কানাডীয় সাহিত্যে বিশ্বসাহিত্যের স্বাদ

একজন কানাডীয় লেখকের কলমে যে কোনো দেশের বা সংস্কৃতির কথা নিয়েই সাহিত্য রচনা হোক সেটি হবে কানাডীয় সাহিত্য। এমন একটি কথা বলেছিলেন রাইটার্স ইউনিয়ন অব কানাডার নির্বাহী পরিচালক কবি, ঔপন্যাসিক ও কলমিস্ট জন ডেগেন। টরন্টোতে বাঙালিদের সাহিত্য সংগঠন বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার [বিএলআরসি-এর আয়োজনে ‘কানাডীয় লেখকের সাথে আড্ডা’ শিরোনামের এক অনুষ্ঠানে ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর জন ডেগেন টরন্টোর আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি মিলনায়তনে এই কথাটি বলেন। এ কথার মধ্যে যে অদ্ভুত সত্যটি লুকিয়ে আছে, সেটি যে কোনো সাহিত্যপ্রেমীর জন্য বিশেষ মনোযোগের দাবিদার।

শিরোনামে কেন কানাডীয় সাহিত্যকে বিশ্ব সাহিত্যের আধার বলেছি, সেটির কারণ ব্যাখ্যা করার শুরুতেই জন ডেগেনের নিজের সাহিত্যকর্ম থেকে উদাহরণ দিতে চাই। জনের প্রথম গ্রন্থ হলো একটি কাব্যগ্রন্থ। শিরোনাম এনিম্যাল লাইফ ইন বুখারেস্ট। গ্রন্থের নাম থেকেই স্পষ্ট হয়, তার গ্রন্থের কবিতাগুলোর প্রেক্ষাপট হাঙ্গেরির রাজধানী বুখারেস্ট। এই যে ব্যাপারটি অর্থাৎ একজন কানাডীয় কবির কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে অন্য একটি দেশের প্রেক্ষাপট সেটি ঘটে কারণ সম্ভবত জনের আদিবাড়ি সে দেশেই। কানাডাতে অভিবাসী হওয়া অধিকাংশ নাগরিকেরই তো এভাবেই থাকে একটি অতীত—যে অতীতের ভূখণ্ডটি হয়তো কানাডা নয়। হয়তো কখনও কখনও লেখক নিজে জন্মগ্রহণ করেন কানাডাতেই, কিন্তু তার পিতৃ-মাতৃ পুরুষের আবাস ছিল ভিন্ন দেশ। আর তাই প্রায়শই দেখা যায়, কোনো কোনো লেখক অনুসন্ধান চালান তার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির। তাদের রচনায় উঠে আসে সেই ভিটের চিত্র, সেই মাটির গন্ধ। এবং এটিই কানাডার ঔদার্য যে, ভিন্ন ভিটের চিত্র, ভিন্ন মাটির গন্ধকে নিজের করে নিতে কানাডা একটুও পিছপা নয়। প্রশাসনিকভাবে নয়, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণেও নয়।

২০১৪ সালে একলক্ষ ডলার অর্থমূল্যের গিলার পুরস্কারের লং লিস্টে ছিলেন বাঙালি লেখক অর্জুন বসু তার ‘ওয়েটিং ফর দ্য ম্যান’ বইয়ের জন্যে।

