লাতিন সাহিত্যের প্রাণপুরুষ গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেসকে এক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের গোপন আকর্ষণ কি আপনি স্বীকার করেন না? মার্কেজের জবাবটা ছিল সোজাসাপ্টা। উনি বলছেন—‘হাঁ, আমি ক্ষমতার দ্বারা দারুণভাবে আকৃষ্ট হই। এতে লুকাবার কিছু নেই। আমার অনেক আচরণেই এই প্রবণতা স্পষ্ট।... ক্ষমতা যে মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার চরম প্রকাশ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যান্য লেখক কী করে এমন শক্তি দ্বারা বাতিকগ্রস্ত হন না, এটা আমার বোধগম্য নয়।’ মার্কেজের এই কথা হয়তো অনেকাংশে খেটে যায় সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সাথে। সদ্যপ্রয়াত এই দিকপাল—আমার মতে—এ ম্যান অব প্যারাডক্স। উনি লিখলেন—নূরলদীনের সারাজীবন, পরানের গহীন ভিতর—খেটে খাওয়া মানুষের কথা, কিন্তু জীবনযাপন করেছেন সত্যিকার সৈয়দ সাহেবের মতো—ক্ষমতাকাঠামোর কাছাকাছি। বিখ্যাত সৈয়দ হক আর লেখক সৈয়দ হকের এই বৈসাদৃশ্য তাকে আজীবন রেখেছে আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু তাতে একজন বুর্জোয়া লেখকের প্রলেতারিয়েত সাহিত্যের আবেদন ক্ষুণ্ন হয় না। শুধু নিম্নবর্গের বলি কেন, হকের লেখা এক বিশাল প্যান্ডোরা বক্স। কী বের হয় নি সেখান থেকে! কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান, নাটক, শ্রুতিনাট্য, গীতিনাট্য, সিনেমা, অনুবাদ; বাকি ছিল শুধু রবীন্দ্রনাথের মতো ছবি আঁকা। রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে উনার মতো ভার্সেটাইল লেখক হাতে গোনা।
বর্ণবাদ বিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার একটা জগদ্বিখ্যাত তত্ত্ব আছে—রেইনবো থিওরি। দক্ষিণ আফ্রিকার সব জাতি-বর্ণ-গোত্রের মানুষ মিলে তৈরি হবে রংধনুর মতো এক অনন্য জাতি। দীর্ঘ কারাভোগের পর মুক্ত হয়ে প্রথম ভাষণে এমনটাই বলেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ এই নেতা। সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টি জগতের দিকে তাকিয়ে সেই কথাই বারবার মনে হয়। কী নেই তাতে? আছে প্রেমের তিয়াস, খাঁখাঁ বাসনাবাষ্প, আছে বেদনার বারুদ যা জ্বলে ওঠে নিশুতিপক্ষির মতো, তমিস্রায় ফসফরাসের মতো। যেন এক সদাসম্ভাবনাময় বর্ণচ্ছটা। সৈয়দ শামসুল হক। সব্যসাচী লেখক। কবিতার বাবা তিনি, গল্পের খুড়ো, নাটকে ছন্দগীতলা ঠুসে দেয়া শৈল্যচিকিৎসক, উপন্যাসের উত্তরপুরুষ আর গদ্যের গাড়োয়ান। এসবই পুরনো কথা। আমি বলি সৈয়দ হক খুনি। প্রতিনিয়ত খুন করেছেন গতদিনের সৈয়দ হককে, তৈরি করেছেন নতুন সৈয়দ। গঠিত হয়েছে নতুন রাজ্যপাট, তাতে পূর্বধামের রেশ আছে, আছে আগামীর বীজ। পঞ্চাশের দশকের কবি সৈয়দ হক যখন পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক ডায়ালেক্টের সাথে প্রমিত বাংলার এক অন্য সংমিশ্রণে পরানের গহীন ভিতর লিখেছিলেন, তখন কজন কল্পনা করেছিলেন লোকস্বরে এমন আধুনিক মানস আঁকা সম্ভব? যখন তিনি বলেছেন—
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দেয় ক্যান? ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়, ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়? অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান। আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি। বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে। এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে। এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি। মানুষ এমনভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়? পূর্ণিমার চাঁন হয়, অমাবস্যা কিভাবে আবার, সাধের পিনিস ক্যান রংচটা রদ্দুরে শুকায়, সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার। মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মহর।’
ভাবি, যখন প্রমিত বাংলাকে পাশ কাটিয়ে যখন সৈয়দ হক এইসব পরানের গহীন ভেতর থেকে তুলেছেন তখন ক’জনার মগজে এই রসনাজ্ঞান ছিল?
