জানে অন্তর্যামী

চাঁনখারপুলের ঢাল বেয়ে লাশবাহী ঠেলাগাড়িটি যখন বখশিবাজারের সরু রাস্তায় নেমে যাচ্ছিল তখন ভারসাম্য রক্ষার জন্য এক হাত লাশের বুকে, অন্য হাতে ঠেলাগাড়িটি শক্ত করে ধরে রাখতে রাখতে বৃদ্ধ আখতার মিয়ার মনে হয়, দীর্ঘায়ু মানুষের পরম কাঙ্ক্ষিত কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর পরিণতি সুখকর হয় না।

আখতার মিয়ার মনে পড়ে, সেইসব মহামারির দিনগুলোর কথা। যে দিনগুলোতে কখনও কলেরা, কখনও গুটিবসন্ত, কখনও কালাজ্বরের প্রকোপে ঢাকা শহর অনির্দিষ্ট বিরতির পর কেঁপে-কেঁপে উঠত। প্রতিদিন স্বজন হারানো মানুষের ক্রন্দনে ঢাকা শহরের অলিগলি ভারি হয়ে উঠত। ব্রিটিশরাজের অধীনে ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকা ঢাকা শহরের মানুষেরা ‘মোহ’ এবং নতুন জেগে ওঠা জ্ঞানার্জনের তীব্র স্পৃহা বিসর্জন দিয়ে, মহামারি থেকে বাঁচতে, দলে দলে গ্রামে ফিরে যেত, ঠিক তেমনি এক সময়ে, এক গভীর রাতে আখতার মিয়ার বাল্যবন্ধু নবু এসে কানে কানে বলেছিল, ‘আমি আব-ই-হায়াতের খুঁজ পাইছি।’

আব-ই-হায়াত কী তা তখনও অজানা আখতার মিয়ার। কিয়ৎক্ষণের জন্য আখতার মিয়ার মনে হয়, আবে-হায়াত কয়েৎটুলি কিংবা ইসলামপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাইজি বাড়িগুলোর কোনো একটি। যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রমণীরা বাস করে। কিন্তু পরক্ষণেই বাড়ির পাশ দিয়ে মৃতদেহ নিয়ে যেতে থাকা কোনো একটি দলের ‘হরিবল’ চিৎকার কিশোর আখতার মিয়ার কল্পনাকে গলা টিপে মেরে ফেলে। তার মনে হয়, এত রাতে নবু যখন চুপিচুপি তাঁর বাড়ি এসেছে তখন নিশ্চয়ই সে কলেরার মহামারি থেকে মুক্তির কোনো দাওয়াইয়ের সন্ধান পেয়েছে। সেই দাওয়াইয়ের নামই আব-ই-হায়াত। 

আখতার মিয়া তখন তীব্র ব্যাকুলতায় জানতে চেয়েছিল, ‘কাহাঁ ঐ আবি-হায়াত?’
প্রতিউত্তরে নবু যখন বলেছিল, আব-ই-হায়াত কলেরা থেকে বাঁচার কোনো মহৌষধ নয়, এ হলো এক আশ্চর্য ঝর্না, যেখানে গোসল করলে মানুষের যৌবন থাকে অনন্তকাল—তখন চূড়ান্তরকমের অবিশ্বাস নিয়ে আখতার মিয়া নবুর দিকে তাকিয়ে ছিল। চারপাশে যখন মৃত্যুর মিছিল—সেই মিছিলের মাঝে বসে, যৌবনযাত্রা শুরু না-করেই, অনন্ত যৌবনের সন্ধানকে সময়ের প্রেক্ষিতে এক ভয়ংকর তামাশা বলে মনে হয়েছিল আখতার মিয়ার কাছে। আখতার মিয়ার ভাবনাকে পাত্তা না দিয়ে কেরোসিনের আলোতে একটা ছেঁড়া-ফাঁড়া পৃথিবীর মানচিত্র বের করে, ছোট একটা বিন্দুতে আঙুল রেখে, নবু বলল—এইহানে ঐ আব-ই-হায়াত।

