‘আমি দৌর্দণ্ডপ্রতাপ পুরুষের পৃথিবীতে আত্মহননের মধুস্বাদ রক্তের ভেতরে নিয়ে লুপ্ত ও লীন হতে হতে অশ্রু ও রক্তের ফোঁটায় লিখেছি পুরুষেরই জন্য কবিতা। পুরুষাধিপত্যবাদী শব্দপুঞ্জের আঁধারে, ভয়জাগানিয়া বৈরিতার ভেতরে স্বতন্ত্র, আত্মশাসিত ও একা খুঁজতে চেয়েছি নিজের সার্বভৌম এলাকা, যা প্রায় অসম্ভব পুরুষের বিশ্বে। তার পীড়নের কথা লিখতে গিয়ে পুনঃপীড়িত হওয়ার লোভে পড়েছি পুরুষের প্রেমে।’ পুরুষসমগ্র কবিতাসংকলনটির মুখবন্ধের এটি একটি অংশ, গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর মর্মে প্রবেশের জন্য এটি প্রধান এক দরজা হতে পারে। ‘প্রায় অসম্ভব’ জেনেও শেলী নাজ ‘পুরুষের বিশ্বে’ খুঁজতে চেয়েছেন ‘নিজের সার্বভৌম এলাকা।’ কবিরা তাই করেন, তা না করলে প্রথা ও প্রচলনের বিপরীতে তার শক্তি বুঝে ওঠা মুশকিল। যা হোক, এই গ্রন্থের প্রায় সব কবিতায় পুরুষের পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ এক নারীর বিপন্নতা নানাভাবে স্পন্দমান। কবির রচিত আগের ‘বিষাদ ফুঁড়ে জন্মেছি বিদ্যুৎলতা’, ‘শেকলে সমুদ্র বাজে’, ‘চর্যার অবাধ্য হরিণী’, ‘মমি ও মাধুরী’, ‘সব চাবি মিথ্যে বলে’ এবং ‘সুচেঁর ওপর হাঁটি’ এই ছ’টি কবিতাগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে এই সংকলনের কিছু কবিতা। বোঝা যায়, আলোচ্য গ্রন্থটির একটা ইতিহাস রয়েছে, পটভূমি রয়েছে। তা যতটা কালানুক্রমিক, তার চেয়ে বেশি পুরুষের জগতে নারীর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির মূল্যায়নে উচ্চকিত। এটা দিয়েই নারী ব্যাখ্যা করতে চায় নিজেকে, বোঝাতে চায়, সে কেমন আছে। ব্যক্তি আর সমষ্টি এই সক্রিয়তার মধ্যে একাকার হয়ে যায়, কিংবা একে অন্যের রূপক হয়ে ওঠে।
ফলে, নারীর বাস্তবতা ও আত্মমূল্যায়নের জন্য শেলী নাজ হাজির করেন পুরুষ সম্পর্কিত নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির ডিসকোর্স এবং এটা একটা উপায় হয়ে ওঠে পাঠকের জন্য, যাতে তারা রাষ্ট্রে টিকে থাকা লৈঙ্গিক বৈষম্যের সমস্ত কলকব্জার মধ্যেও নারীর মনোজগত এবং তার অনুভূতির সত্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। ‘পুরুষচরিত’ অংশটি এ সংকলনে প্রণয়ন করা হয়েছে সম্ভবত সে-কারণে। এতে পুরুষ সম্পর্কে নারীর ব্যাখ্যা রয়েছে, যদিও তা শেষ পর্যন্ত লৈঙ্গিক পীড়নের সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে কবির মূল্যায়নের দিকে গেছে। যা হোক, ‘উত্তম পুরুষ’ কবিতার এই অংশটুকু পড়লে প্রচলিত সমাজকাঠামোয় লিঙ্গভিত্তিক চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায় :
তোমারই দেবালয়, বেশ্যাপাড়া, মসজিদ... শেষ আর শুরু নারী অধঃস্থিত, রুদ্ধ; সর্বত্র প্রবেশ্য তুমি উত্তম পুরুষ!
