মার্গারেট এটউড একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সাহিত্য-সমালোচক। কানাডার সবচেয়ে খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তিনি। বিশ্বের জীবিত মহিলা লেখকদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী এই লেখকের জন্ম ১৯৩৯ সালে, কানাডার অটোয়ায়। শৈশব কেটেছে ঝোপঝাড়-ঘেরা উত্তর কুইবেকে। পড়াশোনা করেছেন টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে মাস্টার্স করেছেন ম্যাসাচুসেটসের রেডক্লিফ কলেজ থেকে। প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করলেও ১৯৭২ সালে লেখালেখিকেই বেছে নেন পেশা হিসেবে।
এটউডের লেখালেখির শুরুটা কবিতা দিয়ে। ১৯৬৪ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ দ্য সারকেল গেম বের হওয়ার পর কানাডার গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করেন তিনি। তবে ঔপন্যাসিক হিসেবেই তার জনপ্রয়িতা আকাশচুম্বী। তার লেখায় শহুরে জীবনযন্ত্রণা, নারী-অধস্তনতা ও সেক্সুয়াল পলেটিক্স, প্রভৃতি বিষয় উঠে আসে। ইতোমধ্যে এটউডের লেখা বিশ্বের ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে সিনেমা, মঞ্চস্থ হয়েছে একাধিক নাটক। ইন্টারলুনার (১৯৮৮), মর্নিং ইন দ্য বার্ন হাউস (১৯৯৫), ইটিং ফায়ার—সিলেকটেড পয়েমস (১৯৯৮) তার কবিতাগ্রন্থ। অন্য দিকে প্রথম উপন্যাস এডিবেল উইমেন (১৯৬৯)-এ স্পর্শকাতর তীব্র বোধসম্পন্ন নারী চরিত্র তৈরিতে মুনসিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি। এই উপন্যাসটির প্রধান নারী চরিত্রটি কিছুই খেতে পারে না। কারণ তার সব সময় মনে হয়, কেউ যেন তাকেই খেয়ে রেখে গেছে। এরপর একে একে বেরোয় লেডি ওরাকেল (১৯৭৭), লাইফ বিফোর মেন (১৯৮০), হ্যান্ডমেইড টেল (১৯৮৬)। তার আলোচিত উপন্যাস বডিলি হার্ম (১৯৮২)—যেখানে একজন মহিলা রিপোর্টার ক্যারিবিয়ান দ্বীপে রোগমুক্তি লাভ করে। এলিয়াস গ্রেস (১৯৯৬)—এই বইয়ে এক বিড়ম্বিত নারীর কাহিনি তুলে ধরেছেন এটউড, যার মাথায় ঝুলছে দুই-দুইটি হত্যা মামলা। কিন্তু হত্যার ঘটনা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুই তার মনে নেই। বিভিন্ন স্তরিত পারিবারিক কাহিনির ওপর গড়ে-ওঠা উপন্যাস দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিয়েন-এর জন্য ২০০০ সালে তিনি বুকার পুরস্কার লাভ করেন। হার্ট গোজ লাস্ট উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন কিৎসেস ব্রিটিশ সাহিত্য পুরস্কার 'রেড টেন্টাকল'। পেয়েছেন আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কার, প্রিন্স অফ অস্ট্রিয়াস অ্যাওয়ার্ড, গভর্নর জেনারেল অ্যাওয়ার্ড সহ নানা সম্মাননা। বর্ণাঢ্য লেখক জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ অভিষিক্ত হয়েছেন কানাডার ওয়াক অফ ফেমে। সম্প্রতি বিশ্বের দেড়শোর বেশি নামকরা লেখক বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে খোলাচিঠি দেয়। এদের মধ্যে মার্গারেট এটউডও ছিলেন।
মার্গারেট এটউডের কবিতাগুলো ভাষান্তর করেছেন কবি মাজুল হাসান...
বন্দোবস্ত
কী নেব আমরা
নিজেদের সাথে? কী পরব
অথবা বছরের ঠিক কোন সময়টায়
বেরিয়ে পড়া উচিত; মনস্থির
করতে পারি নি কখনই
আর সে কারণেই—
এই যে আমরা
ফিনফিনে রেইনকোট আর পায়ে রাবারের বুট
দাঁড়িয়ে আছি বীভৎস বরফে
, বাতাসের তীব্রতায়।
কিছুই নেই পকেটে আমাদের
একটা চিরকুট পেন্সিল, দুটো নারঙ্গী
টরোন্টো স্ট্রিটকারের চারখানা টিকেট ছাড়া
আর আছে একটি ইলাস্টিকের ব্যান্ড
প্রয়োজনীয় তথ্য সমাবেশে ওতে বাঁধা আছে
এক বান্ডিল ছোট্ট শাদা কার্ড।
বসত
বিয়ে আর কিছু নয়
বাস্তুভিটে অথবা একটা তাঁবু
ওটা আরো আগের পথ এবং যেখানে শীতল:
ঘন অরণ্য প্রান্ত, ধুধু বালিয়াড়ি
যেন মরুপ্রান্তর কোনো
যেখানে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে আছি আমরা
,
খাচ্ছি পপকর্ন।
আর পেছন-পেছন চলে যাচ্ছে অভূতদৃশ্য সিঁড়ির ফোয়ারা।
যেখানে চিনচিন ব্যথা মিশ্রিত বিস্ময়!
এ নিয়েও বেঁচে থাকা যায়!
