পাণ্ডুলিপির কবিতা : কাক তার ভোরের কোকিল


বিউগল


সম্পর্ক চুকিয়ে দিলে সূর্যও দেবে না আলো চাঁদের পৃষ্ঠায়। গ্রহসূচনার পথে পথে কারও কারও চারুকীর্তি চরণ চিহ্নের আশা করে তাই। ছত্রভঙ্গ জীবনের সবটুকু হলাহল তোমার ভিতরে দিয়ে আমিও দাঁড়িয়ে ভাবি :                কর্মিষ্ঠ হৃদয়ে ঠেস দিয়ে আছি। বিমর্ষ রাতের হুইসেলে একটি ফিরতি ট্রেন চলে গেলে আলস্য নির্ভর এই ভেঁপুবারান্দায় রাতভর জেগে থেকে আমার কেবলি মনে হয় : আঁচলগল্পের ছায়াতলে কতকাল আমাদের জননীকে                ‘মা’ বলে ডাকি না।

নির্মাণ


জীবন তোমাকে ডাকে। তন্দ্রাসঙ্কলিত রাতের পৃষ্ঠায় চাঁদ হয়ে জেগে থাকো; মুদ্রিত আলোর মতো           সারাদিন পাঠ করি তোমার অতল। ও সূর্য সারথি, কালো অক্ষরের মৌন পরিচ্ছদে মহাসড়কের প্রবল জ্যামের মতো আটকে রয়েছি। তুমি কি জটিল গ্রন্থ? মুখস্থ নিদ্রায় গুহামানবীর মতো রহস্য নিশ্চিত? আমাকে দেখাও শুধু বাদুড়ের ব্যস্ত কাতরতা? তবু রাতকাহিনির নতুন অধ্যায় আবর্তিত বেদনার শহর চাপিয়ে দিলে মায়াউনুনের পাশে           গ্রামীণ পিঠার ব্যর্থ ভাবালুতা যেভাবে নিঃশেষ হয় প্রতিদিন শীতার্ত সন্ধ্যায় বিলীন স্বপ্নের তীর হয়ে সেরকম আমি কি পথের কালো? পিচঢালা তোমার আত্মায়                     মর্মযন্ত্রণার ইট গাঁথি?

ইমারত


জিজ্ঞাসার সমাধিপ্রস্তরে আজীবন অবোধ মৃত্যুর মতো জেগে আছি; বিষণ্ন কবর নিজের ভিতরে নিয়ে পুনরুত্থানের নিরুপায় ইচ্ছের জগৎ পাখিসান্ত্বনার নিজস্ব ডানায়                তুমিও কি করেছ স্মরণ? ও মাধুর্য, নিত্য বৈমানিক নগর প্রপঞ্চে শুধু সঙ্গ দিয়ে আমাকে ওড়াও। তবু রোজ সুনীল শিখর হয়ে ফিরে আসি আকাশে তোমার। উড্ডীন স্বপ্নের পাশে      তোমার শরীর যেন স্পর্শসমতল; ইট বালি সুরকির সুমন্তর ঢেলে           আঙুলে আঙুলে গড়ি ইমারত।

গুপ্তচর


আমার জীবনে তুমি পাথরের প্রজাপতি হও। দুরন্ত বিক্ষোভে ফেটে-পড়া বিমুক্ত টিয়ার গ্যাসে শহরের বিপুল আবাস অমূলক অসুস্থ কান্নায় ভেসে গেলে প্রস্তর ডানায় তুমি সুখ নিয়ে এসো। ক্ষরণখাতায় আমি এঁকে নেব তোমার বিদ্যুৎ, জন্ম বৃত্তান্ত, আলো ও মধুমক্ষিকার সব আড়াল রাত্রিকে। তুমি কি বধির গোপনতা? বাণিজ্যকীর্তির শুল্ক বাড়িয়ে অমর দূরত্বে আমাকে রাখো? সোডিয়াম বাতির নিঃশ্বাস গলিত চাঁদের হাড়গোড় কর্পোরেট প্রেমিকার বিলুপ্ত সংসারে চুরি করে নিলে আমিও প্রবল প্রতারক গোপন স্নানের মতো      তোমার জীবনে গুম হই।

পথের দর্শন


পথে নামলেই শত দালানের পাদদেশে নিজেকে বোঝাই : মহাজগতের ছুঁড়ে দেওয়া মূর্ছিত আঁচিল তুমি নও; নও কোনো প্রমোদ টোকাই এই রাজপথে। লিফ্‌টের গুমঘরে ফেলে রেখে                হৃদয়ের কাগুজে দেয়াল শিখর সূর্যের দিকে হা-হয়ে ভোগের ফানুস কেবল ওড়ে যায়... তুমি তাকে ধরবে না; নেড়ি কুকুরের বিষাক্ত দাঁতের সঙ্গে ভালোবাসা হলে জলাতঙ্ক ছড়াবে নিশ্চই। এ পৃথিবী বহুতল স্পৃহার আগুন জ্বলন্ত নশ্বর হয়ে থাকে। নীলিম বিত্তের দিকে পুড়ে যায় হাত। তবু কেউ সমধিক টাকার পুরুত দাবানল থেকে শুষে নেয় হাসির খোরাক। নির্মম বিবেক তার অট্টহাসি : বেদনা বিদ্যুতে পোড়ে না, হয় না ছাই; বখে-যাওয়া সন্তানের নেশাঘোর আরক্ত বেদনাসহ অরেঞ্জ জেলির সঙ্গে গিলে খায়           সকালের বিরল নাস্তায়। কঙ্ক পুষ্প রক্ত প্রেম আর সোনার পিস্তল-ঘেরা মাধুর্য মদের দেশে সুখের জঙ্গমে ছোটে গাড়ি নিয়ে। যেন পরিতাপময় অযোগ্য সংসারে রাতভর ছুটে যায়      স্বার্থশিখণ্ডির যত ফেরারি কাছিম।