3. 2.Arjun Basu_Waiting for the manআর্থিক মূল্যে কানাডার সাহিত্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে গিলার পুরস্কার। ২০১৪ সালে এক লক্ষ ডলার অর্থমূল্যের পুরস্কারটির জন্য যে ১২টি বইয়ের লং লিস্ট করা হয়েছিল তাতে কিন্তু উঠে এসেছিল এক বাঙালি লেখকের বই। লেখকের নাম অর্জুন বসু। বইয়ের নাম ওয়েটিং ফর দ্য ম্যান। অর্জুনের প্রথম সে উপন্যাসটির আগেও কিন্তু রয়েছে ছোটগল্পের বই স্কুইশি [২০০৮। বাঙালি আরেক ঔপন্যাসিক কানাডাতে ধুমছে লিখে বলেছেন—তিনি হলেন সাম মুখার্জী। এ পর্যন্ত তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সামের। প্রথম এবং শেষটি ছাপা হয়েছে ভারত থেকে। দ্বিতীয়টির নাম ইন দ্য নেইম অব লাভ—ছাপা হয়েছে টরন্টো থেকে। সে উপন্যাসের মানুষগুলোও কিন্তু ভারতীয় বা এশীয়। অথবা সচী [সব্যসাচী নাগের কবিতার বই কুড ইউ প্লিজ, প্লিজ স্টপ সিঙগিঙ ২০১৫ সালে টরন্টো থেকেই প্রকাশিত হয়েছে কানাডা সরকারের আর্থিক সহযোগিতায়। অথবা বাংলাদেশের মেয়ে দয়ালী ইসলামের কবিতা নিয়ে এখন বেশ কথা চলছে মূলধারার সাহিত্য পাঠকদের মধ্যেও। দয়ালীর একমাত্র বইটি, যেটি একটি কাব্য সংকলন, সেটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১১ সালে। নাম ছিল ইউসুফ অ্যান্ড দ্য লোটাস ফ্লাওয়ার। দয়ালীর কাব্যপ্রয়াস নিয়ে ২০১৭ সালে ১৬ এপ্রিল সিবিসি রেডিওতে একটি সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে আরিফ আনোয়ারের লেখাস্টর্ম উপন্যাসকেও আনতে চাই। বাংলাদেশের ভোলা জেলায় ১৯৭০ সালে যে বিধ্বংসী সাইক্লোন আঘাত হেনেছিল, সে ঘটনার প্রেক্ষাপটে আরিফের উপন্যাস স্টর্ম প্রকাশিত হলো এ বছরের মার্চ মাসে। বইটির প্রকাশনার সংবাদ টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে আরও অনেক বইয়ের সাথে বর্তমান লেখকের চোখে পড়ে জানুয়ারি মাসে। হারপার-কলিন্স, কানাডা থেকে প্রকাশিত এ গ্রন্থটি নিয়ে লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, ওই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে শাহরিয়ারকে কেন্দ্র করে, যে কিনা একজন পিএইচডি গবেষক। শাহরিয়ার আমেরিকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয় তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে। শাহরিয়ার তার নয় বছরের মেয়ে আনাকে বলে তার নিজের দেশের কথা। সে কথার ফাঁকে উঠে আসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলার কথা, সেখানকার মৎসজীবী মানুষদের কথা এবং অতীত হিসেবে ১৯৭০ সালে সংঘটিত প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের কথা।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরিফ আনোয়ারের লেখা ‘স্টর্ম’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে এ বছরের মার্চ মাসে।

3.4. Arif Anwar_Stormউদাহরণ টানতে প্রথমেই বাঙালিদের কথা বলে নিলাম যেহেতু আমি নিজে বাঙালি। আর স্বভাবসুলভভাবেই অনেক বাঙালির মতো আমিও খুঁজে চলি এই বিভুঁই বিদেশে সাহিত্যাঙ্গনে কোন কোন বাঙালি কেমন করে ভূমিকা রেখে চলেছেন। আরও বলতে চাই, কলকাতার বাঙালি নারী আয়েশা ব্যানার্জির বটলস অ্যান্ড বোনস প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের জুনে। এর আগে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল দ্য ক্লারিটি অব ডিসট্যান্স। বাঙালি এই কবি কিন্তু ‘লীগ অব ক্যানাডিয়ান পোয়েট’-এর ভূতপূর্ব সভাপতিও বটে। অথবা পূর্বপুরুষের কলকাতার স্মৃতি নিয়ে বড় হয়ে ওঠা আর এক লেখিকার নাম দুর্গা চিউ-বোস। কুইবেক প্রদেশের মন্ট্রিয়লে জন্ম নেওয়া নিউইয়র্কের বাসিন্দা দুর্গার প্রবন্ধের বই টু মাচ অ্যান্ড নট দ্য মুড প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালেই এবং বেশ সাড়া জাগিয়েছে বইটি। এদের ছাড়াও ভারতী মুখার্জী তো আছেনই। ভারতে জন্মগ্রহণকারী নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক জীবনের বেশির ভাগ সময় চাকরি করেছেন আমেরিকাতে। লেখালেখির বেশির ভাগ সেখানেই করা। কিন্তু তারপরও যেহেতু জীবনের বেশ কয় বছর কানাডার মন্ট্রিয়লে ছিলেন, কানাডীয় সাহিত্য ধারাতে তিনি অন্তর্ভুক্ত।

