তীব্র ৩০ : চঞ্চল আশরাফের বাছাই কবিতা

চঞ্চল আশরাফ সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি, মুখ্যত কবি। কথাসাহিত্যে, বিশেষ করে সমালোচনা-সাহিত্যে তার প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত, নির্মোহ অবস্থান তাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রায় সুখ্যাতি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আছে কবিতা। দশকের পরিচয়ে তিনি নব্বইয়ের অগ্রগণ্য কবি। আজ ১২ জানুয়ারি ২০১৮, তার ৪৯-তম জন্মদিনে পরস্পরে মুদ্রিত হলো কবি-নির্বাচিত ৩০টি কবিতা।

চঞ্চল আশরাফের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৫টি। কবিতাগুলির রচনাকাল ১৯৯১-২০১০—এই বিশ বছর। আমরা তার দীর্ঘ কবিজীবন প্রত্যাশা করি। পরস্পরের পক্ষ থেকে কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।


রাত্রির উপাখ্যান


হাড়ের চেয়ারে ব’সে কেটে যায় রাত ওগো অন্ধকার, আমাকে আরেকবার করো আলিঙ্গন, হ্যাজাকের কর্কশ ম্যান্টেলে টক-টক গন্ধ পাচ্ছি, যে হলুদ রাস্তা দিয়ে ভেসে যায় কালোবৃত্তযান, আমি ব’সে আছি তার পাশে, হাড়ের চেয়ারে... বন্ধু, কণ্ঠের লেনদেন শেষ হয় নি এখনো? ধুলাদের আনাগেনা দেখি, এসো, কে তুমি? আমার বিষণ্ন সঙ্গীর স্তন উরুর উপর রেখে চামচে চামচে গেঁথে আধখানা কুণ্ঠিত চাঁদের মহিমাসহ লুকিয়ে ফেলেছ ঝোঁপে—আমি যে ফেলেছি দেখে, পেয়েছ কি টের? বাতিস্তম্ভে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না আর, আমাকে চুম্বন দাও শেষবার টকটকে ঈর্ষাকে এক ঢোঁকে গিলে আমি বায়ুবিদ্ধ পাতার মতো শূন্যে হেঁটে যাব, মাটিকে ছোঁবে না পা, এমন মহান! হাড়ের চেয়ারে ব’সে কেটে যায় রাত হাড়ের চেয়ারে ব’সে কেটে যায় রাত

একটি সভ্যতার শোকপ্রস্তাব


প্রতিটি সড়কে মেঘ ঝ’রে পড়ছিল আহা কালো নদীতে ভেসে যাচ্ছিল হাড়গোড় আহা বিদ্যুচ্চমকের মধ্যে হারানো চেহারা ভেসে উঠছিল আহা যাতে মৃতরা কবর থেকে উঠে আসে আর মুমূর্ষুর নিঃশ্বাস সমুদ্রে জমা হয় ওহ! জীবাশ্মের নিচে চাপা প’ড়ে যায় আমাদের কোট আর কার্ডিগান

বিলাসিতা


তিনি সবকিছু অগ্রিম চাইতেন : বৃক্ষের আগে ফল, সন্ধ্যার আগে চাঁদ— ঘুমের আগে স্বপ্ন, আর সূর্যের আগে সকাল। বিয়ের আগেই তিনি সন্তান চাইলেন, তার প্রেমিকা গর্ভবতী হলো। ঘরের আগে চাইলেন জানালা— আয়তাকার কাঠের ফ্রেমগুলি দুলতে লাগলো শূন্যে, আর ছাদের আগেই চাইলেন পাখা; গোল হয়ে ঘুরতে লাগল বাতাস যেদিন তিনি নিজের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখলেন তার চামড়ায় মালভূমির মতো ভাঁজ— মৃত্যুর মিস্ত্রিকে ডেকে তৈরি করলেন কফিন আর মসৃণ কবর। সেলাই না-করা শাদা পোশাকে শরীর গলিয়ে এক লাফে ডিগবাজি খেলেন কফিনে, আর জুতার শব্দের মতন হাসতে লাগলেন... তার প্রেমিকা ও সন্তানরা কাঁধে নিয়ে চলল তাকে, কবরের দিকে

শবযাত্রা


দ্যাখো যায়, অন্ধকার ঝুঁকে ঝুঁকে যায় হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ তুমি যার সে তো আর ছায়া নিয়ে যাবে না জলের পাশে চিতার পোশাক প’রে করবে না কখনো শিকার দ্যাখো যায়, শাদা শাদা অন্ধকার যায় হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ কোদালে উঠবে মাটি, লুপ্ত হবে সমূহ সমাধি পিঁপড়ার কোলাহল নেবে মৃত্যুর ভাগ, নেবে ঘুম মৃত্যু যার, সে কি তার নিঃশ্বাসে উড়িয়ে দেবে প্রাণভস্ম, অলীক খোলস? দ্যাখো যায়, অন্ধকার ঝুঁকে ঝুঁকে যায় হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ স্তম্ভ ডুববে জলে, প্রাসাদ যাবে ছিঁড়ে খয়েরি বাতাসে রোদের প্রহারে পণ্ড হবে স্মৃতিসভা, অশ্রুভোজ অশ্রু যার, সে কি তার রুমালে শুকাতে পারে ভেজা থাম, আমস্তক জল? দ্যাখো যায়, অন্ধকার ঝুঁকে ঝুঁকে যায় শাদা শাদা অন্ধকার যায় হাতে বাঁশ কাঁধে লাশ

