যে জীবন কেটে যায় তন্দ্রাচ্ছন্নতায় কিংবা ঘোরের সম্মোহনে সে জীবনের ‘লক্ষ্য আছে লক্ষ্যহারা’ আর আছে কিছু ‘কমন ফ্যাক্টর’। সে জীবনের মহাজন এমনই এক জীবন দিয়েছেন যেখানে ‘শুধু মানুষকেই বুঝি না, যেমন নারীও অগম্য বোধের’।
চর্চিত জীবনে কবিতার মায়ায় কিংবা মোহে অথবা ভালোবাসায় যিনি সাঁতরে বেড়াচ্ছেন অকূল দরিয়ায়, যিনি অভিমানে অভিমানে বলে দেন ‘আমি মায়ের কাছে যাবো’, যার কল্পনায় তখনও মনে হয় ‘বাবা তখন আশপাশেই থাকবেন হয়তো’—এমনই এক দলছুট বাউলের ছায়ার পেছন হাঁটতে হাঁটতে একদিন ভেবে দেখি, আমি তো তাকে যতটুকু চিনি, তার চেয়ে বেশি তিনি অচেনাই থেকে গেছেন। তাকে যতটুকু বুঝি তার অজস্র গুণ না বুঝেই মাথা নেড়ে গেছি এতদিন । তিনি আমাদের বাবু ভাই, কবি শেখ ফিরোজ আহমেদ বাবু।
আড্ডায় এক কোণে চুপচাপ বসে বসে কথা গপাপগ গিলতে গিলতে হঠাৎ যখন সেই কথার ভেতরের কথা তাকে স্পর্শ করে, তখন তিনি স্মিত হেসে আবার পুকুরের পানিতে ডুব দেয়া মাছের মতো জলের অন্তরালে অথবা ভাবনার মহুয়াবনে অদৃশ্য হয়ে যান। কিন্তু এক জ্যোৎস্নাপূর্ণ রাতে তিনি দেখলেন এক তীর্থ-উঠোন, আর ‘এই তীর্থ উঠোনে আমাদের কবির সাদামাটা ঘর’। সেই সাদামাটা ঘরের পাশেই তিনি এক বেদেসর্দার। কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের একটি অধ্যায়। যে অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন তিনি ‘ধানমন্ডি হ্রদ’। আজ আলাপ হবে এই হ্রদ আর হ্রদের কিনারের রক্তাক্ত স্মৃতির আর স্মৃতির ভেতরের ঘনঘোর বর্ষায় হ্রদের পাড়-উপচে-পড়া জলের স্রোতে ছুটে চলা এক বাউন্ডুলে কবির গল্প ।
যদিও 'ধানমন্ডি হ্রদ' শিরোনামে মলাটবন্দি একটি পুস্তক আপাতদৃষ্টিতে একটি কবিতাগ্রন্থ। কিন্তু এই আখ্যান-গহিনে পরিভ্রমণে আমার মনে হয়েছে এখানে তিনি কৌশলে করেছেন জীবনের পেইন্টিং—জলের রঙে, জীবনের রঙে, কবিতার ঢঙে।
জল কিংবা জীবনের রঙে আঁকা দীর্ঘ কবিতার এই আলেখ্যে সন্নিবেশিত হয়েছে জীবন থেকে মৃত্যু, সমাজ থেকে সাহিত্য, ডানপিটে শৈশব থেকে টগবগে যৌবন, নাটকের ড্রপ সিন থেকে আততায়ীর রক্তমাখা হাতের কলুষিত রাজনীতি, অর্থনীতি, পৌরণীতি ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাই তো তিনি হতাশায় বলেছেন ‘জন্ম যদি অনিবার্যতার পৃথিবীর গোলক আবাসে/ মৃত্যুকে ততোধিক উপেক্ষা করাই শ্রেয়তর’। যিনি আবার সদর্পে বলতে পারেন ‘এই আমিই আলোকোজ্জ্বল এই আমিই জ্যোতিপূর্ণ’, যেহেতু তিনি একজন আপাদমস্তক কবি। তাই অজান্তেই অন্ত্যমিলে বলে ফেলেন ‘আমার এক হাতে সূর্যোদয় অন্য হাতে চন্দ্রাবসান/আমারা ঊর্ধ্বমুখী, কিছুই দেখি না—তুমি চক্ষুষ্মান’ ।
