২১ ফেব্রুয়ারি 'বাংলালিপি' প্রকাশিত হলো কবি চঞ্চল আশরাফের কবিতাসংগ্রহ।
তাঁর কবিতার বই মোট পাঁচটি। বাছাই করা কবিতা নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে কবিতাসংগ্রহ বইটি।
এ বই থেকে কয়েকটি কবিতা মুদ্রিত হলো পরস্পরের পাঠকদের জন্য...
চোখ নেই দৃশ্য নেই
নিঃসরণ
একদিন
দুইদিন
তিনদিন
অরণ্যের
রক্তডুব
জলঘণ্টা
অন্ধকার
একরাত
দুইরাত
তিনরাত
শূন্যতায়
বেড়ালটা
ভস্মপ্রায়
এ-সূর্যটা
আড়ষ্ট ন্যাপকিনে কী পেয়েছ, কী খুুঁজেছ বনজ কুসুমে?
বিছানায় বর্শা ছুঁড়েছ কতবার, কতবার নতুন পাখনায়
.... ............ ...... ...ঝুলেছ আকাশে?
অনেক হয়েছে রাত। এবার ঘুমাতে যাও, অনুনীতা
যাত্রাসঙ্গীত
টায়ারে বাতাস ছিল না
পথ ছিল বহু বহু দূর
বাতাসে জড়িয়ে ছিল পা
দু’চোখে ঝুলন্ত বাদুড়
তারাদের রাগ ছিল হিম
বাতাস জমাট ছিল শোকে
পৃথিবীর চেহারা আদিম
জনক-জননী দ্যাখে ঝুঁকে
টায়ারে বাতাস ছিল না
পথ ছিল বহু বহু দূর
ধুলায় হারিয়ে ছিল পা
উঠেছিল রক্তঢেঁকুর
বাতাস লুকিয়ে ছিল বুকে
এই কথা জানা ছিল না
জনক বোঝেনি শিশুকে
কে থামাবে তার কান্না!
টায়ারে বাতাস ছিল না
বাতাস লুকিয়ে ছিল বুকে
শরীরে বিশাল দুটি ডানা
অস্ট্রিচ তবু হাঁটে শোকে
অসমাপ্ত শিরদাঁড়া
ক্ষত
কিচ্ছু না, হঠাৎ বাদামি স্তব্ধতায় আলো পড়েছিল। প্রথমে আধুলির নির্বাক বৃত্ত, খয়েরি। সে জানলো, দীর্ঘ শূন্যতা ছিদ্র ক’রে আসতে আসতে আলোর রঙ খয়েরি হ’য়ে যায়; তারপর শুরু হলো ঘর্ষণ, আঙুলের নৃত্য! এমন, পাথর হলে নির্ঘাত আগুনের প্রসব ঘ’টে যেত। ...কোথাও শব্দ নেই, তরঙ্গ নেই... কচ্ছপের কঠিন পিঠ বয়ে নিয়ে যায় পিঁপড়াজীবন, ওহো!
ঘষতে ঘষতে সেই গোল নিঃসাড়তা জীবনের মতো ছোট, আর
পৃথিবীর মতো বড় হতে থাকে
কসমিক
ফেটে যাচ্ছি আমি, তারপর পৃথিবী ও চাঁদ;
কেননা কক্ষপথ বহুকাল টানটান ছিল
পৃথিবীর ভার, তার ঘূর্ণনের দীর্ঘ অবসাদ
আমিও গিয়েছি ঘুরে বহুবার বৃত্তাকার
জঠরের কালো নীরবতা থেকে কোলাহলে
এবং রশ্মিপাতে ফিরে গেছি আরেক জঠরে
স্যাঁতস্যাতে হিমকালো কালহীন স্তব্ধতায়
ফেটে যাচ্ছি আমি, তারপর পৃথিবী ও চাঁদ
কেননা কক্ষপথ বহুকাল টানটান ছিল
ঘাম, মূত্র, সমুদ্র ও রোদনের লবণাক্ত নীলে
ভেসে যায় পালের জাহাজ, ক্লান্ত কলম্বাস
আমিও ভেসেছি বহু, আমার কম্পাস
অথচ পরিধি ছিঁড়ে, কেন্দ্রের দামামা ভেঙে
নিয়ে যেতে পারে নি আমাকে—সেই দূরে,
যেখানে ছিরাম, যেহেতু আমার সব চেনা
পৃথিবীও আসে ফিরে বারবার, চক্রাকার,
সৌরপুরুষের বাঁধা নটী, যেমন কক্ষপথ
সূর্য়ের অনিবার্য ছড়, পৃথিবীর দেহ ঘ’সে
তুলে নেয় মহাজগতের দীর্ঘ এক গান
আমার অগ্রুত নয় কোনো শব্দ তার;
কেননা অনেক ঝড়, জলস্রোতে এ-শরীর
ঢুকে যায় বহু-ব্যবহৃত ঘুমে, অন্ধকারে
দ্রবীভূত হতে থাকে মৃত্যু আর মৈথুনে...