ব্যবচ্ছেদ


হাত-পা ছড়িয়ে সে নিঃসাড় ডুবেছিল লবণ-দ্রবণে। কণ্ঠনালি থেকে বাতাসের ওঠানামা ছিল শুধু! এখন রয়েছে শুয়ে কদলিবাকলে, আলপিনে গাঁথা তার পুরোটা শরীর চামড়া ছাড়িয়ে রাখা হলো মাংসের পাশে। জল ভেঙে ভেঙে গতরাতে ছোট ছোট পায়ে তুমি গিয়েছিলে বহুদূর... স্বপ্নের ভেতর থেকে শোনা যায় জলশব্দ, হামাগুড়ি, নিদ্রিত রোদন

বিবাহ


এইখানে শ্লেষ্মাঝরা রাত, ভবিষ্যহীন সাক্ষাৎ আমাদের প্রজাপতির উড়ন্ত রঙ দেখে তুমি বলেছিলে বিবাহের কথা মর্গের ছাদের নিচে শুয়ে আছি; ময়না তদন্ত শেষে চ’লে যাব পৃথিবীর উপদ্রব থেকে যেভাবে প্রেমিক গণিকার টয়লেট থেকে চ’লে যায়                                          প্রেমিকার বিছানার দিকে তুমি-আমি কাঠ, জোড়া খুব লেগেছিল বিবাহপেরেকে চোখে এনে জলের তরঙ্গ অথবা কুয়াশা আমিও তো তাকিয়েছি মৃতমৎস্যচোখে আমিও দেখেছি ভূত মধ্যাহ্নের মেঘে নিঃশেষিত হলে রোদ তোমাকে দেয়াল ভেবে জাপটে থেকেছি মাকড়ের মতো অনায়াসে স্তব্ধতার সঙ্গে হবে তোমার বিবাহ

দাম্পত্য


আমাদের যৌনান্ধ জাগরণ শেষ হয়ে গেছে; যৌথ লাম্পট্য মূর্খতা, হাওয়ায় রেখে দিগম্বর শরীরের ভর এখন নিঃশ্বাসের অন্ধকার, নিদ্রার স্তব্ধতা, এখন বলো না কোনো কথা, এখন ভেবো না কোনো স্বর এই যে বিছানা, যেন শুযে থাকা—জেব্রা ক্রসিংয়ের উপর শুয়ে তো ছিলাম, তবু রাত্রিজিভ আমার গ্রীবায় ছড়িয়েছে লালা ঘুমের ভেতর কেন জেগে ওঠে দাঁত, মাংসময় ছুরি,                                                     বেশ্যার বিষণ্ন পাঠশালা

শব


তোমার বাদামি গন্ধ ডেকে আনে                    সংখ্যাতীত ডানার গুঞ্জন বহুবার উত্তোলিত ওই হাত স্থির                          স্তব্ধতায় ডুবন্ত, হিম ডানার শব্দ বুঝে গেছে মানুষের লেজ নেই                                       উড়ন্ত, আদিম অসমাপ্ত শিরদাঁড়া, বহু আগে ছিল তার                                  লোমশ ক্রন্দন ডানাগুলো গেঁথে আছে মাংশের আঠালো নিদ্রায় দিগন্তে ছিল না কেউ, জীবন ডুবে আছে শবদেহে                                      মৃত্যুর নৌকায়

চক্র


আমাকে সে কবে যেন ঘুম থেকে টেনে তুলেছিল মেঘে মানুষের অসমাপ্ত শিরদাঁড়া বেঁকে যায়                                     শিশ্নক্ষমতা তার যখন বাজায়                                                         শেষ ঘন্টাধ্বনি কিছুই শুনি নি আমি; কেননা সে-অস্থিশব্দ বহুকাল                                                    কানস্থ হয়ে আছে ঘুম থেকে মেঘে গিয়ে মনে হলো হারিয়ে ফেলেছি সেই ডানা কত গুপ্তহত্যা শেষে শূন্যে মেলে দিয়েছি শরীর; মেঘ থেকে ধুলায় নেমেই দেখি : আমার ভ্রমণ শুধু বায়ুস্রোতে ভেসে যাওয়া, আহার-মৈথুনের জন্য বরাদ্দ ছিল বাধ্যগত ছুটি তারপর জীবনের দ্বিখণ্ডিত জিভের লালায় ঝুলে থাকা...                                                 ঠিকানায় ছিল না-কি ত্রুটি? যেতে যেতে মনে পড়ে : ঘুমের ভেতর কবে শুয়ে থেকে                                    দু’হাতে ধরেছি ওর মথিত গোলক; ‘চাই না এই রাত ভোর হোক’—হাসিতে শীৎকার মিশিয়ে সে                                    বলেছিল, ‘কী বলো, অন্ধ বালক!’

বোবাকাহিনি


সে দেখত মাতালের ঝুপ ক’রে ড্রেনে পড়ার দৃশ্য, বলতে পারত না; দেখত, নীল বাতাস জ্ব’লে উঠলে কিভাবে লুটিয়ে পড়ে অন্ধকারের শাদা শাড়ি, দেয়ালের দিকে কিভাবে উড়ে যায় কালো অন্তর্বাস অসঙ্গত বাতাসে সে দেখত বলতে পারত না ঘর্ষণে-ঘর্ষণে পাথর কিভাবে আর্তনাদ হয়ে যায়...

পৃথিবীর সব দেখল সে, বলতে পারল না; আসলে সে বীর্যের মতো লুকিয়ে রেখেছিল তার সমস্ত শব্দ; একদিন সে দেখল শব্দগুলো কোলাহল হয়ে উঠছে, বেরিয়ে আসতে চাইছে শরীরের সমস্ত চামড়া ছিঁড়ে, তারপর সে দেখল নিজেকে মাতালের মতো ঝুপ ক’রে ড্রেনে প’ড়ে যেতে, তার সামনে মসৃণ সাপের মতো এঁকেবেকে লুটিয়ে পড়ছে অন্ধকার...  নিঃশ্বাসের শিথিলতায় দেখল সে নিজেই একটা পাথর হয়ে ঘষছে অন্য এক পাথরকে, আর সেই আর্তনাদের নৈঃশব্দ্যে হাওয়াসম প্রবাহিত করছে নিজেকে...

