উপসংহারের আগে
মহাজাগতিক পরিণাম হিসেবে মৃত্যু মানবজীবনের একক কোনো ঘটনা নয়। জগতের অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমরা ঐক্য ও সংহতি নিয়ে বেঁচে আছি। শুধু মৃত্যু নয়, জন্ম ও সাংগঠনিক ক্রিয়ায় দূরবর্তী বা নিকটতর অন্বয়ে আমরা একীভূত। ফলে নিজের লেখার উদ্ধৃত অংশে আমার অনুভব হলো : আমি একা নই, অনেকের সঙ্গে একাকার। মহামিলনের এই সমাধিক্ষেত্রে আমার 'আমি’র এইভাবে মৃত্যু হলে ঠিক বুঝে ফেলি আমার উজ্জীবন আসলে অনেকের রঙে রঙিন। হতে পারে তার হাসির সঙ্গে আমার কান্নার সম্পর্ক, কান্নার সঙ্গে হাসির। তার সংবেদনায় আমার হয়তো ভিন্ন অভিমত। তার চিত্রকল্পে আমার চোখ হয়তো অন্য কথা বলে। তার উপমায় হয়তো আমার মন বসে না। কিন্তু সকল ভিন্নতায় আমি তথা আমরা আসলে একটা বিপরীত ঐক্যে গেঁথে আছি। সেখানে আমরা একে অপরের পথিকৃৎ। যাপনে পৃথক, কিন্তু উদযাপনের সারথি। জীবনে অপর, কিন্তু উজ্জীবনে আত্মীয়। সেই আত্মীয়তা এক প্রাণ থেকে মহাপ্রাণে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আমরা পাখির মতো গান গাই। প্রজাপতির মতো উড়ি। সাপের মতো ফুঁসে উঠি। আর কচুপাতার জলের মত স্বচ্ছ জলের নিরাময় চাই জীবনের কোথাও কোথাও। অথচ আমরা পাখি নই। প্রজাপতি নই। নই কচুপাতার জল অথবা সাপ। সেই ঐক্যের সূত্রে আমরা সবাই নশ্বর; কিন্তু অবিনশ্বর এক মহাকালের যাত্রী হিসেবে বিকশিত হই।
সেই বিকশিত ঐক্য ও সংহতির সূত্রে আব্বার মৃত্যুর তাৎপর্য আমি দুইভাবে আবিষ্কার করেছি। মৌলনা ওয়াহিদউদ্দীন খান 'দ্য ট্রু ফেস অব ইসলাম' গ্রন্থে সৃষ্টিতত্ত্ব বোঝাতে একটা ভীমরুলের উদাহরণ দিয়ে লিখেছেন : ডিম পাড়ার আগে ভিমরুল মাটিতে একটি গর্ত তৈরি করে তার ভেতরে একটি মাছি রেখে দেয়। ভিমরুল মাছির স্নায়ুতে এমন নির্ভুলভাবে হুল ফোটায় যাতে করে মাছিটি মারা না যায়, এটা শুধু অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকে, এবং তাজা খাবারের একটি উৎস হয়। তারপর ভিমরুল মাছিটির চারপাশে ডিম পাড়ে যাতে ভিমরুলের বাচ্চা ফুটলে মাছিকে কিছু সময় খাবার হিসেবে খেতে পারে। মাছিটি যদি মারা যেত তাহলে তার মৃতদেহ বিষাক্ত হয়ে যেত। এই খাদ্য প্রদানের পর, ভিমরুল উড়ে চলে যায় এবং তার বাচ্চাদের দেখতে আর কখনো ফিরে আসে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও, এই বাচ্চা যখন বড় হয়, তারা এই একই প্রক্রিয়ার পুরাবৃত্তি করে। সব ভিমরুলই শুধু একবার এ কাজটি করে থাকে, এবং তারা এটি নিখুঁতভাবে করে। আসুন আমরা একটু ভেবে দেখি, তিনি কে যিনি এই শিশু-ভিমরুলকে তার মায়ের মতো করে নিখুঁতভাবে একই কাজ করার প্রক্রিয়া শিক্ষা দেন, যাতে তাদের প্রজাতি অব্যাহত থাকে; যদিও সে কখনোই তার মাকে দেখেনি। মৌলানার মতে ভীমরুলের এই সমস্ত কর্মকাণ্ডই প্রত্যাদেশমূলক নির্দেশনা। মানুষ ছাড়া সব জীবজন্তুই এই প্রত্যাদেশ পেয়েছে আইন বা আদেশের আকারে নয়, বরং প্রবৃত্তির আকারে। প্রবৃত্তির কারণে জীবন্ত যন্ত্রের মতো সীমিত গণ্ডিতে তারা একই কাজ বারবার করে। মৌলানা যাকে ভীমরুলের ক্ষেত্রে প্রত্যাদেশ বলেছেন আমরা হয়তো সেটাকে স্বজ্ঞা হিসেবে জানি। তিনি দেখিয়েছেন মানুষের প্রত্যাদেশ নির্দেশনামূলক। কেবল প্রবৃত্তির অনুগামী না হয়ে সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সে যে-কোনো কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে।
আব্বার এই মৃত্যুর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে অন্তত জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও স্রষ্টার নির্দেশনাকে মেনে নিয়েছেন তিনি। প্রবৃত্তির দোষে আত্মহত্যা করেন নি। পৃথিবীর বহু মানুষের মতো স্রষ্টার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে এই তার শেষ সমর্পণ। পৃথিবীর বহু ঘাত-প্রতিঘাত তিনি সহ্য করেছেন। যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েছেন। কিন্তু অপেক্ষা করেছেন শেষ ডাকের। শুধু মানুষ নয়, প্রাণিকুলেও আত্মহত্যার নজির আছে। মধ্যযুগে রচিত আল্লামা কামাল উদ্দীন দামেরীর 'হায়াতুল হায়ান' গ্রন্থে উটের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। বইটি লিখেছে : উটের অভ্যাস হলো, সে সারা বছর মাত্র একবার সঙ্গম করে। কিন্তু সঙ্গম খুব দীর্ঘ সময় পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে এ দীর্ঘ সময়ে সে বেশ কয়েকবার বীর্যপাত ঘটায়। ফলে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। উষ্ট্রী তিন বছর পর গর্ভবতী হয়। ‘আল-মানতিক' গ্রন্থকারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, উটের বৈশিষ্ট্য হলো, সে তার মায়ের সাথে সঙ্গম করে না। এ ব্যাপারে একটি ঘটনাও বর্ণিত আছে। অতীতকালে এক ব্যক্তি উটনিকে কাপড় দ্বারা ঢেকে দিয়ে তার যুবা বাচ্চাকে মায়ের প্রতি ছেড়ে দেয়। বাচ্চাটি গিয়ে তার মায়ের উপর উঠে গেল। পরে যখন সে জানতে পারল যে, সে তার মা; তখন বাচ্চাটি কামড়িয়ে তার নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলল। এরপর থেকে উটটি ওই ব্যক্তির সঙ্গে বৈরিতা পোষণ করতে লাগল। পরিশেষে একদিন সুযোগ পেয়ে লোকটিকে মৃতপ্রায় করে দিল। তারপর সে নিজে নিজে আত্মহত্যা করল।
