গত শতাব্দীর পঞ্চাশের অন্তিম ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলার বুর্জোয়া পরিবারে বেড়ে ওঠা এক সন্তান এবং তার মায়ের জীবন নিয়ে আনিসুল হক লিখেছেন মা (২০০৩) ‘উপন্যাস’। এটি মূলত সন্তানের প্রতি মায়ের গভীর মমত্ব, তজ্জনিত সংগ্রাম ও ত্য্যাগের কাহিনি। পারিবারিক জীবন, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও মুক্তিযুদ্ধ এর পটভূমি। গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সন্তান আজাদের ধরা পড়ে যাওয়া ও নিখোঁজ হওয়ার পর মা সাফিয়ার জীবন ও পরিণতির ওপর বিশেষভাবে আলো ফেলা হয়েছে এই রচনায়, যা পাঠককে আবেগকাতর করে তোলে। যেদিন পাকিস্তানি হানাদারের হাতে সে ধরা পড়ে, ১৪ বছর পর, সেদিনই, অর্থাৎ একই তারিখে তার মায়ের মৃত্যু হয়—এই কাকতালীয় ঘটনায় লেখক দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস করেছেন। বলা বাহুল্য নয়, এখান থেকে রচনাটি শুরু ও শেষ হয়েছে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের (১৯২৭-২০১৪) হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড (১৯৬৭) উপন্যাসে যেমন দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের (তবে মা ‘উপন্যাসে’ সাফিয়ার মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক) পর দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাক, মা-তেও তেমনটি ঘটেছে। শহীদুল জহিরের (১৯৫৩-২০০৮) সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫) উপন্যাাসেও এটি লক্ষ করা যায়। তা কালেক্টিভ, মানে যৌথ স্মৃতিচারণায় আবর্তিত। আলোচ্য রচনাটিতেও এটি দৃশ্যমান। তবে মৃদু পার্থক্য রয়েছে : ওই উপন্যাসে ‘গ্রামবাসীদের মনে পড়ে’ আর আলোচ্য রচনায় ‘বন্ধুদের মনে পড়ে’ বাক্যাংশটি ঘুরেফিরে এসেছে। সাফিয়াকে সমাধিস্থ করতে যাওয়া লোকজন, যারা আজাদের বন্ধু ও সহযোদ্ধা, তাদের স্মৃতিচারণাতেই কাহিনির বেশির ভাগ পল্লবিত হয়েছে। যেখানে তারা নেই, সেখানে লেখক অংশ নিয়েছেন ঘটনাবর্ণনায়। তবে তা উহ্য বা পরোক্ষ থেকেছে। নইলে লিখতে হতো, ‘আমার মনে পড়ে’, বা, ‘লেখকের মনে পড়ে’! ‘উপন্যাস’টির কাহিনি বলে নিজস্বমৌলিক বা আলাদা কিছু ভাবা মুশকিল। কেননা, এর প্রায় পুরোটাই ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীর বর্ণিত অভিজ্ঞতা, বইপত্র ইত্যাদি থেকে সংগৃহীত ও সমন্বিত। কেবল ঘটনা-পরিস্থিতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং তা মেনে চরিত্রগুলির জন্য সংলাপ বরাদ্দ হয়েছে। দু-তিনটি বাদে সব চরিত্রই চেনা, এদের মধ্যে কেউ-কেউ বিখ্যাত। যেমন—জাহানারা ইমাম (১৯২৯-’৯৪), খালেদ মোশাররফ (১৯৩৭-’৭৫), আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২০), শাহাদৎ চৌধুরী (১৯৪৩-২০০৫), নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, সৈয়দ আশরাফুল হক প্রমুখ। পাকিস্তানি হানাদারের হাতে আটক ও নিখোঁজ আজাদ এবং তার বন্ধু-সহযোদ্ধাদের নামও অনেকের জানা। দু’চারজন ছাড়া, এদের কেউই আজ বেঁচে নেই। এই চরিত্রগুলির একজন আলোচ্য ‘উপন্যাস’ নিয়ে একটা শংসামূলক রিভিউ লিখেছেন। তিনি আর কেউ নন, আনিসুজ্জামান। তাঁর সেই রচনা সম্পর্কেও কিছু আলাপ আছে, একটু পরেই তা হবে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস যারা জানেন, ‘উপন্যাস‘টি না-পড়লেও তাদের চলবে বলে মনে হয়। তবে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে বিকাশমান ঢাকা শহরের বুর্জোয়া জীবনধারা, সেই শ্রেণির পরিবারে বিকশিত সন্তানের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সূত্র, শহরকেন্দ্রিক গেরিলা যুদ্ধের প্রকৃতি, পাকিস্তানি হানাদারের হাতে আটকের পর আজাদ এবং তার মায়ের কী হয়েছিল—ইত্যাদি সম্পর্কিত কৌতূহল থেকে গ্রন্থটি পাঠ করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবিক, সে-সময়ের পত্রপত্রিকা, সিনেমা, স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ প্রভৃতি থেকেও এই ধরনের আগ্রহপূরণ সম্ভব। এটা ঠিক যে, যুদ্ধ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে এবং আর ফিরে আসে নি—এমন সন্তানের মায়ের হাহাকার ও যন্ত্রণাময় জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে জানার জন্য, জেনে কাতর হতে চাইলে গ্রন্থটি পাঠ করা যেতে পারে।