26782418_1724126854299095_678581394_o


ক্ষত


কিচ্ছু না, হঠাৎ বাদামি স্তব্ধতায় আলো পড়েছিল। প্রথমে আধুলির নির্বাক বৃত্ত, খয়েরি। সে জানলো, দীর্ঘ শূন্যতা ছিদ্র ক’রে আসতে আসতে আলোর রঙ খয়েরি হ’য়ে যায়; তারপর শুরু হলো ঘর্ষণ, আঙুলের নৃত্য! এমন, পাথর হলে নির্ঘাত আগুনের প্রসব ঘ’টে যেতো। ...কোথাও শব্দ নেই, তরঙ্গ নেই... কচ্ছপের কঠিন পিঠ বয়ে নিয়ে যায় পিঁপড়াজীবন, ওহো! ঘষতে ঘষতে সেই গোল নিঃসাড়তা জীবনের মতো ছোট, আর পৃথিবীর মতো বড় হতে থাকে

উৎস


যদিও অনেকবার বলেছি ধোঁয়ার কথা আগুনের উৎসজ্ঞান কখনো ছিল না পাহাড়চূড়ায় সারারাত বৃষ্টিপাত-শেষে পাথরের গায়ে লেগে প্রবাহিত জল                      জেনে গেল আত্মপরিচয় নদী বলে : এত সরল সূত্র ধ’রে                       আমি কি চলেছি? বিশাল বরফখণ্ড আমার একক উৎসের সামান্য তাপে সেটি অনেক গলেছে এ-বৃত্তান্ত সমুদ্রকে বহুবার স্পর্শ করেছে

বৃষ্টিযাপন


বৃষ্টিতে তুড়ির শব্দ, তুমি নাচো, হে মহিলা, তোমার ভেতর থেকে তুলে নেব তৃষিত নর্তকী, মুদ্রা এক ঝাঁক বায়ুর দাপটে গোল হয়ে ফুলে ওঠে জরির পোশাক বায়ু না মুদ্রার? চোখ উপগত হলে বোঝা যাবে কার নিয়ন্ত্রণ ঝড় এসে ছিঁড়ে দিল বিস্ময়ের সমস্ত গোপন তখন শুনব আমি : এবার একটু থামো, অনেক তো হলো, ঝড়েরও ক্লান্তি আছে, ঝরেছে শেষের ফোঁটা, নাচের মুদ্রাগুলো স্থির; এ-বিরতি স্বাভাবিক, মন্থর নিঃশ্বাসে বারবার ভেসে যাই ‘আর বৃষ্টি হবে না-কি! আর একবার ঝড়?’ যে তুমি তরল হাই তুলে বলেছ আমাকে, নিঃশ্বাসে দ্রুততা আসে, পর্দা উড়ে যায় আবার সে-মেঘ হয়ে ঝ’রে পড়ি তোমার শরীরে, মুষলধারায়

নিমজ্জনচিত্র


সে ফিরেছে তার জলমগ্ন ঘরে মা ছিল নিদ্রিত সরলরেখায়, এসেছে শুভ্রতা থেকে অন্ধকারে, অধমাঙ্গে অস্ত্রোপচারের পর; ‘ডেটলের গন্ধে ঘুমাতে পারি নি সারারাত’—ব’লে, ঊর্ধ্বমুখি হাই তুলে                                                    ফের ডুবে যায় সে ফিরেছে চুক্তি-করা প্রেমিকের কাছ থেকে... ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে, কিছু দূর, মর্মাপ্লুত আইসক্রিম, আপেল                                                     আর হাই হিলে ‘এই নাও’—রাতজাগা স্বর ব্যর্থ ঢেউ তোলে নিদ্রিত দেহের দশদিকে, দরজায় উঠে যাচ্ছে জল, আপেলের সব লাল অন্ধকারে ঝ’রে যেতে থাকে, গড়ায় শুশ্রূষাকামী তলপেটে                                                    গলছে আইসক্রিম; এখনি কান্নায় ডুবে যাবে সমস্ত দরোজা তার আগে একবার মেয়েটিকে যেতে হবে টয়লেটে   ০২ জল ভেঙে ভেঙে যেতে হয়—প্রতি পদক্ষেপে শুধু বিপ্রতীপ নুড়ির প্রবাহ, যেতে যেতে যেতে যেতে কক্ষ থেকে কক্ষান্তর, এ-বারান্দা ও-বারান্দা, দরজায় দরজায় সেই কবে চিৎ হওয়া পুরুষেরা এখন উপুড় হয়ে                                                             নিম্নাঙ্গ হাঁকায় আলো জ্বলে আরো নীল, ক্রমে অন্ধকার গোড়ালি ও করতলে গোপনতা দাবি করে সমস্ত পাহাড়; যেতে যেতে মুদ্রা আসে, সব নয়, কিছু শুধু দু’উরুর শূন্যস্থান                                                            পূরণে তৎপর ‘যত আসে তত চাই, যত আসে তত যাই’—যেতে যেতে                                              আইসক্রিম গলে যায় যেতে যেতে শুক্রস্নান, ভ্রূণহত্যা, আড়ষ্ট চুম্বন, তন্দ্রাপ্লুত স্বর যেতে যেতে ফিরে আসা, যেতে যেতে নিমজ্জিত ঘর পুরনো চিঠির ভাঁজে গোলাপের বিবর্ণ পাপড়ির ভেসে ওঠা                                           যেতে যেতে যেতে যেতে ফসফরাসের চকিত আলোর দিকে যেতে যেতে                                           কিছু দূর গিয়ে থেমে পড়া

