কানাডিয়ান সমাজ-রাজনীতিতে ক্রিস্টিয়ান প্রভাব এখনও কম না। আমি যে ছোট ভিসিনিটিতে থাকি, মানে ইউনিভার্সিটি এলাকার কয়েক মাইলের মধ্যে হাঁটাহাঁটির সময়, কম করে হলেও ৮টি চার্চ দেখেছি। বেশির ভাগই ক্যাথলিক। ২০২১ সালের কানাডার সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি (৫৩.৩%) নিজেদের ক্রিস্টান মনে করে। এর মধ্যে ৩০%-ই রোমান ক্যাথলিক।
মৌলবাদী খ্রিস্টান মুভমেন্টের আধিক্য দিন দিন আরও বাড়ছে। 'Liberty Coalition Canada' নামে একটি বিরাট রক্ষণশীল খ্রিস্টান অ্যাডভোকেসি গ্রুপ আছে, যাদের আন্দোলনের মূল বিষয় হলো বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে রক্ষণশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক নীতি তৈরি করতে হবে। সিবিসি নিউজ রিপোর্ট করছে যে এদের উদ্দেশ্য হলো 'আগামী কয়েক বছরের মধ্যে, কানাডা জুড়ে পদ্ধতিগতভাবে ১০০০০ নতুন খ্রিস্টান রাজনৈতিক প্রার্থী তৈরি করা'। আমেরিকার 'Christian reconstructionism' মুভমেন্ট আর কানাডার এই মুভমেন্ট একই সাথে একই লক্ষ্যে কাজ করছে। যদিও ট্রাম্প রেইজিমের পর আমেরিকায় এই ধরনের ফার-রাইট মুভমেন্ট এখন আরও বিরাট আকার ধারণ করেছে (কতটা ব্যাপক তা বোঝার জন্য পড়তে পারেন: American Zealots, Arie Perliger, 2020, Columbia University Press)। যাই হোক এই আন্দোলনের এজেন্ডার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে 'anti-LGBTQ+' সেন্টিমেন্ট গড়ে তোলা। এরা রাস্তায় কিংবা সামাজিক মাধ্যমে খোলাখুলি স্লোগান দেয় LGBTQ+রা হলো 'satanic' and a 'godless death cult'. এদের আন্দোলনের আর একটা জনপ্রিয় এজেন্ডা এন্টি-মুসলিম সেন্টিমেন্ট তৈরি এবং প্রকাশ। এই বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন করে যাচ্ছে এমন মৌলবাদী খ্রিস্টান এবং ফার-রাইট উগ্রবাদী মুভমেন্টের অভাব নাই কানাডা আমেরিকাতে। যেহেতু আমার কাজের জায়গা এগুলো, এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখব পরে। আপাতত সোর্স হিসেবে সিবিসির 'Inside the fundamentalist Christian movement that wants to remake Canadian politics' এই নিউজটা পড়তে পারেন।
এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কথায় আসি। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই একাডেমিক স্পেসেও আপনি এরকম বহুত রক্ষণশীল চিন্তাবিদ পাবেন। যারা কাজ করে যাচ্ছেন বিব্লিকাল (biblical) চিন্তা-দর্শন নিয়ে। উদাহরণ হিসেবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় University of Alberta-র কথাই বলি। Frances Widdowson নামে এক কন্ট্রোভার্সিয়াল প্রফেসরের আমাদের ক্যাম্পাসে একটা টক ছিল এই মাসের (জানুয়ারি ২০২৪) ১৮ তারিখ। তাকে দাওয়াত করে এনেছিলেন University of Alberta-র নৃবিজ্ঞান বিভাগের LGBTQI+ ইস্যুর কন্টেক্সটে আরেক কন্ট্রোভার্সিয়াল শিক্ষক Kathleen Lowrey। দুইজনই মূলত বায়োলজিকাল সেক্সে বিশ্বাসী। Frances মূলত anti-indigenous, anti-Black Lives Matter এবং anti-transgender rights পজিশন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার ব্যাপারটাকে একাডেমিক ফ্রিডম মনে করে। এগুলো বলার জন্যে তার প্রফেসরশিপের চাকরিও গেছে। তাই এই টকের শিরোনাম দিয়েছিল 'Academic Freedom under threat'। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে কোনো একটা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ঘৃণা এবং ফোবিয়া ছড়ানো আর একাডেমিক ফ্রিডম এক জিনিস না। পুরো ক্যাম্পাস তাই এই টক-এর বিরুদ্ধে নড়ে-চড়ে ওঠে। Indigenous Graduate Students' Association-এর নেতৃত্বে আমরা এর বিরুদ্ধে সরব হই। পাল্টা ইভেন্ট এবং কর্মসূচির আয়োজন করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টকে ওপেন লেটার দেওয়া হয়। আরও জানতে দেখুন: 'Frances Widdowson to speak on campus, IGSA plans counter-event'।
মূল কথা হলো এই ধরনের আন্দোলন প্রতি-আন্দোলন ক্যাম্পাসগুলোতে চলতেই থাকে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়। LGBTQ+ মানুষদেরও অধিকার এখানে আইন করেই সুরক্ষিত। কিন্তু তার পরও স্কুল কারিকুলামে LGBTQ+ ইস্যু কিভাবে ডিল করা হবে তা নিয়ে আন্দোলন পাল্টা আন্দোলন এখনও রেগুলার ফেনোমেনন এখানে। এই তো চার মাস আগে সেপ্টেম্বরেও বিরাট আন্দোলন হয়েছে।
এবার মুসলমানদের প্রশ্নে আসি। কানাডায় মুসলিম মোট জনসংখ্যার ৫%। প্রচুর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ থেকে প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা এদেশে ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে এসেছেন। নতুন জীবন শুরু করেছেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্রিস্টিয়ানের দেশে এদের তখন রাষ্ট্র বলে দেয় নি যে তোমাদের ক্রিস্টিয়ান প্রিন্সিপলের ভিতরে জীবন যাপন করতে হবে। এন্টি-মুসলিম সেন্টিমেন্ট আসে নি এই দেশে তা না। সব সময় ছিল। কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে 'The Canadian Charter of Rights and Freedoms'।
৯/১১-এর পর সারা বিশ্বের মতো কানাডাতেও ইসলামোফোবিয়া আস্তে আস্তে বাড়তে থাকায় কানাডা সিনেট সম্প্রতি এন্টি-ইসলামোফোবিয়া বিল তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। অবস্থা কতখানি গুরুতর তা খতিয়ে দেখতে মানবাধিকার বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৮০ পৃষ্ঠার একটি উদ্বেগজনক প্রতিবেদন পাবলিকলি প্রকাশ করে। এর উপর ভিত্তি করেই কানাডার সিনেটররা এন্টি-ইসলামোফোবিয়া আইনের খসড়া তৈরি করছেন। যাতে করে মুসলিমদের অধিকার আরও সুরক্ষিত রাখা যায়। একটা আধুনিক রাষ্ট্রের এটাই কাজ। সংখ্যালঘুদের অধিকার বজায় করতে সচেষ্ট থাকা। ঠিক এই কারণেই কানাডা এত সমস্যার মধ্যেও দুনিয়ার বুকে মাল্টি-কালচারালিজমের একটা আলাদা উদাহরণ হতে পেরেছে।
এতক্ষণ এই উদাহরণগুলো দেবার পিছনে আমার মূল পয়েন্ট হলো দুনিয়ার সব দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের একদল মানুষ তাদের নিজ ধর্ম দিয়ে রাষ্ট্র চালাতে চায়। এটা শুধু আমাদের বাংলাদেশের মতো অর্ধ-শিক্ষিত গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর চেহারা না। প্রায় সকল উন্নত পশ্চিমা দেশ এই মৌলবাদী জ্বরে আক্রান্ত, নানান ভাবে। আমরা ওখানে বসে দেখতে পাই না তাই মনে হয় এটা কেবল আমাদেরই সমস্যা। পশ্চিমা ফার-রাইট রাজনীতিতে ধর্ম এখন একাকার ভাবে মিশে আছে। সরকারকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করছে। প্রশ্ন হলো এইসব মৌলবাদী মুভমেন্টের চাপে রাষ্ট্র কী করছে?