উটের এই আত্মহত্যা পশুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে স্বাভাবিক। মানবিকতার মানদণ্ড আরোপ করে দেখলে এই আত্মহত্যা বরং মহিমান্বিতই হয়ে ওঠে। এমন অনেক পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের পরও মানুষ দিব্যি হেসেখেলে ঘুরে বেড়ায়। আবার তুচ্ছ কারণে আত্মহত্যা করে বসে। আলীয়া আলী ইজেতবেগোভিচ বলেছেন : 'সংস্কৃতির বাহক মানুষ, সভ্যতার বাহক সমাজ। সংস্কৃতির অর্থ হলো সহজাতবোধের পরিচর্যার মাধ্যমে আত্মশক্তি অর্জন।' আমাদের সভ্যতায় মানুষ যে-সংস্কৃতিচর্চায় অভ্যস্ত সেখানে এই আত্মশক্তির অভাবই আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। ধর্মবোধের কারণে আব্বা সেই প্ররোচনা থেকে মুক্ত ছিলেন। বেঁচে থাকার প্রয়োজন তার অনেক আগেই ফুরিয়েছিল। একদিন সহসা বলেছিলেন : বেঁচে থাকার খুব শখ নাই। এখন ইমান নিয়ে মরতে পারলেই খুশি। 'ইমান' ছিল তার কাছে পারলৌকিক মুক্তির অনুষঙ্গ। টলস্টয়ের গল্পের ইভান ইলিচের মতো সার্বক্ষণিক চিৎকার চেঁচামেচি করে জীবনের শোচনীয়তাকে আরো দুর্বিষহ করে তুলেন নি। ধৈর্য ও স্থিরতার মধ্য দিয়ে কষ্টকেও তিনি যাপনের অংশ করে নিয়েছিলেন। তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তার অপেক্ষা ছিল স্রষ্টার প্রাকৃতিক আহ্বানের। স্রষ্টা তার এই শেষ মান্যতাকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে খতিয়ে দেখবেন বলে আমার বিশ্বাস।
আব্বার মৃত্যুর দ্বিতীয় একটি তাৎপর্য হলো মুক্তি বা পরিত্রাণ। মহাজাগতিক সংহতি বোঝাতে এক জাতীয় পিঁপড়ের উদাহরণ কাজে লাগবে বলে আমার ধারণা। প্রকৃতিতে প্রথম আনুষ্ঠানিক স্কুল খুলে বসে পিঁপড়েরা। খাবারের খোঁজ, সংগ্রহ ও সঞ্চয় ইত্যাদি কিভাবে করতে হয় এ বিষয়ে বয়স্ক পিঁপড়েরা ছোটদের শিক্ষা দেয়। ব্যাপারটা আজকের দিনে স্কুলে-কলেজের ক্লাসরুমে ছাত্রদের শিক্ষা দেবার মতোই। এই শিক্ষা নিয়ে পিঁপড়েরা খাবার খোঁজে এবং শত্রুর মোকাবেলা করে। কিন্তু পলিআরগাস প্রজাতির পিঁপড়েরা খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। বাচ্চাদের খাওয়াতেও পারে না। এমনকি নিজেদের বাড়িঘর পর্যন্ত পরিষ্কার রাখতে পারে না বলে এদের দরকার হয় শ্রমিক পিঁপড়ের। শ্রমিক সংগ্রহের জন্য এরা দল বেঁধে হানা দেয় আরেক প্রজাতির পিঁপড়ের বাসায়। এদের বলে ফর্মিকা প্রজাতি। কখনো পলিআরগাস পিঁপড়েরা দেড়শ মিটারের অধিক পথ পাড়ি দিয়ে আক্রমণ করে ফর্মিকার বাসায়। আক্রমণকারী পলিআরগাসরা ফর্মিকা রানি ও শ্রমিকদের তাড়িয়ে দেয়। আর মূককীটগুলো নিয়ে আসে নিজেদের বাসায়। অন্যান্য দাস পিঁপড়েরা এসব মূককীটগুলোকে যত্ন নেয় এবং ফুটে বেরোনোর পর তারা বাসার দায়িত্ব নেয়। একটা বাসায় যখন পিঁপড়ের সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন দাস ফর্মিকা পিঁপড়েরা প্রায় হাজার দুয়েক পলিআরগাস পিঁপড়ের মূককীট এবং রানিকে নতুন বাসায় নিয়ে যায়।
পলিআরগাস রানি একাই কোনো ফর্মিকা রানিকে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট। ফর্মিকা রানিকে হত্যার পর শ্রমিক ফর্মিকারা আক্রমণকারী পলিআরগাস রানিকে নিজেদের রানি বলে মেনে নেয়। যখন পিঁপড়ের দলে নতুন কোনো রানি পিঁপড়ের জন্ম হয় তখন নতুন রানি দাস-অভিযানে অন্যান্য শ্রমিক পিঁপড়ের সহযাত্রী হয়। অগ্রগামী পিঁপড়ের দল যখন এগিয়ে চলে তখন নতুন রানি হঠাৎ করে থেমে পড়ে এবং চোয়াল থেকে ফেরোমন (বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণের জন্য নিঃসরিত রাসায়নিক পদার্থ বিশেষ) নিঃসরণের মাধ্যমে একটি পুরুষ পিঁপড়েকে মিলনে প্রলুব্ধ করে। মিলনের পর পিঁপড়েটি ডানা ত্যাগ করে। রানি পিঁপড়ে এর পরপরই তার সঙ্গীদের ত্যাগ করে। ফর্মিকার বাসার খোঁজে বের হয়। বাসা খুঁজে পাওয়ার পর সে খুব দ্রুত রানি পিঁপড়েকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে যায় এবং সকল বাধা অতিক্রম করে রানির কাছে পৌঁছায়। রানিকে হত্যা করার জন্য সে তার শক্তিশালী চোয়াল ও পেটের কাছের ডুরোপফস গ্রন্থি-নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে। কর্মীদের বাধা অপসারণ করার পর পলিআরগাস-রানি ফর্মিকা-রানির মাথা, ধড় ও পেট কামড়াতে থাকে। কামড়ানো থাকা অবস্থায় সে ফর্মিকা রানির ক্ষতসমূহ চাটতে থাকে। ফর্মিকা রানির মৃত্যুর সাথে সাথেই পিঁপড়ের বাসার পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ফর্মিকা শ্রমিকেরা মোহগ্রস্তের মতো শান্তভাবে নতুন রানির দিকে অগ্রসর হয়। যেভাবে আগের রানির যত্নআত্তি করত ঠিক সেভাবেই নতুন রানির যত্নআত্তি করতে থাকে। পলিআরগাস রানি তখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মূককীট গাদা করে বিজয়ীর ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। আর এভাবেই সম্পন্ন হয় কলোনি দখল।