কেন কবিতাটির নাম ‘উত্তম পুরুষ’ রাখা হলো? ব্যাকরণের সূত্রে উত্তম পুরুষ বলে যা চিহ্নিত, তা জ্ঞানতত্ত্বে ব্যক্তির ‘সেলফ’; এটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষ একটি টার্ম, ব্যাকরণেও তাই; কিন্তু শেলী নাজ বদলে দিতে চেয়েছেন এর ফেনোমেনা, বোঝাতে চেয়েছেন পুরুষের পৃথিবীতে ‘সেলফ’-এর মালিকানা পুরুষেরই, নারীর নয়। কেবল তা নয়, এ-কবিতার মধ্য দিয়ে লৈঙ্গিক বিবেচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন ধারণাটিকে; ফলে, ব্যাকরণের সূত্রও তাঁর চ্যালেঞ্জের সামনে এসে পড়েছে : নারী কখনো ‘আমি’ নয়, সে ‘অন্য’, কারণ কোথাও তার প্রবেশাধিকার নেই, পুরুষ চাইলে তবেই সে প্রবেশ করতে পারে। ‘পুরুষাধিপত্যবাদী শব্দপুঞ্জের আঁধারে’ কবি ‘নিজের এলাকা’ সন্ধান করতে গিয়ে প্রচলিত অর্থ থেকে শব্দকে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, পুরুষের ভাষার রাজনীতিও তাঁর পছন্দ নয়। নারীবাদী কবিরা এভাবেই পুরুষের ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিনিধিত্বকারী যন্ত্রপাতিগুলোকে অকেজো করে দিতে চান। এই মনোবৃত্তিতে প্রকৃতিও কবির রোম্যান্টিক সংবেদনশীলতা থেকে দূরে সরে যায় এবং প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। ফলে, ‘যুবক মেঘেরা’ কবিতায় তাঁকে লিখতে হয় : ‘মেঘেরা পুরুষ ঘরানার, ফন্দিবাজ, উদ্দেশ্যপ্রবণ, উড়ন্ত’।
পুরুষ সম্পর্কে মনোভাবের জায়গায় কবি নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ, বা, এ নিয়ে এক রকম দোদুল্যমানতা তাঁর মধ্যে রয়েছে
এটা ভাবা অসঙ্গত নয় যে, ‘পুরুষচরিত’ অংশে পুরুষের একটা প্রোফাইল, যা নারীর দেখা, হাজির করা হয়েছে। ‘নিষ্ঠুর’, ‘শিকারী’, ‘বদমাশ’, ‘প্রথাবন্দি’, ‘সুচতুর’, ‘মনবন্ধ্যা’, ‘যাযাবর’, ‘পরিব্রাজক’ ইত্যাদি চেহারায় তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু পুরুষের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যত তাকে দেয়া হোক মদ, রুটি, শস্য ও আফিম/ মেটে না আকাশচুম্বি ক্ষিদে কোনোদিন এ দ্বিপদী জন্তুর’। এই দৃষ্টিভঙ্গি র্যাডিক্যাল নারীবাদীদের; কিন্তু ‘পুংমাতৃত্ব’ কবিতায় যখন পুরুষকে লক্ষ করে বলা হয়, ‘তুমিই আমাকে জন্ম দিচ্ছ প্রেমে প্রতিদিন, প্রতিদিন/ তাই মুখে রক্ত তুলে, হৃদয় থেঁতলে শোধ করি এই মাতৃঋণ!’ তখন ধাঁধায় পড়ে যেতে হয় পাঠককে, কিংবা এই ভাবনায় জড়িয়ে যেতে হয় যে, পুরুষ সম্পর্কে মনোভাবের জায়গায় কবি নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ, বা, এ নিয়ে এক রকম দোদুল্যমানতা তাঁর মধ্যে রয়েছে। অধিকন্তু, পুরষ প্রতিদিন জন্ম দিয়ে চলেছে বলে নারীর মাতৃঋণ তাকে ‘মুখে রক্ত তুলে, হৃদয় থেঁতলে’ শোধ করতে হবে, কার্যকারণের ধারণায় এটা ভাবা যায় না। কিন্তু এও ঠিক, কবিতার শিল্পকলায় যুক্তির প্রচলিত শৃঙ্খলা টেকে না, বরং তা ভেঙে ফেলা যদি