আলফা : মানুষ নামের এক মহাকাব্যের উপাখ্যান

একটি শিশু তাজিয়া মিছিল থেকে হারিয়ে গিয়ে আশ্রয় পায় একজন নিঃসন্তান পেইন্টারের কাছে; আলফা ছবিটির শুরু এখান থেকেই। হারিয়ে যাওয়া এই শিশুটির নাম ‘আলফা’, রেখেছেন তাকে পালনকারী পিতা। কেনই-বা তিনি শিশুটির এই নামটি রেখেছেন? অথবা, কেনই-বা এই সিনেমাটির নাম ‘আলফা’—প্রশ্নটি সামনে রেখেই সিনেমাটি দেখতে থাকি।

দৃশ্যের পালাক্রমে দেখা যায় এক অভিজাত শহরের নিশ্বাস দূরত্বে লেকের উপর একটি ছাউনি ঘর। জলঘেরা এই ছাউনি ঘরের বাসিন্দা আলফা আর্টিস্ট নামে সবার কাছে পরিচিত। এই দৃশ্যে তিনি পরিণত যুবক। ধ্যানমগ্ন আসন পেতে মেডিটেশনে তিনি মুহুর্তেই চলে যান স্টেশনে। তন্দ্রাচ্ছন্নতায় তিনি দেখতে পান একটি ঘন সবুজ বন, যার ভেতরে তিনি হাঁটছেন। জ্ঞান হারিয়ে ফেললে সেখানে তার শুশ্রূষায় হাত বাড়িয়ে দেয় একদল আদিম মানুষ। এমনই এক অদ্ভুত রহস্যঘেরা ঘোরের ভেতর দিয়ে ছবিটি চিত্রিত করেছেন কিংবদন্তি পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।


হিজড়ার আবার ছওয়াল, এ, তুই ফির মা হইলি ক্যামন কইরে?


ছবিটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দৃশ্যত কোনো ঘটনাপ্রবাহ নেই। তবে, মাঝে মাঝেই হঠাৎ করেই আলফা যখন তখনই হারিয়ে যান অন্য কোনো এক জগতে। সেটি এমনই এক জগৎ যা হয়তো তাঁর একন্তই নিজের বানানো অথবা প্রত্যাশিত। তার এই প্রত্যাশিত জগতের ভেতরে ক্রমেই প্রবেশ করার বাসনা জন্মাতে থাকে।

আলফা তার স্মৃতির ডানায় ভর করে যখন যেখানে সাধ, সেখানে চলে যায়। কখনো কখনো চলে যান তার শৈশবে। আবার তুলি হাতে ক্যানভাসে তাকিয়ে দেখতে পান বাবার কাছ থেকে রঙের মিশ্রণে তার ছবি আঁকার হাতেখড়ি নেয়ার স্মৃতি।

—এইটা লাল, আর এইটা হলুদ। এহন আমরা... এই জায়গায় আছে নীল। হলুদ আর নীল মিশাইলে কী অয়, হলুদ আর নীল মিশাইলে সবুজ হইয়া যাইতাছে। দেখছেন আলফা মিয়া...

এমন বদলে যাওয়া অনেক কিছুই আলফা তার হৃদয়ের চোখে দেখতে পায়। উপলব্ধি করতে পারে। আর তাই মোজার্টের মিউজিকের মূর্ছনায় আলফা আনমনে হয়ে যায় শুভ্র ডানার পরি, সমুদ্রতীরে ডানা মেলে নেচে বেড়ান। নাগরিক যান্ত্রিকতা আলফাকে স্পর্শ করতে পারে না। সে এই জটিল সমীকরণের সমাজ ব্যবস্থায় একেবারে আনাড়ি। তাই সে রিকশার পেছনের প্লেটে কোন ধরনের ছবি আঁকা উচিত জানেন না।

—আর্টিস, আপনার আঁকনের আত বালাই, মাগার দিন দুনিয়ার হাল হাকিকত আপনার বুঝে নাই।

—ক্যান?

