কালবাসি'র কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন কবি মাজুল হাসান
ড্রইং
ছবি আঁকছে ছোট্ট খুকি হাত ধরাধরি হাঁটছে বাবার সাথে পরনে তার হ্যালোয়েনের পোশাক একটা ইঁদুর একটা সূর্য একটা সাদা বাড়ি। মাও কিন্তু আঁকছেন ছবি... কারাপ্রাচীরে বন্দি মৃত বাবা, বন্দুকধারী সৈন্য যুদ্ধ আর ক্লাস্টার বোমা।মধুর স্বপ্ন এবং আমার স্বপ্ন—বলল সে
আপন মনেই ভাবি, স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না কখনো পাই নি আমি পাঁচ বছর বয়সের জুতো থামে নি বোমার গর্জন, তখন আমি আট কবর থেকে ফেরেন নি মা—এখন আমি একত্রিশ লেখার মাঝে চাই না তারে, না স্বপ্নে। চাইছি তারে দিনে রাতে বিরামহীন বেদনায়।কিছু না
কোনো কিছুতেই পুরোপুরি নেই আমি, এমনিতেই বাড়ছে নিরর্থকতা এই যে বন্ধ হচ্ছে কপাট খুলে দিচ্ছে আরো আরো রিক্ত প্রান্তর যুদ্ধ ছাড়া কোনো কিছুই নির্ধারিত নেই আজ বোমা, বোমা-ঠিকরানো আলো দিচ্ছে অন্ধ করে; আর তেহরানের পথ ধরে জ্বলছে দামেস্কো। বোনেরা কাঁদছে—হতাশ সময়ের বাহুবন্দি নাকাল হচ্ছে ভাই। কিছুই ঘটে না মরে থাকে শিশু। সাংবাদিকরা ফিতাবন্দি করে নতুন ডেট-লাইন । কিছুর পরে আসে না কিছুই তবু হাঁটু গেড়ে বসি, কাঁদি সেই অনাগত 'কিছু না'র জন্যই। আর দেখো—আজও উড়ুক্কু পাখিরা পুড়ে যায় নি। কিছুই ঘটে না। কেন্দ্রীয় উদ্যান ধরে হাঁটি সেখানে নেই কিছু—তারপরেই নো-ফ্লাইং জোন কেবল গলা গলিয়ে নেমে পড়ে না নিরর্থকতা গুলি চলে, রক্ত ঝরে—তবু এখানে ঘটে না কিছুই তবু লিখি, নিরর্থকতা যাতে আর নিরর্থকতার ভার বাড়াতে না পারে।ডান্সিং টেংগো
ওহ ওরলান্ডো! মনে পড়ে সেই রাতের কথা? বালিয়াড়ির সঙ্গীতের মূর্ছনায় নেচেছিলাম আমরা। চুপিচুপি বলছিলে, আর আমার কানের পকেটে ঝরে পড়ছিল বিস্ময়। ওহ স্পাহান! তোমার নীল তুর্কি-মসজিদগুলো জায়ান্দেরুদ তীরে বালিতে লুকিয়ে থাকা প্রেমিকেরা আজও তাড়া করে নীলাভ আকাশ। সে কথা আজও বিস্ময় ঝরায় আমার কানের পকেটে। সময় অন্তহীন, আমার আত্মসম্মান জড়িয়ে আছে তোমাতে আর তোমার শব্দ এক চরম বিস্ময়, আমার কাছে সেগুলো বহুমূল্য কয়েনের মতো ঝরে পড়ে আমার কান্নার পকেটে।বুদ্ধ বসে আছেন
বুদ্ধ বসে আছেন যখন জীবন মাটি হয়ে যাচ্ছে মাটি হচ্ছে পাথর গাছেরা হয়ে যাচ্ছে লাকড়ি আর শীতের অভিশাপ রূপান্তরিত হচ্ছে দরজার ভাঙা হাতলে। বুদ্ধ বসে আছেন, তোমরা জানো একদম গভীরে, স্বর্ণ দিয়ে তৈরি এই পৃথিবী জানো—ব্রোঞ্জ ও পিপের মধ্য দিয়ে কিভাবে প্রজ্বলিত হয় আগুন। আর হ্যাঁ, ভাবনার সমুদ্র দিয়ে হেঁটে যান যিশু, মোহাম্মদ, নবীগণ, নারীবাদ, জ্বলন্ত বুশের সাথে কথা বলেন মুসা, কিন্তু তোমরা নিজেরাই থেকে যেতে চাও নিরক্ষর স্বপ্ন খাও, রুটিতে ক্রিম লাগাও, ভারী ক্রিস্টাল গ্লাসের বাইরে থেকেই মদ গিলো যেন তোমাদের হাড় লেগে কাঠের মেঝে কেঁপে ওঠে; বিশ্রাম চায়, খোঁজে পৃথিবীর সীমানাপ্রাচীর। তোমাদের হাতের তালু ঢেকে দেয় ছায়া, তোমাদের চোখ ঢেকে দেয় ছায়া, তবু চারা জন্মায়, সজীবতায় পাতা মেলে দেয় গাছ, পরবর্তী... নাভিকেন্দ্রে যেতে তোমরা সবুজে সবুজে ভরিয়ে ফেল পথ। তুমি অগম্য নও।পাঁচ ফুট সাত
যদি তুমি থেকে যাও তুমি, আর আমিও আমি—সত্যিই কিছু যায় আসে না তাতে। আমি তো নই কোনো ভিনদেশি ফুল। যে কোট-ই পরবে তুমি উষ্ণতার অন্বেষায় তাই জড়িয়ে নেব শরীরে। আর জুতো... হোক সে যতই ছোট, আমাদের উচ্চতার ফারাক কমাতে তাই পরবো পদযুগলে। আমার জন্য বদলাতে হবে না, এরই মধ্যে তোমাতে বদলে গেছি আমি। যাপিত জীবনে কখনোই ধর্ম ছিল না আমার। জন্মক্ষণে তোমার ভালোবাসা ছাড়া সমস্ত ধর্ম থেকে আমি ছিলাম স্পষ্টতই নগ্ন ।
জানি ওগুলো কোনো কাজের কথা নয়। জানি কোনো বদলপ্রক্রিয়া নেই। কোট নেই, উচ্চতার ভারসাম্য নেই, জুতো নেই। তবু এক চিলতে নগ্ন সত্যের মতো তোমাকেই খুঁজি প্রথমে; তুমি নও, খুঁজি নিজেকেই। তুমি; কদাচিৎ জানবে না—আমি কে, কখন আমি বসে থাকি সফেদ চাদরে।
তুমি, নেই আমার পাশে।
আর যে সব কথা লেখা হয়েছে, যে সব কথা বলা হয়েছে, হয়েছে বোঝা; এরই মধ্যে চিরতরে চলে গেছে তারা।
কিন্তু, আমি ওদের ফিরিয়ে আনতে চাই—হাতের শূন্য-তালুতে। সেই হাত রাখতে চাই বুকে, বুক রাখতে চাই বিশ্রামে, বিশ্রাম—অনন্তের। আর হৃদস্পন্দনকে ফেরাতে চাই আত্মায়। ফিরে এসো আত্মা 'তুমি' হয়ে যাবার আগে ঠিক যেমনটি ছিলে।
হায়! আমি মাত্র পাঁচ ফুট সাত।