মহামারিকালে চলমান ধ্বংসযজ্ঞকে উপেক্ষা করে আব-ই-হায়াতের সন্ধানে ব্যস্ত থাকায় বিধাতা হয়তো নবুর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকবেন। তাই দিন পাঁচেক পর এক দুপুরে খবর এল—‘নবুরে ওলাউঠায় ধরছে।’


এত অল্পবয়সী কারো কবিতা ছাপানোতে, বিশেষ করে কলকাতা ঘুরে আসা ঢাকার সাহিত্যিকরা, কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছিল।


নবু তখন জগন্নাথ স্কুলের তুখোড় ছাত্র। খুব অল্প বয়সে সে ইংরেজিতে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি লাভ করে। শেক্সপিয়ার আর লর্ড বায়রন ছিল তাঁর প্রিয় দুই সাহিত্যিক। তবে তার আগ্রহ ছিল কবিতায়। ইংরেজ সাহিত্যিকদের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বাংলায় কবিতা লেখা শুরু করে নবু। ততদিনে ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় তাঁর দু’খানা কবিতাও বের হয়েছে। ঢাকা শহরে মাত্রই জন্ম নিতে শুরু করা সাহিত্য-সমালোচক দলের মাঝে নবুর ঐ কবিতা ছাপা নিয়ে অল্প বিস্তর সমালোচনা হয়েছিল সেই সময়। সেই সমালোচনা ছন্দের ওপর নবুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নয়। সেই সমালোচনাটি ছিল বয়সজনিত। এত অল্পবয়সী কারো কবিতা ছাপানোতে, বিশেষ করে কলকাতা ঘুরে আসা ঢাকার সাহিত্যিকরা, কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। কিন্তু যখন এক সাহিত্যসভায় 'কবিতা কুসুমাবলী’র প্রাক্তন সম্পাদক এবং কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের বন্ধু হরিশ্চন্দ্র মিত্র স্বয়ং নবীনচন্দ্র সেন ওরফে নবুকে আগামী দিনে বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কবি হতে যাচ্ছে মর্মে স্বীকৃতি দিলেন, তখন তাঁর প্রতিভা নিয়ে কোনো পক্ষেরই আর সমালোচনা করার সুযোগ থাকে নি।

নবুর বাড়িতে নিয়মিত সাহিত্য-আড্ডা হতো। প্রাণেশচন্দ্র সেন, হীরালাল আর জগদীশ ঘটক ছিল সেই আড্ডার নিয়মিত সদস্য। সাহিত্যরসিক না হলেও, প্রতিবেশী এবং নবুর বন্ধু বিবেচনায় আখতার মিয়া সেই আড্ডার নিয়মিত সদস্য ছিল। মাঝে মাঝে সাঁচি বন্দর এলাকা থেকে রাসবিহারী, কখনওবা লক্ষ্মীবাজার থেকে শিবপ্রসন্নরাও এসে সেই আড্ডায় জুটত। মাঝে মাঝে হাফিজ নামে নিজেকে স্বশিক্ষিত দাবী করা এক মুসলমান বাঙালি বালক, যিনি ফারসি হরফে বাংলা লিখত, সেই আড্ডায় যোগ দিত। তবে হাফিজ মুসলমান হলেও বিশ্বাসের দিক দিয়ে ছিল সুন্নিপন্থি। তারপরও হাফিজ আসলে আখতার মিয়ার ভালো লাগত। কারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাইরে অন্তত একজন সাথি পেত আখতার মিয়া।