বন্যপ্রাণীর অন্য আচরণ বই থেকে পিঁপড়ের সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য, হত্যার ধরণ, সঙ্গমে প্রলুব্ধকরণ এবং কলোনি দখলসহ বিভিন্ন বিষয় জানলাম। এবার শুরু থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে মিলিয়ে দেখতে পারি। দাসপ্রথা, রাজ্যদখল, সাম্রাজ্যবিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, বিশ্বযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ফিলিস্তিন-ইজরাইল হানাহানি, পুঁজিবাদের শোষণ, খুনখারাবিসহ ধর্ষণ, রক্তারক্তি ও নানা অনাচার আমলে নিলে পৃথিবীকে শান্তির জায়গা হিসেবে ভাবা যায় না। আগেই জেনেছি প্রাণিজগতের ওইসব ক্রিয়াকাণ্ড পুনরাবৃত্তিমূলক প্রবৃত্তির ফলাফল। ভীমরুলের বাচ্চারা যেমন কোনোদিন তার মায়ের খোঁজ করবে না, মায়ের মতো নিজেরাও একই কর্মকাণ্ড করে বেড়াবে, ফর্মিকা প্রজাতির পিঁপড়েরাও পলিআরগাস প্রজাতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না কোনোদিন। মহাজাগতিক ঘূর্ণিচক্রে একই ঘটনা ঘটতে থাকবে তাদের মধ্যে। কিন্তু মানুষ বিদ্রোহ করে। দাসপ্রথা রদ করে। রেনেসাঁ ঘটায়। সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের নীতিতে ফরাসি বিপ্লব সংগঠিত করে, রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষের মুক্তির কথা ভাবে। গঠন করে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন জোট। গণতন্ত্রের পক্ষে রক্ত দেয়। বৈষম্য নিরসনে সাম্যের কথা ভাবে। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বুক পেতে রক্ত দেয়। এক দেশের শরণার্থীরা আশ্রয় পায় অন্য দেশে। সবই শান্তির প্রত্যাশায়। এই-যে ন্যায়ের স্বার্থে মানুষ দ্রোহ করে, এটা একটা চলমান ও চিরন্তন প্রক্রিয়া। কিন্তু শান্তির নামে যা তারা অর্জন করে তা সাময়িক ত্রাণ। নানা আঙ্গিকে আগের দাসপ্রথা, আগের সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশ ফিরে ফিরে আসে। কাজেই মুক্তির ধারণা ইহলৌকিক নয়। মানুষ ত্রাণ পেলেও পরিত্রাণ পাবে না। এটাই পার্থিবতা। যারা পরলোক মানেন না, তাদের জন্য ইহলোক সাঙ্গ করে মৃত্যুই হবে পরিত্রাণ-বিন্দু, এখানেই নিঃশেষ। যারা পরলোক মানেন তাদেরও পরিত্রাণের পাদবিন্দু মৃত্যুই। বিশ্বাসের জায়গা থেকে তারা ভাবেন মৃত্যু পাদবিন্দু হলেও অসীমের ক্ষমায় পরিত্রাণের দিকে কেবল যাত্রা শুরু এখান থেকে। কাজেই মহাকালের যাত্রী হিসেবে বিকশিত হওয়ার আগে তাকেও অপেক্ষা করতে হয় মৃত্যুর। পৃথিবীর সাময়িক ত্রাণ আব্বাকে তৃপ্তি দিত না কিছুতেই। ফলে জগতের ঝঞ্ঝা থেকে মুক্ত হয়ে পারলৌকিক পরিত্রাণের পথে পা রেখেছেন।
এক
'আব্বা, আব্বা গো' বলে মর্মন্তুদ একটা চিৎকার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল আমার এক ছাত্র। তার বাবা সেদিন মারা গেছেন, এই জন্য। স্ট্যাটাস পড়ে আমার নিজের মধ্যে আব্বার জন্য ভীষণ একটা আকুলতা তৈরি হয়। আব্বা তখনো জীবিত। প্রথমবার স্ট্রোক হয়েছে মাত্র। কথা মোটামুটি ভালোই বলতে পারেন। অন্যের সহযোগিতায় কিছুটা হাঁটতেও পারেন। আমরা হাত ধরে মাঝেমধ্যে তাকে বারান্দার সিঙ্গেল সোফায় বসিয়ে দিতাম। তখন বারবার মুখে আওড়াতেন : তুমি গাফ্ফার, আমি গোনাহগার। তুমি গাফ্ফার, আমি গোনাহগার। তার এই বিনয়বিবৃতি আধ্যাত্মিক প্রতিধ্বনির মতো মনে হতো আমার। যেন নিজেকে চূর্ণবিচূর্ণ করে খুবই ক্ষুদ্র হিসেবে পরিবেশন। যাতে 'গাফ্ফার'—সেই মহামহিম শক্তির সামনে দাঁড়ানোর শক্তি তার নিজের মধ্যেও সঞ্চিত হয়। কাজেই ‘ক্ষুদ্র করা’ মানেই ‘ক্ষুদ্র হওয়া’ নয়। বরং বৃহতের সামনে এমনভাবে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি : এই যে দ্যাখো আমি ক্ষুদ্র, গোনাহগার, তোমার সামনে দাঁড়িয়েছি। এমন ক্ষুদ্রভাবে উপস্থাপন, যাতে মহান 'গাফ্ফার' তার ক্ষুদ্রত্ব তথা গোনাহকে আমলে নেওয়ার ফুসরত না পান। এই ‘আমলে না নেওয়াটা’ই হয়তো ক্ষমা। মহাপরিত্রাণ। যা আব্বা ওই শব্দ জপার মধ্য দিয়ে আগে ভাগেই নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। নিজেকে ক্ষুদ্র করার শক্তি একটা বৃহৎ ব্যাপার।
কাউকে সামনে পেলে নিজে থেকেই কথা বলতেন। তার চাকরি-জীবনের কোনো একটা স্মৃতি হয়তো শোনালেন। কিছুক্ষণ পর আবার বলতেন ওই কথা। দু'চারবার এভাবেই চলত। আমরা যারা শ্রোতা তারা বুঝতাম, তিনি হয়তো ভুলে যান। বুড়ো বয়সে সঙ্গহীনতা ও আড্ডার অভাব মানুষের অনাবিল, স্ফূর্ত আনন্দকে নষ্ট করে। ভিতরের সেই সংগোপন হাহাকার আমরা কেউ দেখি না। তাই যতটা পারতাম তার ওই বারংবার বলা কথাগুলো শুনতাম। আমার ছেলেরা হাসত। স্মৃতিবিভ্রাটের কারণে আব্বার পুনরাবৃত্তিমূলক কথাগুলো নাতিদের জন্য আনন্দের খোরাক হচ্ছে, এটা ভাবতে আমার ভালো লাগত। কেননা জীবনে বহু ফলফলান্তি, ফসল, সমৃদ্ধি দিয়ে বাবা হিসেবে তিনি আমাদের পরিপুষ্ট করে তুলেছেন। আজ তিনি অকেজো। ফলনবিহীন এক প্রাণপিণ্ডের মতো দিনের সিংহভাগ শয্যাশায়ী। কে তাকে কামনা করে আর। অবচেতনায় হয়তো আমরাই ভেবেছি, তার অনুপস্থিতিই বরং স্বস্তিদায়ক। আর মৃত্যু ছাড়া কে পারে সেই স্বস্তির নিশ্চায়ক হতে? আমাদের বাসনাবৃত্তে তার মৃত্যুকামনা হয়তো সক্রিয় ছিল না, কিন্তু অসুস্থতার ভারবাহী তার নিজের জীবনের যে-অস্বস্তি, তা আমাদের জন্য নিশ্চয়ই তৃপ্তিদায়ক ছিল না। জীবনের এই নির্মম অসহায়ত্বকে সামনে নিয়ে আব্বা যে এখনো দুই নাতির মধ্যে হাসির সূচনা করতে পারছেন, করোনাক্লিষ্ট পৃথিবীতে এটাও একটা