২০১৬ সালের গিলার পুরস্কার ও গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পান চাইনিজ অভিবাসীর উত্তরসূরি মেডেলিন থিয়েন। তার উপন্যাসটির নাম ‘ডু নট সে উই হ্যাভ নাথিং’।

5.2.Medeliene Thien_Do not sayকানাডার সাহিত্য জগৎজুড়ে এই যে বহু বহু লেখকের পদচারণা সেখানে কিন্তু দেশ-কাল কিছুই গ্রাহ্য হয় না। হয় না যে, সেটির বড় উদাহরণ ২০১৬ সালের ১ লক্ষ ডলার মূল্যের গিলার পুরস্কার। কথাসাহিত্যে সে বছর ওই বইটি গভর্নর জেনারেল পুরস্কারও পায়। পুরস্কারটি পান মেডেলিন থিয়েন। ভ্যানকুভারের বাসিন্দা মেডেলিন মালয়েশিয়ান চাইনিজ অভিবাসীর উত্তরসূরি। এবং তার উপন্যাসটির নাম ডু নট সে উই হ্যাভ নাথিং। আর গল্পটি কেন্দ্রীভূত হয়েছে চিনের তিয়েন আন মেন স্কোয়ারের ১৯৮৯ সালের ঘটনাটি। সাথে উঠে এসেছে ১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকের চিনের সাংস্কৃতিক বিস্ময়ের কথা। এবং আনন্দের এই যে, গ্রন্থটি কানাডীয় সাহিত্যের বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে একটুও অসুবিধা হয় নি।

২০১০ সালে জোহানা স্কিরসরুড ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘দ্য সেন্টিমেন্টালিস্ট’-এর জন্যে গিলার পুরস্কার পান।

অথবা ধরা যাক নোভা স্কোশিয়ার লেখিকা জোহানা স্কিরসরুডের কথা। ২০১০ সালের নভেম্বরে জোহানার উপন্যাস দ্য সেন্টিমেন্টালিস্ট-এর নাম যখন গিলার পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখনকার ঘটনাটি অনেকেরই জানা। দেশের সবচেয়ে দামী পুরস্কার পেল বইটি—অথচ বইটির কোনো কপি বাজারে নেই। কেননা, নোভা স্কোশিয়ার যে ছোট প্রকাশক ওই বইটি প্রকাশ করেন তারা সপ্তাহে এক হাজার কপির বেশি সরবরাহ করতে পারতেন না। সেই যে বই যেটি মাত্র ত্রিশ বছর বয়সী, তখন অবধি সর্বকনিষ্ঠ, এই লেখককে পরিচিত করে তুলল পুরো উত্তর আমেরিকা জুড়ে, সেটির বিষয় কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়ে এক পিতার সাথে পুত্রীর ভাবকে আলোকিত করেছে। আবার ধরা যাক কানাডীয়-লেবানিজ লেখক রাউই হেজের কথা। তার উপন্যাস ডি নিরো’স গেইম ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। ২০০৬ সালে প্রকাশিত সে উপন্যাস ওই বছরের গিলার এবং গভর্নর জেনারেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য শর্টলিস্টেড হয়েছিল। লেখকের প্রথম এই উপন্যাসে প্রেক্ষাপট কিন্তু বৈরুত।

বিশ্বনন্দিত ঔপন্যাসিক আয়ান মার্টেলের উপন্যাস ‘লাইফ অফ পাই’ (২০০১) ।

ভেন বেগামুদ্রের উপন্যাস ‘বিষ্ণু ড্রিমস’ (২০০৮) এর প্রেক্ষাপট ভারত।

এবার আসি কানাডার প্রথম সারির কথাসাহিত্যিক আয়ান মার্টেলের কথায়। আয়ান বিশ্ব জুড়ে আলোচিত হয়েছেন লাইফ অফ পাই [২০০১ উপন্যাসটির জন্য। সারা পৃথিবী জুড়ে বইটির এক কোটিরও বেশি বিক্রি হওয়া সে উপন্যাসের বিষয় কী? ম্যানবুকার পুরস্কার পাওয়া এই বইটি কিন্তু প্রেক্ষাপট হিসেবে নিয়েছে ভারতকে। এভাবে দেখা যায়, ভারতকে আশ্রয় করে রচিত কথাসহিত্য কানাডীয় সাহিত্যে বিপুল। ভেন বেগামুদ্রেও কিন্তু অনেক বেশি ভারত-কেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন। ধরা যাক, ভেনের বিষ্ণু ড্রিমস [২০০৮ উপন্যাসের কথা। উপন্যাসটির পরিকাঠামোতে তিনি চিত্রায়ণ করেছেন ভারতীয় মিথলজির বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে।