নবুদের বাড়ির বিশাল নিমগাছটার ছায়াতে বসে চলা সেই আড্ডায় আখতার মিয়া ছিল নিয়মিত কিন্তু নির্বাক শ্রোতা। কিন্তু স্বশিক্ষিত হাফিজ, মাঝে মাঝে ছন্দ মিলিয়ে কিছু বুলি আউড়ে, নিজের কবি-প্রতিভার প্রমাণ দিতে চাইত। আখতার মিয়ার মনে পড়ে, কোলকাতা থেকে প্রকাশিত কিছু বাংলা গল্প-উপন্যাসের বই জোগাড় করে আনতে সক্ষম হওয়ায় সেই আড্ডায় হাফিজের গুরুত্ব হঠাৎ বেড়ে যায়। আখতার মিয়ার এখনও মনে পড়ে, দুর্গেশনন্দিনী নামের বইটির কথা। সেই উপন্যাসটি পড়ার জন্য নবুর বাড়ির অন্দরমহলের মেয়েরাও এতটা আগ্রহী হয়ে উঠেছিল যে, তাদের ছোট্ট দলটির বাড়ির নিমতলা থেকে কিছুদিনের জন্য জায়গা হয়েছিল, দোতলা বাড়ির লম্বা বারান্দায়। আখতার মিয়ার চোখে এখনও ভাসে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, পাছে আলোর অভাবে প্রাণেশ দুর্গেশনন্দিনী পড়া বন্ধ করে দেয়, এই ভেবে, নবুর দিদি দিগ্বসনী দেবী আলো কমার আগেই একটা হারিকেন এনে প্রাণেশচন্দ্র সেনের পাশে রেখে দিয়েছে। সেই আলোতে প্রাণেশ তার মাত্রই মোটা হয়ে ওঠা গলায় এক নাগাড়ে পড়ে যাচ্ছে দুর্গেশনন্দিনী আর দরজার ওপাশে বসে নিঃশব্দে তা শুনে যাচ্ছে অন্দরমহলের নারীরা। পাঠে মনোযোগ ধরে রাখার জন্য মাঝে মাঝে নবুর ভাবী লীলা দুএকবার পরম মমতায় বাতাবিলেবুর শরবত দিয়ে যেত। প্রাণেশ যখন উপন্যাসের কোথাও কোথাও দুঃখের অংশ পাঠ করত, তখন হাফিজ বা নবুর চোখ থেকে জল নেমে আসত। তবে পুরুষ বলেই তারা জল ফেলত নিঃশব্দে। কিন্তু আখতার মিয়া কান পাতলে, এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও শুনতে পায়, দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসে বীরেন্দ্র সিংর মৃত্যু, তিলোত্তমার ইজ্জত হারানোর ভয় কিংবা জগৎ সিংকে না-পাবার বেদনার বিদীর্ণ আয়েশার বর্ণনা শুনে অন্তঃপুর থেকে ভেসে আসা রমণীদের ক্রন্দনের শব্দ।

আখতার মিয়ার জীবন ছিল ভাষার ত্রিমুখী রাস্তার সংগমস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকের মতো। তাদের বাড়িতে দুর্বল বাংলা চলত, উর্দু প্রায়ই হামলে পড়ত, আর ইংরেজি মাঝে মাঝেই উঁকিঝুঁকি দিত। তবে রুকুবিবি সময়ের ডাককে উপেক্ষা করেন নি। তিনি আর সবার মতো আখতার মিয়াকেও জগন্নাথ স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন নিয়ম মেনে। সগীর এবং আখতারের জন্য একজন গৃহশিক্ষককে জায়গিরও রেখেছিলেন।

ইংরেজির প্রাথমিক দৌরাত্ম্য একটু কমে এলেই বাঙালি হিন্দু জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া স্কুলগুলোতে বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা দেয়া শুরু হয়। ততদিনে বাংলা ব্যাকরণও একটা কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে, বাংলা ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শুরু করেছে। ফলে আখতার মিয়া যে বছর পাঁচেক সময় স্কুলে গিয়েছে সেই সময় তিনি বাংলা-ই শিখেছেন। মুখে উর্দু এবং বাংলা মিশ্রিত ভাষা বললেও তার পঠন-পাঠনের দক্ষতা ছিল বাংলা ভাষায়। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত আখতার মিয়ার জীবনে পাঠ করা বা শোনা একমাত্র উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী


লোকে বলত, রূপলাল দাসের বড় ভাই রঘুনাথ দাসের অসামান্য সুন্দরী কন্যা উমা দাস নাকি দূর থেকে নবুর প্রতিভার কথা শুনে তার প্রেমে পড়েছে।


