বাউরি ভাবনা
১
যখন আজান হয়
উদ্ভ্রান্ত নামাজিরা কিছুটা সময়
একাগ্র নিজের মধ্যে
নিজেকে নিয়েই ডুব দেয়;
বিভক্তি ডিঙিয়ে
সবাই দাঁড়ায় পাশাপাশি।
বিচিত্র বৈরিতাসহ
সবুজ কল্লোলে
নিসর্গ দাঁড়িয়ে
ঠিক এভাবেই।
এখন সকাল;
রোদ
পৃথিবীকে জড়িয়ে ধরছে;
সূর্যের প্লাবন বুকে নিয়ে
গাছের ভুবনে
বইছে বাতাস।
সবুজ পাতার এক রাষ্ট্রকে দেখছি।
পাখিরা একান্ত নাগরিক;
নির্মল আশ্রয়ে অনুগত।
গোপন খোঁড়লে
সাপের সমাজ
একসঙ্গে আছে; কিছু বিরল পোকাও
স্বদেশ বানায় ডালে ডালে।
পাখিরা উড়ছে;
গানের মুখর সত্য
ফিরে ফিরে আসছে নীড়েই।
পোকার আনন্দ ঘিরে সাপের কুণ্ডলি
নির্জন পুলক হয়ে লুকিয়ে কোথাও।
গাছের কর্তৃত্ব শুধু
এইসব বিপরীত মোহনতা
সুখ ও সংগ্রাম
আমূল ক্ষমতাসহ টিকিয়ে রাখার।
নইলে পাখিরা যাবে; পোকার স্বদেশ
ভেঙে ভেঙে দাঁড়াবে অন্যায়;
বিষধর স্বার্থ হবে সাপের ফণাও।
এখন বিকেল;
বকচর গ্রামে
ঝিমিয়ে পড়েছে
রোদের নিঝুম সোনারঙ।
গোধূলি জাপটে-ধরা বাঘাজানা নদীর প্রান্তরে
আমিও দাঁড়িয়ে দেখি গাছের পত্রল আদালত:
একটা নিরেট বাচ্চা ছেলে
ঢিল ছোড়ে পাখির বাসায়;
হঠাৎ পুরনো ডাল ভেঙে পড়ে মাথার ওপর।
কোনো ক্ষোভ নয়;
প্রবল প্রশ্রয় নয় বিরূপ হিংসার।
বিরোধীর বুকে ছুরি মেরে
গাছ দাঁড়াবে না
ক্ষমতা-পর্বতে একা একা।
পাতা ও ডালের বাহুবলে
নাগরিক স্বার্থের বাতাস
বইয়ে দিয়েছে গাছ স্বগত নির্দেশে।
যেন এই বিধিবদ্ধ নিসর্গ-নিয়ম
অনন্ত স্বাধীন চরাচরে
ন্যায়ের সবুজ আকুলতা;
মানব শিশুর দিকে উবু হয়ে ছিল।
প্রকৃতির সরল সংসদে
শাস্তিও নির্মম অধিকার।
জঠর নিঃসৃত
কয়েকটা ভাঙা ডিম
স্মৃতির মায়ায়
আগলে রেখেছে যে পাখিটি
তার জন্যে শুধু শোক নয়;
নির্জন আত্মার নিচে রক্তাক্ত ডানায়
পাখির কান্নায় লিখা নিবিড় নামাজ
পৃখিবী দেখছে।
মৌন পাতার সূর্যাস্তে
সান্ত্বনা লিখছে মহাকাল:
রাষ্ট্র শুধু প্রতিকার দেবে, ধর্ম দেবে নিরাময়;
রাষ্ট্রই জগৎ-ধর্ম, ধর্মের নিজস্ব রাষ্ট্র নাই।
২
একটা চলন্ত ট্রাক হঠাৎ উদয় হলে
অনেক পাতাও দেখি হুমড়ি খেয়েছে পিছু পিছু।
বাউরি বাতাসে কুণ্ডলিত
পাতার জীবন উড়ে যায় শত শত...