আবার ধরা যাক, শ্রীলংকান বংশোদ্ভূত শ্যারন বালার কথা। তরুণী এই লেখিকার প্রথম উপন্যাস দ্য বোট পিপল কানাডার বাজারে আসে এই বছরের ২ জানুয়ারি। শ্যারনকে ২০১৭ সালে রাইটার্স ট্রাস্ট অব কানাডার বাৎসরিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে আমি প্রথম দেখি। তখন তিনি পুরস্কার পেলেন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গল্পের জন্য। বয়সে তরুণী বলেই এই লেখিকার কথা আমার মনে ছিল। তার নতুন বইটির বিষয় শ্রীলংকা থেকে ১৯১০ সালে পাঁচ শ রিফিউজি কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে আসার গল্প। সে বই নিয়েও পাঠকের এত আগ্রহ যে জানুয়ারির ১১ তারিখে বইটি যখন আমি পাবলিক লাইব্রেরিতে হোল্ড করি, তখন আমার সিরিয়াল হয় ৬৭। অথচ লাইব্রেরিতে তখন বইয়ের কপি মাত্র ৪৩। বছরের শুরুতেই সিবিসি চ্যানেলে যে বইগুলো আলোচনার জন্য উঠে আসে দ্য বোট পিপল তাদেরও একটি হয়েছে।

শ্রীলংকা থেকে ১৯১০ সালে পাঁচ শ রিফিউজি কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে আসার গল্প শ্রীলংকান বংশোদ্ভূত শ্যারন বালার উপন্যাস ‘দ্য বোট পিপল’ সিবিসি টেলিভিশন আয়োজিত কানাডা রিডসের শর্টলিস্টে ছিল এবছর। ছবি : সিবিসি ওয়েবসাইট।

শ্রীলংকা থেকে আসা আরেক অভিবাসী লেখকের নাম শ্যাম সেলভাদুরাই [জন্ম ১৯৬৫। উনিশ বছর বয়সে শ্যাম কানাডায় আসেন ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ মাতৃভূমি ছেড়ে। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় শ্যামের প্রথম উপন্যাস ফানি বয় এবং সেটি ১৯৯৮ সালে ‘বুকস ইন কানাডা ফাস্ট নোভেল অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। ফানি বয় যুক্তরাস্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইটালি, ইসরায়েল এবং শ্রীলংকা থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ করে রাখা যেতে পারে যে, পুরস্কারটির বর্তমান অর্থমূল্য চল্লিশ হাজার ডলার। মোট পাঁচটি বইয়ের লেখক শ্যামের সর্বশেষ উপন্যাস দ্য হাংরি গোস্ট ছাপা হয়েছিল ২০১৩ সালে। শ্যামের এই উপন্যাসটি কিন্তু সেবছর কথাসাহিত্যের জন্যে গভর্নর জেনারেল পুরস্কারের শর্টলিস্টেও উঠে এসেছিল। ফানি বয়-এর মতো দ্য হাংরি গোস্ট-এর প্রেক্ষাপটও কিন্তু কানাডা নয়, বরং লেখকের মাতৃভূমি।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত নন্দিত লেখক এম.জি.ভাসানজী রচিত গিলার পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘দ্য ইনবিটুইন ওয়ার্ল্ড অব বিক্রম লাল’-এর প্রচ্ছদ।

