তোমরা কি জানতে চাও, শয়তান কত বিদ্রোহী? ঈশ্বর কতটা বিক্ষুদ্ধ? বসন্ত কতটা বর্ণহীন? বর্ষা কতটা একাকী? শব্দ কতটা শব্দহীন? পড়ো
এক.
কবিতা নাকি যুক্তাক্ষরের ডিকশনারি! জনৈক পাঠকের এমন মন্তব্যে তেমাথা থেকে কাঁচুমাচু সটকে পড়ি। ভাবি—সন্ধ্যার কত কত মানে? স্তন কখনো হয়ে উঠছে সুগোল, কখনো ধরিত্রী, চাঁদ, কখনো মা(ই) —এমন শব্দবিভ্রমের ভেতর ঢুকে খবরের কাগজ পড়তে নেই—পাঠক যদিও ওখানে পানিকে পানি, জলকে জল, চোরকে চোরই বলা হয় কিন্তু রাজনীতির খবরগুলো সরলভাবে পড়তে গেলেই ঘটে বিপত্তি রাজনীতি একটা ময়নাতদন্তের ছাপরা ঘর। কত কত পার্ভার্টেড ডোম অতৃপ্ত লিঙ্গ আর চোলাই ফুলের বেসামাল গন্ধে লুকিয়ে থাকে ওখানে অবলীলায় তারা চুমু খায়, বিড়ি ফোঁকে, এমনকি (কথিত) সেক্স করে মৃত কোয়েলের শোকে আত্মহননকারী কিশোরীর সাথে। লক্ষ করুন : ৭-এর দুই কলামের শিরোনাম— ‘এবার কলার বাম্পার ফলন হয়েছে’
—সবার জন্য কবিতা নয়, খবরের কাগজ
কবিতার কাছে কী চাই? কবিতা আমাকে খাওয়াবে, পেটের ক্ষুধা পাথরের মতো শাণিত করবে, অনুপ্রেরণা দেবে মজুদ মকামের তালা ভাঙতে, নাকি বন্দনা করবে—দারিদ্র্য, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান বলে? এসবই হয়তো ঠিক, আবার কোনোটাই হয়তো নয়। অনেক আগেই বলেছি, কবিতা দুধারি তলোয়ারের মতো, নাজিল হতেও কাটে, লিপিবদ্ধ হবার পরেও কাটে। কখনো আক্ষেপ, কখনো নতুন ক্ষুধা, কখনো ঈর্ষাজারুল, বন্ধুজনের বক্রচাহনি, অস্বীকার, সাহিত্য-রাজনীতি, ঘোড়ার ডিম। কদাচিৎ উজ্জ্বল পাপের তালিকা করি, নিজেকে বাধ্য করি বোধের টালি-রাস্তায় সেই তালিকা হাতে নিঃসঙ্গ হর্ষধ্বনিকে অনিঃশেষ অ্যাভিনিউ অবধি হেঁটে যেতে, আমার পাপের তালিকা ধরে নিজেকে বাধ্য করি সদাই কিনতে। তোমরা কি জানতে চাও, শয়তান কত বিদ্রোহী? ঈশ্বর কতটা বিক্ষুদ্ধ? বসন্ত কতটা বর্ণহীন? বর্ষা কতটা একাকী? শব্দ কতটা শব্দহীন? পড়ো।
দুই.