‘ঘটনার বিবরণে প্রকাশ’—প্রথাগত সাংবাদিকদের বহুল ব্যবহৃত এই বাক্যাংশের পরিবর্তে ‘বন্ধুদের মনে পড়ে’ কথাটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যা হোক, উপন্যাস হিসেবে মা পড়ার বিপদ প্রথমত গণমাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদের মতোই এর ঘটনারাশির বর্ণনা; মনে হয়, ‘ঘটনার বিবরণে প্রকাশ’—প্রথাগত সাংবাদিকদের বহুল ব্যবহৃত এই বাক্যাংশের পরিবর্তে ‘বন্ধুদের মনে পড়ে’ কথাটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, চরিত্রগুলির মনস্তত্ব বা মানসিক জীবন বলে কিছু নেই, তারা একে অন্যের সঙ্গে কেবল কথা বলে, এদিক-ওদিক যায়, একের পর এক ঘটনাগুলি ঘটিয়ে চলে কিংবা সে-সবের অংশ হয়ে পড়ে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ফিচারে বা প্রতিবেদনে বর্ণিত লোকজনও তাই। মনোজগৎ বলে এদের কিছু নেই। উদাহরণস্বরূপ, স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহে ক্ষুব্ধ সাফিয়ার ইস্কাটনের বাসা ছেড়ে ফরাশগঞ্জের বাড়িতে যাওয়ার মুহূ্র্তে যে মানসিক চাপ ও যন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়ার কথা, তার লক্ষণসূচক বর্ণনা এ-রচনায় নেই। এমন সঙ্কটময় সময়ে উদ্বেগ বা অনিশ্চয়তায় তার মন আচ্ছন্ন ও অস্থির হয়ে পড়া স্বাভাবিক; কিন্তু তেমনটি দৃশ্যমান হলো না। এমনকি, বন্দি পুত্রের জন্য খাবার নিয়ে সাফিয়া যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটছে এবং বিফল হচ্ছে, সেসব মুহূর্তে তার মনোচিত্র দেখা গেল না। শুধু বোঝা গেল, লেখকের ইনসাইট বা অন্তর্দৃষ্টি বলে কিছু নেই। তৃতীয়ত, এর ভাষা নিরবচ্ছিন্নভাবে সংবাদপত্রসম্মত, কোনো বিবেচনাতেই উপন্যাসোচিত নয়। পাঠকালে যে-কোনো রসিক ভাবতে বাধ্য হবেন যে, এর রচয়িতা একজন সাংবাদিক মাত্র। তদুপরি, রচনার কোথাও-কোথাও তার ভাষাবোধ সন্দেহজনক হয়ে পড়েছে। যেমন তিনি লিখেছেন—‘স্মৃতি মনে পড়ে’; ‘ফরাশগঞ্জের বাড়িটা যেন তার প্রিয় বলে মনে হয়’; ‘অতীত স্মৃতি’; ‘ছেলেটি দেখতে হয়েছে মাশাল্লা চোখজুড়ানো।’ ইত্যাদি। কিঞ্চিৎ চিন্তাশীলতা থাকলে এটা বোঝা অসম্ভব নয়—যা মনে পড়ে, তাই স্মৃতি, বা, মনে পড়ার অর্থই স্মৃতি; (‘ঘটনা/কথা মনে পড়ে’ লেখাই সঙ্গত ছিল); দ্বিতীয় বাক্যটি গোলমেলে, বাহুল্যপীড়িত; পরের উদাহরণটি ভয়াবহ; কেননা, এটি জানাতে চায় যে, স্মৃতি ভবিষ্যতকালেরও হতে পারে!
চতুর্থত, উপন্যাসে কাম্য যে সৌন্দর্য, তা একেবারেই অনুপস্থিত এই রচনায়। বোঝা গেছে, সাহিত্যের এই শাখাটিরও যে শিল্পকর্ম হয়ে উঠবার অধিকার রয়েছে, সে-সম্পর্কে লেখকের ধারণা খুব গরিব অথবা শূন্য। ডিটেইল, সংশ্লেষক, দৃশ্যাত্মক পরিচর্যা—কিছুই নেই। দু’এক জায়গায় খানিকটা দেখা যায়; কিন্তু সেই চেষ্টা অপরিণত ও হাস্যকর হয়ে পড়েছে। যেমন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণস্থলের এক প্রান্তে গাছের ডাল ভেঙে পড়ার পর পাখিরা ‘স্বাধীনতা স্বাধীনতা’ ‘চিৎকার’ করে উড়তে থাকে বলে যে-বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার রসাস্বাদন কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষেই সম্ভব:
তখন আশ্চর্য হয়ে টগর লক্ষ করে, তার হাতে ধরে রাখা পাখির বাসায় ডিম দুটো ফেটে যায়, দুটো বাচ্চা বেরিয়ে আসে, আর দুটো খয়েরি রঙের পাখি বিমানের মতো নেমে আসে আকাশ থেকে, পা দুটো নামিয়ে তারা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায় শাবক দুটোকে, আর আকাশে উড়ে গিয়ে চক্কর দিতে দিতে তারা চিৎকার করে ডেকে ওঠে স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে, তখন আরো আরো পাখি উড়ে ওঠে আকাশে, বিচিত্র সব পাখি, তারা একটা যেন আরেকটাকে ডেকে বলছে স্বাধীনতা স্বাধীনতা, টগরের সমস্ত পৃথিবীজুড়ে তখন আর কোনো শব্দ নাই, কেবল স্বাধীনতা ছাড়া...