কাশ্মিরে জন্ম নেওয়া নাজনীন শেখের উপন্যাস ‘দ্য প্লেস অব শাইনিং লাইট’-এর প্রচ্ছদ।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখকদের তালিকাটি বিশাল। এম.জি.ভাসানজী [জন্ম ১৯৫০, অনিতা রাও বাদামী [জন্ম ১৯৬১, শওনা সিং বল্ডউইন [জন্ম ১৯৬২, নীল বিশ্বনাথ [জন্ম ১৯৬৫, আনোশ ইরানী [জন্ম ১৯৭৪ ইতোমধ্যে যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছেন। এম.জি.ভাসানজী এবং নীল বিশ্বনাথ আবার একই সাথে ভারতীয় এবং ত্রিনিদাদীয়-টোবাগোনীয়। তাদের পূর্বপুরুষ কানাডায় আসার আগে ভারত থেকে প্রথমে ত্রিনিদাদ-টোবাগোতে যান। ভাসানজীর বই দ্য বুক অব সিকরেটস ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো গিলার পুরস্কার লাভ করেছিল। ২০০৩ সালে কানাডীয় লেখকদের ব্যাপক আগ্রহের এই পুরস্কারটি তিনি দ্বিতীয়বারের মতো লাভ করেন দ্য ইনবিটুইন ওয়ার্ল্ড অব বিক্রম লাল গ্রন্থের জন্য। ২০০৭ সালে প্রকাশিত তার বহুল পঠিত গ্রন্থ দ্য অ্যাসাসিন’স সঙ-এর প্রেক্ষাপটও ভারতীয়। ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যাকুল এক শিখ তরুণের কাহিনি সেটি। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যালগেরির লেখক শেখর পালেজার প্রথম উপন্যাস অ্যান এক্সট্রাঅরডিনারি ডেসটিনি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ দিয়ে শুরু করে তিন প্রজন্মের কাহিনি বুনেছেন শেখর। দেশভাগের যন্ত্রণা, ধর্মীয় সংস্কারের বেড়াজাল শেখরের বই জুড়ে প্রতিফলিত। কাশ্মিরে জন্ম নেওয়া নাজনীন শেখও বেশ নাম কুড়িয়েছেন কানাডায়। ২০১৫ সালে নাজনীনের রহস্যধর্মী দ্য প্লেস অব শাইনিং লাইট উপন্যাসের প্রেক্ষাপট পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। ঐতিহাসিক এক বৌদ্ধ মূর্তি নিয়ে গড়ে ওঠা এই উপন্যাসের প্রকাশক কিন্তু টরন্টো তথা কানাডার প্রথম সারির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আনানসি।

বহু পুরস্কারে ভূষিত কানাডীয়-ত্রিনিদাদীয় লেখক রবীন্দ্রনাথ মহারাজ।

অন্যদিকে ত্রিনিদাদীয় লেখকদের মধ্যে অন্য যে আরেকজন বিপুল পরিচিতির অধিকারী, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ মহারাজ [জন্ম ১৯৫৫। রবীন্দ্রনাথের বই দ্য অ্যামেজিং অ্যাবজর্ভিং বয় ২০১০ সালে ট্রিলিয়াম বই পুরস্কার পেয়েছিল।  ত্রিনিদাদের বংশোদ্ভূত আরেক লেখক হলেন শানি মাতো [জন্ম ১৯৫৭। আয়ারল্যান্ডে জন্ম শানির শৈশব-কৈশোর কেটেছে ত্রিনিদাদে। উনিশ বছর বয়সে শানি ভ্যাঙ্কুভারে চলে আসেন। শিল্পকলার অনেক মাধ্যমে কাজ করা নারী শানির প্রথম বই, ছোটগল্পের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। এ পর্যন্ত মোট ছয়টি কাথাসাহিত্যের বই প্রকাশিত হয়েছে শানুর। সেগুলোর মধ্যে তিনটি একলক্ষ ডলারের গিলার পুরস্কারের শর্টলিস্টেও উঠেছিল। ২০০৯ সালে প্রকাশিত শানুর উপন্যাস বাল্মীকির মেয়ে’র প্রেক্ষাপট ত্রিনিদাদের জীবন। এ প্রসঙ্গে রনজ ধালিওয়ালের [জন্ম ১৯৭৬ কথাও বলে রাখা যেতে পারে। পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত রনজিৎ সিং ধালিওয়াল এ পর্যন্ত দুটি উপন্যাস লিখেছেন। ২০০৬ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসটির নাম ডাকু’ রাখতে তিনি একটুও দ্বিধা করেন নি।