নবুদের সাথে পরিচিত হবার আগ পর্যন্ত আখতার মিয়ার ধারণা ছিল সাহিত্য রচনা এবং চর্চা সমাজের উঁচু স্তরে অবস্থান করা উর্দু এবং ফার্সিভাষী ‘আশরাফ’দের কাজ। কবি মির্জা গালিব, মির্জা জান তাপিস আর খাজা হায়দার জান শায়েক—যারা উর্দুতে সাহিত্যচর্চা করে বিখ্যাত হয়েছেন তাদের সবাই সমাজে ‘আশরাফ’ বলে বিবেচিত এবং উর্দুভাষী কবি। বাংলা ভাষায়ও যে সাহিত্যচর্চা চলে বা চলতে পারে তা কিছুদিন আগেও আখতার মিয়ার অজানা ছিল। ‘আঞ্জুমানি তারাক্কি-ই-উর্দু’র বাইরে কোনো সাহিত্যচর্চার ধারণাটিই তার কাছে নতুন মনে হতো। তার ভাই সগীর মিয়া নিজে কবিতা না লিখলেও ‘আঞ্জুমানি তারাক্কি-ই-উর্দু’ সংগঠনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকত। ঢাকার বড় বড় আশরাফদের বাড়িতে উর্দু কবিদের নিয়ে যেসব মুশায়েরি হতো তাতে প্রবেশ করতে না পারলেও কে, কবে, কোন আসরে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পড়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা সগীরের কাছ থেকে পাওয়া যেত। এইসব তথ্য সংগ্রহের পেছনে সগীরের মূর প্রেরণা ছিল ছোট বোন মারফতি। মারফতির ছিল শিল্প-সাহিত্য-গান নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ। তবে মারফতির উৎসাহ আখতার মিয়াকে কখনই নাড়া দেয় নি। প্রায়ই নবুদের আড্ডা শেষ হলে, একদম কিছু না বললে চলে না ভেবে আখতার মিয়া বলত, ‘একদিন তুই বাংলা কি মির্জা গালিব বান যাওগি।’

ততদিনে ঢাকা শহরে নবীনচন্দ্র সেন, যাকে সবাই নবু বলে ডাকে, সে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিশেষত ঢাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিদায়ী ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মি. জেসি প্রাইসের সম্মানে যে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, তাতে ইংরেজিতে মানপত্র পাঠ করে হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছে নবীনচন্দ্র সেন। নবুর এই সাফল্য আর অসামান্য প্রতিভার গল্প ঢাকার অলি-গলি বেয়ে ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউসে পৌঁছে গিয়েছে বলে চাউর হতে শুরু করে। লোকে বলত, রূপলাল দাসের বড় ভাই রঘুনাথ দাসের অসামান্য সুন্দরী কন্যা উমা দাস নাকি দূর থেকে নবুর প্রতিভার কথা শুনে তার প্রেমে পড়েছে। ঘটনার সত্যমিথ্যা নির্ণয় করা কঠিন হলেও এই ঘটনা কোনো বিস্ময়কর কিছু বলে মনে করে নি আখতার মিয়া গং। বরং এমন প্রতিভাবান কিশোরের প্রেমে কোনো সুন্দরী নারীর না-পড়াই তাদের চোখে তখন অস্বাভাবিক। কোনো একদিন কোনো এক ধনী পরিবারের সুন্দরী কন্যা কাব্য-প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে নবুর প্রেমে পড়বে এবং আত্মহত্যার হুমকি-ধামকি দিয়ে অবশেষে প্রতিভাবান কবিকে বিয়েতে সম্মত করাবে—সে বিষয়ে নবুরও কোনো সন্দেহ ছিল না। নবুর কল্পনার সাথে রূপলাল হাউসের বাসিন্দা উমা দাস ছিল বড়ই জুৎসই। নবুর কেবল একটাই চিন্তা ছিল, ‘আমগো পরিবার গরিব। রঘুনাথ দাস কী এই দূরত্ব মাইন্না নিবো?’