—আইজকাল সিনেমার নায়ক নায়িকাগো ছবি চলে? ফিরবার আওনের সময় কিছু মসজিদ-মুনাজাতের ছবি লইয়া আইসেন।

রিকশার গ্যারেজের মালিক আলফাকে দিন-দুনিয়ার হাল হাকিকত বোঝাতে বোঝাতে তার কাজের খবরাখর নেন। আর্টিস্টের বিলবোর্ড যে ‘ডিজিটালে খাইয়া ফালাইছে’ সেটা তিনিও বুঝেন আর আলফা মুচকি হেসে তার জবাব দেন। আর এরই মাঝে ‘সোনার বাংলা এফএম’-এর ব্রেকিং নিউজে শোনা যায় ‘লেখক ও প্রকাশককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে’। বাসায় ফেরার পথে বস্তির পাশে ডিজিটাল সাইনবোর্ড লাগানোর সময় গোলেনূরের স্বামী তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে যখন থুতু ফেলে, আলফা নির্লিপ্ত তাকিয়ে বিষয়টি উপেক্ষা করে যায়। এফএম রেডিওতে ব্লগার হত্যার খবর কৌশলে তুলে ধরা কিংবা একজন চিত্রশিল্পীর দিকে তাকিয়ে থুতু ফেলার মতো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম এমন কিছু কাজ পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু এই ছবিতে খুব মুনশিয়ানার সাথেই চিন্তাশীল দর্শকদের জন্যই হয়তো কৌশলে করেছেন।

আলফা দেখার সময় মনে হচ্ছিল সময় খুব দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। এ যেন এক নিশ্বাসে দেখে ফেলার মতো একটি সিনেমা। সেজন্যই হয়তো পরিচালক আলফা সিনেমাটিতে আসলে কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন বা দিতে চেয়েছেন, সেটা বুঝে উঠার চেয়ে ছবিটি দেখে ফেলাকে প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি আর তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিশ্লেষণের পূর্বে শেষ পর্যন্ত পরিভ্রমণের। যেখানে নজর কাড়ে বস্তিতে এক কালী নামের হিজড়া চরিত্রের; যে জন্ম পরিচয়হীন কয়েকটি ছেলে মেয়ের মা। এসব ছেলে মেয়েকে যখন একই বস্তিতে বসবাসরত মাদকের খুচরা ব্যবসায়ী গোলেনূরের স্বামী ‘জাউরার পো’ বলে গালি দেয়, তখনই কালীর সাথে তার ঝগড়া বাঁধে। তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি সমাজের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায় তার মন্তব্যে।

—হিজড়ার আবার ছওয়াল, এ, তুই ফির মা হইলি ক্যামন কইরে?

একই সাথে নজর কাড়ে এটিএম শামসুজ্জামানের বিশেষ চরিত্রটি। যিনি পানির নবি খিজির নবির কথা আলফাকে বলেন। চোখে দেখতে পান না, অথচ তিনি বস্তির পাশে একটি দোকানে চকটেল, আচার, এটা-সেটা বিক্রি করেন। গার্মেন্টেসের মেয়েদের তিনি দাদা, অনেক মধুর সম্পর্ক তার সাথে। মাথায় জরাজীর্ণ একটি ছেঁড়া টুপি আর কোলের উপর একটা ঢোল নিয়ে সমাজের বিপরীত ধারার সংমিশ্রণে তিনি বসে থাকেন তার দোকানে। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের শরীরের গন্ধ কিংবা পায়ের শব্দে তিনি বুঝতে পারেন কে যাচ্ছে তার সামনে দিয়ে। কিন্তু গোলেনূরের পেটের ভেতরে যে একটি ভ্রূণ প্রস্ফুটিত হয়েছে, এটি তিনি কেমন করে বুঝতে পারেন, সেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা দুরূহ। অনেকটা পরাবাস্তবতার ছোঁয়া বলে মনে হয়।

