বিস্মৃতি ও অন্যান্য গল্প: স্মৃতিনিষ্ঠ জীবনের বুদ্বুদ

কায়সার আহমদের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ বিস্মৃতি ও অন্যান্য গল্প। কিছুদিন আগে বইটি পড়ে শেষ করলাম। বারোটি গল্পের সবগুলোই এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়। বলার ভঙ্গিতে কোনো প্যাঁচ-মোচড় নাই। গল্পের আঙ্গিক বা প্রকরণ নিয়ে বিস্তর ভাবনাবিলাস তাকে আড়ষ্ট করে নি। তাই হয়তো ভাষাকেও জটিলতাহীন রাখতে পেরেছেন। প্রেম, যৌনতা, পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক অবক্ষয়, মধ্যবিত্তের সঙ্কট, অপরাধ থেকে উদ্ভূত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও তার বিয়োগাত্মক পরিণতি, দার্শনিক জিজ্ঞাসা ইত্যাকার নানা প্রসঙ্গ তার গল্পের বিষয়বস্তু। আমার ভালো লাগবার কারণ হলো বিষয়কে নিরেট 'বিষয়' হিসেবে জারি রাখেন নি গল্পকার। বিষয় বা ভাবকে 'বিষয়বস্তু' করে তুলবার যে-পারঙ্গমতা আমরা একজন লেখকের কাছ থেকে আশা করি তার পুরোটাই তিনি ঢেলে দিয়েছেন তার প্রত্যেকটি গল্পে। কাহিনির বিচারে বিষয়ের অভিনবত্ব তার গল্পে বিশেষ কিছু নয়, হয়তো গতানুগতিকও, কিন্তু ভাবের যে-ব্যঞ্জনা তিনি তৈরি করেন তা একজন সুদক্ষ গল্প-কারিগরের পক্ষেই সম্ভব। তাই বলা যায় ব্যঞ্জনার ভিতর দিয়ে যে গূঢ়ার্থকে তুলে আনেন কায়সার আহমদ, তা-ই তার গল্পের মূল আকর্ষণ এবং মৌলিকত্ব।

গ্রন্থের প্রথম গল্প 'খুনি'। গল্পটি প্রথম পুরুষে লেখা। ভার্সিটিতে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় নিজের ছোট ভাইয়ের খুনিকে হত্যা করেন গল্পের কথক। তারপর 'বড় ভাই'য়ের আশ্রয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এই নিরাপত্তাজনিত অনিরাপত্তাই গল্পের ভাববস্তু। কেননা 'বড় ভাই'য়ের আশ্রয়ে তিনি হয়ে পড়েন বড় ভাইয়ের মাফিয়াতন্ত্রের ক্রীড়নক। তার নির্দেশেই কথক দ্বিতীয় খুনের দিকে ধাবিত হন। এই খুনের বদৌলতে মৃত্যুতাড়িত তার নিজের জীবনও রক্ষা পাবে। কেননা বড় ভাই তার পাসপোর্ট ও ফ্রান্সের ভিসা জোগাড় করে দিয়েছেন। কাঙ্ক্ষিত খুনটা সেরে ফেললেই সে ফ্রান্সে পারি দেবে। আর বড় ভাইয়ের হস্তগত হবে তার বিশাল এলাকার ডিশের ব্যবসাটা। খুনের সমস্ত প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও খুন করতে সক্ষম হন না গল্পের কথক। যাকে খুন করবেন তার বাসার সামনে অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন। এরই মধ্যে খবর আসে মগবাজার রেল গেটের সামনে বড় ভাই নিজেই খুন হয়েছেন। তার গায়ে আটটা গুলি লেগেছে। অতঃপর প্যারিসে গমন ছাড়া কথকের আর কোনো উপায় থাকে না। সে ভাবে, জীবনটা এমন না হয়ে অন্য রকমও তো হতে পারত।