উমা দাসের গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানেরা বয়সে আখতার মিয়া বা নবুর চেয়ে কম নয়।


এই অর্বাচীন ভাবনা নিয়ে যুক্তি এবং পাল্টাযুক্তি প্রদর্শন করতে করতে আখতার মিয়া আর নবু অনেকদিন ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউসের চারপাশে চক্কর দিয়েছে। রূপলাল হাউসের তিন পাশে ছিল উঁচু পাঁচিল। আর এক পাশে ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে নেমে যাওয়া প্রশস্ত সিঁড়ি। অনেক দিন উমা দাসের খোঁজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আখতার আর নবু জানতে পারে—রূপলাল হাউসের অন্দরমহলের নারীরা গান শেখে, কখনও কখনও দলবদ্ধ হয়ে বুড়িগঙ্গার দিকে নেমে যাওয়া প্রশস্থ ঘাটে বেড়াতে যায় এবং বিকেলে তো বটেই কোনো কোনো দিন রাতেও সেখানে গানের জলসা বসে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওস্তাদ সংগীতশিল্পীরা সেখানে আসেন। কিন্তু তিন পাশের পাঁচিলের সাথে মূল বাড়ির দূরত্ব এতটাই বেশি যে গানের শব্দ পাওয়া গেলেও কোনো নারীরই মুখ পরিষ্কারভাবে নবু বা আখতার মিয়ার চোখে ধরা দিত না। 

সুতরাং আখতার আর নবুরা অপেক্ষা করত রূপলাল হাউস থেকে প্রতিনিয়ত আসা-যাওয়া করতে থাকা পাল্কি কিংবা ঘোড়ার গাড়ির জন্য। প্রায় অবরুদ্ধ রমণীরা বিস্ময় নিয়ে জানালার বাইরে উঁকি দিলে, এক পলক বা দুই পলকের জন্য তাদের দেখা যেত। ঐ এক বা দুই পলকের দেখা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে নবু আর আখতার আবিষ্কার করতে চাইত উমা দাস কে? দীর্ঘদিন সময় নষ্ট করার পর কোনো একদিন নবু এবং আখতার মিয়ার জানা হয়েছিল, রঘুনাথ দাসের এক কন্যা আছেন। যার নাম উমা দাস বটে। কিন্তু সেই কন্যার বহু বছর আগেই শাদি হয়ে গেছে। স্বামীসহযোগে তিনি মুর্শিদাবাদ থাকেন। উমা দাসের গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানেরা বয়সে আখতার মিয়া বা নবুর চেয়ে কম নয়।

এই সত্য যেদিন আবিষ্কৃত হলো সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিল নবু। কিছুদিনের জন্য তাঁর কাছে সমস্ত জগৎটাকে একটা হেঁয়ালি বলে মনে হতে থাকে। সেই কষ্টে দরোজায় খিড়কি এঁটে, দোয়াতে হাঁসের পালক ডুবিয়ে সত্তরখানা কবিতা লিখে তবেই শান্ত হয় নবু। কলেরায় আক্রান্ত নবুকে দেখে বারবার আখতার মিয়ার সেই গল্পগুলো মনে পড়েছিল। এত গল্প, এত স্মৃতি নিয়ে আখতার মিয়াকে ছেড়ে নবু চলে যাবে, তা মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিল আখতার মিয়ার।

এমনিতে নবু ছিল কালো আর তার দৈহিক গড়ন ছিল খর্বাকৃতির।। দুই দিনের কলেরার তোপে নবু আরও খর্বাকৃতির হয়ে ওঠেছে তখন। নেংটি পড়া অবস্থায় চৌকির ওপর পড়ে থাকা নবুকে দেখে সদ্য ভূমিষ্ঠ কোনো দুর্বল শিশু বলে ভ্রম হচ্ছিল। বিহারী নাপিত জুম্মনের তখন বিস্তর ব্যস্ততা। কারণ ওলাউঠা হলেই মাথার চুল ফেলে দেয়া তখনকার রেওয়াজ। শত ব্যস্ততার মাঝেও এক ফাঁকে এসে আগ্রার বিখ্যাত হেকিম আলী নকির শিষ্য দাবিদার কবিরাজ আজগর মিয়ার নির্দেশনায় নবুর মাথার চুল চেঁছে দিয়েছে। জুম্মনের ব্যস্ততা কিংবা ক্ষুরের ধার কমে আসায় নবুর মাথা চেঁছে দেয়ার কাজটি যথাযথ ভাবে হয় নি। দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে মাথার কোথাও কোথাও চুল রয়ে গেছে। সেই অমসৃণ মস্তকে দফায় দফায় বরফ ঘষা হচ্ছে। মাথার কাছে কাগুজি লেবুর শরবত রাখা। নবুর কোনো এক মাসী কিছুক্ষণ পর পর তার মাথাটি তুলে পরম মমতায় মুখের ভেতর লেবুর শরবত চালান দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো চেষ্টাই নবুকে জাগিয়ে তুলতে পারছে না। মনে হচ্ছিল, সে গভীর থেকে গভীরতর ঘুমের দেশে যাত্রা শুরু করেছে।

