জীবনানন্দ দাশের মতো বিরল ব্যতিক্রমকে বাদ দিলে বাংলা ভাষার প্রায় সব আধুনিক কবিই বিদেশি কবিতা অনুবাদে প্রলুব্ধ হয়েছেন। কেউ কেউ বহিরাগত তাগিদে কেউবা অন্তর্গত প্রেরণায়। মান্নান সৈয়দের ক্ষেত্রে এই তাগিদ ছিল অন্তর্গত। কিন্তু ‘অন্তর্গত’ বলার পরেও একটা খটকা মনের মধ্যে বাজে। এর কারণ, যদি আমরা মান্নান সৈয়দকে পরাবাস্তব কবি হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে তিনি পরাবাস্তববাদী নন—এমন অনেকেরই কবিতা অনুবাদ করেছেন। কেন করলেন?
পরাবাস্তবাদীদের ইশতেহার যদি আমরা মনে রাখি তাহলে দেখব, সেখানে যে-কথা রয়েছে তার সারাৎসার হচ্ছে যুক্তির গুরুভার শৃঙ্খল থেকে চৈতন্যের মুক্ত কল্পনা ও অবচেতনের উৎসার। সুতরাং কালের বিচারে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এমন অনেক কবি রয়েছেন যারা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অংশত পরাবাস্তববাদের নিকট আত্মীয়। আমরা যদি মান্নান সৈয়দকৃত অনূদিত কবিদের তালিকার দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে তার পাঠের ও উপভোগের জগৎ অনেক বেশি প্রসারিত ছিল। এই কারণে আক্ষরিক অর্থে বা শতভাগ পরাবাস্তববাদী বৈশিষ্টের নন এমন অনেক কবির কবিতার দ্বারা তিনি আকৃষ্ট হয়েছেন। যেমন প্রাচীন লি পো থেকে শুরু করে একালের ব্রেখট, ভজনেসেনস্কি, পাউন্ড, লরেন্সের কথা বলা যেতে পারে। কখনো কখনো সৌন্দর্য-চেতনা, কখনোবা শৈলীর চমৎকারিত্ব, কখনোবা উপলব্ধির শিল্পরূপে মুগ্ধ হয়ে তিনি অনুবাদে হাত বাড়িয়েছেন এসব কবির কবিতার দিকে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হওয়া সত্ত্বেও এরা সবাই মিলে মান্নান সৈয়দের চেতন ও অবচেতন জগতের গোটা পরিমণ্ডলের একগুচ্ছ সংকেত হয়ে উঠেছেন। তাই সৃজনশীল লেখকের ক্ষেত্রে অনুবাদ নিছক অনুবাদ নয়, এ হচ্ছে এক ধরনের মুখোশ। আর আপাতভাবে এলোমেলো মনে হলেও, কবি-অনুবাদক সাজ্জাদ শরিফের ভাষায়, ‘খেলাচ্ছলেরও এক অচেতন ছক থেকে যায় বটে।’ ’সংকেত’ এবং ’মুখোশ’-এ রূপান্তরিত হলে ’খেলাচ্ছলেরও …ছক’ থাকাটা স্বাভাবিক। আর সেটা থাকলেই কেবল অনূদিত কবিরা হয়ে পড়েন তার-ই বিক্ষিপ্ত, চূর্ণ রূপ। অনুবাদ প্রসঙ্গে ভলতেয়ার-এর সেই উক্তিটি স্মরণ করলে মান্নান সৈয়দের এসব অনুবাদের সংযোগসূত্রটি আবিষ্কার করা আরও সহজ হয়ে যাবে আমাদের কাছে: When we decide to translate we must choose our author as one chooses a friend, of a taste confirming to our own. (Candid and other writings, Voltaire, The Modern library, USA, 1956, p-562)
মান্নান সৈয়দ তার নিজের বিক্ষিপ্ত, চূর্ণ রূপের সন্ধান করেছেন রুশ, জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়, স্প্যানিশ, চীনা এবং ইংরেজি ভাষার ‘বন্ধুপ্রতিম’ ২৬ জন কবির কবিতায়; অনুবাদের মাধ্যমে তিনি নিজের কাব্যিক বন্ধুদের এক বলয় তৈরি করে নিয়েছিলেন। আমার এলোমেলো বিন্যাসে তাঁরা হচ্ছেন লি পো, রিলকে, আপোলেনিয়ার, হিমেনেস, ট্রাকল, লোরকা, এলিতিস, শেলি, হাইনে, নের্ভাল, লরেন্স, পাউন্ড, আর্প, আরাগঁ, প্রেভের, নেরুদা, ভজনেসেনস্কী ব্রেখট, মন্তালে এবং সর্বশেষ বোর্হেস।