কাহিনির পাঠ এখানে চুকে গেলেও এই গল্পের সারবত্তায় আমাদের সামাজিক বাস্তবতার নিষ্ঠুর চিত্র উঠে এসেছে। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দখলদারিত্ব নিয়ে আমাদের সমাজে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। 'বড় ভাই'য়ের মতো অদৃশ্য শক্তি ও ক্ষমতার হাতেই আমাদের সমাজ মূলত জিম্মি। বড় ভাইয়ের মৃত্যু তাই কোনো নিষ্পত্তি নয় বরং মাফিয়াতন্ত্রের হাতবদল মাত্র। তাই গল্পের কথকের মতো নিরাপত্তাহীনতা গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থকেই ছেয়ে আছে। খুনের পরিকল্পনা ঘিরে যে-টেনশন গল্পের চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত তা পাঠকের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। কথকের মধ্য দিয়ে নানা রকম ভাবনা ও অনুষঙ্গের অবতারণা করে গল্পকার অপেক্ষার দীর্ঘ সময়কে এমনভাবে চিত্রিত করেছেন যেন পাঠক নিজেই খুনের জন্য অপেক্ষমাণ গল্পের কথক।

দ্বিতীয় গল্প 'বিশ্বাস'। গল্পের প্রধান চরিত্র মিল্টন একজন মননশীল লেখক। তার যুক্তিবাদী মন ঈশ্বর কিংবা অতি-প্রাকৃতিক কিংবা মহা-প্রাকৃতিক কোনোকিছুই বিশ্বাস করে না। এ বিষয়ে তিনি একটা প্রবন্ধ লেখেন। অথচ প্রবন্ধের শেষ দুটো শব্দের জায়গায় অলৌকিকভাবে লেখা উঠে থাকে 'মহা-প্রাকৃতিক কোনো কিছুর অস্তিত্ব অবশ্যই আছে'। এরকম অতি-প্রাকৃতিক ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে। একজন হলুদ টি-শার্ট পরা লোক এসে অতি-প্রাকৃতিক তথা ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে কথা বলে। মিল্টন যে তার নিজের পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা'কে ঘুমের অতিরিক্ত ডোজ খাইয়ে মেরে ফেলেছিলন, সেই রহস্যের কথাও লোকটি জানে। মিল্টনের উদ্দেশ্য ছিল পক্ষাঘাতগ্রস্ত মায়ের কষ্ট লাঘব করা। টি-শার্ট পরা লোটির আগমনও একটা অলৌকিক ব্যাপার। কেননা মিল্টনের স্ত্রী ছন্দা লোকটির অস্তিত্ব টের পায় না। ছন্দা স্বামীর চিকিৎসা করায়। সুস্থ হয়ে মিল্টন আবার লিখতে বসেন। প্রবন্ধের এক জায়গায় যখনই লিখলেন 'মানুষই ঈশ্বর', অলৌকিকভাবে লেখা ওঠে 'মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি'।

এই গল্প পড়ে পাঠকের স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে গল্পকার এখানে তার আস্তিকতার তথা নিজের বিশ্বাসের পক্ষ নিয়েছেন। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে এই গল্পের এতটা সরলীকরণ সম্ভব না। এখানে মিল্টন মননশীল, যুক্তিবাদী ও প্রজ্ঞাবান মানুষের প্রতিভূ। মানুষ ভজনাই তার কাজ। মানুষের ক্রমবর্ধমান বিকাশ ও অভিজ্ঞতায় তার আস্থা। সেই আস্থা ও অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে অতি-প্রাকৃতিক ঈশ্বরে বিশ্বাস না করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষের নিজের অস্তিত্বের ব্যাপার-স্যাপার কেবলি বস্তুতান্ত্রিক ব্যাখ্যায় সুরাহা হয় না। আমরা যতই অলৌকিকতাকে অস্বীকার করি, আমাদের মনস্তত্ত্বে তার অভিঘাত অনিবার্য। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এই দ্বান্দ্বিকতা সৃষ্টিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষের অনিবার্য নিয়তি। আমার মনে হয়েছে এই দার্শনিক অভিপ্রায় গল্পের সারবস্তু। ফলে গল্পকার পক্ষপাতদুষ্ট নয়। আবার এ কথাও বলা যায় যে, চেতন-জগতে মিল্টন অবিশ্বাসী। কিন্তু অবচেতনায় সে বিশ্বাসের আয়ত্তে। এই উভবলতাও গল্পের থিম হিসেবে কেউ কেউ ভাবতে পারেন।

