অলঙ্করণ : মাহবুবুল আলম
পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যে সকল মদের বোতল আমি দেখেছি তারা সকলেই হাঁটতে জানে—গান গায়—রং বদলায়—এমনকি তারা ঘর বাঁধতে পারে শৌখিন—কৌশলে!
তারা নিজেরাই নিজেদের নেশা—বন্ধু ও শত্রু। তারা উজ্জ্বল—কালো—শ্যামলা—বোবা আর বাকপটু!
তারা ছিপি খুললেই শহর—সমুদ্র—পাখির উড়াল—মাছেদের সান্ধ্যভ্রমণ। অথচ একান্ত মানুষের কাছে গেলেই বুকের নিচে ভেঙে পড়ে টুকরো টুকরো কাচের মহিমা।
স্থির কিংবা উড়ন্ত
আমি আর আরক মিশে গেছি রুপালি জলে—তোমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি যতদূর আকাশ দেখা যায় কিংবা ঝুলে থাকা তারা ও নক্ষত্রের পাখি—ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আহার এবং পিতলের উজ্জ্বল থালা ভাসমান পৃথিবীর বুকে।
যেখানে একেকটা আরশি গেঁথে আছে অজস্র মাংস ও চামড়ার মধ্যে। ফুল আর ফলের ভেতর কীটের গুঞ্জন থেকে করোটি পর্যন্ত যে সকল সোনালি মাছি ছড়িয়ে দেয় বিষামৃত—তারই মধু ঝরে টুপটাপ—সারারাত।
সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে এক পাগলা ট্রাফিক আমাকে দেখায় মধ্যরাতের পথ। অথচ আমিই ভণ্ড—ম্যাজিশিয়ান—শাপলার মতো ফুটে থাকা নাকফুল ছিঁড়ে চৌষট্টি ডানা তার ছড়িয়ে দিই শহরের রাস্তায় আর বিলবোর্ডে।
তারপর যত বাসনার পাখি—স্থির কিংবা উড়ন্ত...
গ্রাফিতি
কাচের মতো কী স্বচ্ছ তোমার ছবি, অথচ নিষ্ঠুরও বটে! কাল তোমার হৃদয় হাসপাতালে কাটাছেঁড়া—ডোমের পাশে যে হাসি বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছিল ঘ্রাণ—যেন সমস্ত দেয়াল জুড়ে এই গ্রাফিতি।
সে ভোলে নি আর ভুল করে তারই চুম্বন দেয়ালে-পাথরে যে প্রতিধ্বনি তুলেছিল, সে তো কেবল স্মৃতি থেকে তুলে আনা মখমল বিছানা—রাত থেকে গভীর সমুদ্রে আছড়ে-পড়া ঢেউ কিংবা মাছের পিঠে চড়ে-বেড়ানো উজ্জ্বল তারাটি!
তাকে আমি দেখেছি স্থির একটি নক্ষত্রের পাশে—বড়ই ঈর্ষাকাতর—আয়না হঠাৎ ভেঙে যাবার পর আমার আঙুল ছিটকে পড়ল তোমার বুকের উপর থেকে দূরে—বহুদূরে...
ছাপাখানা
এই তবে ছাপাখানা! আম্মার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা উজ্জ্বল মেয়েটি আর দশম শ্রেণির শ্রমিকেরা সবেমাত্র বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যায় এসে পৌঁছেছে।
কোথাও কি কোনো ভুল হয়েছে?—জ্যামিতির বৃত্ত কিংবা ত্রিভুজ?—যদিও সমস্তটাই বক্ররেখা।
তবুও বৃত্তই ধরেছে মধ্যরাতের গানে। হাড়ের ভেতর হাড়ের ঝনঝন শব্দে যে পাখিটি উড়ে গেল এইমাত্র, তার পেছনেই তো আমাদের দশম শ্রেণি—গণিত আর প্রথম কবিতা।
বোতামগুলো কী বিষণ্ন
প্রতিটি সম্পর্কের সেতু পার হতেই দেখি আমার কালো শার্ট ঝুলে আছে চাঁদের হ্যাংগারে আর বোতামগুলো কী বিষণ্ন তারাদের মতো ফুটে আছে পথের উপর!
যেন তিন ঠ্যাংঅলা একটি কুকুরের বেদনার মতো কখনোবা আমার দিকে বিদ্রূপের হাসি দিয়ে টাল খাওয়া মানুষ—কিছু বিশ্রুত বেদনা নিয়ে ঢুকে পড়ে তড়িঘড়ি ঝোপঝাড়ে।
আর সে মহল—পাখি ও গ্রন্থের মলাট খুলে হৃদয় মার্বেল হয়ে যায় একদিন, যেন পৃথিবীতে প্রতিটি বিকেল নিষ্ঠুর পালকের পাখি অথচ এই বনে ধ্যানও একটি সমবায় ঋতু!
আঠারোটি পাখির নাচের মুদ্রা থেকে পাওয়া একটিমাত্র অনঙ্গফুল—আঙুল থেকে ছিটকে পড়া আতশবাজির মতো তোমার দিকে উড়ে গেলে আহত আরশোলার মতো উল্টো হয়ে চিৎকার করতে থাকা ধারালো পেঁচার ঠোঁটে তুমি—আমি নগ্ন প্রেমের ছবি অথবা তাকে বেদনাও বলা যায়।