তাঁর অনুবাদের ভিত্তি ছিল ইংরেজি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে কার ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে এসব তর্জমা সম্পাদিত হয়েছে তার হদিস পাওয়ার উপায় নেই। তাঁর মতো অসাধারণ গবেষক এবং তথ্য-মাতাল লেখক প্রায় কবির-খামখেয়াল নিয়ে অনুবাদ করে গেছেন জীবনের একটা পর্বে, তথ্যবহুল হ্রস্ব ভূমিকা জুড়ে দিয়েছেন কোনো কোনো অনূদিত কবিতাগুচ্ছের সূচনায়। কিন্তু ইংরেজি কোন অনুবাদকের তর্জমা বা কোন সংস্করণ তিনি ব্যবহার করেছেন সে সম্পর্কে তিনি আমাদের কোনো তথ্যই জানান নি। ফলে এই অনুবাদগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন, মান ও মূলানুগতার বিচারের ক্ষেত্রে একটা বাধার সম্মুখীন আমরা হই। কারণ একই কবিতা ভিন্ন ভিন্ন হাতে ভিন্নভাবে অনূদিত হয়েছে। কেবল ইংরেজ কবিদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটা আমাদের জন্য থাকছে না। এই সূত্রে সাজ্জাদ শরিফ উদাহরণ হিসেবে অ্যালান পোর ‘একা’ কবিতার উল্লেখ করেছেন তার এক লেখায়। সাজ্জাদ দেখিয়েছেন কোন কোন ক্ষেত্রে মান্নান সৈয়দ মূল থেকে সরে গেছেন। মান্নান সৈয়দ ইংরেজি ভাষা ভালোভাবে জানা সত্ত্বেও কেন মূল থেকে সরে গেছেন তার জবাব আমাদের জানা নেই। আর এটাও তো সত্য যে মূল থেকে সরে যাওয়ার ঈষৎ স্বাধীনতা একজন অনুবাদকের থাকতে পারে। এই স্বাধীনতার কথা যদি বাদও দেই, তাহলেও আমরা অনুবাদের ক্ষেত্রে একাধিক আদর্শের কথাও স্মরণ করতে পারি যা একটি আরেকটির চেয়ে ভিন্ন। সুতরাং এমনটা ভাবা সম্ভব যে অন্ত্যমিল এবং ছন্দের নির্ভুল গঠনে তিনি বেশি মনোযোগী না হলে হয়তো মূলানুগতা বজায় রাখা অসম্ভব ছিল না। কিংবা আরেকটু বেশি সময় এবং ধৈর্য থাকলে ছন্দ ও অন্ত্যমিল সহই এটাকে জবরদস্ত ‘বিশ্বাসী’ (Faithful) রূপে হাজির করা সম্ভব হতো। কিন্তু এমন নিষ্ঠা কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় খুবই বিরল। এমনকি, যারা অনুবাদকর্ম নিয়েই সারাটা জীবন কাটিয়েছেন তাদের মধ্যেও এর নজির খুব বেশি নেই। আর একথাও আমাদের অজানা নয় যে আপনি যতই মূলানুগ হওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, অনুবাদের পক্ষে কখনোই শতভাগ বিশ্বস্ত হওয়া সম্ভব নয়। এডিস গ্রোসম্যানের মতো পেশাদার অনুবাদকও বিশ্বাস করেন যে "Fidelity is surely our highest aim, but a translation is not made with tracing paper. It is an act of critical interpretation.” যদি ক্রিটিক্যাল ইন্টারপ্রিটেশানই হয় তাহলে মূল থেকে খানিকটা বিচ্যুতি ঘটবেই।