যদিও নবুর বড় ভাই দেবু ততক্ষণে আশা ছেড়ে দিয়ে মনে মনে হিসেব কষতে বসেছে—নবুই কি শেষ? নাকি ওলাউঠা বাড়ির আরও দুচারজনকে তুলে নিয়ে তারপর ঢাকা শহর ছাড়বে? কিন্তু নিজের সেই চিন্তাটাকে যথা সম্ভব আড়াল করে ভাইয়ের বিছানার পাশে, মায়ের শরীর-ঘেঁষে দেবু দাঁড়িয়ে আছে। নবুর বোন দিগ্বসনী দেবী, যিনি শিশু নবুকে ঘুম পাড়াতে মৃদু স্বরে বৈষ্ণবপদ গাইতে গাইতে নবুর মনে কাব্যপ্রেরণার সঞ্চার করেছে বলে নবু বহুবার দাবী করেছে, তিনি একটা হাতপাখা বিরামহীন মেশিনের মতো নবুর মাথার ওপর দুলিয়ে যাচ্ছেন আর অন্য হাতে সাদা শাড়ির আঁচলের কোণ দিয়ে নিঃশব্দে নেমে আসা চোখের জল মুছে যাচ্ছেন। বাম হাত মাঝে মাঝে নড়ছে বলেই তাকে মূর্তি বলে ভ্রম হয় না।

সেই সময়ে নবুর বড় ভাই দেবু, ছোট ভাইয়ের জীবিত ফিরে আসার চেয়ে মায়ের যন্ত্রণা লাঘবকেই বড় দায়িত্ব বলে মনে করেছে। কবিরাজ আজগর মিয়ার পথ্য এবং নানারকম নির্দেশনা সূচারুরূপে পালনের পরও দেবুর অবস্থার কোনো উন্নতি দেখতে না পেয়ে নবুর মা-ই এক সময় চোখের জল মুছতে মুছতে দেবুকে বলল, ‘ঢাকা শহরে আর কোনো বৈদ্যি নাই, বাবা?’ মায়ের এই প্রশ্নে দেবু যেন হাফ ছেঁড়ে বাঁচল। সে নিজেও অসহায় আত্মসমর্পন করতে চাচ্ছিল না। নবুর দেহ রাখার আগের সময়টায় কিছু একটা করে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে এবং একই সাথে মাকে শান্ত করতে চাচ্ছিল। নতুন ডাক্তার ডাকার নির্দেশ শেষ হবার সাথে সাথেই দেবু তাঁতিবাজারে সদ্যই ডিসপেন্সারি খোলা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার আজহার মিয়াকে ডেকে আনতে বের হয়ে যায়।

আজহার ডাক্তার যেন এইরকমই এক ডাকের অপেক্ষায় ছিলেন। মাত্রই এলাহবাদ থেকে হোমিওপ্যাথি পড়া শেষ করা আজহার মিয়া দেবুর কাছ থেকে বিস্তারিত শুনে এক ঝটকায় ব্যাগ নিয়ে হাজির হয় নবুদের বাড়ি। উদ্যম আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আজহার মিয়া নবুকে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বাতাসে একটি তুড়ি বাজিয়ে বললেছিল, ‘এরেঞ্জ হট ফুট-বাথ ইমিডিয়েটলি।’