যে-পৃথিবী সৌরদাস, আমি তার অধিকৃত
শ্বাস, চাঁদ তার অযৌন চাকর, লিঙ্গহীন
নর না-কি? ধূমকেতুর পুচ্ছের দিকে
আমিও তাকাই—সেও কি আসবে, চুরমার
ক’রে দিতে; মুছে দিতে সব যজ্ঞ আর গান?
অথচ আমিই সত্য শুধু, কাউকে মানি না,
যদিও অদৃশ্য কেন্দ্র বৃত্তাকার ঘোরায় আমাকে;
এবার পিছলে যাবো, কক্ষপথ যাচ্ছে টুটে...
শরীরের ভারে যে-রকম ছিন্ন হয়ে যায়
ফাঁসির পুরনো দড়ি, মুছে যায় অনন্তের দিকে
ফেটে যাচ্ছি আমি, তারপর পৃথিবী ও চাঁদ
কেননা, কক্ষের রশি ছিঁড়ে যায় : কোটিবর্ষ
.......... ........... .............দীর্ঘ
................. .............অবসাদ
সাইকাসের নিচে ব’সে
যে-দৃশ্য মনে আসে
যখন আসে না কেউ
ফাঁপা পেট নিয়ে সে উঠানে দাঁড়ালো
তখন চেঁচিয়ে চলে মুরগিরা
তারা কি পেয়েছে স্থান, ডিম্বস্থাপনের?
মৃতের বাগান থেকে আসে হাওয়া;
সিঁথির করুণ রেখা বেয়ে দৌড়ে আসছে কে
আর হাসছে, শ্রুতির কাঠামো ভেঙে
প্রাণপণ, সুড়সুড়িময়, আহ!
সূর্য ডুবে যাচ্ছে ... যায়
ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে
আত্মগান
আমাকে আক্রান্ত করে বৃক্ষদের যৌনজীবন।
কত দীর্ঘ অনশন
হটিয়ে দিয়েছে সেই শরীরের গোপন উৎসাহ
ম্রিয়মাণ অধমাঙ্গ, কী ক’রে ফিরিয়ে দেবে দাহ
তাকে, তুমি যার ইন্দ্রিয়রক্ষক?