বেদনাজর্জর এক মৃতের মিছিল
যেন ক্ষীপ্র; ত্রাণের আশায়
অনন্ত জীবন শুধু ছুটছেই।
ক্ষমতা অধর্ম হলে
নিপীড়ন সত্য হয়ে ফোটে।
নিখিল মুক্তির দিকে প্রতিটি বিপ্লব
রক্তের ভাণ্ডার; তবু
পরিত্রাণ এখনো দুর্লভ।
অথচ মানুষ ছাড়া কি আছে রাষ্ট্রের
ক্ষমতারঙিন প্রলোভন?
বন্যাকরি বিলের পানিতে
মাছ ধরে প্রলেতারিয়েত;
প্রত্নরোগ শুষে নিলে অবারিত জল
ধুরাখাল বুকে নিয়ে ঘুমায় কৃষক।
ক্লান্তির বিদ্যুতে আলো জ্বেলে
কী তারা অনন্ত লিখে শ্রমের খাতায়?
চেরাই কাঠের শ্রমিকেরা
স-মিলে স-মিলে সারাদিন
কাজের পাহাড়ে উঠে
গড়িয়ে পড়ছে এই বুভুক্ষু সন্ধ্যায়।
সন্ধ্যা মানে রুক্ষ পাদদেশ।
সামান্য খাবার যার অন্ধ প্রহসন।
উদ্বৃত্ত স্বপ্নের পায়ে বেড়ি দিয়ে
মানুষ জাগতে শিখে বিপুল রাস্তায়।
প্রতিবাদ যেন জলাশয়
রক্তের শালুক ফোটে
পিচঢালা পাথর-জলেও।
৩
যখন রাষ্ট্রই দুঃখ
সমাজ বেদনাবহ ভুলের নির্মাণ
তখন কারোর ব্যক্তিগত দুঃখ নাই।
খুন হওয়া ফুলের নিঃশ্বাসে
গন্ধহীন সব পরিবার।
একটি পাতাও গুম হলে
পাখির পিদিম জ্বেলে গানের আলোয়
গাছের আনন্দ
পাবো না কোথাও।
জনগণ নিজের রাখাল।
শাসন জড়িয়ে যদি কারোর আঙুল
মানুষ তাড়িয়ে শুধু দেয়ালে ঠেকায়
ব্যথার পর্বতে মানবতা
অশান্ত ভেড়ার পাল; যেন
রাষ্ট্রই রাখাল।
প্ররোচনা পৃথিবীর আদিম নিয়ম
তাকে পাশে রেখে
আমিও তাড়াই ভাবনার ভেড়াগুলো।
এখন রাতের ডেরা আলোভরপুর;
একবিন্দু অন্ধকার দূরে ফুটে আছি।
পাড়ার বস্তিতে গোলমাল।
বস্তি মানে প্রফুল্ল কবরখানা;
মোহিত অশ্রুর চেঁচামেচি।
এখানে মানুষগুলো ক্ষুধার জঠর।
উত্তাল বাসনা ছেড়ে
নির্মেদ জীবন
পেটে পুরে রাখে।
আবর্জনা ঘেঁটেঘুঁটে মহৎ খাবার
যাপন-তৃষ্ণায় খোঁজে যেভাবে টোকাই।
গাছের সঙ্কটে বাড়ে ঝড়ের প্রকোপ;
খাদ্যের সঙ্কটে দ্রোহ। কখনো দ্রোহই দেশপ্রেম।
তবে কি মানবজন্ম তুমুল ট্র্যাজিক?
তাকেও জাগতে হয় দুর্মর চিৎকারে?
আমি কি চিৎকার হয়ে আছি?
নিজের ভেতরে এক
মর্মন্তুদ পাতার মিছিল?