আজহার মিয়ার তুড়ি বাজানো আর মুখের ইংরেজি শুনে নবুর মায়ের তো বটেই আখতার মিয়ারও মনে হয়েছিল, আজহার মিয়া ডাক্তার নয়, সে যেন এক সাক্ষাৎ দেবদূত। এতক্ষণ মৃতপ্রায় ব্যক্তির বাড়িতে সমবেত হয়েও কোনো ভূমিকা রাখতে না-পারা আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীরা যেন কিছু একটা করে নবুকে সুস্থ করে তোলার সুযোগ পেল। তিন জন তিন দিক থেকে তিনটি মাটির হাঁড়িতে করে পানি নিয়ে এল। কে উনুনে জল চড়াবে এই নিয়ে হাল্কা একটা প্রতিযোগিতা শেষ হবার সাথে সাথেই চুলোয় আগুন দেয়া নিয়ে, দেবুর দুই মাসী-পিসীর মধ্যেও একটু হাল্কা ধাক্কা-ধাক্কি হয়ে গেল। ব্যর্থ দিদি বা মাসী বা পিসীরা একটু দূরে সরে এসে, বক্র দৃষ্টিতে, যখন উনুনে হাঁড়ি বসানোর এবং আগুন দেয়ার পদ্ধতিগত ক্রুটি ধরতে ব্যস্ত তখন শুনতে পেল ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন চিৎকার করে বলছে, ‘লীলা কৈ?’

আখতার মিয়া লীলার খোঁজ করা ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল নবুর মেসো মশায় গুণীন ঘটককে। যিনি অনেকক্ষণ ধরে চলমান কাহিনিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছিলেন না বলে এবং নানারকম সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেবু তার মতামত নিচ্ছে না-দেখে বেশ উশখুস করছিলেন।

লীলা দেবুর বৌ। দুই দিন আগে যখন নবু পায়খানায় জ্ঞান হারিয়ে উপুড় হয়ে পড়ল তার পরদিনই সে স্ত্রী, দুই পুত্র-কন্যা এবং নিজের ছোট তিন ভাইবোনকে নৌকায় চড়িয়ে শুয়াপুরে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি যে তাঁর মেসোমশায়ের অজানা তা নয়। গুনীণ ঘটকের আশা ছিল, পরিবারের জীবিত সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ বিবেচনায় দেবু প্রতিটি পদক্ষেপে তার মতামত নিবে। কিন্তু বাস্তবে দেবু বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়ায় গুণীন ঘটকের মতামতের কোনো তোয়াক্কা করে নি। দেবুর অবজ্ঞার জবাব দিতে অনেকক্ষণ ধরে উশখুশ করতে থাকা গুণীন ঘটকের মনে হয়েছে, পারিবারিক ক্রান্তিকালে, লীলার অনুপস্থিতির সূত্র ধরে আত্মীয়-স্বজনদের সামনে দেবুকে ছোট করার এই মোক্ষম সুযোগটি হাতছাড়া করা ঠিক নয়। গুণীন ঘটকের ঐ কৌশল অল্পবিস্তর ফলদায়ী হয়েছিল। আখতার মিয়া খেয়াল করেছিল, উপস্থিত নারীমহলে এই নিয়ে একটা হাল্কা কানা-ঘুশা শুরু হয়েছে।  তবে সেই কানা-ঘুশা থেকে দেবু যে স্ত্রীর সাথে নিজের ছোট তিন ভাইবোনকেও শুয়াপুর পাঠিয়ে দিয়ে, পরিবারটিকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করতে চাইছে তা পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছে। লীলা এই দুঃসময়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে গেছে—‘এইডা ক্যামনে সম্ভব’—এমন একটা কথা বাতাসে ততক্ষণ উড়ে বেড়াতে থাকল যতক্ষণ না ডাক্তার আজহার আরেকবার বাতাসে চুটকি বাজিয়ে বলল, ‘জল নিয়া আসেন। ডোন্ট বি লেইট।’


নবুর মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর নবুর মা মাথায় ঘষার অপেক্ষায় থাকা দুই কেজি ওজনের একটা বরফ খণ্ড তুলে আজহার মিয়ার দিকে ছুড়ে মারল।