পুষ্টিদান। এখানেই আব্বা ফলদায়ী। এরকম ভাবনার মধ্যেই আমার ওই ছাত্রের 'আব্বা, আব্বা গো' স্ট্যাটাসটা বুকের মধ্যে অস্ফুট শব্দের মতো অনুভব করলাম। ভাবলাম, পিতৃসেবায় জীবনের পরমার্থ অর্জনের মাহেন্দ্রক্ষণ আমার সামনে। কিন্তু সুযোগ বহুদূর। আম্মা, চার বোন, আমার স্ত্রী এবং সার্বক্ষণিক গৃহকর্মীর সেবাপরিবৃত অবস্থায় আব্বার চারপাশে শুশ্রূষার একটা দেয়াল তৈরি হয়েছিল বলা যায়। সেই দেয়াল ভেদ করে সেবাধর্মে আনাড়ি আমার মতো লোক এমন কিই-বা আর করতে পারে। শুনেছি উন্নত বিশ্বে মৌলিক অধিকার হিসেবে রাষ্ট্র নাগরিকের চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়। এখানে পরিবারই সাধ্যমতো সেই দায়িত্ব নেয়। আমরাও চেষ্টা করেছি। কল্যাণরাষ্ট্রে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ কোথাও কোথাও পারিবারিক চেতনাকে ব্যহত করে, এটা ঠিক। কিন্তু চিকিৎসার অধিকারবঞ্চিত হয়ে কোনো কোনো পরিবার নিজেরা ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, এমন নজির আমাদের দেশে অহরহ। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের অতটা বেগ পোহাতে হয় নি। পারিবারিক সংহতির সুফল পেয়েছি আমরা। কিন্তু আমার মনে হলো আব্বার এই অসুস্থতার সময় সন্তান হিসেবে আমি কোনো অবদান রাখতে পারছি না। শাসন বারণ স্নেহ ভালোবাসাসহ আমাকে গড়ে তুলতে আব্বা যা করেছেন তার প্রতিদান দেবার দুঃসাহস এবং দুঃস্বপ্ন, কোনোটাই আমার হয় নি। মানুষ যখন কাফফরা দেয়, সেটা কোনোকিছুর প্রতিদান হিসেবে দেয় না। দেয় অপারগতার প্রতিবিধান হিসেবে। আমিও চাইছিলাম প্রতিদান নয় বরং প্রতিবিধান। যাতে আব্বার মৃত্যুর পর কোনো আফসোস দানা না বাঁধে। নিজের কাছে নিজে যেন একটু নির্ভার থাকতে পারি। কিন্তু বারবার নিজের গহন হাতড়ে তুচ্ছ কবিতা ছাড়া কিছুই খুঁজে পাই নি আমি। অবদান হিসেবে আমার ব্যর্থতার স্মারক ওই সামান্য কবিতাই এখন টিকে আছে। আমার ওই ছাত্রের ফেসবুকের পোস্ট স্মরণে রেখে 'আব্বা, আব্বা গো' শিরোনামে কবিতাটি লিখেছিলাম। যার কিয়দংশ প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় তুলে ধরছি :
অন্তিম সময় এলে হারিয়ে যাবার ছায়া খুব দীর্ঘ হয়, ছায়া হ্রস্ব হতে হতে একদিন নৈঃশব্দ্যে মিলায়। ঝিনুক-প্রদাহ নিয়ে সুদীর্ঘ মুক্তোর আলোয় আব্বাও হ্রস্ব হতে চলেছেন। আমাদের প্রফুল্ল সংসার, মুগ্ধ পরিবারে উদ্বৃত্ত সম্পদ রাখি যতটা মায়ায় সেরকম রেখেছি তাকেও। তবু আব্বা, আব্বা গো, কতটা স্থূল উপাচার নিজের জীবনে নিয়ে আমরা ভাবছি : যে-সম্পদ কার্যকর নাই ব্যবহারে ফলে না নতুন কেউ এসে নিয়ে যাক তাকে। কাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর দাবানল আমরা কখনো চেয়ে আনি। আব্বা কি পুরনো ছাতা? দূরের কোটরে রেখে ভাবা যায় স্মৃতির কাপড়?
কবিতাটা 'ছাড়পত্র' অনলাইনে ছাপা হবার পর আব্বাকে পড়ে শোনালাম একদিন। বারান্দার সেই সোফায় বসা ছিলেন আব্বা। বললাম, আপনাকে নিয়া কবিতা লিখছি। শিশুতোষ একটা হাসি ফুটল মুখে। কী এক সরল অভিব্যক্তিতে একটু বিস্মিতও হলেন মনে হলো। বললেন, আমারে নিয়া? পড়ো। পুরো কবিতাটা আমি জোরে জোরে পড়লাম। কতটা বুঝলেন তিনি জানি না, কান্নাকুঞ্চনে তার বদনবিকৃতি আমি লক্ষ করলাম। চোখে পানি। সেই অশ্রু আমার কবিতায় কতটা পুষ্টিগুণ দেবে, আমি জানি না। আমার ওই তুচ্ছ কাব্যকৃতি আব্বার অশ্রুতে স্বীকৃত হলো, এই বিশাল আনন্দে আজ বরং আব্বাকেই লিখছি আবার।
দুই
দ্বিতীয়বার স্ট্রোক করে আব্বা পুরোপুরি শয্যাশায়ী হলেন। চলচ্ছক্তিহীন জীবনের এই ভার নিয়ে তিনি কী অনুভব করছেন, আমরা জানতে পারি নি। কেননা তার কথা ছিল খুবই অস্পষ্ট। জীবনের একটা উদ্দিষ্ট ফলায় এই যে তার বিদ্ধ হয়ে থাকা, এর কোনো মানে আছে কি না, তা কখনো ভাবি নি। দায়বোধ অনেক ভাবনাকে চাপা দিয়ে রাখে। 'দায়বোধ' কথাটার মধ্যে কোথাও একটু রূঢ়তা আছে। বরং বলা দরকার দায়িত্ব ও কর্তব্য। সেই সঙ্গে ভালোবাসার সামান্য মিশেল এই অথর্ব বেঁচে থাকাটা অর্থময় করে তুলতে পারে। আব্বা শেষদিকে বিছানায়ই প্রশ্রাব-পায়খানা করতেন। ডায়াপার পরিয়ে রাখা হতো। কিন্তু একটা ক্লান্তিকর পরিচর্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আম্মাকে। বোনরা পালাক্রমে আসতেন। সেবাশুশ্রূষায় তাদেরও একটা অনন্যতা ছিল। ক্লান্তি থাকলেও কারও বিরক্তি দেখি নি। মাঝেমধ্যে আমার স্ত্রীকেও দেখেছি অনেক সময় নিয়ে পরম যত্নে আব্বার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। তবে আম্মার পরিশ্রমটাই ছিল অমানুষিক। আমি চাইতাম আব্বার নষ্ট-করা লুঙ্গি ও গায়ের পোশাক নিজে ধুয়ে দিই। কিন্তু আম্মা আমাকে এসবে আসতে দিতেন না। আম্মার হয়তো পারলৌকিক প্রাপ্তির বাসনা জোরালো ছিল। যারা ধর্ম মানেন না তাদের মধ্যেও তো সেবাপরায়ণতার এই গাঢ় গৌরব দেখতে পাই আমরা। সেক্ষেত্রে মানবিকতায় আস্থাশীল তাদের নিজস্ব নীতিবোধ মানুষকে মূল্য দিতে শেখায়। সেই প্রেরণায় তারা কাজ করেন। তাই মানুষের জন্য মানুষের এই ত্যাগ স্বীকার একটা নৈতিক ব্যাপার। নৈতিকতা জাগতিক স্বার্থনিরপেক্ষ। কাজেই পশু নৈতিকতা নিরপেক্ষ, মানুষ নয়। যে-কোনো ভালো বা মন্দ কাজের পরিণাম জগতের আসল বিবেচনা। মধু বা বিষ সবার মধ্যে সমানভাবেই ক্রিয়া করে। যিনি ধর্ম মানেন তার জিভে বিষের ক্রিয়া মধুময় হবে না। যিনি ধর্ম মানেন না তার কাছেও মধু বিষাক্ত হয়ে ওঠে না।