পঞ্চমত, লেখকের জীবনবোধের প্রকাশ এই রচনায় ঘটে নি। সাধারণত রূপক (এটি উপন্যাস কিংবা গল্পের প্রাথমিক শর্ত) সৃষ্টির মধ্য দিয়েই জীবন সম্পর্কে লেখকের এক বা একাধিক ডিসকোর্স হাজির হয়ে যায়। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ এ-রচনায় রাখা সম্ভব হয় নি। লেখকের রাজনৈতিক অবস্থানটি অবশ্য বোঝা যায়; কিন্তু সাহিত্যের জন্য এটা বাহুল্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর; এমনকি, মানবিক দায় যদি কোনো রচনাকে অধিকার করে, তাও বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নৈতিক দৈন্য আর স্বেচ্ছাচারিতা, বুদ্ধিজীবীদের স্খলন, পাঠকের বামনত্ব ও পতন সম্পর্কে ধারণা পেতে গেলে গ্রন্থটি অগ্রস্মরণীয়।
তাহলে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল, এই রচনায় লেখকের জীবনবোধ ও শিল্পদৃষ্টি—দুইই অনুপস্থিত। রইল শুধু ঘটনা, চরিত্র ও সংলাপ। শুধু মা নয়, গত প্রায় তিরিশ বছরে উপন্যাস ও গল্প হিসেবে যা-কিছু রচিত হয়েছে বাংলাদেশে ও বাংলা ভাষায় এবং এখনও হচ্ছে, তার প্রায় সবই এই তিনটি উপাদানে নিঃশেষিত। ফলে, সমস্যা হলো, এগুলি নিয়ে আলোচনার কিছু থাকে না। তাহলে কেন আজ মা প্রাসঙ্গিক হলো? বাংলাদেশের গণমাধ্যমের নৈতিক দৈন্য আর স্বেচ্ছাচারিতা, বুদ্ধিজীবীদের স্খলন, পাঠকের বামনত্ব ও পতন সম্পর্কে ধারণা পেতে গেলে গ্রন্থটি অগ্রস্মরণীয়। আশা করা যায়, বর্তমান আলোচনায় তা বুঝতে পারা যাবে।
২
বইটি সম্পর্কে বেশক’টি রিভিউ বা আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে ‘উপন্যাস’ নিয়ে যত আলোচনা, সবই হয় একটা গৎ মেনে। সেটা কী রকম? শুরুতে ও শেষে শ’খানেক শব্দের আলগা আলাপ, মাঝখানে ‘উপন্যাস’টির কাহিনিবর্ণনা। একে বলা যেতে পারে ‘স্যান্ডউইচ রিভিউ’। প্রকাশের আট বছর পর, ২০১১ সালে প্রথম আলোয় এই গ্রন্থ সম্পর্কে 'মা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস' শীর্ষক যে রচনাটি আনিসুজ্জামান লিখেছেন, সেটিও এর বাইরে যেতে পারে নি। অর্থাৎ কাহিনিবর্ণনায় আলোচককে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে। অবশ্য এমন ‘উপন্যাস’ সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি কিছু করার উপায়ও নেই। ফলে, গ্রন্থটির সংস্করণ-মুদ্রণসংখ্যাবিষয়ক তথ্যে, শুরুতেই তিনি দৃষ্টি আকর্ষণে প্রবৃত্ত হয়েছেন : আনিসুল হকের মা ‘উপন্যাসটির মুদ্রণের ইতিহাস চিত্তাকর্ষক। এটা প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। দ্বিতীয় সংস্করণে—সেটিই বোধহয় বইটির চতুর্থ মুদ্রণ—তাতে নবলব্ধ তথ্য ও ঘটনা সংযোজিত হয় ২০০৩ সালের জুনে। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চম মুদ্রণে বইটি আবার সংশোধিত হয়। সেইরূপেই এ-বছরে ৪৪তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে। আট বছরে একটি উপন্যাস ৪৪ বার মুদ্রিত হয়েছে বাংলাদেশে—এ-ঘটনা সামান্য নয়।’
শেষাংশে তাঁকে লিখতে হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাস হিসেবে এবং মাকে নিয়ে লেখা উপন্যাস হিসেবে আনিসুল হকের মা যে-কোনো সময়ের একটি প্রধান উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করবে বলে আমার মনে হয়।’ তাঁর এই ‘মনে’ হওয়ার কারণ কী, তা জানা যায় নি। অধিকন্তু এর মধ্যে কিঞ্চিৎ চালাকি টের পাওয়া যায়। তা কী-রকম?