জীবনানন্দের ভাষায় যা কারুবাসনা তা অনেকের থাকে, সে কারণেই হয়তো কেউ পিকাসো হয়, কেউ পাবলো নেরুদা, কেউ কেবলি প্রপাগান্ডা; পথের নুড়ি। সৈয়দ হক হতে চেয়েছেন সর্বপ্লাবী ঊজ্জ্বল বর্ণালি। হয়েছেনও। বাংলা ও বাঙালি তাকে সেই দরজাও দিয়েছে। কিন্তু তাকে পুরোপুরি আবিষ্কার করতে পারে নি। সদ্যপ্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ কোনো এক জায়গায় বলেছিলেন যে, সৈয়দ হক যতটা বড় মাপের সাহিত্যিক ততটা স্বীকৃতি তিনি পান নি। আমি এর সাথে একমত আবার দ্বিমতও। কারণ তিনি ছাড়া মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এই বঙ্গভূখণ্ডে আর কে পেয়েছেন? একুশে, স্বাধীনতা পদক থেকে শুর হলে হাল আমলের কালি ও কলম, ব্রাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার—কী পান নি!
গেরিলা কবিতার মুদ্রিত রূপ
সহস্রধারা ঝর্না, তাতে বয়ে চলে সুর, কবিতার। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবধারার সাথে শেকড়সন্ধানী প্রয়াস ভিন্ন মাত্রা পায় সৈয়দ হকের কবিত্বের গুণে। এ কারণেই তিনি বলতে পারেন, ‘একজন কবির গদ্য দেখলে বোঝা যায়, তার কবিতা কতটুকু সক্ষম। আমি বিশ্বাস করি একজন বড় কবি যতটুকুই লিখেন, ততটুকুতেই তার গদ্যের চমকপ্রদতা টের পাওয়া যায়। তার গদ্য কখনও দুর্বল হতে পারে না।’
এই সবল হাত দিয়েই বেরিয়েছে বাংলা সাহিত্যের দু্ই কালজয়ী সৃষ্টি 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' ও 'নুরুলদীনের সারা জীবন '। এ ব্যাপারে তাঁর স্বকৃত স্মৃতিচারণ স্মরণ করা যেতে পারে। সৈয়দ বলছেন, ‘আমাদের মাটির নাট্যবুদ্ধিতে কাব্য এবং সংগীতই হচ্ছে নাটকের স্বাভাবিক আশ্রয়; আরো লক্ষ করি, আমাদের শ্রমজীবী মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে এক ধরনের কবিতাশ্রয়ী উপমা, চিত্রকল্প, রূপকল্প উচ্চারণ করা—আমাদের রাজনৈতিক স্লোগানগুলো তো সম্পূর্ণভাবে ছন্দ ও মিলনির্ভর; লক্ষ করি, আমাদের সাধারণ প্রতিভা এই যে আমরা একটি ভাব প্রকাশের জন্য একই সঙ্গে একাধিক উপমা বা রূপকল্প ব্যবহার না করে তৃপ্ত হই না। ময়মনসিংহ গীতিকা, যা বহু দিন থেকেই আমি নাটকের পাণ্ডুলিপি বলে শনাক্ত করে এসেছি, আমাকে অনুপ্রাণিত করে; একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পঠিত ধ্রুপদী গ্রিক নাটক আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে; শেক্সপিয়ার, যাঁর নাটকের কথা বাবা অক্লান্তভাবে বলে যেতেন একদা, যা আমাকে এক তীব্র আলোকসম্পাতের ভেতর দাঁড় করিয়ে রাখে; এ অবস্থায় আমি, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, বিদেশ থেকে ছুটিতে দেশে ফিরে, ঢাকার প্রবল নাট্যতরঙ্গে ভেসে যাই এবং ফিরে গিয়ে রচনা করি—পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়—এক সংকীর্ণ ঘরে, টেবিলের অভাবে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে হাঁটুর ওপর খাতা রেখে।’