—আল্লায় রহমত পাঠাইছে, চাঁন্দের লাহান মাইয়্যা অইবো।

পুরুষত্বহীন স্বামীর সংসারে মাতৃত্বের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কোনো এক ধ্রুপদী মুহূর্তে গোলেনূরের পূরণ হয়ে যায় আলফার কাছ থেকে। কিন্তু সেই কথাটা আলফাকে বলতে গিয়ে সে বলতে না পারলেও আলফা বুঝতে পারে। অভিব্যক্তিহীন আলফা বিছানায় শুয়ে আবার চলে যায় তার আলফা স্টেশনে, গহিন জঙ্গলে, আদিম মানুষের দেশে। ছয় দরজার বাঁশির নরম সুরে নিজেকে নিয়ে যায় ঢোল-কাঁসার কীর্তনের দলের কাছে। আর ততক্ষণে, গোলেনূরের স্বামী হতে চায় আলফার ঔরসে জন্ম নিতে যাওয়া সন্তানের পিতা, যাকে সে সারাক্ষণ কাঁধে নিয়ে ঘুরবে।


তাইলে তো ও এহন শুধু একজন মানুষ। তার জন্য তোমাগে ধর্ম কী কয়?


একেবারেই সাদামাটা চিত্রায়ণে পরিচালক কাহিনি সামনে এগিয়ে নিতে থাকেন। বস্তির ভেতরে বেশ কয়েকটি নেড়ি কুকুরকে চমৎকার ব্যবহার সিনেমাটির কয়েকটি দৃশ্যে দারুণ ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে। কিন্তু গাধার পিঠে আলফার আঁকা শিল্প নিয়ে ঢাকার রাজপথে হেঁটে যাওয়াটা কিসের ইঙ্গিত বহন করে সেটা দর্শকমনে ব্যাপক ভাবনার উদ্রেক ঘটায়।

আলফা সিনেমার ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তীব্র আবেদন সৃষ্টিকারী আরেকটি দৃশ্যে কিছুটা সময়ের জন্য পিছন ফিরে দেখার ফুসরত হয়। পোশাক কারখানায় আগুনে পুড়ে নিরীহ শ্রমিকের মৃত্যু আর হরতালে পেট্রোল বোমায় মানুষের ঝলসে যাওয়ার বেদনা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে জগৎময়। আর তাই অত্যন্ত সাদা-সিধে প্রশান্ত মনের আলফা ক্যানভাসে সমস্ত রঙ ঢেলে দিয়ে আত্মচিৎকারে শোকের মাতমে মূর্ছা যান।

এমনই ছোট ছোট কাহিনির ভাঁজে যখন সোলেমানের লাশ আলফার কাছে পানিতে ভেসে এসে কথা বলে। তখনই নিমেষেই যেন পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহ সোলেমানের লাশের নিচে চাপা পড়ে যায়। আলফার ঘরের সিঁড়িটি যেখানে এসে পানিতে নেমে গেছে সেখানে যখন বারবার সোলেমানের লাশটি ফিরে আসে, তখন আলফা মুহূর্তের জন্য আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। লাশের খবর পৌঁছান নিকটস্থ থানায়। কিন্তু রহস্যময় কারণে পুলিশ সেখানে গিয়েও সোলেমানের লাশ খুঁজে না পেলেও সেই রাতেই সোলেমানের লাশ আবার ফিরে আসে আলফার কাছে। এক পর্যায়ে আলফা বুঝতে শুরু করে মৃত সোলেমানের কথা। সোলেমান বলে দেয় তার প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগের ভেতর তার ঠিকানা রয়েছে। আর সেই ঠিকানা অনুযায়ী আলফা সোলেমানের স্ত্রী আর সন্তানের কাছে গেলেও সোলেমান যে ক্রসফায়ারে মৃত্যুবরণ করেছে সেই খবরটি দিতে পারে নি। কারণ, তাদের ধারণা সোলেমান বেঁচে আছে আর সে তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে। এক পর্যয়ে আলফাও চলে যায় সোলেমানের গ্রামের বাড়িতে। সোলেমানের অন্ধ মা তার জন্য প্রতিদিন পিঠা বানিয়ে অপেক্ষা করেন। আলফা সোলেমানের মায়ের কাছেও তার মৃত্যুর সংবাদটি দিতে পারেন নি। তাদের কাছে সে সোলেমানের মৃত্যুর ডাকহরকরা না হয়ে পালিয়ে চলে আসে শহরে। আর তখন জানতে পারে পুলিশ সোলেমানের লাশ খুঁজে পেয়েছে।

পুলিশ সোলেমানের লাশটিকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে চায়। আলফা পুলিশের কাছে লাশটির জাত ধর্ম জানতে চাইলে পুলিশ জানায় :

—চেক করেছি, কাটা, কাটা। মুসলমান।

ইতোমধ্যে আলফা সোলেমানের একান্ত আপনজন হয়ে যায়। মৃত সোলেমানকে সে কোনোভাবেই বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করতে দিতে চায় না।

—সোলেমান, তুই কেমনে বেওয়ারিশ হইলি রে?