‘যে-কোনো সময়ের প্রধান উপন্যাস’ বলে যে ভবিষ্যদ্বাণী বা আশা তিনি করেছেন, তার জন্য তাঁকে তৈরি করতে হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাস’ এবং ‘মাকে নিয়ে লেখা উপন্যাস’—সাহিত্যের এই দুটি উপবর্গের ধারণা। কিন্তু ‘যে-কোনো সময়ের একটি প্রধান উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করবে’ বলে যে আশা তিনি ব্যক্ত করেছেন, তাতে ফাঁকি আছে বলে মনে হয়। অন্যদিকে, এই ধরনের উক্তি সান্ত্বনাসূচকও হতে পারে। অনেকটা মর্ত্যে যিশুর পুনরাগমন নিয়ে বাইবেলে যেমন বলা হয় খ্রিস্টের অনুসারীদের উদ্দেশে—তেমনই। কিন্তু সাহিত্য হিসেবে প্রচারিত এই ধরনের রচনার পাঠকদের এত ধৈর্য নেই, সেই প্রয়োজনও তাদের থাকার কথা নয়। তারা অপেক্ষা করে ‘লেটেস্ট’ বা ‘নতুন বই’য়ের জন্য। যা হোক, এমন গ্রন্থের মুখোমুখি হলে আনিসুজ্জামান কেন, যে-কোনো পণ্ডিত, যদি তিনি কিঞ্চিৎ কপট হন এবং দেশের প্রধান দৈনিকের সঙ্গে সুসম্পর্ককে সততার চেয়ে জরুরি মনে করেন, তাহলে এই স্যান্ডউইচ রিভিউ তার পক্ষে স্বাভাবিক।
‘আনিসুল হকের মৌলিকত্ব বা রচনার শ্রী’ কী—সে-ব্যাখ্যাও নেই। তা প্রায় অসম্ভব, কারণ, এটি যে উপন্যাস হয়ে ওঠে নি, আনিসুজ্জামান সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন।
ফাঁকি ও প্রবোধ আরও আছে। ২৫ আগস্টের রাতে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের যে-বর্ণনা আলোচ্য রচনায় এসেছে, সে-সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘পাঠকের হয়তো মনে পড়বে, জীবন আমার বোন উপন্যাসে মাহমুদুল হকও প্রায় এমন রীতি অবলম্বন করেছিলেন, কিন্তু তাতে আনিসুল হকের মৌলিকতা বা রচনার শ্রীর কোনো পার্থক্য হয় না।’ কিন্তু ‘এমন রীতি’ কোন রীতি, তা অব্যক্ত থেকেছে; ‘আনিসুল হকের মৌলিকত্ব বা রচনার শ্রী’ কী—সে-ব্যাখ্যাও নেই। তা প্রায় অসম্ভব, কারণ, এটি যে উপন্যাস হয়ে ওঠে নি, আনিসুজ্জামান সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন। এটাও হয়তো তাঁর বোধগম্য হয়েছিল যে, শুধু গ্রন্থটির সংস্করণ-মুদ্রণসংখ্যার প্রসঙ্গ আর কাহিনিবর্ণনায় উপন্যাস হিসেবে এর স্বীকৃতি বা বৈধতা দেওয়া অনেকটা তালগাছে নারকেল ফলানোর মতোই। ফলে, জীবন আমার বোন (১৯৭৬) উপন্যাসের সঙ্গে (ব্যাখ্যাহীন) তুলনা করে লেখকের ‘মৌলিকত্ব’ ও রচনার ‘শ্রী’র উল্লেখে রচনাটিকে সাহিত্যের অংশ করে তোলার জোড়াতালিসুলভ চেষ্টা করেছেন।
সরদার ফজলুল করিম (১৯২৫-২০১৪) মা গ্রন্থ সম্পর্কে দিনলিপির আঙ্গিকে একটি রচনা লিখেছেন। তাতে তিনি অবতারণা করেছেন ম্যাক্সিম গোর্কির (১৮৬৮-১৯৩৬) মা (১৯০৬) উপন্যাসের; কিন্তু আনিসুল হকের এই ‘উপন্যাস’ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এ একখানি তুলনাহীন গ্রন্থ।’ এবং কিভাবে ‘আনিসুল’ এটি ‘তৈরি’ করেছেন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আমার কথা হলো, বইটি ‘তুলনাহীন’ই; নামের মিল থেকে ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাসটির প্রসঙ্গ উঠলেও এ-দুটির মধ্যে তুলনা চলে না। আজাদের মা সাফিয়ার সঙ্গে পাভেলের মা নিলভনার মিল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অংশত তা অনুসন্ধেয়—পুত্রের সতীর্থ বা বন্ধুদের প্রতি মমতা ও আপ্যায়নের ক্ষেত্রে, কিন্তু বিশ্বব্যাপী মা ও সন্তানের সম্পর্কের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দিকে তাকালে তা বিশেষ কিংবা মহৎ কিছু বলে মনে হওয়ার কথা নয় এবং এই আলাপ নিরর্থক।
সরদার ফজলুল করিম গ্রন্থটির সূত্রে আনিসুল হককে ‘ক্লাসিক্যাল’ লেখকের মর্যাদা দিয়েছেন। আমরা জানি, শাস্ত্রীয় প্রাচীনত্ব, কাঠামোগত বিশুদ্ধতা, সংযম বা পরিমিতিবোধ, সারল্য, ঐতিহ্যস্বীকৃত মূল্যবোধ ও নৈতিকতা, সংযত আবেগ, যৌক্তিক পারম্পর্য, চিরন্তনতা, ভাষার প্রাচীনপন্থি গাম্ভীর্য ও বলিষ্ঠতা—গ্রেকো-রোমান ট্র্যাজেডি, মহাকাব্য এবং রোম্যান্টিক কালপর্বের আগে রচিত শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের এইসব বৈশিষ্ট্য মেনে যা রচিত হয়, তাই ক্লাসিক। মা ‘উপন্যাস’ এগুলির কোনটি ধারণ করেছে এবং করে নি, সে-প্রসঙ্গে না-গিয়ে মূল জায়গায় আসা যাক। এটাও সরদার ফজলুল করিমের জানার কথা যে, বীরের পতন ছাড়া