রায়ট


পুরনো দিনের স্মৃতি পাপ ও পঙ্কিল ধ্রুবতারা পুণ্যসংহতি ও প্রেম-যাপনের সঙ্গী ছিল যারা সমূহ বন্ধুরা ছিল, ছিল নারী, মনোবিকলন আয়ুর নিমেষ মেনে ধুলো-মাটি সবুজ আপন ঘাসের নরম প্রাণে ছাপ রেখে ঘুমিয়েছে সব আমিও ফড়িং, বন্ধু, আজ হোক উড়ার উদ্ভব। ডানার অভ্যস্ত বায়ু-ঝেড়ে ফেলি ব্যস্ততা-সংকট জীবনের সাথে হোক তারুণ্যের নতুন রায়ট যৌবনের পুষ্পধামে চিরদিন কাঁটার বয়ান জেগে ওঠো শাদা দুধ, ফোঁটা ফোঁটা পাথরের গান।

সময়সড়ক


এক আমরা কয়েকজন তরুণ মহৎ পথে পথে আজ জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠি। সকালসূর্যের সাত অঙ্কে যখন মিলেছি এক বিলম্বরাস্তায় ভ্রমণপ্রকল্প ঠিক রেখে জ্যান্ত প্রলোভনে তারপর হেঁটে গেছি                     যতদূর আত্মার বিকল্প নেই। আমাদের ভাবনার মাটি প্রশ্নসমাধির মতো উঁচু হতে হতে একদিন পতনপাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়েছে; সেই মধুপরাজয় মুগ্ধ পরিণামসহ একটি হলুদ খামে তুলে নেয় অনন্ত ডাকপিওন; তাকে তাড়া করি। ঘুঙুরপোকার শব্দস্তম্ভে ঝুলে থাকে যে-কারণশূন্যতা, মুখর গুণগান তার দিকে ছুটে যায় সকল প্রার্থনা। আমাদের নিপাট আত্মায় তুমি কোনো কচুপাতাজল? কান্নাসরোবরে মুহূর্তের      প্রেম হয়ে ঝরো?   দুই প্রভাতকান্তির সূর্যমন্থন অশেষ করে আজ যারা সঙ্গ দেয় তারার জঙ্গলে ওৎ-পাতা চাঁদের নশ্বর দেহে কলঙ্কের মতো মহীয়ান তাদের শপথ... যেন শত শত মানুষের সমাজ প্রতিভূ রক্ত আর অনুতাপে চলার যাজক হয়ে পথে পথে ঘুরে; চন্দ্রপরিহিত রাত আলোর ব্যস্ততা ঘরে নিয়ে যখন ডাকবে ফিরবে সবাই মনোচিকিৎসার দেহসঙ্ঘে; তখন বিশ্বাস-রাঙা পত্র জলাঞ্জলি আর           মৃত্যুর প্রসঙ্গে ঝরে-পড়া পাতার আশ্বাসে যদি আসমান হয়ে ওঠি নীল সান্ত্বনায় আমাকেও ডেকে নিও মেঘের শাসক..   তিন মরুবালিকার লাস্য নিয়ে যখন সময় আসে ঘর পোড়াবার           আয়ুর সুড়ঙ্গ ধরে বসে থাকি আর স্বপ্নকঙ্কালের হাড়গোড় ছুঁড়ে দিতে একটি নদীর কাছে যাই, বলি : এবার আমাকে দাও জলের বিশ্রাম ধার দাও খেয়াঘাট; আমার কপাল জুড়ে নৌকো আঁকো; সারি সারি কালো নৌকো; যেন মনে হয় এক সারি বুনো মোষ নৌকো সেজে স্রোতের সংকটে দল বাঁধে,           অর্ধেক জলের দেহে বিষণ্ন ঝিমায়। কাঠখোলসের নীরবতা আর জন্তুর নৈঃশব্দ্যকাল আমি কেন ভালোবাসি? উন্মাদ ক্লান্তির কাছে নত হয় আমাদের ভবচলাচল; তবু চাই ঘুমন্ত নৌকোর মেলবন্ধ আর           মহিষমেলার জলকানাকানি? আহা! বৃষ্টিজল্পনার সমুদ্রনূপুর এবার আমাকে দাও ঢেউগুলো ঋণ; এই ধূম্রকলহের বিকলাঙ্গ চাকার সংসারে চেতনচিতায় জ্বলে কত বাসস্ট্যান্ড! রিক্সার ছাউনি তুলে বেদনার চলন্ত স্মারক হাতে নিয়ে জীবনের রঙিন ঘূর্ণন স্বজনসাঁতারে ভেসে যাই। সময়ের মায়াপটে তুমি কোন্ সুনীল কম্পন? মিলন মেলায় ডেকে নাও? জ্বেলে দাও সড়কপ্রদীপ?

ছবির হাট


রাতের দহন : পোড়ো, ভস্মের ভিতরে চাও খয়েরি পালক। আমি ঝিমঝাম চিন্তা-শামুক, আকাশ তাকিয়ে দেখে। খোলা পার্ক : তোমাদের কামনা গিটারের তাম্রজীবনে খোলস রাখে নি। গোলক মালায় ধোঁয়ার শরীরে কত মুখরতা... আমরা তো সেইসব পিপীলিকা ডানার সংগ্রামে সমবেত হই।
কাজী নাসির মামুন

কাজী নাসির মামুন

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও...বিস্তারিত