ে নেয়া যায় এমন সুস্থ কর্মক্ষম শ্রমিককে। আতুর অথর্ব পঙ্গু ভালো মানুষের দরকার নেই তার। হাজার হাজার শ্রমিকের শ্রম সস্তা দরে কিনে তাদেরই উৎপাদিত পণ্য বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করার মধ্যেই তার জীবনের সার্থকতা। একই ঘটনা ঘটেছে হোসেন মিয়ার ক্ষেত্রেও। সে তার কুটবুদ্ধির জোরে কেতুপুর ও আশেপাশের এলাকা থেকে লোক সংগ্রহ করে ময়না দ্বীপে নিয়ে যায়। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্যই তাকে ধর্মবিভেদের থেকে দূরে থাকতে হয়, এমনকি ব্যভিচারকেও প্রশ্রয় দিতে হয়। যেকোনো মূল্যে তার প্রয়োজন সুস্থ সবল কর্মী, হিন্দু বা মুসলমান নয়। ময়না দ্বীপে নিষ্কর্ম বসে থাকবার উপায় নেই কারো। হাড়ভাঙা খাটুনির জ্বালায় কেউ কেউ তাই দ্বীপ ছেড়ে পালায়। কিন্তু অধিকাংশই নিরুপায়। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নানাবিধ বিবমিষা নিয়েও আমরা যেমন যন্ত্রের মতো কাজ করে যেতে বাধ্য হই, ঠিক তেমনি ময়না দ্বীপের বাসিন্দারাও পরিণত হয় একেকটি বিষাদগ্রস্ত যন্ত্রমানবে।
কেতুপুর গ্রাম থেকে শেষ যে দুটি মানুষ পাড়ি জমালো ময়না দ্বীপে, তারা কুবের ও কপিলা। কপিলা চায় কুবেরকে পেতে আর কুবের চায় মুক্ত জীবনের সন্ধান। এই দুই চাওয়ার ভেতর দিয়ে তাদের সংশয়ের যাত্রা। কিন্তু এই যাত্রা আসলে কুবের বা কপিলার নয়, সমগ্র ভারতবাসীর। পুরনো জগৎ ছেড়ে আমরা প্রবেশ করছি নতুন জগতে। এ প্রবেশ ও প্রস্থান বাইরে থেকে যেমন, ভেতর থেকেও তেমনি। জীর্ণ প্রথা ও প্রাচীন ধ্যানধারণাকে জলাঞ্জলি দিতে সময়ই আমাদের নির্দেশ করছে যেন। সামন্ততন্ত্র থেকে বুর্জোয়াতন্ত্রে সমাজের এই রূপান্তর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। যে আশাবাদ ও আলো নিয়ে বুর্জোয়া সভ্যতার বিকাশ ঘটে, তার সীমাবদ্ধতা ও নির্মমতাকে অনেকখানি তুলে ধরে ময়না দ্বীপ। যেখানে আছে অমানুষিক পরিশ্রম, পারিশ্রমিক হিশেবে আছে আশ্রয়, কিন্তু নেই লভ্যাংশের অধিকার, নেই কোনো মালিকানা। শ্রমদাসদের আত্মপ্রবঞ্চনার জন্য আছে আফিম, অবৈধ/অবাধ নারীসংসর্গ। এই ময়না দ্বীপে হোসেন মিয়ার মতো বুর্জোয়া মুক্তিদাতার হাতে কুবের বা কপিলার মতো নিঃসহায় নিপীড়িত মানুষের ত্রাণ যে নেই, এ কথাটাই লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন চোখে আঙুল দিয়ে। ভাগ্যবঞ্চিত, জন্মলাঞ্ছিত মানুষদের অবস্থার পরিবর্তন হয় না কখনো। কেবল শোষণের রূপ পাল্টায়। উপন্যাসের মধ্যে সরাসরি এমন মন্তব্যও করে রেখেছেন মানিক।
তাহলে জিজ্ঞাস্য, উপন্যাসের নাম ‘পদ্মানদীর মাঝি’ হলো কেন? কেন নয় ‘পদ্মাপাড়ের জেলে’, যদি জেলেদের ব্যথার ধূপ জ্বালানোই লেখকের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে থাকে? বিভ্রম তৈরি হতে পারে, পদ্মানদীর মাঝি নিশ্চয়ই কুবের। হয়তোবা তাই। কিন্তু আমরা যদি হোসেন মিয়াকেই মূল মাঝি সাব্যস্ত করি, খুব কি ভুল হবে? মাঝি তো সেই যে খেয়া পারাপার করে। হোসেন মিয়া কি সেই কাজটিই করছে না? ময়না দ্বীপে মানুষ নিয়ে আসাটা তো তারই কাজ। আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে বলা যায়, হোসেন মিয়ার মতো পুঁজিবাদীরাই কি সমাজকে পাল্টে দিচ্ছে না, নিয়ে যাচ্ছে না আমাদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়? সারা পৃথিবীই তো এখন নিয়ন্ত্রণ করছে গুটিকয় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বা কর্পোরেট সংস্থা। এই গ্রহ যদি একটি তরণি হয়, তবে সে তরণির বৈঠা এখন তাদেরই হাতে। তারাই নাবিক, তারাই পাঞ্জেরি, তারাই মাঝিমাল্লা। আমরা শুধু অসহায় যাত্রী।
১৯৩৩ সালে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা নিষ্পত্তির পর ৩৪-এ যখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয় ভারতে, সেই সময়ে লেখা উপন্যাস পদ্মানদীর মাঝি। আমরা এ কথাও ভুলি নি, ঐ সময়ে ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি মাঠে আন্দোলন করছে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদকল্পে। এবং এ তথ্যটিও উল্লেখ্য যে, ১৯৪৪ সালের আগে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন নি লেখক। পার্টির সদস্য না হয়েও নিজস্ব অনুধ্যানের মধ্য দিয়ে যে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত মানিক রেখে গেছেন তার উপন্যাসে, তা এককথায় অনন্য। বিশ্বসাহিত্যেও এর তুল্য রচনা বিরল।