‘IC 814: The Kandahar Hijack’: ইতিহাসের পুনর্মঞ্চায়ন নাকি “মারণবাদী” রাজনীতির উস্কানি

IC 814: The Kandahar Hijack। নাম দেখেই নিশ্চয় আঁচ করতে পারছেন আর একটা ইসলামিক টেরোরিজমের গল্প হাজির। নতুন কিছু কি আছে এই সিরিজে? নাকি সেই একই চিরচেনা গল্পের পুনর্মঞ্চায়ন?

নতুন বলতে পরিচালক হিসেবে অনুভব সিনহা। নায়ক হালের সেনসেশন বিজয় ভার্মা। নাসিরউদ্দিন শাহ, পংকজ কাপুর, অরভিন্দ স্বমীর মতো এনসেম্বল কাস্টিং। এইসব বড় বড় নাম দেখে আগেই মুগ্ধ হইয়েন না। এত এত নামজাদা সেলেব্রিটির সম্মিলিত প্রয়াসে “ওয়ার অন টেরর” প্রজেক্টকে আরও টেকসই করা, বায়োপলিটিকাল গভর্নমেন্টালিটিকে জাস্টিফায়েড করা এবং কাউন্টার টেররিজম মিজারস কেন আরও এগ্রেসিভ এবং মারণবাদী হওয়া উচিত সেই ন্যারেটিভকে উস্কিয়ে দেওয়া ছাড়া নেটফ্লিক্সের নতুন এই সিরিজ আর কোনো বেটার পলিটিক্স হাজির করে না আখেরে।

কেন বা কিভাবে?

১। আমি হার্ড-রাইট এন্টি-মুসলিম সরকারের রেইজিমের মধ্যে বসে, ম্যাসিভ পোলারাইজেশন, ক্রমবর্ধমান হেইট ক্রাইম আর ধর্মভিত্তিক নাগরিক আইনের ওয়াক্তে বসে, ওয়ার অন টেররের গাজা গণহত্যার নির্মম ওয়াক্তে বসে ইতিহাসের কোন গল্পটা বাছাই করে বলতে চাইতেছি আর কোন গল্পটা বাদ দিতে চাইতেছি সেইটা আমার কালচারার পলিটিক্স। আমার বাছাইয়ের রাজনীতিটা আপনি ধরতে পারছেন কিনা সেটা দর্শক হিসেবে আপনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মুন্সিয়ানা। 

আমি যদি এখন সিনেমায় কান্দাহার হাইজ্যাক নিয়ে বলতে চাই, ইমেজ তৈরি করতে চাই, কিন্তু গুজরাট-দাঙ্গার হিন্দু-সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বলতে বা কালচারাল মেমোরি নির্মাণ করতে না চাই সেইটা আমার রাজনৈতিক বাছাই। এই বাছাইয়ের রাজনীতিটা দর্শক একা তৈরি করে না। ঠিক করে দেয় না। এইটা রেসিপ্রকাল। "Mulk" সিনেমায় অনুভব সিনহা যে প্রো-মুসলিম মাইনোরিটি রাজনীতিটা করেছিলেন সেটার জন্য তাকে হিন্দত্ববাদীদের কাছে প্রচুর গালি আর সমালোচনা খেতে হইছিল সত্যি, কিন্তু তাকে সেক্যুলার দর্শক তো সেই সময় প্রসংশা করে মাথায় তুলেছিল। এখন IC 814 বানিয়ে উনি যেন সেটা ব্যালেন্স করে প্রমাণ করতে চাইলেন 'কেউ আমারে ভুল বুইঝো না...। আমি ধর্মেও আছি জিরাফেও আছি।'

২। এত ব্যালেন্স করার পরও অনুভব সিনহা প্রচুর গালি উপহার পাচ্ছেন বিজেপির কাছে। একের পর এক মিডিয়া নিউজ করছে, কেন উনি IC 814 সিরিজে মুসলিম টেরোরিস্টদের নাম না ব্যবহার করে কোড নেইম ব্যবহার করেছেন। কেন সেই নামগুলা ভোলা ও শংকরের মতো হিন্দু নাম হলো? হাহা। আইরনিই বটে।

পুরো গল্পে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা ন্যারেটিভ খুব এক্সপ্লিসিটলি প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন অনুভব সিনহা যে, আইএসআই এবং আল-কায়েদা মূলত আলাদা নামের "টুইন ব্রাদার্স"। শুরু থেকে শেষ শট পর্যন্ত গল্পে কোনো রাখঢাক ছাড়া পাকিস্তান, আফগানিস্তান, আইএসআই, ওসামা, মোল্লাদের নাম নাম নেওয়া হইছে। কিন্তু পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার বাসনায় অনুভব সিনহা টেরোরিস্টদের ভিসিবলি একটু কম "মুসলিম" দেখিয়ে দাড়ি-টুপি ব্যবহার করেন নি, তাদেরকে নামাজ পড়ান নি, আল্লাহু আকবার বলান নি, আবার হাইজ্যাক মিশন চলাকালে তাদের কোড নেইম ব্যবহার করেছেন, একটু দয়ালু হিসেবে দেখিয়েছেন। ব্যস তাতেই ধরা। যেহেতু এতদিনের ভিজ্যুয়াল কালচারের যে চাষাবাদ সেই ইমাজিনারিতে এই ধরনের টেরোরিস্ট তো নেই। তার মানে এখন অনুভব সিনহাকে ধরতে হবে। আরএসএস হিন্দুত্ববাদী মানুষজন আর গোদি মিডিয়া উনাকে এই পাপের জন্য ধুয়ে দিচ্ছে রীতিমতো! এই ঘটনাটা প্রমাণ করে একটা ডেঞ্জারাস আইডেন্টিটি পলিটিক্সকে ভারতীয় কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি খেলতে খেলতে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যার বাইরে কোনো পলিটিকাল ইমাজিনেশন এখন দাঁড় করানো ভয়াবহ কঠিন।