ট্র্যাজেডি অকল্পনীয়। ‘উপন্যাস’টির প্রধান চরিত্র আজাদের মধ্যে বীরের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। অধিকন্তু, অনেকটা হুজুগে পড়েই মুক্তিযুদ্ধে সে অংশগ্রহণ করেছিল। তার জীবনপ্রবাহ, কর্মকাণ্ড, পরিণতি—কোনোটাই বীরোচিত নয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, ক্লাসিক যে-বীরের ধারণা দেয়, এখনকার সাহিত্যে তা সম্ভব কি-না। আমার কথা হচ্ছে, অসম্ভব নয়, যদি চরিত্রটি সংগ্রামশীল, আত্মমর্যাদাবান ও উন্নত নৈতিক গুণসম্পন্ন হওয়ার সূত্রে বীরের রূপক হয়ে ওঠে। আজাদের ক্ষেত্রে তা ঘটে নি। কারণ জন্মসূত্রে পাওয়া তার শ্রেণিচরিত্র। মায়ের আপসহীনতার মধ্যেও সে আরামআয়েশে থাকার জন্য টাকা নিয়েছে বাবার কাছ থেকে। পড়াশোনার জন্য তাকে যে করাচি পাঠানো হচ্ছে, এর বিরুদ্ধেও তার কোনো অবস্থান নেই। আরও শোচনীয়, প্রহারের কথা বলে মায়ের চিত্তে উদ্বেগ সঞ্চারের মধ্য দিয়ে বন্দি আজাদ প্রকাশ করেছে মানুষ হিসেবে সে অপরিণত ও দায়িত্বহীন। বাস্তবিক, শ্রেণিচরিত্র তাকে বীরোচিত বা সংগ্রামী করে তোলা দূরের কথা, ব্যক্তিমানুষরূপে বিকশিত হতে দেয় নি। বরং মা সাফিয়ার চরিত্রটির ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট ছিল। বন্দি আজাদকে দেখতে গেলে সে যখন বলে যে তাকে খুব প্রহার করা হচ্ছে এবং পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের নাম জানতে চায়, তখন মা তাকে নাম বলতে নিষেধ করে এবং নির্যাতন সহ্য করতে বলে। যদিও এর বিপরীতটি করলে পুত্রের মুক্তির সম্ভাবনা ছিল। ‘উপন্যাস’টির এই অংশে সাফিয়ার মাতৃত্ব প্রসারিত, সার্বিক, চিরন্তন ও মহান হয়ে ওঠে। এটা ছিল একজনের মা থেকে সব মুক্তিযোদ্ধার জননীতে তার উত্তরণ। কিন্তু আটক পুত্র ভাত খেতে পারে নি এবং শোয়ার জন্য বিছানা পায় নি বলে অন্নগ্রহণ থেকে আমৃত্যু বিরত থাকা আর মেঝেতে ঘুমানোর ব্যাপারটি মাতৃত্বকে সেই মুহূর্তের সমগ্রতা ও মহত্ত্ব থেকে বিচ্যুত করে। ফলে, শেষ পর্যন্ত তিনি শুধু আজাদের জননীই থেকে যান। কেবল তা নয়, নিজে গ্রহণ না করলেও ম্বামীর সম্পত্তি আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ও পীরের মাজারে বণ্টন করে দেওয়ার ঘটনাটি সাফিয়াকে মুক্তিযোদ্ধার মায়ের ব্যক্তিত্ব বা মহত্বের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অধিকন্তু, প্রশ্ন জাগে, সন্তান অন্তর্হিত হওয়ার পর মৃত্যু পর্যন্ত, অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের ১৪ বছরে কেন তিনি কোনো সামাজিক অ্যাকশনে আত্মনিয়োগ করলেন না? কেবল রুটি খেয়ে মেঝেতে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলেন? তার নিষ্ক্রিয়তার হেতু কী? উত্তর যেহেতু নেই, বলা যেতে পারে, শেষ পর্যন্ত সাফিয়া আবহমান বাংলার সাধারণ, সন্তানহারা ও পুত্রকেন্দ্রিক নারী বা জননী থেকে গেছেন।
আনন্দের আতিশয্যে মন্তব্য করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘ক্লাসিক’ শব্দটি ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে বাংলাদেশে। সরদার ফজলুল করিম কি এই শ্রেণিতে অবস্থান করেন?
‘উপন্যাস’টির কাঠামো, পরিপ্রেক্ষিত, চরিত্র-ঘটনা-পরিণতি, সংলাপ-ভাষা—কোনোটিই প্রমাণ করে না যে আনিসুল হক ক্লাসিক লিখতে চেয়েছেন। তাহলে কেন তাঁকে সরদারের ক্লাসিক্যাল লেখক মনে হলো? অজ্ঞতাহেতু? নাকি তাঁকে কপট হতে হয়েছে, লেখককে খুশি করার জন্য? এও বাস্তবিক—কোনো নাটক, সিনেমা, গান, নাচ, এমনকি কফি উপভোগের পর আনন্দের আতিশয্যে মন্তব্য করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘ক্লাসিক’ শব্দটি ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে বাংলাদেশে। সরদার ফজলুল করিম কি এই শ্রেণিতে অবস্থান করেন? যা হোক, আনিসুল হক সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যটি সন্দেহজনক।
তিনি লিখেছেন, এটি ‘ইতিহাসের ইতিহাস, উপন্যাসের উপন্যাস।’ আবেগের আতিশয্যবশত এমন কথা অস্বাভাবিক নয়। তবে তিনি গুলিয়ে ফেলেছেন ইতিহাস ও উপন্যাসের পার্থক্য। কোনো রচনা ইতিহাস হলে সেটি উপন্যাস হয় কিভাবে? তেমনি যেটি ‘ইতিহাসের ইতিহাস’ সেটি ‘উপন্যাসের উপন্য্যাস’ কেমন করে হলো? চিন্তার কথা! এখন জানা যাক, উপন্যাস জিনিসটি কী?