এই এত এত দূরে
আমরা শিখছি আগুন ধরাবার বিদ্যা।
রাত্রিকালীন কবিতা
ভয়ের কারণ নেই
ওটা কেবলি দামাল বাতাস
পশ্চিমে ঘুরিয়ে নিচ্ছে মোড়
বজ্র তোমার বাবা
আর বৃষ্টি তোমার মা
এই বৃষ্টির দেশে
জলের ছাঁটে চাঁদ হয়ে যায় ফিকে মাশরুম
জলমগ্ন কাটা-গুঁড়ি
, নোনাধরা চারপাশ
গাছের চারদিকে
সাঁতার কাটে লম্বা পাখিরা
তোমার ছায়াও আপন নয়
কেবলি প্রতিচ্ছবি
দরজাগুলো মশারি—ওগুলো বন্ধ হলে
তোমার আসল বাবা-মা চলে যান
আমরা তোমার অনাত্মীয়
এক জোড়া নিকষ-কালো হাতসমেত
উঠে এসেছি লেকের গভীর থেকে। কান্না আর
দূরের ফিসফিসানি কথার লাল উলে
তোমাকে মোড়াবো বলে
চুপিচুপি শিওরে এসে দাঁড়িয়েছি
বৃষ্টির বাহুডোরে কেঁপে ওঠো তুমি
তোমার ঘুমের শীতল সিন্দুকটাও কাঁপে
আমরা—তোমার রাতের—
বাবা-মা
যখন ঠান্ডা হাত আর মৃত আলোছটা নিয়ে
অপেক্ষা করি
, তখনো জানি
,
আমরা কেবল মোমের ছুড়ে দেয়া
কম্পিত ছায়া। বিশ বছর পরে
এই কম্পনের প্রতিধ্বনি শুনতে পাবে তুমি।
ছায়াকণ্ঠ
বলল নিজেরই ছায়া
ব্যাপারখানা কী?
পোড়া চাঁদের উষ্ণতা কি
যথেষ্ট নয় তোমার
তবে খুঁজছ কেন
অন্য দেহের শীত-কম্বলটি
কার চুম্বন শৈবালের মতো
বনভোজনের সারি সারি টেবিলে
ঊজ্জ্বল গোলাপি হাতে-ধরা স্যান্ডউইচ
ভেঙে পড়ে দূরত্বের করণে। মাছিরা
হামাগুড়ি দেয় মণ্ডামিঠাইয়ে।
জানো কি এসব কম্বলের আড়ালে কী লুকানো আছে
বাচ্চা-কাচ্চাদের বন্দুকের গুলিতে
গাছেদের বাকল যাচ্ছে ঝুলে। থাক না
ওরা। খেলা করছে বেশ তো
আপনা মতো করে
আমি জল ঢালি
, করি কবচি-কীট পরিষ্কার।
আর তোমার ধমণীতে কি
কোনো শব্দ নেই
, যারা তোমায়
টেনে নেবে নিরবধি।
আমাতে মিলে যাও তুমি
চোখের মধ্যে ঢুকে পড়া আংটার মতো
আমার ভেতরে খাপে খাপে মিলে যাও তুমি
একটা মাছ ধরা কল
একটা নিমীলিত চোখে
বানান শিক্ষা
মেঝেতে আমার মেয়ে খেলা করে
প্লাস্টিকের অক্ষর দিয়ে
,
লাল
, নীল
, কড়া হলদে
,
শেখে
, কিভাবে বানান করতে হয়
বানান
বর্ণ সাজাতে হয় কিভাবে
***
জানতে ইচ্ছে করে
, কত মহিলা
তাদের নিজেদের মেয়েকে অস্বীকার করে
নিজেদের আটকে রাখে কপাটবন্ধ ঘরে
এরপর টানিয়ে দেয় মশারি
যাতে তারা অক্ষর সাজিয়ে শব্দের সড়ক বানাতে পারে।
***
শিশু কবিতা নয়
কবিতা শিশু নয়
কারো কোনো বিকল্প নেই
তা যাই হোক
***
ঐ যুদ্ধবন্দি মহিলার গল্পে
আবারো ফিরে আসি
সন্তান প্রসবের মুহূর্তে শত্রুরা তার রান দুটো
চেপে ধরেছিল
যাতে সে প্রসব করতে না পারে
প্রমাতামহী: ঐ জ্বলন্ত ডাইনির মুখ
চামড়ার লাগামে বাধা ছিল
, যাতে
শব্দরা বাধাগ্রস্ত হয়।
একটা শব্দের পর আরেকটা শব্দ
শব্দ হলো শক্তি।
***
সর্বতোভাবে যেখানে ভাষা বিচ্ছুরিত হয়
উত্তপ্ত হাড় থেকে
, সর্বতোভাবে
যেখানে পাথর ভেঙে খানখান হয় এবং অন্ধকার
গলগল বেরিয়ে আসে রক্তের মতো
,
শিসের গলন-বিন্দুতে
যখন হাড়েরা জানতে পারে
কতটা সারশূন্য তারা
, তখনই শব্দ
ঠিকরে পড়ে
, দ্বিগুণ হয় এবং সত্য
কথা বলে
, আর শরীর
নিজেই হয়ে যায় মুখ।
এটা একটা রূপক।
***
কিভাবে বানান শিখবে তুমি
?
রক্ত
, আকাশ আর গনগনে সূর্য
তোমার নিজের নামটিই প্রথম
তোমার নামের বানান
, তোমার প্রথম নাম
,
ওটাই তোমার প্রথম শব্দ।