ধর্মপ্রচার করতে আসি নি। শুধু বলা। কখনো মলিন পোশাক, কখনো অগ্নিবর্ম। তপ্ত দুপুরে যে পুরুষ গনগনে কাম নিয়ে ঘরে ফিরে শীতলতা ঢেলে দিতে চায়, আর তখন সঙ্গিনী বলে— আমি আগুন ভালোবাসি, কয়লা নয়, তবে কি সেই নারী প্রতারক, তিন স্তনের ডাইনি? যেখানে মানবিকতার অবশিষ্ট নেই, স্রেফ ন্যায়-অন্যায়, জাজমেন্ট? চূড়ান্ত বলে কি কিছু থাকে? শেষ বলে? মনে হয়— সবকিছুর শেষে কিছু একটা অবশিষ্ট থাকে। এই রেশ/লেশ-ই কবিতা। কোনো ধর্ম নয়, ভালোত্ব-মন্দত্বের মানদণ্ড নয়, স্রেফ অস্তিত্ব। যেখানে শব্দের লক্ষ্যার্থ আর বাচ্যার্থের বাইরে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না সেখানে আর যাই থাকুক কবিতা থাকে না। শব্দরা যখন শব্দের পরিচিত অর্থ ও লেবাস খুলে অন্য বিভায় উদ্ভাসিত তখনই হয়ে ওঠে কবিতা। তাই তো সাড়ে ৩ হাজার মাইল দূর থেকে মোনার্ক প্রজাপতিরা যখন ঊষ্ণ মেঘমালা বয়ে আনে, আমি হিমার্দ্র প্রেমিক। প্রেমিকাকে নিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ি জীবন্ত রামধনু মাঠে। তীব্র ক্ষুধায় আমি কামড়ে দিই প্রেমিকার মাই। ব্রাকেটে লিখে রাখি একলা দন্ত্য ন। যাতে মাই কখনো মাই+ন = মাইন-এর মতো তুমুল বিস্ফোরক হতে পারে। বস্তুতপক্ষে একটা প্রকৃত সঙ্গম সাবাড় করে পূর্বজন্ম, অভিজ্ঞতা, রাজপোশাকের মতো একটি মুহূর্তের আমিত্বকে খেয়ে, শূককীট যেভাবে খোলস খেয়ে প্রজাপতিতে রূপ নেয়, তেমনি জন্ম লাভ করে সব অর্থ। তখন তার জন্য অপেক্ষা করে আরও বড় এক চ্যালেঞ্জ। এদের নতুন করে পাড়ি দিতে হয় সাড়ে ৩ হাজার মাইল পথ, পাঠকের মন-মর্জি-বোধ-অভিজ্ঞতা-তাৎক্ষণিক স্থিতি। প্রাকৃত গানের মতো একটি তুরীয় স্তরে পৌঁছানো তাই সব কবিতার হয় না। কোনোটার কাছে শুধু সঙ্গমস্মৃতিই থাকে, কোনোটা রূপান্তরিত হয় বিচ্ছুরণে, বোধে। তখনই সাপের মাথায় মণি গজায়, জ্বলজ্বল করে।
এর মাহাত্ম্য আমার কাছে— ‘নারী তৃপ্তিতে হাঁপায়, হাঁ করে, ওর দাঁত জ্বলজ্বল করে অক্ষরের মতো’—এই বাক্যের জন্য
তিন.
অ্যানি সেক্সটন (১৯২৮-১৯৭৪)
খুবই দৈহিক প্রতীকী এক কবিতা। যদিও পুরো বিষয়টি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ থাকে। এর মাহাত্ম্য আমার কাছে— ‘নারী তৃপ্তিতে হাঁপায়, হাঁ করে, ওর দাঁত জ্বলজ্বল করে অক্ষরের মতো’—এই বাক্যের জন্য। এটাই শেষ পর্যন্ত থাকে শব্দের অর্থের বাইরে অন্য এক ইশারা হয়ে। কবিতা তাই সেই শব্দোত্তর শব্দ যা শ্রবণসীমার বাইরে অবস্থান করে, অবশ্যম্ভাবীভাবে সেখানেই জীবনের অবস্থান, যা কাব্যমানসের পরম আরাধ্য। অক্টাভিও পাজ বলছেন, কবিতা হলো তাই যা চোখ দিয়ে শুনতে হয়, আর এর মর্মার্থ শুনতে হলে দেখতে হয় কান দিয়ে।
চার.
টেবিল-ল্যাম্পের পাশে চির অক্ষয় ফটোফ্রেমকেই মানায়। অথবা টেবিলঘড়ি। ঘড়ির তিনটে কাঁটা বস্তুতপক্ষে তিন চরিত্রের। সাহেব বিবি আর দুরন্ত ফিঙের ঘাড় মটকানো তদ্রূপ দুরন্ত হুলোবিড়াল। ধরো একটা পয়েন্ট টু ফাইভ চশমা—ওটা মনে করিয়ে দেয়, প্রিজম নয়, প্রসঙ্গবদলে আলো নিজেই সার্বভৌম। প্রিয় কমলা, বিকেল এক অবিকল দেবযান—কিশোরী-গ্লাডিওলাস সাহচর্যে। বিছানা এক নিবিড় অরণ্য—ঘন সঙ্গমসাগরে। ঘড়ি এক অম্বুদ মনসুড়ঙ্গ—মনোবাঞ্ছা নক্ষত্রসমীপে। অদ্য টেবিলের মন খারাপে আলোকিত টেবিলল্যাম্প...