এটি এমন এক বর্ণনাত্মক শিল্পকর্ম, যাতে কোনো বাস্তব কিংবা বিশ্বাসযোগ্য কাহিনিকে আশ্রয় করে লেখকের জীবনবোধ প্রকাশিত হয়। বদলে যেতে থাকা সময়ের চাপ ব্যক্তি কিভাবে মোকাবিলা করছে কিংবা সমাজ পরিবর্তনের দায় কিভাবে তাকে বহন করতে হচ্ছে—এই অনুসন্ধান ঔপন্যাসিকের প্রধান অভিপ্রায়। অন্যদিকে, আলোচ্য রচনায় বর্ণিত ঘটনা বা কাহিনির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। কারণ, তা ইতিহাস থেকে গৃহীত। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—স্বামীর থেকে বিচ্ছিন্ন সাফিয়ার যৌনজীবন কিভাবে কেটেছে? বা, ফরাশগঞ্জের বাড়িতে মৃত বোনের স্বামীর উপস্থিতি তার জীবনে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি? মালিবাগের বাড়িটি কার? ইউনুস চৌধুরীর কাছে কেন পুত্র আজাদের আটক হওয়ার খবরটি গেল না? মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি কী করছিলেন? ৭১ সালের পর তার অবস্থা, অবস্থান ও পরিণতি জ্ঞাত না-হওয়ার হেতু কী? এই ১৪ বছরে দেশে বেশকিছু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক ঘটনা ঘটেছে। এগুলির কোনোটিই সাফিয়াকে স্পর্শ করে নি?—এসবের উত্তর নেই বলে কাহিনির বিশ্বাসযোগ্যতায় গোলমাল দেখা দিয়েছে।
ধরা যাক, মুক্তিযুদ্ধ ও মা-সংক্রান্ত আবেগকে সম্মান জানিয়ে এই প্রশ্নগুলি বাদ দেওয়া হলো। কিন্তু বিশ্বস্ততায় জোড়াতালি-মারা এই কাহিনিকে আশ্রয় করে জীবন সম্পর্কে লেখক কী ধারণা দিয়েছেন—জানা কিংবা বুঝতে পারা মুশকিল। আগেও এ-প্রসঙ্গে খানিকটা বলা হয়েছে। পরিবর্তনশীল সময়ের চাপ সাফিয়া এবং তার সন্তান মেনে নিয়েছে, মোকাবিলা করে নি। আজাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, আগেই বলা হয়েছে, হুজুগের বশেই; কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শগত প্রেরণা থেকে কিংবা একক সিদ্ধান্তে এটা ঘটে নি। অথবা বলা চলে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিই তাকে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে।
এতক্ষণের আলাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, আলোাচ্য মা টেক্সট নয়; কিন্তু শেষ রক্ষা হিসেবে এটি কি ওয়ার্ক হতে পেরেছে?
ফরাসি দার্শনিক রোলাঁ বার্থ (১৯১৫-’৮০) তাঁর বিখ্যাত দ্য প্লেজার অব দ্য টেক্সট (১৯৭৩) গ্রন্থে ওয়ার্ক ও টেক্সটের মধ্যে পার্থক্য দেখাতে গিয়ে জানিয়েছেন, ওয়ার্ক মূলত লেখক যা চান, তাই—এতে তিনি সর্বেসর্বা; ফলে, এটা বদ্ধ ও স্থির, যে অর্থে সৃষ্টি করা হয়েছে, তার বাইরে যাওয়ার উপায় এতে নেই। এটি ইন্টারপ্রিটেটিভ বা ব্যাখ্যাসম্মত নয় এবং পাঠকের অংশগ্রহণ এখানে অগ্রাহ্য হয়ে থাকে। অর্থাৎ লেখকের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভুত্ব ওয়ার্কে চূড়ান্ত, পাঠক এতে ক্রীড়নক মাত্র। রোলাঁ বার্থের কথায় উপন্যাস, চিত্রকর্ম ও সঙ্গীত—শিল্পকলার এই তিনটি শাখায় রচিত সবই ওয়ার্ক, যেগুলোর নিয়তি পূর্বনির্দিষ্ট কাঠামোয় স্থির হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে, টেক্সট লেখকের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত, তা পাঠককে আমন্ত্রণ জানায় সৃষ্টিশীল অংশগ্রহণের; ফলে এর একের পর এক কিংবা একসঙ্গে বহু মানে তৈরি হতে থাকে। অস্পষ্টতা, দূরত্ব আর অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য বা উপাদানের উপস্থিতিহেতু এমনটি ঘটে।
এতক্ষণের আলাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, আলোাচ্য মা টেক্সট নয়; কিন্তু শেষ রক্ষা হিসেবে এটি কি ওয়ার্ক হতে পেরেছে? এর উপন্যাসত্ব বিচারের মধ্য দিয়ে উত্তরটি মিলবে। বর্তমান আলোচনায় একাধিকবার সে-প্রয়াস করা হয়েছে। বলা দরকার, প্রতিটি রচনাই লেখকের উদ্দিষ্ট ফর্ম বা কাঠামো সম্পর্কিত ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে। আনিসুল হকের মা-র ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এই রচনার উপন্যাসত্ব কতটুকু, তা দিয়েই বুঝতে পারা যাবে উপন্যাস সম্পর্কে তাঁর ধারণা পূর্ণাঙ্গ বা খণ্ডিত, পরিণত কিংবা অবিকশিত কি-না। এই বিবেচনায় দেখা যায়, উপন্যাসের প্লট বা ঘটনা, চরিত্র ও সংলাপ—এই তিনটি উপাদানই কেবল এ-রচনায় আছে; বাকি দুটি—ভাষা ও লেখকের জীবনবোধ নেই। আলাপটি আগেও হয়েছে। যা হোক, আনিসুল হক উপন্যাস বলতে বোঝেন ওই তিনটি উপাদানের সমন্বিত উপস্থিতি। ফলে, এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, বাংলা উপন্যাসের সূচনাকালে অর্থাৎ উনিশ শতকে বসেই তিনি মা লিখেছেন। অথবা, তাও নয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-’৯৪) দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) কিংবা রাজসিংহ (১৮৮২)-র তুলনায় মা-র উপন্যাসত্ব খুব নিরীহ, অন্তত কাঠামোর দিক থেকে। ফলে, ওয়ার্ক হিসেবে এটি অসম্পূর্ণ ও ব্যর্থ। লেখক যা চেয়েছেন, তা সম্ভবত হয়েছে; কিন্তু রোলাঁ বার্থের তত্ত্ব অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় নি।