প্রেক্ষাপট


কেউ নেই, তবু এই তমসাবিদীর্ণ গ্রীবা কেঁপে ওঠে                                               হাওয়াস্রোতে, নশ্বরতায় সে-প্রসঙ্গ মুছে যাক; এই যে মুড়ানো ডানা, তবু                                                   দাপাদাপি একে বলে অভ্যন্তর, পম্পেই ধ্বংসের আগে ও-পাহাড় দৃশ্যত শান্তই ছিল— কতটা নৈকট্যে এসে ওই কম্পমান গ্রীবা শরীর-বন্ধন থেকে                                           বিচ্ছিন্নতা দাবি করে সে-প্রশ্নও সমীচীন নয়; মেরু অঞ্চলের পাখি উষ্ণতার খোঁজে                                            এদেশের শীতে এসে পড়ে যতই অতিথি বলি, তারা কিন্তু বেড়াতে আসে না;                                            আসে অভিশাপে, চিরতুষারের

অনিদ্রালিপি


আমি তো অনিদ্রারোগি, তুমি ঘুমিয়েছ? আগুনে ভাসিয়ে নৌকা, বহুবার পাল পুড়িয়েছি, এবার টানব দাঁড়, বিস্রস্ত ভোরের কোলে ব’সে তুমি ঘুমিয়েছ? দগ্ধ নৌকা আমি ভেড়াব নিদ্রায় সমস্ত পিপাসাস্রোত অধমাঙ্গে হয়েছিল জমা এ কোন কাঠের গুঁড়ি, যাকে আমি জড়িয়ে ধরেছি? সাঁতার শিখিয়ে সে নদীকে জলশূন্য ক’রে রাখে এ দেহ আমার নয়, এই যান দহনবাহিত কাকে বলি হৃৎপিণ্ড, উন্মাদের রক্তধ্বনি কে যায় ডিঙিয়ে একা, দেয়ালের কাছে অবিশ্রাম রেখে যাচ্ছে নাসিকাবাতাস? এবার উঠেছ যদি জেগে, চোখ মুছে দেখো, জ্বলন্ত নৌকা আমি ভিড়িয়েছি অনিঃশেষ নিদ্রার কিনারে