পাহারা দিয়েছে যাকে স্তব্ধতা, স্মৃতির স্তবক
কোলাহলে সে তো অরক্ষিত, উন্মাদের নগ্নতা যেমন;
আমাকে আশ্বস্ত করে বৃক্ষদের যৌনজীবন।
অভিসার
জন্মগত স্বপ্নের হ্রদে যে-নারীকে ডুবিয়ে মেরেছি
আমি তার দেহ থেকে হৃৎপিণ্ড বের ক’রে হাতের তালুতে
নিয়ে দেখি : এ এক বিশাল লাল জলরাশি, আমার উপুড় মুখ
তাতে প্রতিবিম্বহারা; রয়েছে অনেক দ্বীপ এতে, কোনখানে
যাবো আমি? কোন সেতু দিয়ে? কোথায় রয়েছে শুয়ে
অপেক্ষাকাতর প্রেমিকা আমার
পাথরের সেতু দিয়ে যেতে পারি। রোদ উঠছে, করছে
চকচক ঢেউ, হচ্ছে বৃষ্টিও, হোক বিয়ে খেঁকশিয়ালের,
আমারও তা হবে এই মৌসুমে, আমারও তো চাই নারী
মাংশ ও হৃৎপিণ্ডসহ, অতএব যত দ্রুত, অন্তত সূর্য
নেভার আগে সেতুটির কাজ শেষ করা চাই
রক্ত ক্রমে শক্ত ও খয়েরি হতে থাকে প্রাণঘাতী হাতের তালুতে
ইতিহাস
মাতৃবুক থেকে প্রেমিকাবুকের দিকে যেতে যেতে
যেরকম শব্দ হয়, জন্ম থেকে মৃত্যুর দিকে
মানুষেরা তার উল্টা আওয়াজ তুলে চ’লে গেছে
এখানে তেমন কিছু নেই। শিকারীর রক্তমাখা দাঁত,
বৃত্তাকার-বসা নিতম্বের ছাপ, বীর্যের বিক্ষিপ্ত কিছু দাগ
প’ড়ে আছে। নিভন্ত মশাল হাতে এইখানে আমি
মৃতের প্রহরী। রাত নামে শ্লেষ্মার শব্দ নিয়ে।
শরীরনিঃসৃত বায়ু শরীরের কাছে এসে বলে :
অস্থি ও খুলিগুলি অনন্তের গাছে গাছে ঝুলিয়ে রেখো,
মজ্জা আর ঝিল্লিটুকু রেখে দিয়ো, হাওয়ার চাহিদা
বোঝো? শূন্যতায় তার আগ্রহ বিপুল, বোঝো?
‘মৃতরা থাকে না কোথাও।’ ... দ্যাখো, মুছে যাচ্ছে
জলমগ্ন ঘরগুলি, সমুদ্রে বুদবুদ তুলে বিন্দুর মতো
জেগে উঠছে নিমজ্জিত জাহাজের মাস্তুল
আমরা যেদিকে যাই, সেদিকেই স্থবিরতা, অজস্র ভুল
ওডিসাসের নিদ্রা
পসিডন মারলো ডুবিয়ে কাকে, এই প্রশ্নে ন্যাংটা শুয়ে থাকি
হ্রদের কিনারে। না, হ্রদ নয়, সমুদ্র। তবে পুরাণের হ্রদগুলি
এখন পুকুর। বাদামি পোশাক-পরা ওডিসাস, মনুষ্যচর্মের;
খুব সুখে না-কি! যেহেতু শরীর ঘিরে নাচে কুমারীর দল,
ঢেউয়ে দৃশ্যমান হাওয়া ও রোদের লীলা, পাই টের,
আমাকে নিদ্রিত রেখে তারা পোশাক-বদল করে, প্রস্থানের
প্রস্তুতি না-কি এটা? বস্ত্র বুনে কেন ছিঁড়ে ফেলে পেনিলোপি?
কেন জাগে অধমাঙ্গ, ঘুমের ভিতরে?
নাচুক কুমারীগণ এসবের উত্তর বিনা, সমুদ্রকিনারে
পূর্বরাগ
কখনো দেখি নি তাকে, তবে কাশি শুনেছি।
এ-শরীর স্ফীত হলে যাবো কাছে, নির্বুদ্ধিতার পাহাড় যেখানে
গ্রহণের স্মৃতি নিয়ে স্থির; দূর থেকে অদেখা নারীর স্বর-বিপর্যয়
ভেসে এলে মিশিয়ে নিয়েছি তাও, কমলালেবুর রসে; জিহ্বায়
সেই গান তবু বর্ণহারা... অন্তর্বাস প’রে না-কি কালো বালিকার বুক
একবার ফর্সা হয়েছিল
ভস্মপ্রায় পাখা নিয়ে উড়ে আমি মরুতে পড়েছি বহুবার
বিজ্ঞাপিত বনৌষধি, প্রসূতিসদন, গর্দভের গৃহ