কাজেই আমরা মানি বা না মানি, জীবন কোনো না কোনো ক্ষেত্রে একটা অলিখিত নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। যে-ভিত্তি সবার জন্য একটা সাধারণ শর্ত হিসেবে উপস্থিত থাকে। সেই শর্ত মনুষ্যত্বের। জগতের সফলতা ও স্বার্থ দিয়ে তা কেউ বিবেচনা করে না। সাভারে রানা প্লাজা যখন ধসে পড়ল, চাপা-পড়া মানুষদের উদ্ধারে সরকারের পাশাপাশি বহু মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে এসেছেন। এমনকি অনেকে নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন। সফল হয়ে ফিরতে পারেন নি। উদ্ধারকর্মে এই-যে তাদের ব্যর্থতা এবং মৃত্যুবরণ, এটাকে আমরা অনর্থক ভাবতে পারি না। তারা ব্যর্থ হলেও বিফল নন। বরং মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় দারুণভাবে ফলদায়ী। মানুষের জীবনকে তারা মূল্য দিয়েছেন। এই নৈতিক পরিচর্যা স্বর্থসংশ্লিষ্ট নয়। মানুষ সফল না হলেও সার্থক হতে পারে, এটা তার নিদর্শন।
স্বর্ণখণ্ড মূল্যবান হলেও অলঙ্কারেই তার প্রায়োগিক সৌন্দর্য। যেখানে খাদের ভূমিকা সন্দেহাতীত। মানুষের জীবনে দায়িত্ব-কর্তব্য এবং শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ক্ষেত্রবিশেষে একে অপরের খাদ হিসেবে কাজ করে। কোনো একটার সার্বক্ষণিক অভাব থাকলে আমাদের চিন্তায় মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সেবাদান এত শিল্পিত মহিমা পেত না। আম্মা প্রায়ই বলতেন, আল্লাহ এভাবেই রাখুক, তবু বাইচ্যা থাক। আমি আমার সাধ্যমতো তার জন্য কইরা যামু। পরম যত্ন নিয়ে আব্বার বেড়ে-ওঠা গোঁফ, দাড়ির অবাঞ্ছিত অংশ, বগল আর নাকের চুলগুলো সাফ করে দিতেন আম্মা। শরীরে তেল মাখতেন। চিরুনি দিয়ে আঁচড়িয়ে দিতেন দাড়ি ও মাথার চুল। আব্বা মাঝেমধ্যে দুর্বল হাত বাড়িয়ে আম্মার হাত ধরতেন। অপলক তাকিয়ে থাকতেন তার মুখের দিকে। অব্যক্ত কৃতজ্ঞতায় হয়তো বুক ভরে উঠত তার। মনে হয় আম্মার ভালোবাসা কর্তব্যবোধ ডিঙিয়েছে। সেজন্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা নিয়েই তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন আব্বাকে আরও বেশ কয়েক বছর সঙ্গে পাবেন। তিনি বাইরে যাওয়া সীমিত করেছিলেন। গেলেও আব্বার খাওয়া, গোসল, ওষুধসেবন এবং মলমূত্রভরা ডায়াপার খোলার রুটিন যাতে ব্যহত না হয় সেই খেয়াল রাখতেন। বোনরা এলে তার একটু স্বস্তি হতো। তবে বোনদের মধ্যে ভালোবাসার চেয়ে কর্তব্যবোধের প্রতিযোগিতা ছিল বেশি। পিতৃসেবায় কে এবার এল বা এল না, এ নিয়ে তাদের মধ্যে সামান্য বচসাও হতো। আমার কর্তব্যবোধের অবহেলা নিয়েও তাদের মধ্যে ফিসফাস হতো। আম্মা নির্বিকার শুনতেন, আমলে নিতেন না। এ সময় আব্বার খোঁজখবর নিতে আমাদের বাসায় ভগ্নিপতিদের আনাগোনা যে হারে বেড়েছে, আমি ভেবেছি জীবনের অর্থ পারস্পরিক সম্পর্কের দ্যোতনায় আলোড়িত হয়। সেই আলোড়নে তাদের প্রতি আমার আজও কৃতজ্ঞতা। মৃত্যুর অপেক্ষা ছাড়া আব্বার জীবনের আর কোনো বিশেষত্ব ছিল না তখন। কিন্তু এত যত্নআত্তির মধ্য দিয়ে আব্বার জীবন ক্রমশ বিশেষায়িত হয়ে উঠছিল। হয়তো এটাই জীবনের অন্তর্নিহিত গৌরব। আব্বা গভীর অনুভবের শক্তি হারিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুটা প্রশান্তি নিয়ে গেছেন বোধ করি। আর ভালোবাসা বলি বা কর্তব্যবোধ, দু'ভাবেই জীবনের মহিমান্বিত অর্থকে অজ্ঞাতসারে ছুঁয়ে গেছেন আম্মা এবং বোনেরা।
এসময় ফ্রান্সিস বেকনের একটা কথা খুব মনে পড়ত আমার : Wives are young men's mistresses, companions for middle age, and old men's nurses ( Of Marriage And Single Life). অর্থাৎ নারী হচ্ছে যুবক বয়সের প্রেমিকা, মধ্য বয়সের সঙ্গী আর বৃদ্ধ বয়সের সেবিকা। এই চটকদার কথার মধ্যে একরৈখিক পুরুষতান্ত্রিকতা আছে। আমাদের দেশে কিছু হুজুর ওয়াজের নাম করে নারীদের হেয় করে এমনই তো বলেন। তাদের বক্তব্যের অর্থ হলো নারীর জন্মই হয়েছে পুরুষের জন্য। জীবন যে নারী-পুরুষ পারস্পরিকভাবে অর্থময় করে তোলে, সেই ঘোষণা মূর্খ ওয়াজেরিনদের মতো বেকনও বুঝতে পারেন নি। এ ক্ষেত্রে কোরানের কথায় আমি বরং ন্যায্যতা পাই। নারী ও পুরুষকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে দেখিয়েছে পবিত্র কোরআন। সূরা বাকারায় আছে : ‘নারীদের ওপর যেমন অধিকার রয়েছে পুরুষের, তেমনি রয়েছে পুরুষের ওপর নারীর অধিকার।’ আরো বলেছে : ‘তারা তোমাদের আবরণস্বরূপ আর তোমরা তাদের আবরণ।’ সমাজে পুরুষ কর্তৃক নারীকে সেবাদানের দৃষ্টান্ত কম বলেই বেকনের কথাকে প্রতিষ্ঠিত সত্যের মতো লাগে। কিন্তু ব্যতিক্রমও দেখেছি। আমার এক মামাশ্বশুর দীর্ঘ বারো বছর স্ত্রীর সেবা করছেন। মামীশাশুড়ি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে এই সুদীর্ঘকাল বিছানায়। কথা বন্ধ। হাত-পা অবশ। মুখে বোঁ বোঁ শব্দ ছাড়া কিছু বোঝাতে পারেন না। মামাশ্বশুর দিব্যি সংসার করছেন। স্ত্রীকে খাওয়ানো, স্নান করানো, চুল আঁচড়িয়ে দেওয়া সব তিনি করেন। স্ত্রীর পায়খানা প্রস্রাব সাফ করার মতো কাজও তিনি নিরলস করছেন। অবিবাহিতা বড় মেয়েটি ছাড়া তার কোনো সহযোগী নেই। বিয়ের দাওয়াতে গেলে স্ত্রীর জন্য নির্দ্বিধায় খাবার চেয়ে নিয়ে আসেন। স্ত্রীকে নিয়ে তার কত আহ্লাদ : কই গো, আমার লুৎফা, কী আনছি দ্যাখো। আমার স্ত্রী মাঝেমধ্যে বলেন : মামী কত ভাগ্যবান! স্বামীর এত সেবাযত্ন পাচ্ছেন। আমি হেসে বলি, জীবনের এই দুর্ভোগের বিনিময়ে স্বামীসেবার সৌভাগ্য যদি কিনতে চাও, আল্লাহকে বলি। সে চুপ মেরে যায়।