এই যে বিমূর্ততা-পানে যাত্রা, কবিতায় শুধু এরই জয়গান নয়, মূর্ততার পক্ষেও নানা যুক্তি দেয়া চলে। মাহমুদ দারবিশের কবিতা শুনে ফিলিস্তিনের ৩/৪টা প্রজন্ম দখলদারবিরোধী লড়াই চালিয়ে গেল—সে কোন শক্তিতে? রবীন্দ্র-নজরুলের কিছু দ্রোহী কবিতা, শামসুর রাহমানের বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনা ও ইতিহাসস্মারক কবিতাগুলো কেন আমাদের উদ্দীপ্ত করে, করেছিল? কারণ ওগুলো বোধে নাড়া দিয়েছিল, নাড়া দেয়। কবিতা যদি শেষ পর্যন্ত জীবনের কথা বলে, পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানো সেখানে মুখ্য নয়, অন্তত আমি সেটাই মনে করি। এটা একটা দেখা, হঠাৎ বিজলি ঝলকে যতটুকু চরাচর দৃষ্টিগোচর হয়, এর বাইরে কবিতার কোনো অস্তিত্ব নেই। আছে কবিতা কবিতা ভাব। কবির ভাব, ব্যক্তিত্বের ভাব, মিডিয়ার ভেঁপু, সময় ও ঘটনার ঝনঝনানি। প্রতিধ্বনিকে বলি— যাও ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে আবারও ফিরে আসো, তারপর নাচাও ধূসরতম প্রচ্ছায়া। তখন যদি ছন্দোবদ্ধ নান্দনিকতা পেখম দেখায়, নাচাতে পারে মেঘ, ঝরে পড়ে বৃষ্টি—তবে শব্দরা সার্থক।
কবিতা পুরোটাই যাপন। এই যাপনই সাধুসঙ্গের মতো একদিন লালনের, জীবনানন্দের, মোহম্মদের জন্ম দেয়। কবিতার জন্ম হয়। একদিন তা রূপ নেয় আয়াতে
পাঁচ.
এই শহর প্রিয় অ্যালঝাইমা যখন অসংখ্য আমসুপারি গড়িয়ে নেমে যায় পাতালে, ধেয়ে আসে মহাসড়ক। লোকাল বাস একটি প্যারাডাইম, অফিসপাড়া মাথায় তোলে। ইহাই ঘর্ষণবিদ্যা। পবিত্র। ছাল উপড়ে ফেলা সন্ধ্যায় সমকাম বিদ্যালয়—দৃষ্টিমন্থন। অ্যানেশথেশিয়া শুধু। শরীর নয় ঘামেরা ঝর্নাপ্রবণ বিকল শহরে। তাই ফড়িঙের ছায়ায় কেঁপে ওঠা জলতরঙ্গটুকুই কাম্য।—এমন কথাই হয়তো বলতেন চীনা জেন কিংবা তাও সাধকরা—সটোরি লাভের মন্ত্রের আড়ালে। বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, কবিমানসের সাথে তার বহির্বিশ্বের সংযোগ স্থাপিত হলেই কবিতার জন্ম হয়।
একবার র্যাঁবোকে এক কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ চিঠি লিখে জানতে চেয়েছিল কবিতা লিখার টিপস। র্যাঁবো সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, কী করে লিখতে হয় তা বলার অধিকার তার নেই। তবে পরক্ষণে তিনি কিছু সূত্র বা নুসকা দিচ্ছেন, যেমন বলছেন, প্রেমের কবিতা লিখো না। নির্লিপ্ত কবি ভাস্কর চক্রবর্তী শেষ জীবনে কবিতার ইশতেহার কিসিমের