উইনিপেগের লেখিকা ক্যাথি অসলিয়ারও কিন্তু ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে উপন্যাস লিখতে সামান্য দ্বিধা করেন নি। ২০১১ সালে প্রকাশিত তার কাব্য-উপন্যাসটির নামই তিনি দিয়েছেন কর্ম। অ-ভারতীয় লেখকের এই যে প্রয়াস অর্থাৎ ভারতীয় বোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাব ‘কর্ম’কে তার উপন্যাসের বিষয় করা সেটি কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এশীয় আরেক দেশ মায়ানমারকে [পূর্ব নাম বার্মা প্রেক্ষাপট করে দুটি উপন্যাস লিখেছেন কারেন কনেলি [জন্ম ১৯৬৯। কারেনের প্রথম উপন্যাসের নাম হলো দ্য লিজার্ড কেইজ। ১৯৯৬ সালে মায়ানমার ভ্রমণকালে এক রাজবন্দির সাথে তার যে সংযোগ সেটিকে আশ্রয় করে রচিত এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৯ সালে মায়ানমারের প্রেক্ষাপটেই তিনি রচনা করেন নন্দিত গ্রন্থ বার্মিজ লেসনস। কানাডীয় লেখক কর্তৃক কানাডার বাইরের জীবন নিয়ে এই যে সাহিত্য রচনা সেটি কিন্তু শুধু পঠিতই হচ্ছে না, পুরস্কৃতও হচ্ছে। কানাডার সাহিত্যের বিশ্বজনীনতার সূত্র এখানেই।

এশীয় আরেক দেশ শ্রীলংকার বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখক ধারার প্রথম সারির একজন হলেন মাইকেল ওনদাতজী [জন্ম ১৯৪৩। কানাডার সাহিত্যাঙ্গনে হেন কোনো পুরস্কার নেই যা মাইকেল পান নি। তার বহুল পরিচিত উপন্যাস হলো ইন দ্য স্কিন অব অ্যা লায়ন। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত সে উপন্যাসটিতে টরন্টো শহরের বিনির্মাণে অভিবাসীদের অবদানকে চিহ্নিত করেছেন মাইকেল। ২০০০ সালে প্রকাশিত উপন্যাস অনিল’স ঘোস্ট রচিত হয়েছে অনিল টিসেরা নামের এক শ্রীলংকানকে কেন্দ্র করে, যে প্রথমে যুক্তরাজ্য এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে আসে এবং ফিরে যায় মাতৃভূমি শ্রীলংকাতেই। উপন্যাসটি গিলার এবং গভর্নর জেনারেল দুটো পুরস্কারই পেয়েছিল।

আবার ধরা যাক, বারবারিয়ান লস্ট : ট্রাভেলস ইন দ্য নিউ চায়না বইয়ের কথা। কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ছোটভাই আলেক্সান্ডার ট্রুডোর লেখা এই বই কিন্তু চিন দেশ নিয়ে। চিনের ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে লেখক-সাংবাদিক আলেক্সান্ডারের এই বই কিন্তু বেস্ট সেলারও হয়েছে। বইটির ফরাসি অনুবাদ গভর্নর জেনারেল পুরস্কারও লাভ করেছে, কোনো অসুবিধা হয় নি।

এবার আসি বিপুলভাবে প্রশংসিত কানাডীয় কবি ও ঔপন্যাসিক অ্যান মাইকেলসের কথাতে। অ্যানের উপন্যাস দুটির একটি হলো ফিউজিটিভ পিসেস। বর্তমানে টরন্টো শহরের শিল্প-সাহিত্যের বিকাশে নিয়োগপ্রাপ্ত এই প্রতিভাধর লেখকের উপন্যাসটি সিনেমা হিসেবেও অর্জন করেছে বহুল প্রশংসা। অথচ উপন্যাসের বিষয় হিসেবে নিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে স্পেনের প্রেক্ষাপটকে। কোনো একটি একক গ্রন্থ কানাডায় এত বেশি পুরস্কার অতীতে কখনো পেয়েছে বলে মনে হয় না। অথচ বইটির বিষয় কিন্তু অ-কানাডীয়।