তিন
আব্বা যেদিন মারা গেলেন সেদিন বিকেলবেলা আমি এক সাহিত্য-আড্ডায় ছিলাম। আড্ডায় যাওয়ার পথে আমার দুই বোনের সঙ্গে দেখা। তাদের শিডিউল ছিল সেদিন আব্বাকে দেখভাল করার। ওদের দেখে ক্ষণিকের জন্য আমার মনে হয়েছিল আজ কি আব্বা মারা যাবেন? ওরা কি আগাম খবর পেল? যদি এমন হয়, আড্ডা দিতে দিতে আমি এসে আব্বাকে আর পেলাম না! এসব মনের খেয়াল ভেবে আর পাত্তা দেই নি। কেননা ঘরে আব্বাকে ভালোই দেখে এসেছি। বোনেরা বলল ওরা আব্বাকে দেখে সন্ধ্যার আগেই চলে যাবে। আমিও বললাম মাগরিবের আগেই চলে আসব, তোরা আমার সঙ্গে দেখা করে যাস। আসরের পর সামান্য সময় গড়িয়েছে। এরই মধ্যে আমার স্ত্রী ফোন করে। আব্বার অবস্থা খুব খারাপ। আড্ডা রেখে আমি দৌড়ে আসি রাস্তায়। কিন্তু একটা রিক্সাও পাচ্ছিলাম না। দ্রুত হেঁটে রওনা দিলাম। না, কোনো রিক্সা নেই। কেন যেন মনে হলো আজ আব্বার শেষ দিন। পথে আরেকটা ফোন পেলাম। আব্বার অবস্থা খুব খারাপ না। এত অস্থির হবার কিছু নেই। তবু বাসার কাছাকাছি এসে রিক্সা পেয়ে উঠে বসলাম। মিনিট দু'য়েকের মধ্যে বাসায় এসে দেখি অনেকেই এসে হাজির হয়েছেন। কেউ কেউ প্রতিবেশী। বেশিরভাগই আশেপাশে থাকা আত্মীয়স্বজন। স্ত্রী বললেন এখন অবস্থা একটু ভালো। শ্বাস কষ্ট খুব বেড়ে গিয়েছিল। এখন কমেছে। অনেকেই বললেন এটা দুর্বলতার ফল। দীর্ঘদিন যাবৎ দু'চার চামচ তরল খাবার ছাড়া আব্বা কিছু খেতে পারতেন না। হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসে আমরা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধপত্র দিচ্ছিলাম। লালমনিরহাটে আমার এক ভাগ্নির পোস্টিং। সে ডাক্তার। আমার বোনও তার বাসায়। আব্বার এরকম একটা অবস্থায় সে যে সামনে থাকতে পারল না, এ নিয়ে তার কান্নাকাটি। ভগ্নিপতি অবশ্য খবর পেয়ে বাসায় এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে। ফোনে ভাগ্নি বলল, দূর থেকে পরামর্শ দেওয়া মুশকিল। শরীর যেহেতু দুর্বল খাবার-স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে। তবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভালো। বড় ছেলেকে স্যালাইন আনতে পাঠালাম। স্যালাইন পুশ করার জন্য হাসপাতাল থেকে কাউকে নিয়েও আসতে বললাম। আমি ভাবলাম অ্যাম্বুলেন্স খবর দিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করি। মাগরিবের বেশ পরে হাসপাতালের সেই লোকটাকে নিয়ে স্যালাইনসহ বড় ছেলে ফিরে এল। লোকটি আব্বার বুক পরীক্ষা করে বললেন স্যালালাইন দেওয়া ঠিক হবে না। ফুসফুসের অবস্থা ভালো না। স্যালাইন দিলে শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে। লোকটি আব্বাকে হাসপাতালে নিতে বলল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নিতে হবে। আমরা বুঝে ফেললাম আব্বার যা অবস্থা তাতে আশু ব্যবস্থ না নিলে তিনি বাঁচবেন না। অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আমি নানান জায়গায় ফোন করতে শুরু করলাম। ফোনে যা বুঝলাম করোনার সময়ে অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় সহজ হবে না। মাইক্রো ভাড়ার চিন্তা করলাম। খবর পেয়ে আমার ফুপাত ভাই ভাবিসহ আগেই এসেছেন। ভাবি বললেন : এত উতলা হইয়েন না তো ভাই, বসে পড়েন। কালেমা পড়েন। আম্মা এবং বোনরা একসঙ্গে বিলাপ শুরু করলেন। আমি জানি, আব্বার যে অবস্থা, তাতে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলাটাও বিরাট একটা ঝক্কিঝামেলার ব্যাপার। তবু মন মানছিল না। আমি হাসপাতালে নেওয়ার কথা বললাম। আমার ভগ্নিপতি মৃদু ধমকের স্বরেই বললেনঃ এত অস্থির হইতেছ ক্যান, মামুন? এটা হাসপাতালে নেওয়ার সময় না। ভাবি আবার বললেন : তার পাশে থাকেন এখন। দোয়া পড়েন। অন্যদের বললেন সুরা ইয়াসিন পড়তে। আমি দেখলাম আব্বার কপাল কিছুটা ঘামছে। তিনি খুব জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। তার শ্বাস ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম শোয়া অবস্থাতেও তিনি মাথা ঘুরিয়ে আমাদের দেখতে চেষ্টা করছেন। মাথার দু'পাশে এবং পেছনটায় আম্মা আমি এবং বোনেরা ঘিরে ছিলাম। তিনি চেষ্টা করছিলেন সবার দিকে একবার করে তাকাতে। কী অপলক, কী অসহায় এবং অবোধ সেই তাকানো। অনেকটা শিশুর ঔৎসুক্যের মতো। আবার মনে হচ্ছিল কোনো এক রহস্যালোক তার সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। তাই বিস্ময়াভিভূত কোনো আকুল প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন তিনি এভাবে তাকিয়ে। রবীন্দ্রথের কবিতার কথা মনে পড়ছে এখন :