কবির অভিপ্রায় বলে কবিতায় প্রতীয়মান করে তোলা যায় এবং সেই বিবেচনার পরিসর গড়ে তুলতে পারলে ভিন্ন কথা। শেলী নাজ সম্ভবত সেই চেষ্টা করেছেন, ‘উত্তম পুরুষ’ সম্পর্কে প্রথাগত ভাবনায় অনাস্থা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তা মোটামুটি প্রমাণিত। মোদ্দা কথা এই যে, শেলী নাজের কবিতা পুরুষ সম্পর্কে নারীর যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা আপাত-দ্বান্দ্বিক, বা, বলা চলে, তা সিদ্ধান্তসম্মত নয়। এটা মনে রেখে তাঁর কবিতাপাঠ সমীচীন বলেই আমার মনে হয়। কিন্তু একে যদি কোনো পাঠক দুর্বলতা হিসেবে দেখেন, তা হলে ভুল করবেন। ভুল করবেন এই কারণে যে, অনেক বড় কবির মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
এই গ্রন্থের আরও তিনটি অংশ ‘প্রেম’, ‘প্রতারণা’ ও ‘ঘৃণা’। বোঝা যায় পুরষকে দেখার ক্ষেত্রে অনুভূতির মূল্য তাঁর কাছে বেশি। তাতেও লক্ষণীয় হয়ে ওঠে নারীর অবস্থান, যেখান থেকে সে দেখছে পুরুষকে। পাঠকালে, অন্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে এও মনে হয়েছে, শরীর ও মন দুটোই কবির কাছে গুরুত্বপূর্ণ, হোক তা নারীর কিংবা পুরুষের। তবে পুরুষকে তাঁর মনে হয়েছে শরীরসর্বস্ব, চিত্তবর্জিত। লিখেছেন, ‘প্রেম তার কাছে/ মাংসের মন্থন শেষে বমির উদ্রেক’; তবু নারী তার কাছে সমর্পণ করতে চাইছে নিজেকে এবং বারবার এই চাওয়ারই প্রকাশ নানাভাবে লক্ষ করা গেছে আলোচ্য অংশের কবিতাগুলোয়। তাতে স্পন্দমান বঞ্চিত, ব্যর্থ, পরাজিত নারীর স্বর :
...তোর জন্য তবু শিরাভর্তি তুলে রাখি মদ আমার না হোক, তোর বজরায় লাগুক প্রমোদ
পোর্সেলিনের বাটিতে খেতে দিই দুধ, তাজা রক্ত হে পরম প্রহেলিকা, পুরুষ আমার, তবু তুই এত বিমুখ, বিরক্ত! (প্রহেলিকা)
গ্রন্থের ‘প্রতারণা’ অংশে প্রেমে ব্যর্থ, নিঃসঙ্গ নারীর ক্রোধ ও হাহাকার লক্ষ করা যায়। তা লক্ষণীয় শুরু থেকেই। পুরুষ সম্পর্কে যেসব বিশেষণ তিনি ব্যবহার করেছেন, সেগুলোয় কবির এই অনুভূতিগত অবস্থান প্রমাণিত। তবে তিনি এর ব্যাখ্যা হাজির করেছেন প্রায় প্রতিটি কবিতায়, ফলে, পুরুষের প্রতি তাঁর উচ্চারণগুলো বৈধতা অর্জন করেছে। চেষ্টাহীনভাবেই এমনটি ঘটেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের প্রতি নারীর বিরক্তি ও ক্ষোভের যে বিস্তীর্ণ কিন্তু কারাগারতুল্য প্রেক্ষাপট রয়েছে, তা বোঝাতে গিয়ে বারবার তিনি দ্রষ্টব্য করেছেন নিজেকে :
আমার শরীরভর্তি প্রতারণা, বিষ, চুম্বনের পোড়া দাগ প্রেমের মুদ্রায় আর ভাঁজখোলা সরণীতে, রক্তাভ ফাটলে লাল পিঁপড়ের ডাঁই, শঠ ওষ্ঠ ও অধর, দূষিত পরাগ সমুদ্র মন্থন শেষে সকলেই প্রবঞ্চনা রেখে গেছে জলে
এই পর্বের অসামান্য একটি কবিতা ‘প্রত্যেকে’। এতেও নারীর প্রতি পুরুষের প্রতারণা বিধৃত। একটা অংশ :
তোমার শরীরটাকে হাড়গোড় খুলির শ্মশান বানালো কে? যখনই যাকে মধুুক’পী ঘাস বুনতে দিয়েছি, প্রত্যেকে...