জাদুবাস্তবের ঘোর লাগা একটি অসাধারণ গল্প 'বিস্মৃতি'। এই গল্পের একটিই চরিত্র। গল্পে তার নাম দেওয়া হয় নি। গল্পকার তৃতীয় পুরুষ ব্যবহার করে কাহিনি বর্ণনা করেছেন। 'সে জেগে আছে না স্বপ্ন দেখছে ঠিক বুঝতে পারছে না' এই বাক্যেই গল্পের শুরু। তারপর স্বপ্নে বা অবচেতনায় সে যখন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে তখন একটা দৃশ্যে তার চোখ আটকে যায়। 'এক ষোড়শী মাতা তার পুত্রকে স্তন্য পান করাচ্ছে'। এই মায়ের ঠোঁটের বাম দিকে একটা তিল আছে আর শিশুর হাতে আছে ছয়টি আঙুল। সিঁড়ি বেয়ে সে আরও নিচে নামতে থাকে। বহু জাদুকবলিত দৃশ্যের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে সে কামতৃপ্ত এক রমণীর পাশে নিজেকে আবিষ্কার করে। ত্রিশোর্ধ এই রমণীর ঠোঁটের বাম পাশে একটি তিল। তারপর আরও দৃশ্যপট পেরিয়ে গেলে আস্তাবলে সে একটি ঘোড়াকে পায়। ঘোড়ায় চড়ে সে আসলে একটা শহর পার হয়ে পূর্ব দিকে ধেয়ে চলে। লাগাম ধরা তার ডান হাতে মূলত ছয়টি আঙুল।

এই গল্পে পাঠক এক ধাঁধাঁর জগতে বিচরণ করবেন। ষোড়শী মা যে শিশুকে স্তন্য পান করায় তার সঙ্গে ত্রিশোর্ধ রমণীর মিল আছে। উভয়ের ঠোঁটের বাম পাশে একটি তিল। শিশুটির সঙ্গে মিল আছে গল্পের একমাত্র চরিত্রেরও। উভয়ের হাতে ছয়টি আঙুল। এ যেন সন্তান ও মায়ের যথাক্রমে প্রেমিক ও দয়িতায় রূপান্তর। অজ্ঞাতসারে ইডিপাস যেমন মাতৃসম্ভোগের দায়ে পড়ে, এই গল্পে সেরকম একটি জটিলতা ইঙ্গিতময় হয়েছে। জটিলতার কারণ হলো গল্পে বর্ণিত এই 'সে' উল্লেখিত দুই নারীর কারোর সঙ্গেই তার নিজের সম্পর্ক নিরূপণ করতে পারে না। হতে পারে আধুনিকোত্তর সময়ে মানুষের সম্পর্কের নিগূঢ় সঙ্কটকে তিনি এই গল্পে প্রতীকায়িত করেছেন। আর মানুষ তো এখন বড় স্বপ্নবাজ। স্বপ্নের অতল যাত্রায় মানুষের যে-বন্দিত্ব তাকেও ইঙ্গিতময় হতে দেখি।