এবার যারা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে বুঝে না বুঝে জিহাদি জোশে ধর্মের নিশানা উড়ালেন তাদেরকে বলি। যদি আপনারা ভেবে থাকেন যে দেশে আমরা ৯০ শতাংশ অধিবাসী মুসলিম বলে অন্য সব মানুষের বেঁচে থাকার সমস্ত গ্রামার মুসলিম ফ্রেম অনুযায়ী হতে বাধ্য তাহলে মনে রাখবেন আপনাদের রাজনীতির সাথে ভারতের গেরুয়াবাদীদের রাজনীতির এক্সপ্রেশন এবং ব্যাপকতা আলাদা হলেও আপনাদের মূল নৈতিক অবস্থানটা একই। একই রাজনীতির চর্চা করছেন আপনারা। বাংলাদেশে যদি কোনদিন RSS-এর মত কার্যকরি ধর্মভিত্তিক মবিলাইজিং ফোর্স তৈরি হয় সেদিন সুযোগ পেলে আপনারা ঠিক একই রকম মিলিট্যান্ট হবেন সংখ্যালঘুদের উপর। সেটা্র আপনারা ইশারা দিচ্ছেন নানান ভাবে। ইউরোপে যখন মুসলমানদের নিজস্ব আইডেন্টিন্টি হিজাব দাঁড়ি টুপি রাখতে-পরতে বাঁধা দেওয়া হলো তখন আপনাদের বাংলাদেশে বসে খারাপ লেগেছে। প্রতিবাদ করেছেন। এই প্রতিবাদ আপনি একা করেন নি। দুনিয়া জুড়ে অন্য ধর্মের কিংবা অধর্মের বহু মানুষ, একাডেমিক, এক্টিভিস্ট মুসলমানদের পরিচয়ের এই নিজস্বতা রুখে দেওয়ার প্রতিবাদ করেছেন। ইসলামোফোবিয়া যে নতুন রেসিজম তার তত্ত্ব নির্মাণে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্যালেস্টাইনে যে গণহত্যা চলছে তার বিরুদ্ধে কয়টা মুসলিম দেশ রাস্তায় নেমেছে আর কয়টা অমুসলিম দেশ সেটার হিসেব আছে আপনাদের কাছে? দুনিয়া জুড়ে ঈসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে মুসলিমদের পাশে সব ধর্মের মানুষ নিরলস ভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। শুধু তাই না। ৭৫ বছরের বেশি ধরে প্যালেস্টাইনে কি ধরনের সিস্টেমিক বর্ণবাদ এবং অত্যাচার চলছে তা দুনিয়াকে জানানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেলেকচুয়াল তৎপরতা ইহুদিদেরই। অথচ আপনার মাথার মধ্যে ভয়ংকর সব এন্টি-সেমেটিক আইডিয়া ঢুকিয়ে রেখেছে এই উৎসের মত বিভিন্ন সময়ে গজিয়ে ওঠা কিছু মৌলবাদী ঘৃণা ছড়ানো ধর্মগুরু যে, ইহুদি মানেই খারাপ! সৌদি আরবসহ বড় বড় ক্ষমতাশীল মুসলিম রাষ্ট্র যখন প্যালেস্টাইন ইস্যুতে নীরব থেকে এই অন্যায়কে এতগুলো বছর টিকিয়ে রেখে ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশনের রক্তে নিজেদের হাত লাল করে রেখেছে। অথচ আজ একটা অমুসলিম দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ঈসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে নির্যাতিত