দিবসের শেষ সূর্য শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম-সাগরতীরে, নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়— কে তুমি? পেল না উত্তর।
আব্বা কি উত্তর পেয়েছিলেন? পেলেও তা জানিয়ে যাবার কোনো মোক্ষম সুযোগ কোনোদিনও আসবে না তার। মেজবোনের দিকে তাকালে বোন জিগ্যেস করলেন : আব্বা, আপনার কি কষ্ট হচ্ছে? আমাদের বিস্মিত করে তিনি দু'পাশে মাথা নাড়ালেন। না, তার কষ্ট হচ্ছে না। আমিও একই প্রশ্ন করলাম। মাথা নাড়ানোটা এবার একটু কম হলেও জবাবটা তার একই রকম মনে হলো। এর পরই আব্বার দীর্ঘশাস আস্তে আস্তে হ্রস্ব হতে থাকল। প্রসঙ্গক্রমে আমার 'আব্বা, আব্বা গো' কবিতার অংশবিশেষ মনে পড়ছে আবার :
অন্তিম সময় এলে হারিয়ে যাবার ছায়া খুব দীর্ঘ হয়, ছায়া হ্রস্ব হতে হতে একদিন নৈঃশব্দ্যে মিলায়। ঝিনুক-প্রদাহ নিয়ে সুদীর্ঘ মুক্তোর আলোয় আব্বাও হ্রস্ব হতে চলেছেন।
'আব্বা হ্রস্ব হতে চলেছেন' মানেই তো তার শ্বাস-প্রশ্বাস মিইয়ে যাওয়া। চোখের সামনে আমি তা-ই ঘটতে দেখছিলাম। তাহলে কি আব্বার মৃত্যুকে ঘিরে আমার কবিতাও অক্ষরের সুবর্ণ কাকতাল? জীবনভর আমার ভিতরে জ্বলজ্বল করবে? তার মৃত্যুকালীন আরও একটা ঘটনা না বললেই নয়। তখনো আব্বার শরীর এত ভেঙে পড়ে নি। তার শৌচকর্মের সুবিধার্থে এটাচ্ড বাথরুমঅলা রুমের ফ্লোরে তার বিছানা পাতা হয়েছিল। আব্বা একবার আমাকে একা পেয়ে কাছে ডেকে বললেন : দোয়া কইরো। আল্লাহ যেন বিছানায় ফালায়া না রাখে। আগে পরে আরও কিছু বললেন। যার মর্মার্থ হলো দীর্ঘকাল বিছানায় পড়ে থাকলে নিজের এবং পরিবারের লোকদের যে-ভোগান্তি হয়, তারচে মৃত্যু ভালো। আল্লাহর কাছে তার প্রার্থনাও তাই। মৃত্যুর আগে বেশ কিছুদিন তার শরীর বেশি খারাপ ছিল। গলা দিয়ে তরল খাবারও নিতে পারতেন না। গলায় তরল আটকে কাশিতে শ্বাস বন্ধ হবার জোগাড় হতো। শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠে বেডসোরের মতো ঘায়ের রেশ বেড়ে যাচ্ছিল। ডানে বাঁয়ে পাশ ফিরলে কিছুটা ব্যথায় কাতরাতেন। পা মেলতে গিয়েও 'আঁ..' বলে চিৎকার করে উঠতেন। এসব দেখে নিজের মধ্যে নিমজ্জমান একটা কষ্ট নিয়ে আমিও নীরবে কাতরাতাম। আব্বার মৃত্যুর আগের দিন বিশেষ এক ভাবান্তর হলো। ধর্মে বিশ্বাস থাকলেও নামাজে নানা রকম গাফেলতি নিয়েই তো আমরা থাকি। তবু ওইদিন রাত্রিবেলা ইচ্ছে হলো আব্বার জন্য একটু মোনাজাতে বসি। নামাজের পর আব্বার কাঙ্ক্ষিত সেই দোয়া করতে বসে বুক ভিজে উঠেছিল। আমি চাইছিলাম আব্বার জন্য সুস্থতার এক অলৌকিক নিদান চলে আসুক ওপর থেকে। সুস্থতার ভাগ্য না হলে একটা নির্বিঘ্ন মৃত্যু তার জন্য দুই জগতের পরিত্রাণ হিসেবে নেমে আসুক। আব্বার মৃত্যুশয্যার পাশে বসে একটা অপরাধবোধের তাড়না তাই অনুভব করলাম। মনে হলো আমার প্রার্থনার দ্বিতীয় অপশনটাই গৃহীত হয়েছে। পরিত্রাণের অভিলাষে আব্বা পরপারমুখী। রাতের ওই প্রার্থনা না হলে হয়তো আরো কিছুদিন আব্বাকে কাছে পেতাম। আমি জানি এসব হচ্ছে ব্যথিত মনের খেয়ালি অনুভব। তবে আব্বার প্রার্থিত দোয়া আমি যে মোনাজাতে গড়াতে পেরেছি এ নিয়ে আমার সন্তুষ্টিও আছে।
আম্মা এবং বোনদের কান্না আরেকটু জোরালো হলে আরো কিছু প্রতিবেশী এসে ঘিরে থাকলেন আমাদের। মৃদু গুঞ্জরন মুখরিত হলো। দেখলাম আব্বার মৃত্যুকে ঘিরে একটা উদযাপনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমি প্রায়ই বলে থাকি জীবন হচ্ছে যাপনের। মৃত্যু হচ্ছে উদযাপনের। আর যাপিত জীবনের মধ্যে উদযাপনের ভাষায় কথা বলাই তো কবিতা। তাহলে কবিতা কি মৃত্যুকেই ভাষাময় করে তোলে? সকল আনন্দের ভিতর কবিতা তো একটা অন্তর্লীন বেদনাকেই স্পর্শ করে যায়। অথবা বেদনার ভিতরেও খুঁজে পায় আনন্দের লাল রঙ্গন। আর গহনমৃত্যুর দিকে অবচেতন দৃষ্টি রেখেই আমাদের বেদনার আনন্দ অথবা আনন্দের বেদনা উদযাপিত। বরীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে গেলে এর কারণ হলো ‘জীবনের মধ্যে বাঁচিবার একটা অহেতুক ইচ্ছা আছে’। কেন অহেতুক? হয়তো এজন্য যে, বাঁচার ইচ্ছা কখনো ফলপ্রসূ হবার নয়। ‘মহাভারত’-এ যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিল : জগতের সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় কী? যুধিষ্ঠির জবাব দিলেন : প্রাণিকুল প্রতিদিন যমালয়ে যাচ্ছে। তা দেখেও মানুষ চিরজীবী হবার অভিলাষ পোষণ করে। জগতে এর চেয়ে আশ্চর্যজনক আর কী হতে পারে? কিন্তু এও তো ঠিক, 'বাঁচিবার একটা অহেতুক ইচ্ছা' আমাদের সব সৃষ্টিচেতনার মূল। আর আমরা বাঁচব না বলেই আমাদের মহৎ সৃষ্টিগুলো বেদনাজাত। মৃত্যু যার প্রতীক-পরিণাম।