প্রেম ও যৌনতা কায়সার আহমদের গল্পে অন্যরকম মাত্রা পেয়েছে। আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের প্রাত্যহিকতার অনুষঙ্গেই এসব বর্ণনা করেন তিনি। কিন্তু সেই বর্ণনা এবং ঘটনার আবর্তে এমন এক বিশ্বস্ততার আঁচ লাগে যে পাঠক সেই গল্পে একাত্ম হতে পারেন। যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি, হরহামেশাই ঘটে এমন ব্যর্থ প্রেমের ট্র্যাজিক অনুভব, সাংসারিক জীবনের অনটন ও স্বামী-স্ত্রীর মানসিক দ্বন্দ্ব, পিতামাতার স্বপ্নভঙ্গ ও আত্মত্যাগ ইত্যাকার নানাবিধ প্রসঙ্গে পাঠক নিজেকে খুঁজে পাবেন। পারিবারিক গোপনতায় যে-অপরাধ লুক্কায়িত তার চমকপ্রদ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের গার্হস্থ্য জীবনের রহস্যকে চিত্রিত করেন। যৌনতার বর্ণনায় লেখক যে দ্বিধাহীন অথচ পরিমিত বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন তা সিদ্ধহস্ত গল্পকারের পরিচয় বহন করে। নিজের কাজিনকে নিয়ে অসুস্থ স্ত্রী মিলার সন্দেহ ও অসভ্য গালাগাল থামাতে প্রথমে স্বামীর চড় দেওয়া এবং অতঃপর আদরের ছলে ওষুধ খাওয়ানো ও শেষটায় যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ায় যে-পরিণতি পায় 'বিষণ্নতা' নামক গল্পটি, তা কোথাও আরোপিত মনে হয় নি। এই গল্পের বাস্তবতা হলো যৌনতাই বিষণ্নতার আপাত নিরাময়। 'পারফিয়্যুম' গল্পেও শারীরিক ও যৌনতার বর্ণনা কাহিনির অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে। তাই কোথাও সাবলীলতায় বাধা পড়ে নি। এই গল্পে নাজের সঙ্গে ইরার প্রেম ব্যর্থ হয়। নাজ যৌন তাড়নায় ইরার শরীরের নানা অঙ্গ স্পর্শ করেছে ঠিকই কিন্তু চূড়ান্তভাবে ভোগ করতে পারে নি। ইরার কাছে সে কথা দিয়েছিল অন্য কোনো নারীকে সে স্পর্শ করবে না। নাজ কথা রাখতে পারে নি। বন্ধু রাখালের প্ররোচনায় ইস্কাটনের এক হোটেল বালিকাকে সে ভোগ করে। ইরার কাছে যা সে পায় নি, হোটেল-বালিকা টাকার বিনিময়ে তাকে তা-ই দিয়েছে। ইরাও অবশ্য কথা রাখে নি। অন্য ছেলেকে বিয়ে করেছে। উভয়ের প্রেমের মধ্যে কমিটমেন্টের অভাব ছিল। নাজ অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে আর ইরা নাজকে ঠকিয়ে স্বাবলম্বী ছেলেকে বিয়ে করেও কোথায় যেন অনুশোচনাহীন। তবু এই গল্পকে ব্যর্থ প্রেমের গল্প বলা যাবে না। ইরার বান্ধবী মিতা যে-ছেলেকে ভালোবেসেছিল, সেই ছেলে মিতাকে ছেড়ে যায়। মিতা নাজের কাছে হৃদয়জ আশ্রয় খুঁজে পায়। নাজও ভুল শোধরাবার অবলম্বন পায় মিতার কাছে। ব্যর্থতা এখানে পূর্ণতায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে। যদি সততার প্রশ্নে আসি তবে বলতেই হবে ইরা এবং নাজ পরস্পরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে নি। বরং জীবনের পক্ষেই থেকেছে। লেখকও সৎ থেকেছেন জীবনের দিকে। তাই প্রেমের কৃত্রিম মহত্ত্ব ডিঙিয়ে মিতাকে এনে দুই পরাজিত হৃদয়ের মিথষ্ক্রিয়া ঘটিয়েছেন। এই প্রতিস্থাপন তাই সত্যিকারের জীবনের গল্প হয়ে উঠেছে। সঙ্কট উত্তরণে জীবন তো কোনো না কোনো মীমাংসার দিকেই যেতে চায়। ইরা নাজ আর মিতার জীবনের মীমাংসা বরং সুখকর।