এমনই এক বিদ্রোহী কবি আবার কখনও ছুটে গেছেন কবিতার হাত ধরে ছেলেবেলায়। তাঁর ‘ঘর জুড়ে ডাংগুলি ফুর্তি ও ছেলেবেলা কাল’। এই ছেলেবেলার গণ্ডি পার না হতেই তিনি সাক্ষী হয়ে যান ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়ের। যেখানে তিনি দেখতে পান ‘৩২ নম্বরের সিঁড়িতে মুঠোভর্তি সাহস নিয়ে গুলির মুখোমুখি’ এক মহামনবের অন্তিম পরিভ্রমণ। আর ‘তখনই কেঁদে ওঠে ভোরের পাখিরা’। এই ইতিহাস এমনই নির্মম যেখানে ‘লাল রক্ত অশ্রুসজল ধানমন্ডির হ্রদে এসে/অবশেষে মেশে’।
আশেপাশে যত উপকরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টি এড়াতে পারে না একেবারেই। কবির চোখে তখন তিনি দেখতে পান সূর্যের বিপরীতে এক প্রস্থ ছায়ার মতো ‘দগ্ধ বাংলার প্রান্তরে ঘুমান/তিনি শেখ মুজিবুর রহমান’।
যাপিত জীবনে বাবু ভাই একজন দুর্দান্ত সংগঠক, নিভৃতচারী নাট্যকার, স্বল্পভাষী । কথার পরিমিতিবোধ সকলের নজর কাড়ে যেমন, দীর্ঘ কবিতায়ও অধিকাংশ সময়েই তাকে মনে হয় নি যে, তিনি টেনেহিঁচড়ে কবিতাকে দীর্ঘায়িত করেছেন। তবে মনে হয়েছে যেন একটি স্নিগ্ধ নদীর স্রোত, আমি যেন একটি ডিঙিনৌকা। ঝিরিঝিরি বাতাসে পাল তুলে ছলছল নদীর মৃদুমন্দ স্রোতে এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম পাঁচটি দীর্ঘ কবিতা। তার কবিতায় ভাবনা কিংবা ভাষায়, উপকরণ কিংবা উপমায়, আবেগ কিংবা অবহেলার এক দারুণ কনট্রাস্ট পাঠককে বিমোহিত করবেই, এ বিষয়ে নিরাপদ বাজি যে কারও সাথে ধরাই যায়। যেমন :
‘চাঁদ কতটা অসহায় শুধু আকাশই জানে তা’/ ‘পানি জমা চোখে ফারাক্কার বাঁধ নেই’/ ‘ভালোবাসা মানুষের কোনো বুদবুদ নয়?’/ ‘এভাবে ঘুমানোর কথা ছিলো না জাতির জনকের’/ ‘ধুকপুক মানে ভালোবাসা; উন্মুখর রাত্রিরও মানে তাই’/ ‘পা টিপে টিপে স্বপ্নরা আয়’—এমন অসংখ্য পঙ্ক্তির সমাহারই তার প্রমাণরূপে পাতায় পাতায় শিশিরের মতো জমে আছে।
শিশুরা যেমন কাদামটি পেলেই খেলায় মেতে ওঠে, লালন মেতে উঠতে একতারা হাতে টুনা মাঝের ঝাঁকের মতো আসা ভাব ও সুরের সাগরে। আর কবি শেখ ফিরোজ আহমদ তার অন্যান্য গ্রন্থের মতোই এখানেও মেতেছেন শব্দ নিয়ে খেলায়, শিশুর মতো, লালনের একতারার মতো। যেমন—‘যুবতি ফড়িং, প্রজ্ঞার টোল, দিলখোলা বাতাস, ক্ষিপ্ত কাঁটাতার, হুক্কা মহাজন, ঘোরগ্রস্ত চাঁদ, ট্র্যাজিক বন্দনা, ভালোবাসার বিদ্যানুশীলন, দৃশ্যসচল ডিকশনারি, আধ্যাত্মিক পর্যটন, মগজ নিক্তি‘ ইত্যাদি শব্দের ঝংকার।