নবুর পায়ের কাছে জলের হাঁড়িটা কে নিয়ে যাবে তা নিয়েও কয়েকজন রমণীর মধ্যে হাল্কা বিবাদ-বিসম্বাদ ঘটে গেল। এমনি জটিল পরিস্থিতিতে নবু আর এই পৃথিবীতে থেকে সময় নষ্ট করতে চায় নি হয়তো। দেবু ক্রমশ ছোট হয়ে আসা নবুর দেহটা কোলে তুলে মৃদু গরম পানিতে পা ডুবিয়ে দিতেই সর্বশক্তি দিয়ে কয়েকবার মুখের ভেতরে বাতাস নেয়ার চেষ্টা করে নবু। কিন্তু পর্যায়ক্রমিক ব্যর্থতার পর, হঠাৎ করে নবুর মাথা এক দিকে হেলে পড়ে। প্রতিদিন বিস্তর মৃত্যু দেখে দেখে বড় হওয়া মানুষেরা ডাক্তারের ঘোষণার অপেক্ষা না করেই দলবদ্ধভাবে ক্রন্দন শুরু করল। আখতার মিয়া দেখল, চিকিৎসক আজহার মিয়া নাড়ি টিপে এবং নবুর বুকে মাথা রেখে হৎস্পন্দন পাবার শেষ চেষ্টা করার পর নিজেও সেই পারিবারিক ক্রন্দনে শামিল হয়েছেন।

নবুর মৃত্যু হয়তো আবশ্যম্ভাবী ছিল, কিন্তু কার হাতে হবে—তা বিধাতা ছাড়া আর কেউই জানতেন না। যদিও নবু কলোরায় মারা গেল, কিন্তু তার মায়ের সকল রাগ গিয়ে পড়ল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আজহার মিয়ার ওপর। নবুর মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর নবুর মা মাথায় ঘষার অপেক্ষায় থাকা দুই কেজি ওজনের একটা বরফ খণ্ড তুলে আজহার মিয়ার দিকে ছুড়ে মারল। সেই বরফ খণ্ড আজহার মিয়াকে পাশ কাটিয়ে নবুরই পিসতুতো ভাই নরেন্দ্রর গায়ে লাগল। এবং সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দলবদ্ধ ক্রন্দনে বিরতি দিয়ে একদল নরেন্দ্রকে বাড়ির অন্য পাশে সরিয়ে নিয়ে, সেই নিক্ষিপ্ত এবং খণ্ডিত বরফ টুকরোগুলো দিয়েই আবার নরেন্দ্রর ব্যথা লাঘবের চেষ্টা শুরু করল।

সবাই ধারণা করেছিল, এই ঘটনায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আজহার মিয়া রুষ্ট হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আজহার মিয়া নিজেও এই করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারে নি। কারণ আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রকে পৃথিবীর বুক থেকে সরিয়ে দিয়ে হোমিওপ্যাথিকে প্রতিষ্ঠিত করার যে পণ নিয়ে তিনি ঢাকা শহরে ডিসপেন্সারি খুলেছিলেন তা শুরুতেই এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে তা তাঁর কল্পনায় ছিল না।

তাঁর বিশ্বাস ছিল মৃত্যুপথযাত্রী নবুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে সে ক্রমপ্রসারমাণ ঢাকা শহরে নিজেকে এক বিস্ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। কিন্তু মানুষের পণকে ধ্বংস করার জন্য বিধাতাও সদা প্রস্তুত থাকেন। আজহার মিয়ার পণকেও তিনি গোড়াতেই যেন ধূলিসাৎ করে দিতে চাইলেন। আজহার মিয়া তার গুরু এলাহাবাদের বিখ্যাত চিকিৎসক সৈয়দ হারিস আলীর শিখিয়ে দেওয়া ‘রোগীকে একটা প্রাণী দেহের বাইরে আর কিছু ভাবা যাবে না’ সেই অপ্ত বাক্য ভুলে নিজেও ডুকরে ডুকরে কাঁদতে শুরু করল।

নবুর মায়ের ছুড়ে দেয়া বরফখণ্ড লক্ষ্যচ্যুত হওয়ায় আজহার ডাক্তার যেন নবুর মায়ের চেয়েও বেশি কষ্ট পেলেন। আজহার ডাক্তার নিজের কোটের বোতাম খুলে, লোমশ বুকটা নবুর মায়ের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলতে থাকলেন, ‘মারেন মা। আমারে মারেন। আমি নবুর মরণের জন্য দায়ী। আমারে মাইরা আপনের যদি শোক নিবারণ হয় তবে হেইডাই করেন।’


২য় পর্বের লিংক
মাসউদুল হক

মাসউদুল হক

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৪। পড়াশোনা : বই বাড়িয়া কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, শাহজালাল...বিস্তারিত