যা হয়েছে, তাতে মুক্তিযোদ্ধা আর তাদের জননীর গৌরবচ্যুতি ঘটেছে। বলতে চাইছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এত নিরীহ কিছু নয়। আত্মরক্ষার জন্য যদি এটা বলা হয়—আজাদ এবং তার মায়ের জীবন সম্পর্কে যে-বর্ণনা বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য, তাই এ-উপন্যাসে ধারণ করা হয়েছে এবং এটাই লেখকের উদ্দেশ্য ছিল—তাহলে এ-প্রসঙ্গ অবধারিত হয়ে ওঠে যে, চরিত্র-নির্বাচনে লেখকের কাণ্ডজ্ঞানের অভাব রয়েছে।
নিজের লেখা ‘উপন্যাস’ নিয়ে আলোচনা সেই পত্রিকায় ছাপানো, যেখানে লেখক পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত—এমন নির্লজ্জ স্বেচ্ছাচারিতা বাংলাদেশেই কেবল সম্ভব।
৪
জীবনবোধশূন্য ও অশৈল্পিক হওয়া সত্ত্বেও এই ‘উপন্য্যাস’ কেন এত বিপুল জনপ্রিয়তা পেল? উত্তর পাওয়া যায় সোহেল হাসান গালিব রচিত আমার খুতবাগুলি গ্রন্থের 'টেক্সট কন্টেক্সট' শীর্ষক রচনায়। তিনি লিখেছেন:
কন্টেন্ট ও কন্টেক্সটের গরিমা যে কোনো টেক্সকে বাই-ডিফল্ট মহিমান্বিত করে। যেমন ধরেন, আপনি মা-কে নিয়ে একটা গান গাইলেন। অমনি নিখিল-সন্তানেরা হামলে পড়বে, হাইমাউ করে কেঁদে উঠবে। এই কান্নার কারণ এক চিলতে রিচুয়াল, এক চিলতে ব্যক্তিগত স্মৃতি—সব মিলিয়ে 'মা' সম্পর্কে করুণ ও আর্দ্র একটি পারসেপশন। এখানে আর্টের ভূমিকা খুব সামান্য। একটা অ্যালার্ম ঘড়ির মতো, সে শুধু ঘুম ভাঙাবে। বাকি কাজ আপনিই করবেন।
ঠিক তেমনি, আপনি যখন নাজি-হলোকাস্টের ওপর কোনো উপন্যাস পড়েন, কিংবা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর, আপনার আবেগ-তাড়িত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা ১২ আনা, যদি সে উপন্যাস ১৬ আনা ফালতুও হয়। কারণ এখানে আপনি পরিচালিত হন কনটেক্সট দিয়ে, টেক্সট দিয়ে নয়।
সুতরাং বুঝতে বাকি থাকে না, এই গ্রন্থ জনপ্রিয় হওয়ার কারণ ‘টেক্সট’ নয়, কন্টেক্সট; অর্থাৎ মা ও মুক্তিযুদ্ধ—এই দুটি বিষয়প্রসূত আবেগ। যারা বইটি পড়ে সপ্রশংস কাতর হয়েছে, তারা সাহিত্যের পাঠক নয়, আবেগ উৎপাদনের বিষয়ে ভর করে লিখিত বিনোদনের ভোক্তা। আর্ট বা শিল্পকলা এখানে কোনো ফ্যাক্টরই নয়। বরং সৌন্দর্যসৃষ্টির লক্ষণ যত কম থাকবে, এর ভোক্তাজগৎ তত প্রসারিত হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো আরও ‘উপন্যাস’ রচিত হয়েছে, সেসবও জীবনবোধ ও আর্টের দিক থেকে অসম্পূর্ণ বা ব্যর্থ এবং কাহিনির ঊর্ধ্বে উঠতে পারে নি; তবু সেগুলি এত জনপ্রিয় হলো না কেন? উত্তর খুব সোজা। আগের লেখকরা উপন্যাসের কাঠামো বা এর উপাদানগুলির প্রতি বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করেছেন। তাদের রচিত উপন্যাসগুলির ভাষাও অপেক্ষাকৃত অনুশীলিত; কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের প্রাদুর্ভাবের পর মধ্যবিত্তের অবিকশিত অংশ থেকে এমন এক বিপুল শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা সাহিত্যের নয়, কাহিনির পাঠক। ভাষা, জীবনবোধ, অর্থ ও সৌন্দর্য—এসব বোঝার উপযোগী নয় তাদের মস্তিষ্ক। কেবল মধ্যবিত্তের আনন্দবেদনা-হাসিকান্নার একটা কাহিনিতেই তারা অশেষ সুখ বোধ করে। নব্বইয়ের দশকে এই শ্রেণির বিস্তার ঘটেছে, গণমাধ্যমের পোষকতায়। আর 'প্রথম আলো' হুমায়ূনের তৈরি করা রুচিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছে নিজের বাজার, মা এখানকার সম্ভবত সবচেয়ে সফল পণ্য। এটিকে সাহিত্য হিসেবে প্রচারের চেষ্টায়, ‘বুদ্ধিজীবী‘দেরও ব্যবহার করা হয়েছে, বিভিন্ন কৌশলে। যেমন, আনিসুজ্জামানকে এর একটি চরিত্ররূপে দেখানো হয়েছে। তাতে তিনি প্রবন্ধ পাঠ করছেন। তাঁর প্রশংসাও করা হয়েছে ভিক্টোরিয়ান যুগে রচিত উপন্যাসের প্রথা মেনে, যেখানে চরিত্রের বহিরঙ্গ অর্থাৎ চেহারা ও বেশভূষা বর্ণনার মধ্য দিয়ে তার স্বরূপ ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের চেষ্টা থাকত:
মেয়ে দেখার লোভেই আজাদ, ফারুক, ওমর—সবাই মিলে বিকালে গিয়ে হাজির হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সিটিটিউটে। পাকিস্তান লেখক সংঘের আয়োজনে এই অনুষ্ঠান হচ্ছে।...
