সজল সমুদ্র
২২.১২.২০১৩
সাধারণত শেষরাত্রি বা খুব ভোরে উঠে লেখার অভ্যাস আমার। সেদিনও টেবিল-ল্যাম্পের মৃদু আলোয় বসে লিখছিলাম। বাইরে প্রচণ্ড শীত। সকালে ঘুম থেকে জেগে বিছানায় শুয়েই বউ বললো—'এতক্ষণ ধরে বসে আছো, চুলায় একটু জল-টল তুলে দিলেও তো এতক্ষণে গরম হতো!'
শুনে মনে হলো, কয়েক কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে একটা বজ্র এসে মাথায় পড়লো! দেখলাম—বিছানায় শুয়েই আছি। পরে মনে হলো—ধুর, আমি তো বিয়েই করি নি! হোক তা স্বপ্ন, তবু এই দৃশ্য দেখার পর বিয়ে করার ইচ্ছাটা একপ্রকার খুব প্রিয় কোনো গ্রন্থের মতো আলমারিতে তুলে রেখে দিয়েছি! মাঝে মাঝে পড়তে ইচ্ছা হয় বটে, সময় হয় না...
♦ ‘শাহবাগ’ এসে কিছু লোকের আসল চেহারা দেখালো। রামু ও যশোরের ঘটনাও দেখালো কিছু। বিশ্বকাপ এসেও তা-ই ♦
২৭.১২.২০১৩
মনে পড়ে, আট বছর বয়সে, বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে থাকতে হয়েছে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১। দিনহাটা, কোচবিহার, দার্জিলিং। মামা-খালার বাসা। জ্বর হতো প্রায়ই, অস্বাভাবিক। তারই চিকিৎসা। সেখানে তিনটি বছরে মামাতো-খালাতো ভাই-বোনের বাইরেও বন্ধুত্ব হয়েছিল বাসুদেব, পার্বতী, মোস্তাক, রণবীর, হিমাদ্রী, চারুলতার সাথে। ৯১-এ যখন দেশে আসি, এসে কয়েকটা দিন খুব বন্ধুহীন। বুকফাটা কান্না। তবু বাসুদেব-মোস্তাক, হিমাদ্রী-চারুলতা—কেউই এলো না। পরে, সবই সয়ে গেল। এমনকি, আরো পরে খালাতো বোনের মুখে শোনা—চারুলতার আত্মহত্যাও... 
এইভাবে, প্রাইমারি ছেড়ে হাইস্কুল, হাইস্কুল ছেড়ে কলেজ—কতজনকে ভুলে যেতে হলো! কত প্রিয় মুখ! বিশ্ববিদ্যালয়ে, সাত বছরের জীবন। সেখানেও গড়া আর ভাঙা। চিন্তায়, আদর্শে, চর্চায়। পেশাগত ক্ষেত্রও তার ব্যতিক্রম হলো না, লেখালেখিও নয়। ‘শাহবাগ’ এসে কিছু লোকের আসল চেহারা দেখালো। রামু ও যশোরের ঘটনাও দেখালো কিছু। বিশ্বকাপ এসেও তা-ই। ফিলিস্তিনে, ইসরায়েলের জঘন্য, ন্যাক্কারজনক হামলাও দেখিয়ে দিলো বন্ধুদের উদার কিংবা কুৎসিত মুখের রূপটি...
জীবন আদতে একটা চলন্ত গাড়ির আসন; কেউ একজন কোনো স্টপেজে নেমে গেলে, অন্য কেউ এসে ঠিকই বসে পড়ে!
♦ তারপর এই তো ঘুরছি-ফিরছি। হাত না-থাক, দিব্যি হাত হারানোর গল্প লিখছি ♦
৩০.১২.২০১৩
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনগুলোর কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। খুব পীড়া দেয়। গবেষণা করবো বলে আগে থেকেই সিকদার আমিনুল হকের কবিতাকে পছন্দ করে রেখেছিলাম। সে অনুযায়ী ‘সিনোপসিস’ হিসেবে ছোটখাটো একটা প্রবন্ধও লিখে ফেলি। কিন্তু সুপারভাইজার হিসেবে যিনি সম্মতি দিয়েছিলেন, তাঁর পছন্দ শামসুর রাহমান। আমার প্রস্তাব শুনে তিনি বলেছিলেন—‘ও, সিকদার ক্যানো, রাহমান করো!’ আমি বিনীতভাবে বলেছিলাম—‘স্যার, হুমায়ূন আজাদের ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’র পর শামসুর রাহমানকে নিয়ে আর কোনো কাজের দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না।’ না, স্যারকে কিছুতেই রাজি করাতে পারলাম না। শেষে গবেষণাই বাদ। স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে রাগে-দুঃখে-অভিমানে কয়েকমাস খেটে লেখা আমার প্রবন্ধের একমাত্র কপিটিও ছিঁড়ে ফেললাম।
তারপর এই তো ঘুরছি-ফিরছি। হাত না-থাক, দিব্যি হাত হারানোর গল্প লিখছি। আয়না-সংক্রান্ত বিবাদগুলো কাচের দোকানে জমিয়ে রাখছি। আর অনর্গল লিখে যাচ্ছি কীটপতঙ্গের রাশিফল। বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে একখানা আধা-রোমান্টিক উপন্যাস লেখার কথাও ভাবছি! দিন বদলে গেছে। তোমাকে উল্টো করে ধরার সময় হয়েছে, দূরবীন।