ওই দিন আব্বার কপালে হাত দিয়ে আমি বারবার প্রলেপ করছিলাম। দেখছিলাম কিভাবে তিনি নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছেন। মিনিট পঁচিশেক আগেও তিনি আমাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন। আমরা তাকে কষ্টের কথা জিগ্যেস করছিলাম। এখন নিবিড় নিস্তব্ধতার মধ্যে তার নিশ্বাস বন্ধ হতে দেখছি। কোনো মুখবিকৃতি নেই। কাতরানো নেই। নিশ্চল চোখ আস্তে আস্তে বুজে আসছিল। প্রশান্তির কোনো অলৌকিক হাত যেন তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। আমার এক ভাগ্নি নাড়ি পরীক্ষা করে বলল, নাই। কেউ বলল : না, এখনো আছে। ভাবি এবং আমার ভগ্নিপতিও বললেন : না, নাই। সম্ভবত আমার মেজবোন চোখ মুদিয়ে দিলেন। আমি দেখলাম, অভিজ্ঞতা একটা দারুণ ব্যাপার। ভাবি এবং আমার ভগ্নিপতি অনেক মৃত্যু সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। তারা টের পেয়েছিলেন আব্বার সময় শেষ। কাজেই অ্যাম্বুলেন্স বা মাইক্রো খবর দিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার বন্দোবস্ত করতে করতেই আব্বার দফা সারা হবে। শেষবেলাটায় আব্বাকে টানাহেঁচড়া করে কষ্ট দেওয়ার কথা তারা ভাবতে পারেন নি। সবার কান্না সম্মিলিত বিলাপে রূপ নিলে আমি সবাইকে স্বান্ত্বনা দিয়ে থামাতে চাইলাম। যে-ঘরে লাশ রাখা ছিল সেখানে ভগ্নিপতিকে একা পেয়ে আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম : আসলেই কি নাই? নাকি ভুল হইল। পরীক্ষা করে দেখবেন? আমার এই অবুঝপনায় তিনি সামান্য হাসলেন। ভোরে দাফনের আগে খুব যত্ন নিয়ে আব্বাকে গোসল দিয়েছি আমি। আমার সঙ্গে ছিলেন ফুপাত ভাই। হালকা গরম পানি আর বরইপাতা সহযোগে যখন তার শরীরে আলতো করে সাবান মাখছিলাম, বেদনাবিহ্বল একটা দারুণ ভালোলাগা কাজ করছিল। ছোটবেলায় আব্বা আমাকে বাড়ির সামনের পুকুরে সাঁতার শেখাতেন। সাবান মেখে খুব সোহাগ করে গোসল করিয়ে দিতেন। আজ মৃত্যুর গহিন পুকরে তিনি সাঁতরাচ্ছেন। আমি তাকে বুলিয়ে দিচ্ছি সাবান-সোহাগ। আমার মনে আছে, ওই পুরনো পুকুরে ডুব দিয়ে বালু হাতড়ে মাঝেমধ্যে রূপার আধুলি পেতাম। আব্বার কাছে জমা রাখতাম সেই রূপার আধুলি। আব্বা লেখার সরঞ্জাম কিনে দিতেন। এই যেমন স্লেটে লেখার চক, পেন্সিল এইসব। আজ মৃত্যুজলে ডুব দিয়ে কোন রূপার আধুলি হাতে তুলে দিবেন আব্বা, সেটা ভাবছিলাম। কাফন পরিয়ে পরম আদরে আতর লাগানো হলো। খাটিয়ায় কাফন মোড়ানো আব্বাকে দেখতে দেখতে ভাবলাম, এই যে মৃত্যুর পর একটা লাশ কত আলতো করে ধোয়ামোছা করা হয়, যাতে তার কষ্ট না হয়। আতর লোবানে সুরভিত করে, কর্পূর ছিটিয়ে পরম যত্নের পরাকাষ্ঠায় তাকে শ্রদ্ধার শেষ চাদরে জড়ানো হয়, ধর্মের বৈশিষ্ট্য হিসেবে এটা বেশ একটা কাজের জিনিস। মানুষের বহু দোষত্রুটির পরও রূঢ়তাহীন এক অনন্যতা। মানুষের শেষ মূল্যায়ন। কারণ মৃত্যুর পর মানুষ এমন এক নির্বিকার স্থানে পৌঁছে যায়, দোষত্রুটির বাইরে এইটুকু মূল্যায়ন তার প্রাপ্য হয়ে ওঠে। সম্মিলিতভাবে তাকে কবরস্থ করা মানে তার সঙ্গে আমাদের শেষ সংহতি।
উপসংহার
ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত 'মৃত্যু' শিরোনামে এ.এন.এম নূরুল হকের একটা বই পড়েছি। এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পড়েও মৃত্যুর স্বরূপ ধরতে পারি নি। তবে লেখক জর্জ এলিয়টের The Spanish Gipsy কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করেছেন। মৃত্যুকে নিয়ে সেই চিত্রকল্প আমার ভালো লেগেছে :
Death is the king of this world, 'Tis his park where he breeds life to feed him. Cries of pain are music for her banquet.
স্বাভাবিক অনুবাদ হলো : মৃত্যু পৃথিবীর রাজা। পৃথিবীটা তার খামার। যেখানে সে তার খাবারের জোগান দিতে জীবনের জন্ম দেয়। মৃত্যু-যাতনার যে-কান্না, সেটা তার ভোজনসংগীত। এই-যে একটা ভাবচিত্র, এটা আসলে মৃত্যুকে সঠিক অর্থে উন্মোচিত করে না। আমি এক সময় ভাবতাম, জীবন একটা যৌথ স্বপ্নের মধ্যে থাকে। মৃত্যু সেই স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। কিন্তু পশুরা স্বপ্নের মধ্যেই থাকে। মৃত্যুতেও তাদের কোনো পরজগতের জাগরণ নেই। পরে ইমাম গাজ্জালির একটা বইয়ের অনুবাদে একটা হাদিসের উদ্ধৃতি পেলাম। সুফিরা এই হাদিসটা নাকি বেশি বেশি বলে থাকেন। টিকায় আবার উল্লেখ আছে এটি হযরত আলি (রা)-এর উক্তি। বইটির নাম 'যেভাবে আমি সত্যকে পেয়েছি'। অনুবাদ করেছেন ফায়সাল বিন খালেদ। উদ্ধৃতিটি হলো : 'মানুষ ঘুমিয়ে আছে, মৃত্যুবরণ করে তারা জেগে উঠবে।' কোরানের আয়াতের উল্লেখও আছে : 'আমি তোমার থেকে সরিয়ে দিয়েছি আড়াল, আজ তোমার দৃষ্টি প্রখর'।
সুতরাং কোরান-হাদিসের ভাষ্যে মৃত্যু হলো মহাকালের আরেকটি অধ্যায়ে জেগে উঠবার পাদবিন্দু। জীবন যেখানে শেষ হয়। তাহলে এতক্ষণ আমি যা লিখলাম তা আব্বার জীবন নিয়েই। জীবনের শেষাংশের উদযাপনই যে-লেখার বিষয়বস্তু। সেই উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু আব্বা। কিন্তু তিনি তার অংশীদার নন। বিজ্ঞান নিজেও সেই অর্থে জীবনের পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞায়নে সফল হয় নি। আমাদের যাপনের মধ্য দিয়ে নানা স্ববিরোধ, ঐক্য এবং ঐক্যহীনতার যে-বহুরৈখিক ব্যঞ্জনা প্রকাশ পায়, তা শুধু জীবনের লক্ষণাক্রান্ত। ফলে জীবন রহস্যময়। মৃত্যুর আবহে সেই রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। আমরা মৃত্যুকে জানি না। তার আবহকে জানি। কেননা মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নিয়ে কেউ ফিরে আসে না। তবে আমরা পরলোক মানি আর না মানি, মৃত্যু নিয়ে প্রামাণিক সত্য হিসেবে এইটুকু চূড়ান্ত জানি : কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাউত—প্রত্যেক প্রাণিকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।