অনুবাদে মান্নান সৈয়দের বিচ্যুতি ছিল, কিন্তু সেই বিচ্যুতি ও দূরত্বকে তিনি পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁর কবিমনের সৃষ্টিশীলতার বিনিময়ে। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথের বেলায় হিমেনেসকৃত স্প্যানিশ অনুবাদে। হিমেনেসের প্রবল ব্যক্তিত্বের ছাপ রবীন্দ্রনাথকে অনেকটা আন্দালুসীয় করে দিয়েছিল। হিমেনেস নিজের কাব্যব্যক্তিত্বের বিনিময়ে রবীন্দ্রনাথকে এতটাই স্বাজাত্যমধুর করে তুলেছিলেন যে স্প্যানিশ পাঠকদের কাছে রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন পরমাত্মীয়। হয়তো সে বিনিময় যথাযথ ছিল না, কখনো কখনো তা ছিল মূল সুর ও স্বর থেকে খানিকটা দূরবর্তী। মান্নান সৈয়দের মতো প্রবল কবিব্যক্তিত্বের হাতে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। মূলের সঙ্গে অনূদিত কবিতাটির সাদৃশ্যের বিপর্যয় ঘটেছে অনেক ক্ষেত্রেই। উদ্দিষ্ট (Target Language) ভাষায় এই বিপর্যয়কে তিনি প্রশ্রয় দিয়েছিলেন মূল বাক্যাংশের অর্থগত বিপত্তি ঘটিয়ে। কিন্তু মনোযোগী ছিলেন তাঁর নিজের ভাষায় কবিতাটিকে অর্থময়, চিত্রল ও ধ্বনির মাধুর্যে পরিপূর্ণ করার দিকে। সেই দিক থেকে মূল কবিতাকে খানিকটা বঞ্চিত করলেও তিনি উদ্দিষ্ট ভাষায় (Target Language) আমাদেরকে একটি পরিপূর্ণ নিটোল কবিতা উপহার দেয়ার মাধ্যমে পুষিয়ে দিয়েছেন। আর সেটা দিয়েছেন বলেই অনুবাদ তার সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল, যেখানে তার মৌলিক সত্তা ও অনুবাদক সত্তা একাকার হয়ে আছে। পেশাদার অনুবাদক বা সফল অনুবাদকের মতো অনুবাদকে তিনি অতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন বলে মনে হয় না। অনুবাদের মুখোশে তার সৃষ্টিশীল সত্তার এক পরীক্ষায় নেমেছিলেন মাত্র, যেখানে তিনি শৃঙ্খলিত স্বাধীনতার স্বাদ পেতে চেয়েছেন। তার মতো উপচেপড়া সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের পক্ষে অনুবাদের মতো শৃঙ্খল ও মূলানুগতার সীমাবদ্ধ ছক মেনে কাজ করা ছিল অকল্পনীয়। ফলে, মান্নান সৈয়দের অনুবাদকে নিছক অনুবাদ নয়, বরং তার কাব্যসত্তার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলেই আমরা কবি মান্নান সৈয়দের পরিপূর্ণ আদলটিকে দেখার সুযোগ পাব। অনুবাদের মাধ্যমে তিনি আসলে নিজের সেই মৌলিক সত্তাকেই আবিষ্কার করেছেন যে-সত্তা অন্যসব কবিসত্তায় চূর্ণ রূপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। মান্নান সৈয়দ সেইসব চূর্ণ একত্রিত করে নিজেরই এক পরিপূর্ণ আদল তৈরি করেছিলেন। সুতরাং অনুবাদ ছিল তার কাছে ‘আপন আয়নায় মুখ’ দেখার আনন্দ যে-মুখ অপর কবিদের অংশবিশেষের সমাবেশে পরিপূর্ণতা পেয়েছে।
তিন কবির কবিতা
অ্যাডগার অ্যালান পো
স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন
চুমো নাও ভুরুর উপরে!
এ-মুহূর্তে তোমার বিচ্ছেদে
বলতে দাও গো অকপটে—
ভুল করোনি তো বিবেচনা :
আমার জীবন স্বপ্ন এক;
তবু যদি উবে যায় আশা
এক দিনে কিংবা এক রাতে
পরাদৃষ্টি কিংবা শূন্যতায়
তাহলে কম কি যায় কিছু?
যা-কিছু দৃষ্টিতে আসে, বোধে,
স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন সব।
গর্জমান তরঙ্গতাড়িত
সিন্ধুতীরে আছি-যে দাঁড়িয়ে।
আর মুঠোহাতে ধরে আছি
সোনালি বালির কণারাশি—
অল্প কত! তবু আঙুলের
ফাঁক বেয়ে গলে ঝরে পড়ে
যখন রোদনে ঝরি শুধু!
হে ঈশ্বর! পারি না রাখতে ধরে
আরেকটু কঠিন মুঠোয়?