রেললাইন শুধু রেললাইন


০১ ভেবেছি উপুড় হয়ে নৌকাটি নিঃসঙ্গ ছিল—কতদুর জলসীমা পার হয়েছিল ছইয়ের ভেতর থেকে ম্রিয়মাণ আলো চোখে টেনে ফিরে আসি অন্ধকারে, নিদ্রা ও নিঃশ্বাসের; বহু আগে একটি লোকের উপত্যকা পার হয়ে পাহাড়আড়ালে মুছে যাওয়া দেখে ভেবেছি সে কোথায় হারালো; চলন্ত ট্রেনের ভেতর পাশাপাশি ঝিমায় অনেক লোক, তাদের রক্তের চলাচল জনপদে প্রবাহিত লোহা ও স্লিপার; ট্রেনটির দানবীয় নিঃসঙ্গ গর্জন কানে মেখে ফিরে আসি শব্দহীনতায় ঝিল্লি ও ধমনীর; বহু আগে এক নিরাপত্তাকামী পিঁপড়ার জলের সীমানা ঘেঁষে অবিরাম হেঁটে যাওয়া দেখে ভেবেছি উপুড় হয়ে পিঁপড়াটি নিঃসঙ্গ ছিল—কতদূর, স্থলসীমা পার হয়েছিল   ০২ ঘুমের ভেতর দিয়ে চলে গেছে রেলপথ আমাদের।... ঘুমাতে যাবার আগে কেউ গান, কেউ জলপান করে; কারো কারো মৈথুন খুব আবশ্যক, না-হলে নিজের ঘরে ছায়াদের চলাচল দেখা ছাড়া অন্য কোনো কর্তব্য থাকে না তাদের। ছায়াগুলো আসে কোথা থেকে? মধ্যরাতে ট্রেন ছুটে চলে ব্রিজ ও টানেল ছিঁড়ে, অবিরল তার শব্দ ভেসে আসে— ঘুমোতে যাবার আগে আমিও তো দাঁড়িয়েছি নগ্নতার পাশে শরীর এখানে তবু স্থির; কলাপাতা নড়ে শুধু গাঢ় মফস্বলে মানুষ ছড়িয়ে পড়ে এক মৃত্যু থেকে আরেক মৃত্যুর বারান্দায় মানুষ ছড়িয়ে পড়ে এক রক্ত থেকে আরেক রক্তের দিকে; তাদের নিঃশ্বাস ও নৈঃশব্দ্য থেকে তার হুইসেল শোনা যায় ভোর হলো, দোর খোলো, অন্ধকার হয়ে এল ফিকে...   ০৪ মানুষ চেয়েছে যেতে সাবলীল ঘুমে রাতভর... নিদ্রার ভেতর চুপচাপ প’ড়ে থাকে নিসর্গের টুকরা, শয়নঘর, ধোঁয়াশূন্য রান্নার চিমনি, এমনকি রক্তের জটিলতা রেলগাড়ি চ’লে গেলে তার নৈঃশব্দ্যের নিচে নুড়িদের কথা চাপা পড়ে; লোহা ও চাকার হট্টগোলে কারো-কারো স্বর মৃদু সংকেতের মতো অস্ফুট শোনা যায়। তারপর তাও ঢুকে যায় কোনো ঘুমন্ত বা মৃত চেহারায়... মানুষ তো যেতে চায়, দুটি রেখা যে-বিন্দুতে যেখানে হারায় সেরকম কিছু ঘটে না কি?—প্রতিধ্বনি বেজেছে স্লিপারে পাশাপাশি থেকে দূরত্বের সরলতা মানুষ বুঝেছে পরপারে গিয়ে; তাদের নিদ্রা ও জাগরণ বহে সমান্তরাল ভোরের স্টেশনে এসে চোখ মুছে দ্যাখে ; দিগন্তরেখা এমন ছিল না লাল, গতকাল...   ০৫ আলোকিত গোলাকার বরফের নিচে সারারাত কাঠ ও লোহার ফাঁকে নুড়িগুলো স্থির মানুষের নরম উত্তপ্ত শরীর বারবার পাথরের প্রতিঘাত এড়িয়ে চলন্ত, ট্রেনে-ট্রেনে, ভ্রাম্যমাণ পলায়নপর জানালায় একদিন ভোরবেলা ক্ষরিত হৃৎপিণ্ডের গান থেমে গেল ভেবে কেউ-কেউ নেমে যেতে চায় অবতরণ-মুহূর্তে এসে দ্যাখে : ভারবাহী গতিস্মান কুলিদের থেকে স্থির মানুষের ভার বহুগুণ বেশি : অতিক্রান্ত লোহা ও স্লিপার এটা জানে তার জন্মেরও আগে;— অভ্যস্ত বাঁশিটি বেজে ওঠে, পরিচিত দাগে -র ওপর কাঁপে চাকা গন্তব্য নেই, তবু পাথরআক্রান্ত পথ দীর্ঘবর্তুল, বাঁকা মানুষ লোহার মধ্যে ঢুকে যায়, পলায়নপর জানালায় রাখে মুখ, নিজের বাহুতে দিয়ে ভর মাটিতে নুড়ি ও কাঠ, কাঠে লোহা, লোহায় আবার লোহা, তার মধ্যে মানুষেরা, শুধু ভার আর ভর পৃথিবীর নুড়ির বিছানা থেকে আলোকিত গোলাকার বরফের নিচে মনুষ্যশরীর পুনরায় যেতে চায়, যদিও জেনেছে তারা পূর্ণিমার পরবর্তী চাঁদ ছোট হয়ে আসে ধীরে মানুষের মনে পড়ে অকস্মাৎ—যখন ঢুকছে রাত অমাবস্যার তীব্র গভীরে কাঠ ও লোহার ফাঁকে সারারাত নুড়িগুলো স্থির মানুষের নরম-নশ্বর শরীর চলন্ত, ট্রেনে-ট্রেনে, ভ্রাম্যমাণ পলায়নপর জানালায় দানবীয় হট্টগোলে নিঃসঙ্গ চেহারাগুলি কেবলি হারায় ভোরের কুয়াশা থেকে সন্ধ্যার অস্পষ্টতায়   ০৬ ফ্রেমের ভেতর ওই মুখগুলি মুছে গেলে চাকায়-চাকায় প্ল্যাটফর্মের ধুলা চুপ, যূথবদ্ধ কাকের সংগীত তুলে ধরে স্টেশনের নীরবতা, পরিশ্রান্ত হাতগুলি গামছা হাঁকায় আড়ষ্ট কাঁধে; ঘর্মাক্ত গান ওঠে বিশ্রামে ডুবন্ত স্বরে... ঘুমাবে না রেলকর্মী?—তোমাদের লালরঙা ঘরগুলি সূর্যাস্তের পর কালো, ঝিমধরা আকাশের নিচে রহস্যময় নিবু নিবু জানালাগুলি শয্যার শূন্যতায় নগ্ন, কোন গোপন আধুলি পাতাল থেকে টানছে তোমাদের?—এই প্রশ্নে শোণিতের ক্ষয় কেউ মানে না তো; হল্কাময় রৌদ্রেও লোহার প্রসারণ ঘটে; জলন্ত জানালাগুলি অসংখ্য পলায়নপর মুখ নিয়ে জনপদে প্রবাহিত, তাদের আমর্ম নিঃসঙ্গ অবগাহন ভ্রমণ ও নিদ্রার জলাশয়ে; তন্দ্রাপ্লুত রেলকর্মী সেই ফ্রেমে আগন্তুক হয়ে টের পায় ভ্রাম্যমাণ মানুষের পুরনো অসুখ

স্ট্র্যাপ


তার ব্রার স্ট্র্যাপ থেকে সেই যে উড়ল অজস্র রঙিন ঘুড়ি, আমার আকাশ সেই দিন থেকে উদাসীন, দোদুল্যমান। আর দ্যাখো সে হাসে, যেন সমস্ত লাটাই তার হাতে; ‘নাামিব না নামিব না’ ব’লে ঘুড়িদল দোলে, ঘুমের ভেতর আমাকে পেঁচিয়ে ফেলে গোপনতাকামী আগুনের সরু সুতাগুলি যতই প্রকাশ্য হতে চাই চাপা পড়ি তার হাসির তলায় অন্তর্বাস থেকে ছুটি নিযে, দ্যাখো, সে কেমন বেরিয়ে পড়েছে... আর স্বপ্নে হারিয়ে ফেলা হাসিসহ জড়িয়ে ধরেছে তাকে বিরহলাঞ্ছিত প্রেমিকের দল