তোমার বৈকুণ্ঠপথে এত কাঁটা বিছালো কে? যখনই যাকে হৃদয়ে যাবার পথ দিয়েছি, প্রত্যেকে...
কবিতাগ্রন্থের শেষ অংশ ‘ঘৃণা’; খুব যৌক্তিক এই অবতারণা। কিন্তু কবির ঘৃণায় রোম্যান্টিক সংবেদনশীলতারই প্রকাশ ঘটেছে বেশি। যেমন, ‘ভালোবাসি বলেই ঘৃণা ও কান্নার পর শাড়িভর্তি/ জ্বলে ওঠে রঙধনুগুলো’ (মোহর); ‘আয়নামহল জুড়ে জেগে থাক ঘৃণার ময়ূখ!’ (পিলসুজগুলো) ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, শুরুর অংশ থেকে ‘প্রেম’ ও ‘প্রতারণা’র কিছু কবিতায় (ব্যক্তি) নারী ও (সমাজের) পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিচ্ছিন্নতার চাপ প্রকাশে সামষ্টিকতার অনুরণন টের পাওয়া গেছে; ‘ঘৃণা’ পর্বে তা প্রায় অপসৃত হয়েছে এবং ব্যক্তিক উচ্চারণে সমর্পিত হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের ক্ষেত্রে কবি সম্ভবত ব্যক্তির প্রাধান্য স্বীকার করেছেন। তবে আলোচ্য গ্রন্থের কবিতাগুলোর মধ্যে আবহগত মিল ও ঐক্য লক্ষ করা যায়।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অবস্থা খুব শোচনীয়; শুধু সামাজিকভাবে নয়, শারীরিক ও মানসিকভাবেও সে অবরুদ্ধ, যদিও পুরুষের প্রতি তার অনুরাগ ও বিরক্তি রয়েছে
পুরুষসমগ্র কি নারীবাদী কবিতাগ্রন্থ? এর সব কবিতা নারীবাদী নয়; তবে বেশির ভাগ কবিতায় ‘লৈঙ্গিক রাজনীতি’ ও ‘কন্ঠস্বরের স্বাতন্ত্র্য’—নারীবাদের এই প্রধান দুটি প্রত্যয়ের স্পন্দন টের পাওয়া যায়। তা র্যাডিক্যাল নয়, কেননা পুরুষের প্রতি নারীর শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতার আবেগ কবিতাগুলোয় প্রাধান্য পেয়েছে। গত শতাব্দির চল্লিশের দশকে ইঙ্গ-মার্কিন কনফেশনাল কবিতায় নারীবাদী সংবেদনশীলতার যে তরঙ্গ দেখা দিয়েছিল প্রধানত সিলভিয়া প্লাথ ও অ্যান সেক্সটনের কবিতায়, পুরুষসমগ্র কবিতাগ্রন্থে তা দুর্লক্ষ্য নয়। সে-বিচারে তাঁর কবিতাও, প্রসারিত অর্থে, স্বীকারোক্তিমূলক এবং তাতে ধ্বনিত হয়েছে নারীরই স্বর, যা পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত নয়। এ নিয়ে পৃথকভাবে একটি প্রবন্ধ রচিত হতে পারে। আলোচ্য গ্রন্থ খুব ভালো করে মনে করিয়ে দেয়, পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অবস্থা খুব শোচনীয়; শুধু সামাজিকভাবে নয়, শারীরিক ও মানসিকভাবেও সে অবরুদ্ধ, যদিও পুরুষের প্রতি তার অনুরাগ ও বিরক্তি রয়েছে।