তার কবিতায় শব্দেরা এসেছে মুক্ত বিহঙ্গের মতো । দেশ, মানচিত্র, মাতৃভাষা, ভিনদেশি ভাষা, ধর্মীয় উপসঙ্গ, গ্রামীণ উপকারণ সাবলীলভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে তার কবিতায়। যেমন :
‘আইল বিভাজিত নদীর চর’, ‘এই আমার বাইয়্যাত গ্রহণ’, ‘ছাপাখানার নিয়ামক কমম্পোজিটর’, ‘ফ্যাক্টরীর চিমনি’, ‘ভায়োলিন বিষণ্ন সুর’, ‘ড্রাকুলা উপাখ্যান’, ‘ব্রামস্টোকার’, ‘কামরূপ কামাখ্যা’, ‘ট্রান্সলভানিয়া’, ‘মুনকার-নাকির’, ‘পুলসিরাত’, ‘করোটি’, ‘এপিটাফ’, ‘সিরিজ’, ‘জংশন’, ‘ড্রেন’, ‘এন্ট্রিখাতা’, ‘জবান’, ‘মর্জিমাফিক’, এমনকি ‘টার্গেট’-এর মতো শব্দসমূহ। সঙ্গতই বলা যায় শব্দের ব্যবহারে তিনি তার যাপিত জীবনের মতোই স্বাধীন ও সাবলীল ।
কয়েক ফর্মার একটি ছোট্ট কবিতাগ্রন্থ ‘ধানমন্ডি হ্রদ’; কিন্তু তার বিস্তৃতি পদ্মার খরস্রোতা ঢেউকেও ছাড়িয়ে গিয়ে মহাসমুদের সাথে মিতালি করে । নস্টালজিয়ায় কবি তাই বলেন : ‘পদ্মার জলে স্নান করে যদিও আমি ইলিশের ভাষা পুরোপুরি বুঝি নাই/ আমি প্রকৃতির বিবরে রহস্যেও ঘরবাড়ির কড়া নাড়তে শিখেছি'। একই পরিক্রমায় তিনি বলেন, ‘বালিশে হেলান দেই তবে আমার চুক্ষু মুদ্রিত নিদ্রায়’। আর তিনি বিশ্বাস করেন, ‘ছোট্ট আমিটা জন্মের পর যে ঘরে প্রথম কেঁদেছিলাম/ সেইই আমার ঘুমানেরা জায়গা’।
এমনই ঘুম কিংবা তন্দ্রাচ্ছন্নতায় তার কবিতায় ধরা দেয় ‘জীবনানন্দ’ এবং ‘খৈয়ামের রুটি-মদ আর আমাদের ভোট রং’, অথবা ‘বিব্রত লেনিন আর বিষণ্ন কিছুটা মার্কস’ আর রকগুরু আজম খানের গান ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে’।
কবি ঘোষণা করেন ‘আমি সেই ঘোরগ্রস্ত চাঁদের সঙ্গী.../ আমার দেহমনে ভাষা আর বাক্য তৈরি হয়’ ।
অন্তত পাঁচ দশকের বেশি সময় কবিতার মেঠো পথে চলতে চলতে চলতে একদিন তিনি বলেন, ‘সব কুল হারিয়ে আমি আজ দারুণ ফতুর’ । দারুণ ফতুর এই কবি বলেন, ‘একদিন চেয়েছিলাম আমি ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে মনসুর বয়াতির সারিন্দা বাজাই’ ।
খেয়ালে-বেখেয়ালে কবি শেখ ফিরোজ আহমদ, আমাদের বাবু ভাই যেন তার কবিতার পঙ্ক্তির মতোই ‘ডাল ভাঙা চূর্ণ তলোয়ার’ । ‘ধানমন্ডি হ্রদ’ নামের উপাখ্যান তাই যেন হয়ে উঠেছে ‘এই নিশুতির স্বপ্ন ভাঙা রাঙা উদ্যানে’ একলা চাঁদের গান।
এই চাঁদ—আমাদের বাবু ভাইয়ের ছায়া, এই চাঁদের জোৎস্নামাখা গান—আমাদের বাবু ভাইয়ের হৃদয়ের নির্যাসমাখা কবিতার পঙ্ক্তিমালা।