এই প্রশ্নটি যেন আলফা সোলেমানের উপর ভর করে এই সমাজের প্রতি রেখে গেছেন। ডোমের কাছে গিয়ে সোলেমানকে দেখে আসেন। মদের গ্লাস হাতে তাদের সাথে অনেক কথা হয়।

—তাছাড়া মরারও একটা ঠিকানা থাকে। তাই না?

—হু, হু। সাছ বাত বোলা।

—আর ওই মুর্দার একটা ধর্ম আছে, আছে না?

—লেকিন ও মুসলমান না হিন্দু বুঝার কোনো উপায় নাই। এর ওইটা তো কুত্তা বিলাই খেয়ে লিয়েছে।

এটা শোনার সাথে সাথে আলফা খুব বড় একটা ধাক্কা খায়। কারণ পুলিশের তথ্য আর ডোমের বক্তব্যে মারাত্মক বিভ্রান্তিকর। নিজেকে সামলে নিয়ে আলফা ডোমের সাথে কথা চালিয়ে যায়।

—তাইলে তো ও এহন শুধু একজন মানুষ। তার জন্য তোমাগে ধর্ম কী কয়?

—আমার ধর্ম তো তার সৎকারের কথা বলে।

—যে জল, যে খিজির নবি সোলেমানরে আমার ঘরের নিচে পাঠাইছে। আমি তারে হেই জলে খিজির নবির কাছে ভাসাই দিয়া আসুম। এইটা সোলাইমানের হক।

—হ, হ। সাছ বাত। ওই মুর্দারও একটা হক আছে। বাবু তুই একটা কাজ কর। ওই লাশটা তুই লিয়ে যা বাবু। ওর একটা বিহিত কর। ওরে ওর হক পাওয়াইয়া দেওয়ার বিহিত কর বাবু।
এই দৃশ্যেই যেন বিচ্ছিন্ন সব সমীকরণের কেন্দ্রস্থল এবং ছোট ছোট অনেকগুলো গল্পের একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দান করে। যেখানে পারফর্মিং আর্ট, ফ্লাশব্যাক, লং টেক, পরাবাস্তবতায় চিত্রিত খুবই সূক্ষ্ম ও সুকৌশল রহস্যঘেরা প্রায় অদৃশ্য এক সরল রেখার সন্ধান মেলে।

তন্দ্রাচ্ছন্ন এই সরল রেখাটি চিত্রায়ণ করতে গিয়ে পরিচালক গাধার পিঠে সোলেমানের লাশ তুলে দিয়ে একটি রূপক দৃশ্য ধারণ করেছেন। কিন্তু দৃশ্যটি ধারণে আরও নিরীক্ষার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করি। কারণ, জলাশয়ে বেশ কিছুদিন পড়ে থাকা লাশটি যৌক্তিকভাবে পচে গিয়ে থাকলেও তাকে বহনকারী আলফা কিংবা কালী এবং ছোট ছোট শিশুগুলো লাশ পচা গন্ধের বিষয়ে কোনোরূপ অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন নি। তাছাড়া একটি মানুষ যখন মারা পড়ে তখন তার ওজন স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে বেড়ে যায় এবং লাশটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু সোলেমানের পচে যাওয়া লাশটি যখন গাধার পিঠে করে অনায়াসে বহন করা হয়, সেখানে এই বিষয়গুলোতে নজর দেয়া হয় নি বলে মনে হয়েছে। একই সাথে, সিনেমার কিছু কিছু দৃশ্যে অ্যানিমেশনের কাজ খুব কাঁচা হাতের বলে মনে হয়েছে। তাছাড়ও পানিতে ভাসমান সোলেমানের লাশটি কিভাবে শিয়াল-কুকুরের কাছে পৌঁছাল, সে বিষয়টি যৌক্তিক মনে হয় নি। তর্কের খাতিরে যদি সোলেমানের লাশ কোনো হিংস্র প্রাণীর কাছে পৌঁছেও থাকে, তারপরও আঁটসাঁট প্যান্ট পরিহিত একটি লাশের পুরুষাঙ্গটিই শুধু শিয়াল কুকুর কেন খেয়ে নিয়েছে সে-ব্যাপারে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে। একইসাথে সোলেমানের লাশে যে পুরুষাঙ্গ অক্ষত রয়েছে, সেটি কয়েক দৃশ্য পূর্বেই পুলিশ আলফাকে বলেছে এবং যা পরস্পর সাংঘর্ষিক। শেষতক মনে হলো লাশের পুরুষাঙ্গটি না থাকার বিষয়টি শুধুমাত্র গল্পের শেষ পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই বয়ান করা হয়েছে যা অন্য কোনোভাবেও করা যেতে পারত বলে মনে করি। একই সাথে একজন ডোম কখনোই একটি লাশকে কোনো একজন ব্যক্তিকে আবেগের বশে দিয়ে দিতে পারে না যা সিমেনাটির দৃশ্যায়নে বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে হয় নি। এমন দু’একটি বিষয়ের দিকে নজর দিলে সিনেমাটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।