জাপানি বংশোদ্ভূত জয় কগোয়া ও তার উপন্যাস ‘ওবাসান’ (১৯৮১)।

16.2. Joy_Kogowa_obasanজাপানি বংশোদ্ভূত জয় কগোয়ার জন্ম কিন্তু ভাঙ্কুভারেরই। প্রবীন এই লেখকের [জন্ম ১৯৩৫ সবচেয়ে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত গ্রন্থ হলো ওবাসান [১৯৮১। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রদেরকে ওবাসান বা ঠাকুমার কথা পড়তে হয় পাঠ্যতালিকায়। জয় কিন্তু তার উপন্যাসের বিষয় করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে কানাডীয় জাপানিদের গল্পকেই। ভাবলে আনন্দ লাগে ১৯৯৩ সালে আর্নল্ড ই ডেভিডসন ওবাসান-এর ভূমিকা নিয়ে এক শ পৃষ্ঠার একটি বই লিখে ফেলেছিলেন। ১৯৯৭ সালে ম্যাসন হ্যারিস লেখেন জয়ের সাহিত্যকর্মের ওপর একটি সমালোচনা গ্রন্থ। ২০১১ সালে জয় কগোয়ার সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে ৩৬৩ পৃষ্ঠার বহু লেখকের বিপুল এক গ্রন্থ প্রমাণ করে জয় কানাডীয় সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য এক শব্দশিল্পী। জাপানি বাবা-মার সন্তান কেরি সাকামতো [জন্ম: ১৯৬০ রচিত দুটি উপন্যাস দ্য ইলেকট্রিক্যাল ফিলডস [১৯৯৮ এবং ওয়ান হানড্রেড মিলিয়ন হার্টস [২০০৩ উভয়েই কানাডীয় জাপানিদের অভিজ্ঞতার কথা। এবছর কেরির তৃতীয় যে উপন্যাস ফ্লোটিং সিটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, সেটির বিষয়ও জাপানি কমিউনিটি, চরিত্রগুলো আদিতে জাপানি। উল্লেখ করা উচিত হবে যে, দ্য ইলেকট্রিক্যাল ফিলডস শ্রেষ্ঠ প্রম উপন্যাস হিসেবে কমনওয়েলথ লেখক পুরস্কার লাভ করেছিল।

আবার ধরা যাক, চাইনিজ বংশোদ্ভূত ওয়েসন চয়ের [জন্ম ১৯৩৯ কথা। ২০০৯ সালে ওয়েসনের স্মৃতিকথা নট ইয়েট : অ্যা মেময়র অব লিভিং অ্যান্ড অলমোস্ট ডাইং একটি নন্দিত গ্রন্থ হিসেবে সাহিত্যামোদীদের কাছে পরিচিত। এই গ্রন্থের দশ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল তার আরেকটি স্মৃতিকথা পেপার শ্যাডোস : অ্যা চাইনাটাউন চাইল্ডহুড [১৯৯৯। ভ্যাঙ্কুভারের বাসিন্দা ওয়েসনের প্রথম উপন্যাস দ্য জেড পিওনি প্রকাশ পায় ১৯৯৫ সালে। উপন্যাসটির প্রধান চরিত্রগুলোর সবাই কিন্তু চিনা। উপন্যাসের সময়কাল হলো ১৯৩০-এর দশক পেরিয়ে ১৯৪০-এর দশকে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান দখল করে চিনকে। কানাডীয়রা, কানাডায় চিনা মানুষেরা সে বিষয়টিকে কিভাবে দেখেছেন, ওয়েসন সেটিকেই তার উপন্যাসের উপাত্ত করেছেন।

২০০৬ সালে গিলার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ভিনসেন্ট ল্যামের [জন্ম ১৯৭৪ পূর্বপুরুষও চিনা বংশোদ্ভূত। যদিও তারা চিন থেকে প্রথমে ভিয়েতনামে অভিবাসী হন। পরে আসেন কানাডাতে। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহরেই ভিনসেন্টের জন্ম। ২০১২ সালে ভিনসেন্টের উপন্যাস দ্য হেডমাস্টার’স ওয়েজার গভর্নর জেনারেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও স্থান পেয়েছিল। যদিও উল্লেখ করা প্রয়োজন পেশায় ডাক্তার ভিনসেন্টের যে বইটি ২০০৬ সালে গিলার পুরস্কার পেয়েছিল সেটি ছিল একটি নন-ফিকশান। ডাক্তারি অভিজ্ঞতাতেই রচিত হয়েছিল সেটি। নাম ছিল ব্লাডলেটিং অ্যান্ড মিরাকুলাস কিওরস