শুধু কবিতা বা কাব্যাশ্রয়ী নাটকই বলি কেন? সৈয়দনামা অধিভুক্ত পিওর গল্প-গদ্যে নিরীক্ষার বহরও বিশাল। তাঁর খেলারাম খেলে যা কিংবা নিষিদ্ধ লোবান বহুল পঠিত, জনপ্রিয়, বিতর্কিত। আমি বলি, যেখানে তর্ক, সেখানেই মগজের কসরত; সুস্বাগতম। হেনরি মিলারের ট্রপিক অব ক্যান্সার কিংবা ফিলিপ রথের পোর্টনয়েস কমপ্লেইন্ট বা দ্য প্রফেসর অব ডিজায়ার-এর কথা ধরুন। অপরিণত পাঠক এগুলোকে যৌন অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে নেয়। খেলারাম খেলে যা-র ভাগ্যেও তাই ঘটেছে। অথচ এই উপন্যাসই ন্যায়-নীতির সনাতন সংজ্ঞার বাইরে পাঠককে অস্বস্তি মধ্যে ফেলে জীবনের অন্য এক সূত্রমুখ আবিষ্কারের আনন্দ দেয়। হয়তো এ কারণেই আরেক শক্তিমান গদ্যশিল্পী হাসান আজিজুল হক একে ‘রাগী’ উপন্যাস বলেছেন। অবশ্য সৈয়দ হকের অনেক লেখা শেষ পর্যন্ত একটি গীতলতার দিকে যাত্রা করে, যাত্রা করে নৈঃশব্দ্যের দিকে। লালন যেমনটি বলে, একদিন নৈঃশব্দ্য খাবে শব্দরে, এই নৈঃশব্দ্য এক অদ্ভুত স্থিতিবস্থা। আর এর বিপরীত ছবি পাওয়া যায় তার রাজনীতি-সচেতন কবিতাগুলোতে, যেগুলো প্রায় বাংলার আধুনিক স্বাধিকার আন্দোলনের সমান বয়সী। অগ্রজ রফিউল্লাহ খান বলেছেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রশ্নে অনেকের মতো তিনিও উদার মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক চেতনাকেই গ্রহণ করেছিলেন। জীবনায়নের সূত্রেই গড়ে ওঠে একজন শিল্পীর মানসলোক। দেশ বিভাগ-পরবর্তী উপনিবেশিত মধ্যবিত্তের ক্রমায়ত জীবনসংকটের বিচিত্র স্তর তার ছোটগল্পের জগৎ। প্রথম প্রকাশিত তাস (১৯৫৪) গল্পগ্রন্থেই তার বস্তু-অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য সুস্পষ্ট। ব্যক্তি, পরিবার ও সমষ্টি-অভিজ্ঞতার এই স্তরক্রমকে অনিবার্য প্রকরণে তিনি উপস্থাপন করেছেন। পঞ্চাশের দশকে রচিত কবিতা ও উপন্যাসে তিনি তার বাসনাসম্ভব জগৎ সৃষ্টি করেছেন, যা সময়স্বভাব থেকে অগ্রগামী।’
মুক্তিসংগ্রামের দলিলদস্তাবেজ হয়ে যাওয়া সৈয়দ হকের কবিতা-অস্ত্র গর্জে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। তিনি বলছেন—
যে খুন করেছে ছেলে, তোমার ছেলেকে মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে অতর্কিতে মাঝরাতে ছাত্রাবাসে দরোজায় লাথি মেরে পাঠরত ছেলেটিকে পিস্তলের লক্ষ্য করে গোলাপ এখনো ফোটে, জল বয় এখনো নদীতে তুমি ঊরুতে চাপড় দিয়ে বেপাড়ায় বাংলাদেশ কার সুখে নেচে যাচ্ছ কোন উল্লাসে?