মানবতার জাদুতে আলফা বুঝতে সক্ষম, জন্ম না দিয়েও কিভাবে মা হওয়া যায়।


সরিষা দানার মতো এসব ক্ষুদ্র বিষয়গুলো সত্ত্বেও সিনেমাটির পরিচালক খুব দক্ষতার সাথে জানান দিতে সক্ষম হয়েছেন যে, এই আলফা শুধুমাত্র গ্রিক বর্ণমালার প্রথম বর্ণ নয়। অথবা, আলফা এখানে এমন কেউ নয় যে বলবে, আমিই আলফা, আমিই ঈশ্বর। শিয়া পরিবার থেকে হারিয়ে গিয়ে ছেলেবেলায় আলফা মূলত পেয়ে যান এমনই এক পথের সন্ধান যে পথটি ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে গেছে তার আদিম গন্তব্যের মহাসড়কে—যার শেষপ্রান্তে থাকে জাত-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-গোত্রের বিভাজনহীন একটি নিরাপদ ঠিকানা। যে ঠিকানার নাম মানুষ।

মানুষ নামের সেই ঠিকানায় আলফা অনুভব করতে পারে সৃষ্টিতত্ত্ব, যেখানে দুটি রঙের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় ভিন্ন কোনো রঙ, যেমন মানুষের ভেতরে জন্ম নেয় মানুষ। মানবতার জাদুতে আলফা বুঝতে সক্ষম, জন্ম না দিয়েও কিভাবে মা হওয়া যায়। আবার জন্মদাতা না হয়েও কিভাবে পিতা হওয়া যায়। যেমন কালী কাউকে জন্ম না দিয়েও জন্ম পরিচয়হীন শিশুদের মা হয়েছেন। আর আলফার ঔরসের সন্তানের পিতা হয়ে গেছে গোলেনূরের স্বামী। এ যেন আলফার তন্দ্রাচ্ছন্ন বিচরণ জগতের বাস্তব রূপ যা সে আঁকতে চেষ্টা করে যাচ্ছিল বহুকাল থেকে।

আলফা যেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কল্পিত সেই জগতেরই ইঙ্গিতময়তা, রূপকতায় ঘোর লাগা এক মহাকাব্য যেখানে পথের বাঁকে বাঁকে অপেক্ষা করতে থাকে পরাবাস্তবতা। যে মহাকাব্যের আলফা মানে শুধুমাত্র একজন মানুষ, যাকে জাত ধর্মে আলাদা করা যায় না। তবুও এই আলফার কাছে মনে হয়, জীবিত কিংবা মৃত মানুষেরও একটা হক আছে। অন্ততপক্ষে পানির নবি খিজির নবির কাছে ভেসে পৌঁছে যাওয়ার।

 

মোক্তার হোসেন

মোক্তার হোসেন

জন্ম ৬ এপ্রিল ১৯৮২, লক্ষ্মীপুর। স্নাতকোত্তর, মৎস্যবিদ্যা, ঢাকা কলেজ। পেশা :...বিস্তারিত