সজল সমুদ্র
'লিটল ম্যাগাজিন' ও 'আন্দোলন'—এই আন্তর্জালিক যুগের বাস্তবতায় ব্যাপারটা আপনি কিভাবে দেখেন? এই আন্তর্জালিক যুগের বাস্তবতায় লিটলম্যাগ কি তার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে? যদি তা-ই হয় তবে বলতে হবে এখন চলছে লিটলম্যাগের স্বর্ণকাল। কেননা ক্রান্তিতেই লিটলম্যাগের সর্বোত্তম উত্থান হয়।
হোসেন দেলওয়ার
লিটলম্যাগ-এর আবেদন সার্বজনীন—কি চোখে রাখার সুখ কি হাতে নেড়ে দেখার সুখ—আর ভালো একটি সংখ্যা তো শেল্ফের সুসজ্জিত তাকে স্থান পায় বারবার পড়ে দেখার জন্য। ওয়েবম্যাগ-এর বিকল্প কিভাবে হবে—অথবা হওয়া আদৌ সম্ভব কি? লিটলম্যাগ আন্দোলন... আগে তো আন্তর্জালিক ব্যাপার ছিল না... অর্ন্তজাল প্রিন্টেট লিটলম্যাগের বৈরী শক্তি নয়—বাধা দিলে বাধবে লড়াই—লড়াই অবশ্যম্ভাবী। কারণ আপনি প্রচলিত বিশ্বাসকে উপেক্ষা করছেন। বহুল প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শে আপনার আস্থা নাই। প্রতিষ্ঠান আপনাকে প্রশ্রয় দেবে? কখনোই না।
তাই লিটলম্যাগ শব্দটির সাথে আন্দোলন শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কি সামাজিক আন্দোলন কি শিল্প-সাহিত্যের আন্দোলন। সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতেও লিটলম্যাগ আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। কারণ সামাজিক আন্দোলনগুলোও কখনো কখনো সাহিত্যের স্রোত হিসেবে বিবেচিত হয়। স্পেনীয় গৃহযুদ্ধ কিংবা বাস্তিল দুর্গের পতন শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমের মতো কবিতাকেও কি নাড়িয়ে দেয় নাই?
প্রতিটি শিল্প-আন্দোলন উন্মেষকালে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়েছিল প্রচলিত মূল্যবোধ ও মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকদের কাছে। এখানে এন্টি-এস্টাবলিশমেন্টের প্রসঙ্গটি এসে পড়ে। লিটলম্যাগ এন্টিএস্টাবলিশমেন্টকে হৃদয়ে ধারণ করে। এটি প্রচলকে উপেক্ষা করে। প্রচলিত বিশ্বাসকে ভেঙেচুরে দিতে চায়। তাই লিটলম্যাগ এক দ্রোহ।
বড় কাগজ এটি কখনোই পারবে না—কারণ তার থাকে বাণিজ্যে লোকসানের ভয়, বাজার হারানোর ভয়। তাই একটি শুদ্ধ লিটলম্যাগ কখনো বাণিজ্যিক হতে পারে না।
কবিতাপত্রের সর্বশেষ সংখ্যা
সজল সমুদ্র
সব লিটল ম্যাগাজিনেরই নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য থাকে। 'কবিতাপত্র'-এর লক্ষ্যগুলো কী বা কেমন...
হোসেন দেলওয়ার
কবিতাপত্রের উদ্দেশ্য বলতে হলে এর উত্থানপর্ব বা জন্মরহস্য সম্পর্কে বলতে হবে। অনেকটা খেয়ালের বশে এর প্রথম ২টি সংখ্যা বের হয়। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। মোটামুটি টঙ্গী এবং ময়মনসিংহের লেখকরা এখানে স্থান পায়। ৩য় সংখ্যা বের হবার পূর্বে আমার তারুণ্যের সাথি, বন্ধু, অমিত্রাক্ষর সম্পাদক কবি আমিনুর রহমান সুলতানের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ঐ সময়ের তরুণ এবং অতি-তরুণ কবিদের সাথে পরিচিত হই। প্রচ্ছদশিল্পী পাল্টে যায়। প্রথম ২টি সংখ্যার প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন স্বর্গত মানবেন্দ্র সুর। ৩য় সংখ্যা থেকে প্রচ্ছদ করছেন সব্যসাচী হাজরা।
ট্রেসিংয়ের জায়গা পাল্টে যায়—শাহবাগের কালজয়ী থেকে শাহবাগের কবি ও সম্পাদক আহমেদুর রশিদ টুটুলের শুদ্বস্বরে চলে আসি। আরো কিছু নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। উত্তরা সেক্টর ১৩-তে কবি মারুফ রায়হান এবং তার পাশের গলি থেকে আসেন কবি সোহেল হাসান গালিব—উত্তরায় শান্তা মারিয়ামের পাশে 'কবিতাপত্র'কে নিয়ে আড্ডা শুরু হতে থাকে—পাশ্ববর্তী সেক্টর থেকে আসেন কবি মাজুল হাসান—এবং আমার প্রত্যাশার চেয়েও ৩য় সংখ্যা বেশি ভালো হয়ে যায়। এইভাবে দেখা যায় প্রথম থেকে নয়, কিছুদূর হাঁটার পরে কবিতাপত্রের লক্ষ্য তৈরি হয়।
এখন কবিতায় আত্মমুগ্ধতা বেড়ে গেছে—সেই সাথে আত্মমুগ্ধ কবিদের সংখ্যা। এইসব কবিদের ডানা পিঁপড়ের মতোই হ্রস্ব। অ্যালবাট্টসের দীর্ঘ ডানা এরা কখনোই পাবে না। এরা পরস্পর পরস্পরের কবিতার গুণমুগ্ধ পাঠক। আত্মমুগ্ধ এইসব কবি ভোগ করবে নার্সিসাসের করুণ পরিণতি।
এক সময়ে এদের কেউ কেউ কবিতাপত্রে লিখত। কবিতাপত্র এইসব আত্মমুগ্ধ কবিদের এখন বর্জন করছে। কবিতাপত্র কোনো প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয় না। প্রচলের বাইরে এর অবস্থান। এটি মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয় না। এটি মুক্তমনাদের প্লাটফর্ম।
সজল সমুদ্র
লিটল ম্যাগাজিনের গোষ্ঠীবদ্ধতাকে আপনি কিভাবে দেখেন? মানে, এটা থাকা উচিত কিনা? যদি মনে হয় উচিত, তাহলে এর পেছনে যুক্তিগুলো কী? কিংবা যদি বলা হয়, উচিত নয়, তাহলেই বা যুক্তি কী?
হোসেন দেলওয়ার
লিটলম্যাগ লেখকের প্রস্তুতির জায়গা। এখানে গোষ্ঠীবদ্ধতা থাকা উচিত নতুবা বিশ্বাসের জায়গাটি তৈরি হবে না। সেই অর্থে গোষ্ঠীবদ্ধ থেকেও কবিতাপত্র বেশ খানিকটা স্বাধীনতাই ভোগ করে। তা হলো নতুন লেখককে সুযোগ করে দেয়া। প্রতিষ্ঠান কখনো নতুন কবিদের কবিতার এক্সপিরেমিন্টের স্থান দেবে না।