অদল-বদল ও অন্যান্য কবিতা

নিঃশব্দে

. নিজেকে একবার লোহা ভেবে দেখলাম, দূর কামারশালায়— গনগনে আগুনে পুড়িয়ে সকাল-সন্ধ্যা আমাকে চারজন পেটালো। খণ্ড খণ্ড করলো। ছুরি বানালো, দা বানালো কেউ; কুড়াল, চাপাতিও। তারপর বহুখুন, বহুরক্তগঙ্গার পরে, হাতে হাতে ঘোরাচ্ছে এখন। পনের বছর, হৃদয়ে তুমি যা নিঃশব্দে করে চলেছ...

ধোঁয়া

. এখন যে কাউকে ভাবলে স্বপ্নে তাকে পড়ে যেতে দেখি; অথবা সে জামা হয়ে ধুয়েমুছে নিজেকেই হ্যাঙারে টানিয়ে রোদে দিচ্ছে, কবেকার ছিঁড়ে যাওয়া আস্তিন সেলাই করছে, ছাইরঙা বোতাম লাগিয়ে নিচ্ছে, তারপর খুব আহ্লাদে লন্ড্রি করছে নিজেকেই আমাদের মাঝখানে অবিচল আজ তারই ধোঁয়া উড়ছে...

ঠনঠন-পাখি

. পাহাড়ে ওঠার দাবি থেকে তুমি ইদানীং নামতে শুরু করেছ। চাঁদ খুলে আজ তাই জ্যোৎস্না গুছিয়ে রাখছি। চাবি হারানো তোমার বন্ধ তালাটি এবার হয়তো পথে পাওয়া চাবিতেই খুলে যাবে। জং-ধরা তোমার বাড়িটি আবার দাঁড়াবে রোদে; সকালে-সন্ধ্যায় অহংকার ও পতনের বাইরেও চিরকাল কিছু ফুল ঝরে যায়, কিছু অশ্রু, কিছু বৃষ্টি, দুটো-একটা ময়ূরের নীলাভ পালক, আর শূন্যকুম্ভ থেকে চিরদিন উড়ে যায় ঠনঠন-পাখি...

শূন্য

. মনে হয় তোমার গলা শেষরাতে সাপ হয়ে বেরিয়েছে তাই আজ এত নির্জন চারপাশ; এত উঁচু নীরবতা— যেন পদ্ম ও জলের মাঝখানে টুপ করে বেঁচে আছি! সারাদিন রেডিও বেজেছে, তার ভেতরে সার্কাস চলেছে, দূরদেশগামী ক্লাউনের হাসি—সব হুবহু, একাকার শোনা গেছে... এই তো কোথাও সংবাদ শুরু হলো; খবর আসছে— নিউটনের তৃতীয় সূত্রটির মৃত্যু হয়েছে সাপের কামড়ে আমাদের পোষা পাখিটিকে তার ইনসেটে দেখা যাচ্ছে... কেবল তোমার নিখোঁজ গলা, রূপান্তরিত হাঁকডাক— পৃথিবীর কোনো বেতার-তরঙ্গে ধরা পড়ছে না...

বিচ্ছেদ

. দাঁড়-বিস্মৃত নৌকায় একদিন নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছি তারপর বহুদূরদেশ ঘুরে সে ফিরে এসেছে দরজায় তার মাথায় আজকাল অনর্গল পাখি বসে, মুখে দেখা যায়— বারমাসি মেঘ। অস্পষ্ট হাতের লেখার সাথে তাকে তুলনা করছে কেউ। কারো কারো সন্দেহ, তার জন্ম ইকারুসের ডানায়! যদিও সে ডিডেলাসের নাম শোনে নি, যদিও তার আর আমার মাঝখানে এখন শুয়ে থাকে নীলাভ ও বেগুনি রঙের দু'কোটি আলোকবর্ষের স্তব্ধতা! আপাতত, বন দিবস সামনে রেখে সবুজ-গোলাপি মিলিয়ে আমি একটি কাগজের খরগোশ বানাচ্ছি। বলাবাহুল্য, খরগোশটি দৌড়াতে পারে...

ক্লিক

. বন্ধু হচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে। রুদ্ধদ্বার খুলে যাচ্ছে। গ্রীষ্মে বসে শীতের ছবি দেখা যাচ্ছে, ভাবা যাচ্ছে। প্রেম থাকছে, ঘর ভাঙছে; দু'চোখের বিষ— কাছে আসছে। শত্রু জমছে দিনে দিনে, পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকছে ধূসর আততায়ী— একটি ক্লিকে এখন শুধু বৃষ্টি পড়াই বাকি...

অদল-বদল

. জলে পা ডোবানোর স্মৃতি আবার তোমার পাশে বসতে বলছে। ধীর গলায়, নিচু স্বরে। সন্ধ্যায় দুই দোয়েলের কথা যেভাবে হয়। যদিও উনিশশোনব্বই আজ লুপ্তপ্রায় নদী; তার ঢেউগুলো হয়তো বৃষ্টিবাহিত এইদিনে মৃত কোনো হাসের পালক হয়ে ঘুরছে কোথাও! যেভাবে গড়াতে গড়াতে বাঁশপাতা উড়ে চলে পাখির ভূমিকায়— সাতাশ বছর পরে বৃষ্টি হলে এরকম কোনো কোনো রাতে, মনে হয় মাছ হই, কারো কারো জালে ধরা পড়ি, ভূমিকা বদলাই...
ঈদসংখ্যা ২০১৮
সজল সমুদ্র

সজল সমুদ্র

জন্ম ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৮২; নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ। বাংলা ভাষা ও...বিস্তারিত