স্মৃতিচারণ


একদিন রঙধনুর তলা দিয়ে পৃথিবীর বাইরে                                            চ’লে গিয়েছিলাম একদিন ভোরের দিকে পা রেখে                     সন্ধ্যার স্তব্ধতাকে চুম্বন করেছিলাম একদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত বিপ্লবীদের অমরত্ব                                 ব্যাখ্যা করেছিলাম একদিন মোমবাতির আগুনে তর্জনি ঝুলিয়ে              বুঝেছিলাম আত্মহত্যা সবার জন্যে নয় একদিন ছাদে শাড়ি মেলে-দেওয়া বিষণ্ন মহিলাকে                         জড়িয়ে ধরেছিলাম স্বপ্নের ভেতর একদিন মনে হলো আকৃতির ধারণায় কমলালেবুর আবেদন শেষ হয়ে গেছে— পৃৃথিবী আসলে উপবৃত্তাকার সেদ্ধ ডিমের মধ্যে বৃত্তাকার হলদে অংশের মতো গোল আর একদিন মনে হলো—এসব কিছুই দেয়ালে হিসির পর উবে-যাওয়া মূত্ররেখার চেয়ে বেশি অর্থ                                           ধারণ করে না

সুইসাইড নোট


তোর শ্বাসচাপা চুমু আমি হেমন্তের বনশীর্ষে রেখে আসি। ধূলির তরঙ্গ থেকে যাছি শূন্যে ছুটি নিয়ে— এমন তো নয়; তবু কোথাও চাই না যেতে, গিয়ে কী হবে? তার চেয়ে ভালো এই অনিদ্রার বন, আর লুটিয়ে-পড়া পাতার শব্দ। যত নিঃশ্বাস আমার— সব গুঁজে দিই এই নিম্নগামী ঢেউয়ে। যত দূর থেকে আসুক বাতাস, ঝরে-পড়ার আগে ব্যথায় বেঁকে গেলে তোর মুখ আমিও দেখেছি;                                                এখন যে-মাছি ওড়ে ওই চেহারার চারপাশে, তার ডানার কম্পনে জেগে ওঠে নশ্বরতা; আর অনন্তের বনে                                                          ঘুরে-ঘুরে স’রে যাব এই উপড়ানো হৃৎপিণ্ড নিয়ে, বহু দূরে   26772508_1724126857632428_1797329627_o  

বিবেকনামা


ওকে হত্যা ক’রে আমিও মৃত্যুর ভেতর রইলাম প’ড়ে— ঘাসে, তার পাশে; গোড়ালির শব্দ আসে শ্রুতির কিনারে। ও-শরীর নিয়ে গেল ওরা, প্রমাণ করল আমি কতটা নিষ্ঠুর: হত্যার আগে হাসিটি কেমন ছিল, ঘুমিয়েছি কি-না, পায়চারি করেছি ক’বার—                               এইসব প্রশ্নের শস্যভূমি ভেদ ক’রে আমার নিঃশ্বাস থেকে একটা লাল রেখা কেঁপে-কেপে মিশে গেল গোধূলির দিগন্তরেখায়। ...কাঠের পাঁচিল ডিঙানোর শক্তি বিনা পৌঁছে যাই সেই রঙধনুর তলায়, যেখানে ছিলাম শুয়ে মৃতবৎ—উপুড় হয়ে, ঘাসে, তার পাশে; যদিও সে নশ্বরতার ডিঙা, স্তব্ধ, জড়...                                                  এই ঘুম ভেঙে গেলে মৃত্যুর সমস্ত কাক আমার শরীর ঘিরে ওড়ে। দেখি, কারা যেন নিয়ে গেছে তাকে, নৈঃশব্দ্যের দিকে—চিহ্ন শুধু রয়ে গেছে নিয়তির মতো; সেটিও দখল করে পিঁপড়াবাহিনী, ধুলা আর নীরবতা। আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কাগজের ঝড়, শেকল, আলখাল্লাময় চিৎকার, হাতুড়ির শব্দে উঠি জেগে ফের, দেখি:                   ফাঁক হয়ে আছে পাটাতন, তাতে অন্ধকার মৃতের গন্তব্যের মতো; আর দড়িনির্মিত বৃত্তের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে বিচারকের বিষণ্ন, রোদনলাঞ্ছিত মুখ...

চিঠি নয়


ঝকমকিয়ে চলি না ব’লে তুমি কোনোদিন দ্যাখো নি আমাকে।... তোমার রোদ ও রক্তকে যারা লোহা ও স্লিপার ভেবে বইয়ে দেয় যাত্রীরহিত রেলগাড়ি, তাদের কাউকে তুুমি নিয়ে যাও সমুদ্রে, কাউকে বনের ভিতর, ঝর্নার কাছাকাছি। আমি থেমে আছি মেঘে ঠাসা স্নায়ু নিয়ে আর নিজের মৃত্যুর দিকে গড়িয়ে দিচ্ছি একেকটি ভের আর সূর্যাস্ত।... আমার চুম্বনে নয়, ওই ট্রেনের হুইসেলে জেগে ওঠে তোমার পৃথিবী। কার্নিভালের সকাল যেমন স্বপ্নমত্ত রাতের আঙটায় ঝুলে থাকে রঙবেরঙের পোশাক হয়ে, তাদের প্রতিটি স্টেশন তেমনি তৈরি হয়ে আছে তোমার জন্য। প্রতি রাতে আমি পেশেন্সের তাসে ঠেকিয়ে রাখি সমুদ্র, যখন কেউ অন্যের নিঃসঙ্গতা উদযাপন করে ফোনসেক্সে, মাস্টার্বেটের গনগনে মুহূর্তে ভর দিয়ে বিশাল কোনো নীল তিমির পেটে ঢুকে পড়ে। সবই পুরনো। নিঃসঙ্গতা, অন্ধকার, পাথরকাঁপানো জল কিংবা দূর থেকে নীরবতায় ঢুকে পড়া ট্রেন, তার শব্দময় ঝকমকিয়ে ওঠা