'পলাতক' গল্পেও এরকম এক মিলনমধুর মীমাংসা আছে। কাহিনি যদিও 'পারফিয়্যুম' গল্পের প্রায় বিপরীত। তন্বীকে ঠকিয়েই লেখক সফলতার খোঁজে আমেরিকায় প্রবাসী হয়েছিলেন। ক্যাথেরিনকে বিয়ে করেছিলেন। ওই আমেরিকান নারী তাকে ছেড়ে চলে যায়। তন্বীর বিয়ে হয় এক বড় লোকের সঙ্গে। সেও সুখী হয় না। লেখক তন্বীকে ফিরে পাওয়ার গোপন আকুতি নিয়ে দেশে আসে। কিন্তু আশাহত বেদনায় আবার ফিরে যেতে চায়। বিমানবন্দরে পৌঁছতেই তন্বীর ফোন তাকে চমকে দেয়। তন্বী তার স্বামীকে ছেড়ে চলে এসেছে। ক্লাসমেটকে বিয়ে করতে পারবে বলে তন্বীর স্বামীও খুশিই হয়। তারপর পরস্পরের সেই কাঙ্ক্ষিত মিলন। এই গল্পেও কেউ কারো সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। যা ঘটেছে তা না ঘটলেই বরং জীবনের প্রতি নির্দয়তা হতো। এই যে অন্য কোনো বাহ্যিক দায় নিজের ওপর না চাপিয়ে জীবনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, এটি কায়সার আহমদের গল্পের পাত্রপাত্রীদের এক বিশেষ গুণ। এই গল্পে প্রেম ও জীবন একাকার হয়ে গেছে। তাদের পক্ষে অন্যথা করার উপায় ছিল না। অনন্যোপায় তাদের জীবন তাই প্রেমের মিলনকেই বেছে নিয়েছে, বিচ্ছেদকে নয়।

'মাতা ও পুত্র' গল্পটি ভিন্ন আঙ্গিকের। খিলগাঁওয়ের একটা সরু গলির ভেতর পাঁচতলা আবাসিক ভবনে আগুন লাগে। এই ভবনের তিন তলায় মা-বাবাকে নিয়ে বাস করে ইমরান। সে ভার্সিটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। যখন আগুন লাগে, বাবা তখন অফিসে। মায়ের প্রতি ইমরানের ভালোবাসা অস্বাভাবিক রকমের। এই ভালোবাসা ইডিপাস কমপ্লেক্সও হতে পারে। বেলকনির পাশে যে-পাইপটা আছে সেটা দিয়ে নিচে নেমে যেতে পারে ইমরান। আগুনের হল্কা কিছুটা গায়ে লাগলেও সে বাঁচতে পারেবে। কিন্তু মা'কে ছেড়ে সে যাবে না। মায়ের পা ভাঙা। তিনি বিছানায় শায়িত। এর পরই গল্পে ফ্ল্যাশব্যাক চলে আসে। পায়েলকে ভালোবাসে ইমরান। কিন্তু ইমরান কখনো সে কথা পায়েলকে বলতে পারে না। ইমরানের বিবাহিত এক ভাই ও বোন আছে। ভাই যে টাকা দেয় সেটা পর্যাপ্ত নয়। ফলে সে টিউশনি করে। আগুন লাগার কাহিনি আসার আগেই সে শেষবার চেষ্টা করে পায়েলকে ভালোবাসার কথাটা জানাতে। না, সেদিনও সে বলতে পারে নি। বাবার অসুস্থতার কারণে পায়েল হাসপাতালে চলে যায়। দেড় ঘণ্টা পর দমকল বাহিনী আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। এর আগে তিন তলার বেলকনিতে একজন যুবককে ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে জনতা। সে ব্যালকনির পাশের পাইপ দিয়ে নিচে নেমে আসে। জনতা তাকে এম্বুলেন্সে তুলে দেয়। কিন্তু তিন তলা থেকে দুটি ও চারতলা থেকে একটি অঙ্গার হয়ে যাওয়া মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। দেখা গেল তিনতলা থেকে উদ্ধারকৃত মৃতদেহ দুটি পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।