তাকে তুমি করেছ সমীহ? ... না হলে কেন ভিটামিন, শৌচাগার
অন্তত নৈশনিদ্রা, প্রাতঃ ও সান্ধ্য ভ্রমণ,
কখনো বিবাহপূর্ব অনৈচ্ছিক দীর্ঘ অনশন
কখনো দেখি নি তাকে, তবে তার কাশি শুনেছি।
এরকম শোনা গেলে মনে হয় পরবর্তী রাত থেকে ক্ষয়
শুরু হবে যে-কোনো চাঁদের, যে-কোনো পুরুষ
অদেখা নারীর কাশিকে শীৎকার ভেবে নিজের হৃৎপিণ্ড
নেবে হাতে—আহা! অন্ধকারে ভর দিয়ে দিয়ে প্রতি রাতে
পৌঁছে যাবে পাহাড়ের করুণ ও নিঃসঙ্গ চ’ড়ায়
গ্রহণের স্মৃতি নিয়ে স্থির ওনীরব;
তারপর শূন্যতার গান
চাবুক
এবার চাবুক নিয়ে কথা হোক আমাদের
প্রহারের গান শুনেছি অনেক, তার চেয়ে বেশি মৃত্যুশোক
মাকড়ের ছেঁড়া জাল হয়ে কাঁপছে বাতাসে
মনুমেন্টে ভ’রে যাচ্ছে এ-শহর, মধ্যরাতে তারা হাঁটাহাঁটি করে
পার্কের ঘাসে, পরস্পর কথা বলে
তাদের আলাপ চাবুক বিষয়ে, আমিও শুনেছি
প্রহারের গল্প হয়েছে অনেক, তার চেয়ে বেশি মৃত্যুশোক
খাদ্যকণার মতো লেগে আছে আমাদের দাঁতে;
(পুরুষ-বদলপ্রিয় নারীদের হৃৎপি- যেরকম ওষ্ঠরঞ্জনী হয়ে
লেগে থাকে ব্যবহৃত কাপে ও চামচে)
চাবুকের কথা ব’লে আমাদের রাতগুলি হবে ভোর
প্রত্নকাঠামোর
গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো
স্মৃতিচারণ
একদিন রঙধনুর তলা দিয়ে পৃথিবীর বাইরে
...... .............. ........চ’লে গিয়েছিলাম
একদিন ভোরের দিকে পা রেখে
......... ...সন্ধ্যার স্তব্ধতাকে চুম্বন করেছিলাম
একদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত বিপ্লবীদের অমরত্ব
........... ............ব্যাখ্যা করেছিলাম
একদিন মোমবাতির আগুনে তর্জনি ঝুলিয়ে
. ..... ....বুঝেছিলাম আত্মহত্যা সবার জন্যে নয়
একদিন ছাদে শাড়ি মেলে-দেওয়া বিষণ্ন মহিলাকে
....................জড়িয়ে ধরেছিলাম স্বপ্নের ভেতর
একদিন মনে হলো, আকৃতির ধারণায়
কমলালেবুর আবেদন শেষ হয়ে গেছে—
পৃৃথিবী আসলে উপবৃত্তাকার সেদ্ধ ডিমের মধ্যে
বৃত্তাকার হলদে অংশের মতো গোল
আর একদিন মনে হলো—এসব কিছুই
দেয়ালে হিসির পর
উবে-যাওয়া মূত্ররেখার চেয়ে বেশি অর্থ
............ ............ .... .....ধারণ করে না
আহার
সকালেই মধ্যাহ্নের আকাশসহ সূর্যটা
খাদ্যনালি দিয়ে নেমে গেল
পুষ্টি হল দেহে
আর স্নায়ুর বাইরে দুপুরের গনগনে রোদে
ছাতা মেলে ধরে এক বুড়া
তার বংশধর বহু আগে সমুদ্র দেখতে গিয়ে
ফিরেই আসে নি
ভেড়ার লোমে বানানো জামা আর শেয়ালের চামড়ার বেল্ট প’রে
শুয়োরের মাংস খায় তারা
বালির উপর বসে
তাদের ঢেঁকুরের শব্দ বাতাস আর সমুদ্রের মাঝখানে
বার্গারের শসা হয়ে মিশে থাকে নোনা কোলাহলে
শিরদাঁড়া বেয়ে তখন দুপুর যেতে থাকে সন্ধ্যার দিকে
আর মাথার ভিতর চলে অভিবাসনের নিরীহ প্রস্তুতি