প্যালেস্টাইনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাতেও আপনারা বুঝেন না যে ধর্মই দুনিয়ার একমাত্র পরিচয় না। দুনিয়াকে দেখার একমাত্র লেন্স না। প্যালেস্টাইন হোক, আরাকান হোক, উইঘুর প্রভিন্স হোক কিংবা কাশ্মীর—সবখানে সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায় অবিচারকে আপনি যে নৈতিকতা দিয়ে অন্যায় মনে করেন সেই একই নৈতিকতার বিপরীত অবস্থান নিয়েন না বাংলাদেশের কিংবা অন্য যে কোনো দেশের সংখ্যালঘুদের অধিকারের বেলায়।
আপনি যদি মনে করেন বাংলাদেশ শুধু মুসলমানদের নিয়মে চলবে তাহলে মনে রাইখেন পশ্চিমা বিশ্বের শত শত ফার-রাইট গ্রুপের আন্দোলনকে আপনি নৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন। নিজেদের মূল রাজনৈতিক আন্দোলনটা চিনেন। পাশের দেশে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে এপিটোমিক এন্টি-মুসলিম রাজনীতিটা আজ হয়ে গেল ভারতে, তা নিয়ে যে ক্রিটিকাল আলাপটা চলছিল বাংলাদেশ, তাকে আপনারা এই বই-ছেঁড়ার উগ্র রাজনীতিকে সমর্থনের মাধ্যমে দিশেহারা করে দিলেন। ইউরোপে কেউ কোরান পোড়ালে বাংলাদেশে যে উত্তেজক নিউজ ভ্যালু তৈরি হয়, আপনি ভাইবেন না যে আপনারা এখানে anti-LGBTQ+ সেন্টিমেন্ট নিয়ে বই ছিঁড়ে লাইভ করলে পশ্চিমে তার পাল্টা রাজনৈতিক উত্তেজনা কম হয়। এইসব বিভক্তি উৎপাদনের ডাইভার্টিং রাজনীতির মাদকেই আপনারা যেন বুঁদ হয়ে থাকেন সেটাই চাইছে গ্লোবাল রাজনীতি। এইসব ফাঁদে পা দিয়েন না। ক্লাস সেভেনের এই গল্প পড়ে মানুষের মধ্যে কী আলোড়ন হতো তা আমরা কেউ জানি না। কিন্তু আপনাদের এই বই-ছেঁড়ার উগ্রবাদিতা যে বাংলাদেশে LGBTQ+ মুভমেন্টের নতুন এক অধ্যায় সূচনা করল সে ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন।
LGBTQ+ সারা দুনিয়াতেই অত্যাচারিত নিষ্পেষিত স্টেরিওটাইপড জনগোষ্টী। এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ভাইবেন না আপনি ইসলামের বিরাট উপকার করছেন। চলমান গ্লোবাল ইসলামোফোবিয়াকে লেজেটিমেসি দিতেছেন বরং। ভয়ংকর ভাবে দিতেছেন। হিন্দু হোক, শিয়া হোক, আদিবাসী হোক, কালো হোক, শিখ হোক, ইহুদি হোক, কিংবা LGBTQ+, দুনিয়ার যেকোনো নিষ্পেষিত সংখ্যালঘু জনগোষ্টীর পাশে দাঁড়ানোর (রাজ)নৈতিক প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও হিম্মত অর্জন করতে না পারলে আমি সারা দুনিয়ায় চলমান ইসলামোফোবিয়া এবং ইসলামোফোবিক স্টেরিওটাইপিং-এর বিপক্ষে ইন্টেলেকচুয়াল ফাইট করি কোন মুখে? কোন নৈতিক বলে?