টাফ, ড্যামকেয়ার, নাক-উঁচু, উদ্ধত। তিনি নিজেই এক ঝনঝটা। তসলিমা নাসরীন তার দিকে তির ছোড়ে, অনুজরা বলে উনি নিজের ছাড়া কারও লেখা পড়েন না, সাক্ষাৎকার নিতে যাওয়া সাহিত্য সম্পাদক বলেন, হঠাৎ ক্ষিপ্ত হন সৈয়দ। অবলীলায় বলে দেন, আগে আমার লেখা পড়ে আসেন, তারপর কথা বলব। শেষ জীবনে তিনি আওয়ামী সরকারের কালচারাল উইং-জাত সহস্র নাগরিক কমিটি করে নিজের নিরপেক্ষতা নষ্ট করেছেন... এমন অনেকে কথাই বলেছে নিন্দুকেরা। কিন্তু যখন ফুসফুসে ক্যান্সার নিয়ে লন্ডনে গেলেন হক সাহেব তখন সবাই উদ্বিগ্ন হয়েছে। আবার যখন জানা গেল তার সময় ঘনিয়ে এসেছে, বড়জোর মাস ৬, তখন তিনি ফিরে আসতে চাইলেন বাংলাদেশে। আবারও আবেগে ভিজে উঠল সাহিত্য-অঙ্গন। এই ফিরে আসার ইচ্ছেই প্রমাণ করে উপরে উপরে এলিটিজমের খোলস থাকলেও তার মন ছিল শেকড়মুখী। হয়তো এইসব কথারও কাউন্টার কথা উঠবে। কিন্তু একজন ব্যাক্তি সৈয়দ হক নয়, আমার কাছে মুখ্য লেখক হক। যিনি যাতে হাত দিয়েছেন তাতেই সোনা ফলিয়েছেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রে স্বর্ণালি যুগে এফডিসির সাথে তার সম্পৃক্ততা, কি কাহিনি নির্মাণ, কি চিত্রনাট্য, কি গান রচনা—সবখানেই সৈয়দ হক উজ্জ্বল। উনার 'হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস' গানটির কথা মনে পড়ছে আজ তার এই প্রয়াণক্ষণে। দম ফুরানোর সাথেই হয়তো শেষ হবে না হকের কীর্তি। যত গভীরেই থাক, একদিন ঠিকই আবিষ্কৃত হয় খনি আকরিক, তেমনি সৈয়দ হকের নিরীক্ষা-প্রবণতা, চাপা রহস্য একদিন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া হবে, পুনরাবিষ্কৃত হবে—এমন প্রত্যাশাই করি। ততদিন পর্যন্ত, নাকউঁচু হক সাহেব আপনি সৌরমণ্ডলসহ গ্যালাক্সি-মিল্কওয়ে চষে বেড়ান। কারণ, আপনার তো কোথাও দাঁড়াবার কথা ছিল না—
আমি একটুখানি দাঁড়াব এবং দাঁড়িয়ে চলে যাব; শুধু একটু থেমেই আমি আবার এগিয়ে যাব; না, আমি থেকে যেতে আসি নি; এ আমার গন্তব্য নয়; আমি এই একটুখানি দাঁড়িয়েই এখান থেকে চলে যাব। আমি চলে যাব তোমাদের এই শহরের ভেতর দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি এর মার্চপাস্টের যে সমীকরণ এবং এর হেলিকপ্টারের যে সংক্রমণ, তার তল দিয়ে তড়িঘড়ি; আমি চলে যাব তোমাদের কমার্সিয়াল ব্লকগুলোর জানালা থেকে অনবরত যে বমন সেই টিকার-টেপের নিচ দিয়ে এক্ষুনি; আমি চলে যাব তোমাদের কম্পিউটারগুলোর ভেতরে যে বায়ো-ডাটার সংরক্ষণ তার পলকহীন চোখ এড়িয়ে...