হে ঈশ্বর বাঁচাতে পারি না এককণা
নির্মম তরঙ্গ থেকে আমি?
যা-কিছু দৃষ্টিতে আসে, বোধে,
স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন সব॥
হ্রদ
যখন, বসন্তকালে, ব্যাপ্ত পৃথিবীর
পথে ঘুরে ভাগ্যে পেয়েছিলাম এক নীড়—
যার ভালোবাসা তন্ময় কথোপকথা—
এমন মোহিনী ছিল সেই নির্জনতা
আরণ্য হ্রদের, ঘিরে যাকে কালো শিলা
আর দীর্ঘায়ত সব পাইন রঙ্গিলা।
কিন্তু যবে রাত্রি আর-সকলের মতো
হ্রদের উপরে করে আচ্ছাদ সন্তত,
আর এক অলৌকিক সুর তুলে হাওয়া
সারারাত নির্বিরাম করে আসা-যাওয়া—
তখন—তখন হঠাৎ উঠেছি জেগে
নির্জন হ্রদের তীক্ষ্ণ আতঙ্কসংবেগে!
তবু সে-আতঙ্কে নই একটুও ভীত
বরং হৃদয় কোন হরষে স্পন্দিত—
রত্নগর্ভ খনি এ-অনির্বচনীয়ের
ব্যক্ত করবে কী, জানি না অভিধা এর,
এমনকি এ নিঃসংঙ্গ দয়িতা-প্রেমের।
মরণ সংগুপ্ত তার বিষাক্ত ঢেউয়ে
উপকূলাবর্তে উন্মুক্ত কবর শুয়ে
তারি জন্যে, এরো পরে যে আনে সান্ত্বনা
শান্ত করতে তার দীপ্ত নির্জন কল্পনা,
আত্মার নিভৃতে তার যে-পরিবর্তন
অস্পষ্ট হ্রদেরে করে নিবিড় নন্দন ॥
একা
শৈশবসময় থেকে আমি আর-কারো মতো নই—
দেখিনি অন্যের মতো—একক উৎস থেকে তাথৈ
জেগে ওঠেনি আমার সাধারণী রক্তিম বাসনা—
দুঃখও পাইনি আমি যেমন লভেছে পাঁচজনা—
আনন্দ ওঠেনি বেজে আর-সকলের সহগামী—
যা-কিছু বেসেছি ভালোবেসেছি একাই ভালো আমি—
ফলত শৈশবে সেই, সবচেয়ে ঝোড়ো জীবনের
এক পহিল প্রভাতে—যত রন্ধ্র ভালো ও মন্দের
এজরা পাউন্ড
দোকানি-মেয়ে
একট ক্ষণ ন্যস্ত তার দেহভার আমার শরীরে
দেয়ালের 'পরে যেন আলতো লেগে আছে এক পাখি,
এদের আলাপে চলে নজরুলের নারীদের কথা,
ধোপানির সাথে সেই কবে মিলেছিলো চণ্ডীদাস,
আর সেইসব যতো কালিদাসের গণিকা-বনিতা।
লিউ শি
রেশমের খশখশ থেমেছে কখন,
প্রাঙ্গণে ছেয়েছে ধুলা,
পদশব্দ নেই কোনো, জমেছে পত্রালি
স্তূপে-গুপে, সেই মেয়ে হৃদয়ের অমরার থেকে
চ'লে গেছে মাটির অনেক নিচে :
হৃদয় দ য়ারে শখ, ভিজে এক পাতা লেগে আছে।
পল এলুয়ার
ভালোবাসা
দাঁড়িয়ে সে মেয়ে আমার চোখের পাতায়
ওর কেশদাম আমার চিকুরে মেশে
আমার চোখের রং মাখা ওর গায়ে
আমার হাতের মতোই শরীর ওর
আমার ছায়ায় জড়ানো ওর সে-দেহ
আকাশে যেনবা পাহাড় তুলেছে মাথা
সে-মেয়ে কখনো বুজবে না ওর চোখ
আমাকে কখনো ঘুমোতে দেবে না মেয়ে
উজ্জ্বল দিনে ওর স্বপ্নরা যেন
রৌদ্রকে দ্যায় বাষ্পে বিলীন ক'রে
আমাকে হাসায় কাঁদায় হাসায় আর
কথাও কওয়ায় যখন কিছুই বলার নেই