একটি বিশাল প্রবন্ধ লিখে ফেলেন, যেখানে তিনি বলছেন সমস্ত গয়না খুলে ফেলতে হবে। এটা তার উপলব্ধিজাত ছবক হলেও হতে পারে, তবে এমন চাঁছাছোলা চাবুকের মতো পঙ্ক্তি লেখার ঘোষণা উত্তর-ঔপনিবেশিক অনেক লেখকের অন্যতম এজেন্ডা ছিল। এমন ঘরানা বা বাজারচলতি নতুনত্ব সবই শব্দকে, শব্দের ভেতরের চিন্তাকে পাঠকমানসে সঞ্চালিত নয়তো আত্মঅহমের সৌধ নির্মাণের প্রচেষ্টা। এমন একটি সৌধ নির্মাণের উপকরণ কী হবে? কী উদ্দেশ্যে এর নির্মাণ? ভবিষ্যতে কী পারপাসে এটি ব্যবহৃত হবে? নাকি জীর্ণ হয়ে খোরাক হবে জংলি লতাপাতার—তা বলা যায় না। তাই পথ তৈরি করতে হয় নিজের পায়ে, মাড়াতে হয় সেইসব এঁদো প্রান্তর, পূঁতিময় সৌন্দর্য, রূপকঙ্কাল। এর মধ্যে কোনো পূর্বসূরির পদচ্ছাপ কখনো ফুটে উঠতে পারে, কখনো ফিনিক্স পাখির কল্পিত পালক কলম হতে পারে আমার, কিন্তু লিখতে চাই নিজের চিন্তাকম্প। এই অস্বীকার ও অহম এক সততাপূর্ণ মগ্ন যাত্রার, যেখানে আমার ইতিহাস আর পূর্বপুরুষেরা সমান্তরাল যাত্রী মাত্র, আমার প্রভু-উদ্ধারক-ত্রাতা নয়। আমার কাছে মায়া-ই মুখ্য। এই মুহূর্তে আমি বিযুক্ত করি সকল ভক্তিরস, দ্বিধাখণ্ডিত তিরপাল, এনিসাপের বিয়েতে হালকা-পাতলা বাংলা গেলা ছাড়া কোনো দায় নেই কবির, মাথায় ঠাসা থাক কোয়েলকান্না, ভাবনার যৌনকেশ, কীটদংশিত ধর্মগ্রন্থের ছেঁড়াপাতা, শয়তানের চকচকে পবিত্র হাসি। একটা বিষণ্ন কাঠবাদামে যতটুকু আলো ছলকায়, এর বেশি কবির কোনো পরিচয় নেই। নগরের প্রথম শ্রেণির মন নিয়ে ৫ম গ্রেডের সুবিধাভোগী নাগরের মতো হন্যে হয়ে ছুটি। জানালার কাচ ভেঙে কখনো হানা দেয় আত্মঘাতী অ্যানি সেক্সটন। উনি বলছেন— একটা আইডিয়ার কোড নিয়ে ব্যস্ত আছি। লিখছি ডান থেকে বামে ছুটে যাওয়া সঙ্কেত। অথবা বাম থেকে ডান। একটা শব্দ বেছে নেয়া গিঁটের ভেতরে গিঁট লেখার মতো যতক্ষণ না বেজে ওঠে গোপন অনুরণন, তখন হঠাৎ করেই কারিহানী থেকে নীহারিকা লেখা সম্ভব। তখন যদি সেই তারা আলো জ্বালাতে সক্ষম হয় তবে ভাবব, আমি সত্যিই মিরাকল লিখেছি। কবিতায় অবশ্য ঐশী বাণীর পক্ষপাতী নই আমি। কিছু কবিতা থাকে কখনো স্লোগানে, কখনো স্রষ্টার রাগী স্বরে, তুমুল ক্ষোভের কিংবদন্তে, নয়তো ভিক্টোরিয়া কিংবা আঠার শতকের ব্রজবুলি সাহিত্যের নৃ- ও ভাষা-তাত্ত্বিক ডিসকোর্সে। কবিতা পুরোটাই যাপন। এই যাপনই সাধুসঙ্গের মতো একদিন লালনের, জীবনানন্দের, মোহম্মদের জন্ম দেয়। কবিতার জন্ম হয়। একদিন তা রূপ নেয় আয়াতে।