গল্পকার কায়সার আহমদ অমীমাংসিত রহস্যে পাঠকদের আটকে রাখতে পছন্দ করেন। এতে পাঠকের মনস্তত্ত্বে একটা টেনশন কার্যকর থাকে। টেনশনে রাখার এই অভিপ্রায় কতটা নান্দনিক সম্ভাবনা নিয়ে টিকে থাকে সেটা যাচাই করাই হয়তো লক্ষ্য তার। সেক্ষেত্রে গল্পকার বহুলাংশে সফল বলে মনে করি আমি। এই গল্পে জনতার চোখ দিয়ে দেখা দুটো দৃশ্যের অবতারণা করে লেখক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থেকেছেন। কোনো বাসাবাড়িতে আগুন লাগলে এর কারণ হিসেবে নানা রকম গুঞ্জরণ আমরা শুনতে পাই। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মর্মান্তিক দৃশ্যের বর্ণনাসহ বিভিন্ন গুজব, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট অভিমত বিভিন্নভাবে জনতাকে তাড়িত করে। তাই বর্ণিত দু'টো দৃশ্য লেখকের বস্তুনিষ্ঠ পরিবেশনাকে নিশ্চিত করে। তিন তলার ব্যালকনির পাশের পাইপ দিয়ে নেমে আসা যুবকই কি ইমরান? নাকি পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে রাখা ঝলসানো লাশ দুটোই ইমরান এবং তার মা? ইমরান তো আবার অনেক বেশি মাতৃভালোবাসাপ্রবণ। হতে পারে বাঁচার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে মা'কে ছেড়ে যেতে চায় নি। মাকে জড়িয়ে ধরে মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু কোনোটাই নিশ্চিত বলা যায় না। 'অশরীরী পিতা' গল্পেও এরকম একটা অমীমাংসিত রহস্য আছে। আমীন তার অসুস্থ বাবাকে জিম্মি করে ঢাকার দুটি ছয় তলা বাড়ি নিজের নামে লিখে নেয়। চার বোনকে ঠকিয়ে বাড়ি দুটো লিখে নিলেও তার আত্মিক শান্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। বাবার মৃত্যুর পর অশরীরী আত্মা হিসেবে বাবা আমীনকে মানসিকভাবে বিব্রত করতে থাকে। এক সময় বাবার ঘর থেকেই আমীনের লাশ বের করা হয়। ডাক্তারের মতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তার গলায় দুটো আঙুলের ছাপ কেউ লক্ষ্য করল না। পাঠকের মনে এ নিয়ে যে এক রহস্য দানা বাঁধে। আর এই রহস্যই এই গল্পকে গল্প করে তুলেছে। যেমন 'মাতা ও পুত্র' গল্পে দুটো দৃশ্যের মীমাংসা হয়ে গেলে গল্পটি শৈল্পিকভাবে এতটা উপাদেয় হতো না। ফর্মের দিক থেকে তার গল্পে একটা পরিকল্পনার ছাপ থাকলেও বর্ণনাভঙ্গিতে স্ফূর্ততার অভাব নাই। আবার রহস্যের ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে তার গল্পে কেউ কেউ হুমায়ূন আহমের দূরবর্তী প্রভাব আবিষ্কার করতে পারেন। এও সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়াবে না যে, হুমায়ূনের হিউমার এবং ভাষার নিরীহ সহজতাকেও গ্রহণ করেন নি কায়সার আহমদ। তার ভাষা এবং চরিত্রের নির্মাণ অনেক বেশি সিরিয়াস। তার গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্যেও একটা কম্পারেটিভ স্টাডি সম্ভব। যেমন 'অশরীরী পিতা' গল্পে আমীনের অপরাধবোধ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব হিসেবে হাজির হয়। পাপের পরিণাম হিসেবে তা যেন তাকে মৃত্যু অবধি নিয়ে গেছে। এই মৃত্যু একটা ডিভাইন পানিশমেন্টের মতো আসে বলে পাঠক আমীনের জন্য সহানুভূতিশীল হতে পারে না। কিন্তু 'সাধারণ/অসাধারণ' গল্পে অধ্যাপক নূর মেধাবী ছাত্রী সোহানাকে ধর্ষকদের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারে নি বলে তারও অপরাধবোধ কাজ করে। সোহানা তাকে ভীরু, কাপুরুষ বলে ভর্ৎসনা করে যায় এবং অতঃপর আত্মহত্যা করে। সমাজের একজন সচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ হিসেবে সোহানাকে উদ্ধারের