আজাদরা যখন ঢোকে তখন আনিসুজ্জামান প্রবন্ধ পড়ছেন। ফারুক মন দিয়ে বক্তৃতা শোনে। আনিসুজ্জামান চমৎকার পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। তাকে দেখতেও লাগছে নায়কের মতো। ফারুক আনিসুজ্জামানের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ। যেমন সুলিখিত, তেমনি সুপঠিত। আনিসুজ্জামানের গলার স্বরও মাশাল্লা লা-জবাব। রবীন্দ্রনাথ যে বাংলা ভাষাটাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাঁর কোনোই সন্দেহ নাই।
কৃতজ্ঞতাবশত আনিসুজ্জামানও গ্রন্থটির প্রশংসা করে লিখেছেন, তা প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোতেই! (একটু আগে সে-সম্পর্কে কিছু বলা হয়েছে) নিজের লেখা ‘উপন্যাস’ নিয়ে আলোচনা সেই পত্রিকায় ছাপানো, যেখানে লেখক পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত—এমন নির্লজ্জ স্বেচ্ছাচারিতা বাংলাদেশেই কেবল সম্ভব। নৈতিক মূল্যবোধের দিক থেকে এটা একরকম দস্যুতা, যা কেবল সাহিত্য-পরিমণ্ডলের জন্য নয়, সমাজের জন্যও অশেষ ক্ষতিকর। একদিনে, আকস্মিকভাবে, এই অপকর্ম সম্ভব নয়। এটি করতে গেলে ধাপে-ধাপে প্রয়োগ করতে হয় বিভিন্ন কৌশল। প্রথমত, লেখকের কল্পনামনীষাকে 'সাংবাদিক বাস্তবতা' দিয়ে ধ্বংস করা : প্রতিবেদনই যে সাহিত্য এবং এটি রচিত হবে গণমাধ্যমের ভাষায়—দীর্ঘদিনের চর্চায় সে-ধারণা সমাজে জারি রাখা; দ্বিতীয়ত, এমন এক বিপুল পাঠকশ্রেণি গড়ে তোলা, ছোট-ছোট বাক্যের সহজসরল সৃষ্টিছাড়া রচনার মধ্যে যারা বছরের পর বছর আছাড় খাওয়ার নেশায় থাকবে এবং সাহিত্য-অসাহিত্যের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতাই তাদের থাকবে না; তৃতীয়ত, চিন্তাশক্তিহীন ও অবিকশিত শ্রেণির এই পাঠকদের জন্য যারা লেখে, তাদের প্রতিপালন শুধু নয়, তারা যে সেরা লেখক, সমাজে সে-ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা; পক্ষান্তরে যারা চিন্তাঋদ্ধ ও সৃষ্টিশীল, তাদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন। কাজটি খুব পরিকল্পিতভাবে হয়ে থাকে; উদাহরণস্বরূপ, লেখা প্রকাশ দূরের কথা, সংবাদ বা প্রেস রিলিজে যদি গণমাধ্যমটির বাজার-বহির্ভূত কোনো নাম আসে, যত প্রতিভাবান হোক, সেটি মুছে ফেলা হয়। উদ্দেশ্য, তাকে জাতির সামনে আসতে না দেওয়া; চতুর্থত, বিনিময়মূলক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিত্বহীনতার এমন পর্যায়ে বুদ্ধিজীবীদের নামিয়ে আনা, যাতে অপপ্রতিষ্ঠানটির মর্জি অনুসরণ করতে তারা বাধ্য বা উৎসাহিত হয়।
শুরু থেকেই 'প্রথম আলো' এই কৌশলগুলির চর্চায় খুব আন্তরিক। বাজে লেখকের বাজার সৃষ্টির জন্য পাঠকের পতন ঘটিয়েছে, তাদের অবিকশিত রাখার উদ্দেশ্যে প্রতিভাবান লেখকদের এড়িয়ে গেছে, প্রকাশ করেছে রাশি-রাশি নিকৃষ্ট রচনা এবং সেগুলির রচয়িতাদের ‘সেরা লেখক’ বলে প্রচার করছে। এই কাজে বৈধতা দেওয়ার জন্য পত্রিকাটি সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল (তিনিও মা নিয়ে লিখেছেন প্রথম আলোয়!) প্রমুখকে নিয়ে একটা ঘরোয়া বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠী গড়ে তুলেছে এবং তৈরি করেছে তাদের মহান ভাবমূর্তি; তাতে, উদাহরণস্বরূপ, সরদার ফজলুল করিম হয়ে যান ‘প্রখ্যাত দার্শনিক’। প্রাচীন গ্রিক দর্শনের দু’চারাটি পুস্তক ও গ্রন্থাংশ অনুবাদ করে যে দার্শনিক হওয়া যায় বাংলাদেশে, সে-ধারণা প্রথম আলোই দিয়েছে। এই মিথ্যাচারের কারণ কী? প্রশ্নটির উত্তর মা নামের প্রতিবেদনটি যিনি লিখেছেন, তাঁর কাছে থাকার কথা। তবে, নিশ্চিতভাবেই, সাহিত্যের সচেতন পাঠক সব বুঝতে পারে। তাদের নীরবতার অর্থ সর্বদা এই নয়—যা ঘটেছে, তারা তা মেনে নিয়েছে।