ভঙ্গিস্ত্রোত্র


এই হলো তোমার হাঁটার ভঙ্গি। অনিদ্রাসঙ্কুল কতো ঘাট পার হয়ে এলে, কতো কুয়াশাকাতর ভোরে আবার দু’চোখ রক্তের স্তব্ধতা মেলে ধরলে আকাশে, হাওয়ায় রৌদ্রে পা-ফেলার এই ভঙ্গি দেখা যায়? পুনর্বার প্রেমে পড়া যায়! এই তোমার কথার ভঙ্গি। এটা গান; সেই স্বর—স্বপ্নের নৈঃশব্দ্যে জড়ানো? না, ডানা— সমুদ্রপাখির; আমি তার কম্পনে উপুড়, দূরে যেতে যেতে খুব সুখে, শূন্যতার বুদবুদ থেকে তুলে নিচ্ছি আমার আহার; এই তো তোমার মধ্যাহ্নরঞ্জিত হেসে ওঠা। সব অশ্রুচিহ্ন মুছে গেল পৃথিবীর—সেই ঢেউয়ে, ঝরাপাতা ফিরে এল গাছে; তার কাছে ক্লোরোফিলে আত্মহত্যার আগে                                                            হৃৎপিণ্ড হয়েছে সবুজ আর এই তোমার ব’সে থাকার ভঙ্গি। এর কাছে এসে নশ্বরতা থেকে ছুটি পেল প্রেমিকের দল; কিছুক্ষণ তুমি এইভাবে থাকো...

পাথর


পাথর সম্পর্কে দেখছি তোমার কোনো ধারণাই নেই! এটি জলপিণ্ড, মুঠোয় যদিও তাকে ধরা যায়, ধূলির সমুদ্র থেকে ধীরে-ধীরে বহু বছরের হাওয়ায় তাকে তুলে নিলে তুমি তার পুলক দেখো নি? দেখেছ সে-হ্রদের তলদেশে উদ্ভিদের আলোড়ন? আজ দেখি, পাথরের মতো গড়িয়ে পড়ছে প্রেমিকের দল পাহাড়ের চূড়া থেকে, উপত্যকায় নিজের নারীকে দেখে; আর ঝরনায় বয়ে-যাওয়া নুড়ির ভেতরে বীজ, ঘুমন্ত শস্যের; ক্রমশ কঠিন হয়ে-ওঠা অববাহিকায়, শান্ত লোকালয়ে, ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে হ্রেষাধ্বনি শেষ হয়ে এলে ট্রেনের হুইসেল বাজে আর আন্তজেলা বাস ছুটে চলে ধূলির সমুদ্র দিয়ে, বহু বছরের হাওয়ায় সেই পিষ্ট, সূক্ষ্ম ও উড়ন্ত কণারাশি বৃষ্টিতে জমাট, যখন হাঁটবে তুমি স্তব্ধতায়, দেখো, অজস্র পাথর এসে লাগছে শরীরে—ঠান্ডা, সুখকর, তুলতুলে                               আর বুদবুদ হয়ে মুছে যাচ্ছে আকাশে

অন্তিমতা


যখন ঘুমিয়ে পড়ি খোদাই চলতে থাকে হাওয়ায় নশ্বরতার, ব্যথায় বেঁকে যাওয়া চেহারার আর এক টুকরো পাথর এসে পড়ে জন্মের মুহূর্ত থেকে, জেগে ওঠার আগেই ক্ষয়ে-যাওয়া, বর্তুল, যেন পৃথিবীর শেষ ধূলিকণাগুলো এতে নিয়েছে আশ্রয় তাতে আমিও খোদাই ক’রে চলি নিজের ফসিলচিহ্ন, বিলাপ

যারা দূরে থাকে


যারা দূরে থাকে, তাদের নিদ্রায় ঢুকে দেখি, সেখানেও যন্ত্রণা অনেক; বহুগামী কাছিমের পিঠ থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে পৌরাণিক গণিকারা; অজস্র সন্তান যদিও আনন্দে থাকে পিতৃপরিচয় বিনা; পেয়ারা গাছের নিচে ভোর হলে শিশুদের মল চাটে কুকুরেরা; প্রাপ্তবয়স্কের দল বদনা নিয়ে দক্ষিণমুখী হয়, রাতভর সুখকর পরিশ্রমে তারা খুব করেছে চিৎকার; গোসলের পর রানিও কেঁপেছে শীতে কেননা, তারও অর্গ্যাজম হয়—মধ্যরাতে খাটের কাঁপুনি কাঠমিস্ত্রির শরীরে এসে লাগে; তা লাগুক। রানিও থাকুক দূরে, কাছে এলে দাবানল যদি, আকাশ গরম, লাল আর নৃত্যগীতবাদ্য নিয়ে হল্লাময় হয়ে ওঠে ফিরে আসি নিজের নিদ্রায়...