কার্যকরী ভূমিকা নিতে না পারার মতো অক্ষমতায় বা তাকে বাঁচাতে না পারার চরম বেদনাবোধে মনস্তাত্ত্বিকভাবে নূর খুব কাবু হতে থাকে। এক সময় সে নিজেও স্বেচ্ছামৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। তার অক্ষমতা, ভীরুতা কিংবা কাপুরুষতা অন্য কোনো সাধারণ মানুষের মতোই। কিন্তু মানসিক দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠাই নূরকে অসাধারণ করে তুলেছে। আমীনের সঙ্গে এই জায়গায় তার পার্থক্য। আত্মহত্যা কিছুতেই কাম্য নয়, সেটা ঠিক। তবে আত্মহত্যার মধ্য দিয়েই নূর পাঠকের শিল্প-সহানুভূতি কাড়ে। এরকম আরও একটি মহৎ আত্মহত্যার গল্প 'ফ্ল্যাট'। ক্যান্সার আক্রান্ত পিতা পেনশনের সমুদয় টাকা নিজের চিকিৎসায় ব্যয় করবেন, তা ভাবতে পারেন না। ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বেছে নেন। আর্থার মিলারের ডেথ অফ এ স্যালসম্যান নাটকের স্যালসম্যান তো দুই ছেলের 'ড্রিম অফ সাকসেস' পূরণ করতে নিজের নষ্ট গাড়ি চালিয়ে আত্মহত্যাই করেছিলেন। ভেবে ছিলেন সে মরে গেলেই ইন্সুরেন্সের টাকা পেয়ে আর্থিক সফলতা পাবে তার দুই পুত্র। মধ্যবিত্তের জীবনে এমন মর্মান্তিক আত্মত্যাগ হয়তো সব দেশেই ঘটে থাকে। 'প্রতারিত' এবং 'ভুল মানুষ ভুল সময়' গল্প দুটো পরকীয়া থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও মনস্তত্ত্বকে ইঙ্গিত করেছে। প্রথম গল্পে স্ত্রীর পরকীয়ায় মানসিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে ক্ষমাই করে দেয়। যৌন সমস্যা না থাকলেও তার কোনো একটা সমস্যা আছে। যে কারণে সে স্ত্রীর সন্তান ধারণে সহায়ক হতে পারবে না কোনোদিন। ফলে স্ত্রী যখন তার খালাত ভাইয়ের সঙ্গে ঘর করতে চলে যায়, তখন হৃদয়ের শত অভিযোগ ও হাহাকার নিয়েই সে তার জন্য শুভ কামনা করে। তার অক্ষমতার পরিণাম তাকে ট্র্যাজিক চরিত্র করে তোলে এই গল্পে। দ্বিতীয় গল্পটিও এক অর্থে প্রতারণার গল্পই। স্বামীর অজান্তে নিশাত ভাবী সাগরের সঙ্গে যে-পরকীয়ায় মাতে তা তো বৈবাহিক চুক্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। প্রথমটায় নিশাত ভাবীর সঙ্গে যৌনসম্ভোগের সুযোগ হয় নি সাগরের। কিন্তু ব্যাঙ্ককে ভাবীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়ার সুবাদে সাগর সেটা চরিতার্থ করতে পারে। 'প্রতারিত' গল্পের মতো এখানে কারোর হাহাকার পরিলক্ষিত হয় না। তবু একজন ট্র্যাজিক চরিত্র এখানেও আমরা আবিষ্কার করতে পারি। গল্পের বাইরের সেই ট্র্যাজিক চরিত্র নিশাত ভাবীর স্বামী।

কায়সার আহমদ তার গল্পে বিভিন্ন মিথ ও বিশ্বসাহিত্যের পাঠ থেকে পরোক্ষ উল্লেখ করেছেন। গল্পের বিষয় ও চরিত্রের নানা টানাপড়েনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তা যেমন গল্পকে সমৃদ্ধ করেছে তেমনি লেখকের মুন্সিয়ানাও প্রদর্শিত হয়েছে। হারুকি মুরাকামির লেখায় এই দক্ষতা আমরা প্রায়শ দেখে থাকি। তবে যেখানে ভাষাকে অহেতুক কাব্যিক করে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন কায়সার আহমদ, সেখানেই তার লেখার স্ফূর্ততার গুণটিকে ব্যহত হয়েছে কিছুটা হলেও। অন্যথায় গল্পে তার দার্শনিক মনোবৃত্তি, সংহত ফর্মের সঙ্গে বোঝাপড়া, ভাষার সাবলীলতা, ভাবের বৈচিত্র্য ও বিষয়ের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য মিলিয়ে আমরা পাঠক হিসেবে যা পাই, তা এক কথায় অনন্য শিল্পিত সঞ্চয়।

কাজী নাসির মামুন

কাজী নাসির মামুন

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও...বিস্তারিত