৩। সাদা চোখে 'IC 814' সিরিজকে আমরা ভারতীয় রাজনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের আমলাতন্ত্র, মিডিয়ার রাজনীতি ইত্যাদি অনেক কিছুর একটা ইন্টারসেকশনাল সাগা কিংবা “ইতিহাসের পুনর্মঞ্চায়ন” বলতেই পারি। কিন্তু ক্রিটিকালি যখন দেখবেন তখন দেখা যাবে যে অনুভব সিনহা তার 'IC 814' সিরিজে মোটাদাগে দুইটা বিষয় দেখিয়েছে:  

ক) ১৮৮ জন প্যাসেঞ্জারের করুণ অভিজ্ঞতার ইমোশনাল রেপ্রেজেন্টেশন।
খ) ইসলামিক জঙ্গিবাদের শক্তির মোকাবিলায় ভারতীয় রাজনীতিবিদ, মিলিটারি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অসহায়ত্বের রেপ্রেজেন্টেশন।

এই দুই রেপ্রেজেন্টেশনের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে বারবার নানান গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মুখ দিয়ে বলানো হইছে 'আমরা যেসব টেরোরিস্টদের পাকড়াও করি তাদের হিউম্যান রাইটসের পরোয়া না করে, সভ্য বিচারের জন্য জেলে না ভরে যদি সবাইকে গ্রেফতারের সাথে সাথে মেরে ফেলতাম তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না।' মূলত এই বয়ানটাকে কাঠামোগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করাই এই সিরিজের ডিপ পলিটিক্স। এবং সাধারণ দর্শকের এই দুই রেপ্রেজেন্টেশনের ইমোশনাল ট্র্যাপে পড়ে তখন বারবার মনে হবে ‘ঠিক ঠিক। এদের আবার হিউম্যান রাইটস কিসের? বিচার কিসের? মেরে ফেলুক কুত্তার বাচ্চাদের।’

এবং রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তার নামে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী বিভিন্ন জায়গায় তার বায়োপলিটিকাল উদ্দেশ্য হাসিল করতে ধরে ধরে মুসলমান মারবে, তখন এর জাস্টিফিকেশনে বলা হবে এগুলো আমরা করেছি রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য। আমরা এগুলা না করলে তোমাদের কী হতো ভাবতে পারো? রাতে ঘুমাইতে পারতা তোমরা? দীর্ঘদিনের শত শত এরকম রেপ্রেজেন্টেশন দেখে দেখে বুঁদ থাকা জনগণও তখন এসব বয়ানে পূর্ণ ঈমান এনে সরকার বাহাদুরকে থ্যাংকইউ দিয়ে রাতে ঘুমাতে যাবে। এই তো।

সে জন্যেই আমি বারবার নানান লেখাতে বলে আসছি গাজা কিংবা ইয়েমেন, কাশ্মীর কিংবা চেচেন, জিনজিয়াং কিংবা আরাকান সবখানে যে এত এত মুসলমান গণহারে হত্যা করা যায় তার জাস্টিফিকেশন এবং দায়মুক্তির কাঠামো তৈরি করাতে সিনেমার মতো সাংস্কৃতিক টুলগুলার দায় সীমাহীন। কিন্তু এই দায়কে আমরা কখনও “ফিকশন” কিংবা কখনও “বিনোদন” বলে আমরা ক্রিটিকালি ডিল না করে এড়িয়ে গেছি বেশিরভাগ সময়ই। এই এড়িয়ে যাওয়ার ফলশ্রুতিতে আজ দিনে দিনে “ওয়ার অন টেরর ইন্ডাস্ট্রি”র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপারাটাস বা সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে এই ‘ভিজ্যুয়াল কালচার’। ক্রিটিকাল ক্রিমিনোলজি ও ক্রিটিকাল টেররিজম স্টাডিজে তাই সিনেমা ও টিভিশো নিয়ে আরও বেশি বেশি একাডেমিক এনগেইজমেন্ট তৈরি করাটা তাই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। 

নাজমুল আরেফিন

নাজমুল আরেফিন

জন্ম ১২ মার্চ, মেহেরপুর। সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, ঢাকা...বিস্তারিত