বাড়ি


বাড়িগুলো দেখি স্থির, চুপচাপ ভোরের আলোয়। কখনো এসেছে ভেসে কোলাহল, আর্তনাদ, গান; ফাঁক হওয়া পর্দার ভেতরে বাড়ি খুব নড়ে সেই কম্পন কারও-কারও ঘুমে এসে পড়ে দেখি, বাড়িগুলো থমথমে, সন্ধ্যার পাখি-ফেরা আকাশের স্তব্ধতায়। তারপর জানালা-দরজা আর ভেন্টিলেটর দিয়ে পড়িমরি ছুটে আসে বাতাসের তীব্র হল্লা; গোত্তা খেয়ে শূন্যে ওঠে                               সেই কাগজপত্তর, পূর্বপূরুষের আড়ষ্ট আঙুল বাড়ি কি সমুদ্র? সেখানেও নিম্নচাপ, বায়ুঘূর্ণি? একদিন দেখি বাড়িগুলো ছুটছে, পালাতে চাইছে মানুষের জঙ্গল থেকে; তখন রাস্তার পাশে নির্মাণজীবীর দল দাবি তুলছিল ন্যায্য মজুরির আর কাঁচা সুপারির রসে ঘাম বের করে বুলডোজারচালক রইল দাঁড়িয়ে; উড়ন্ত বাড়ির পিছু-পিছু মালিক দৌড়ুচ্ছে দেখে নেচে উঠলো বিষণ্ন স্থপতির দল এক বার প্রলয়ের ভয় থেকে এই গল্প শুরু হয়েছিল

প্রান্তিকের স্তনভাবনা


কী-যে ঘটে যাচ্ছে, দ্যাখো, সে জেগে ওঠার পর ভূগোলের সংজ্ঞা নিয়ে যৌনশিক্ষার্থীদের সভা হলো, কম্পমান কাছিমের পিঠ থেকে বুড়োদের পড়ে যেতে দেখে মুখে হাত চেপে হেসে উঠল পৌরাণিক গণিকারা গলির মাথায় সেই বর্ধিত গোলক নিয়ে কথা বলে পাড়ার ছেলেরা— ‘শক্ত হয়ে যায়, যদি ভাবি কেউ এসে দেখালো আমাকে জামা খুলে, দেখে ঘুম হবে না কখনো’; ‘তুই ডুবেছিস’... ধর্মশিক্ষার ক্লাসে গিয়ে মনে হলো, ডুবে গেলে ভালো হতো, যদিও সমস্ত জল মধ্যাহ্নের মেঘে; নিচে বালি, সেখানেও ডুবে থাকা যায়, জেনে নিয়ে এ-পৃথিবী রহস্যে বর্তুল; তারপর ধরো, চেপে ধরো, সাড়ার পরিধি উহ্য রেখে, পিষে ফ্যালো আর কেন্দ্রে যেতে যেতে বলো, ‘সমুদ্র শুষেছিস,                                                              যা দেবার, এ-দেহেই দিবি’...

ফেনোমেনা


প্রথমে উঠল ফেনা, ঘর্ষণের রূপ এই, হাওয়ায় হারানোর আগে ঘাম, যখন হয়েছে ফাঁদ পাঠ্যবই, খুব উত্তেজনা, শিক্ষকের রাগে পালিয়েছি ক্লাসরুম থেকে; যে-গণিতে বীজ হলো বোনা— সবই কদলিবৃক্ষ আজ, মোটাসোটা, ফলের ফেনোমেনা... এলোমেলো রেখা থেকে আকৃতি পেয়েছ তুমি, তাতে দাঁত আমি বসিয়েছি; আনন্দের ক্ষত মুছে দিতে-দিতে চলে গেল রাত স্বপ্নে এমন ঘটা স্বাভাবিক; সেখানে অনেক নারী সোজা কলা খুব খায় তারপর আমাকে নিকটে ডেকে বলে, ‘অ্যাই কলাগাছ, এইদিকে আয়’; ‘গিয়েছিলি, সেই বনে?’ এই প্রশ্নে দৌড়ে পালাই প্রদর্শনী থেকে— তখন উত্তাল সন্ধ্যা, বর্ষীয়সীভরা মাঠ শুকনা হ্রদের দিকে গেছে বেঁকে অথচ পৃথিবী আড়ষ্ট ভোরের মতো লাগে, দেখি, সব রেখা বেরিয়ে পড়েছে আগের জ্যামিতি থেকে; কিছু দূর গেলে দেখা যায় সেই শিক্ষকের মুখ—বাঁকা কলা সোজা ক’রে যিনি বহুবার পুরস্কৃত; ‘কেন তুমি দিয়েছ কামড়?’ এই প্রশ্নে আমার কি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক? বর্ষীয়সীভরা মাঠে গিয়ে ব’সে পড়ি, আমাকে হাঁপাতে দেখে এক নারী বলে, ‘এটা স্বপ্ন নয়, এ-ঘুমের বড়ি আমিও খেয়েছি’...

মেঘমলল্লার, উন্মাদআশ্রম থেকে


তোমার প্রশ্নসঙ্কুল একটা মেসেজ পেয়েছি। মেঘের মতো নৈর্ব্যক্তিক, কিন্তু বুনোফুলের গন্ধে জড়ানো। লিখেছ, দু’টি সিঙ্গল বেড জোড়া লাগালেই প্রেম হয় না-কি? সম্পর্ককে বারবার পেরেক বলার অসুখ তোমার কিভাবে হলো?... বৃষ্টির ছাটের নিচে রেখে সেই বার্তা মুছে ফেলি। ঝড়ো হাওয়া তীব্র আর এলোমেলো হ’লে দেখি, একটি সুপারি গাছের কাছে চ’লে আসছে আরেকটি সুপারি গাছ। ওদের নৈকট্য যে হাওয়ার তীব্রতানির্ভর, কখনও ভেবেছ? শুধু মেসেজ পাঠিয়েছ, মেঘের মতো নৈর্ব্যক্তিক আর বুনোফুলের গন্ধমেশানো। লিখেছ, ভালোবাসা কেন বারবার অতীত হয়ে যায়?... ঘটমান বর্তমানকে তুমি ভবিতব্যে রেখে দিও। এই যেমন এখন বৃষ্টি হচ্ছে, মুষলধারার মধ্যে রয়েছে শহর আর তোমার শরীর; আগামী শ্রাবণেও এমনই ঘটবে
চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা...বিস্তারিত