বাংলা নাটকের ইতিহাস ও আঙ্গিকের খোলনলচে পাল্টে দেয়া শিল্পী, রূপকার সেলিম আল দীনের ৬৬ তম জন্মদিন ছিল গত ১৮ আগস্ট ২০১৫। তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে কবি চঞ্চল আশরাফ লিখেছিলেন আল দীনের শিল্পপ্রতিভার শিখরসম্পর্শী রচনা 'চাকা' নিয়ে একটি ক্ষুদে গদ্য। রচয়িতার আর সকল সৃষ্টিকর্ম, চিন্তা ও তৎপরতার সঙ্গী হতে এই গদ্যটি প্রবেশকের ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের উপলব্ধি। তাই এই গদ্যের মৃদু গুঞ্জনেই সেলিম আল দীনের প্রতি 'পরস্পর'-এর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা...
কথানাট্য চাকা (১৯৯১) সেলিম আল দীনের অসাধারণ একটি রচনা। অসাধারণ, কেননা, এর আগে বাংলা ভাষায় কেন, বিশ্বনাট্যেতিহাসে এই আঙ্গিকে রচিত কিছু সম্ভবত নেই। কারণ এই যে, আঙ্গিকটি রচয়িতারই সৃষ্টি। এর বিষয়েও রয়েছে অসাধারণত্ব। একটি ‘অন্যায় মৃত্যু’র দায় রাষ্ট্র কীভাবে চাপিয়ে দিচ্ছে প্রান্তিক মানুষের ওপর, তা এ-রচনার মূল প্রতিপাদ্য। বিষয়টি নানাভাবে সম্প্রসারিত হয়ে নানা ইঙ্গিত-অর্থ-রূপক-প্রতীকের নৈঃশব্দ্যে ঠাঁই নিয়েছে। এটি ক্লাসিক বা মহৎসৃষ্টির একটি প্রধান লক্ষণ। আরেকটি লক্ষণ এই যে, এটি কখনওই পাঠক-দর্শক-শ্রোতাকে ছেড়ে যায় না; কালে-কালে তাদের সঙ্গেই থাকে। যতবার আমরা তা পড়ি, দেখি ও শুনি—ততবার নানা মাত্রায় নতুন-নতুনতর কিন্তু চিরকালীন অর্থ আর আবেদন নিয়ে হাজির হয়ে যায়।
রচনাটি আমি প্রথম পাঠ করি ১৯৯৩ সালে। একেবারেই নতুন সেই অভিজ্ঞতা, যা আমাকে উপহার দিয়েছিল একটি অপরিচিতের লাশ শ্লথগতির চাকায় গ্রামের নিসর্গের ভিতর দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়ার চিত্রকল্প। তাতে শব বয়ে-বেড়ানো চারজন মেহনতির যন্ত্রণাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আজ একই রচনা প’ড়ে দেখি, সেলিম আল দীন বারবার বলছেন ‘অন্যায় মৃত্যু’; বিদ্রূপ করে বলছেন : কল্যাণমূলক রাষ্ট্র মানেই লাশের গন্তব্যে লাশকে পৌঁছানো। (পৃষ্ঠা ১৩) এবং সাধারণ মানুষের প্রতি এই রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিটি কেমন, তা-ও বোঝার বিষয় হয়ে উঠেছে এ-রচনায়। আর তা বুঝে নিতে, গাড়িতে লাশ ওঠানোর আগে যখন গাড়োয়ানকে পঞ্চাশ টাকার নোট দেয়া হয়, তখনকার বয়ানটুকুই যথেষ্ট :
এই নোটে মসজিদ থাকাতে তার সরল হৃদয় ঈশ্বর মৃত্যু ও মৃতের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়।। লেনদেনের ফাঁকে-ফাঁকে খিলান গম্বুজ মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দেয়ার এও এক কৌশল বটে।। কেননা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সরল হৃদয়কে বাড়তি মূল্য দিতে হয়* (পৃষ্ঠা ১৩)
এতে রাষ্ট্র সম্পর্কে তো বটেই, রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের ধারণা আর চেহারাটিও মিলছে। অন্যদিকে, মৃতের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ এবং তার জের রয়েছে পুরো কথানাট্যেই। এতে অংশ নিয়েছে মানুষও : তারা নয়ানপুর ও নবীনপুর গ্রামের বাসিন্দা; রাষ্ট্রের অনুগত কি-না তা স্পষ্ট করে বোঝা না-গেলেও, রাষ্ট্রকাঠামোর শেকলে তারা যে বন্দি ও ভীত, এটা সহজেই বোঝা যায়।
মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত চলচ্চিত্র 'চাকা'র পোস্টার
আখ্যানসূত্রেই এটি একদিকে রাষ্ট্র ও মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার রূপক হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে, মৃতের প্রতি জীবিতের আবেগ ও দায়িত্ববোধের রূপকও
আমরা বেশ ভালো করেই জানি গল্প, উপন্যাস, নাটক যা-ই হোক না কেন, লেখকের অভীষ্ট একটা রূপক। শূন্য থেকে এই চাওয়া পূরণ হবার নয়, একটা বিশ্বস্ত ও বহুমাত্রিক আখ্যান এতে জরুরি। চাকায় তা আছে এবং নানাভাবে এর স্তরান্তর ও উত্তরণ ঘটেছে। আখ্যানসূত্রেই এটি একদিকে রাষ্ট্র ও মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার রূপক হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে, মৃতের প্রতি জীবিতের আবেগ ও দায়িত্ববোধের রূপকও। কেবল এ-দু’দিকেই এর মর্ম নিঃশেষিত নয়। যে ষাঁড় আর চাকা অজ্ঞাতপরিচয় লাশটি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মাটিতে-কাদায় দাগ রেখে রেখে, তাদের মধ্যেও রাষ্ট্রের সঙ্গে জীবিত ও মৃতের সম্পর্ক এবং জীবিতের সঙ্গে মৃতের সম্পর্কের দায় বহনের রূপক-আবেদন সঞ্চারিত হয়েছে।
ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চায়নে 'চাকা' নাটকের একটি দৃশ্য
১৪. ০৮. ০৮