ভিয়েতনামী বংশোদ্ভূত ফরাসি ভাষার কথাসাহিত্যের জন্যে গভর্নর জেনারেল পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক কিম টুই ও তার উপন্যাস ‘রু’।

19.2. kim thuy ruভিয়েতনামী বংশোদ্ভূত পুরস্কারপ্রাপ্ত আরেক কানাডীয় লেখকের নাম কিম টুই [জন্ম ১৯৬৮। কমিউনিস্ট শাসন থেকে ১৯৭৮ সালে যে দশ লক্ষাধিক মানুষ ভিয়েতনাম ছেড়ে নৌকো করে দেশ ত্যাগ করেন, দশ বছরের কিম তাদের একজন।  তাদের পরিবার কুইবেকে আবাস গড়েন। কিমের প্রধান ভাষা হয়ে ওঠে ফরাসি। ২০০৯ সালে ফরাসি ভাষায় কিম প্রথম উপন্যাস লেখেন রু নামে। উপন্যাসের বিষয় হলো ভিয়েতনাম থেকে কুইবেক পর্যন্ত এক দশ বছরের শিশুর যাত্রা। উপন্যাসটি ২০১০ সালে ফরাসি ভাষার কথাসাহিত্যের জন্যে গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করে। উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ গিলার পুরস্কারের জন্যে শর্টলিস্টেডও হয়েছিল। উপন্যাসটি এ পর্যন্ত পনেরটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং কিম হয়েছেন বর্তমান কানাডার ফরাসি-ভাষী সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।  কিমের পরের উপন্যাস মান এবং ভি-এর বিষয়ও কিন্তু ভিয়েনামী উদ্বাস্তু মানুষ।

১৯৯০ সালে প্রথম উপন্যাস লাইভস অব দ্য সেইন্টস দিয়ে কিন্তু ইতালীয় পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার নিনো রিচির [জন্ম ১৯৫৯ গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ। ২০০৮ সালে প্রকাশিত দ্য অরিজিন অব স্পেসিস উপন্যাস দিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য পুরস্কারটি ছিনিয়ে নিয়েছেন। তার পুরো রচনাবলীতেই ইতালির প্রেক্ষাপট কিন্তু বারবার ওঠে আসে।

কানাডীয় সাহিত্যধারায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত লেখকদের অবদানও বিশাল। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সারা কানাডার পোয়েট লরিয়েট হিসেবে যিনি কিছুদিন আগেই প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি হলেন জর্জ ইলিয়ট ক্লার্ক [জন্ম ১৯৬০। ২০০১ সালে জর্জ তার কাব্যগ্রন্থ এক্সিকিউশন পোয়েমস-এর জন্য গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করেন। জর্জের সাহিত্যের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে নোভা স্কোশিয়া প্রদেশের কালো মানুষদের অভিবাসী হওয়ার ইতিহাস। জর্জের উপন্যাস জর্জ অ্যান্ড রু [২০০৫ দুই কালো কানাডীয় ভাইয়ের কথা, যারা ১৯৪৯ সালে নিউ ব্রান্সউইকে এক ট্যাক্সিচালককে খুন করে।

টরন্টোবাসী নন্দিত লেখক এলিসন পিকের কথাও এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন। ২০১০ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ফার টু গো দিয়ে এই লেখক কিন্তু ২০১১ সালে ম্যান বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে উঠে এসেছিলেন। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তার স্মৃতিকথা বিটুইন গডস। এবং যে কারণে এই লেখককে বর্তমান রচনায় আমি উল্লেখ করছি সেটি হলো তার পূর্বপুরুষ চেকোস্লোভাকিয়ার বাসিন্দা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের আক্রমণে তার ঠাকুরদা চলে আসেন কানাডাতে। আর সেই সময়ের সেইসব কথাকে লিপিবদ্ধ করেছেন এলিসন তার উপর্যুক্ত দুটি গ্রন্থে। ব্যাপকভাবে নন্দিতও হয়েছেন তিনি।

এই যে ভিন্ন দেশের মানুষ ও তার সংস্কৃতিকে কানাডীয় সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সেটা দিয়েই আসলে তিন শ নব্বই বছর আগে কানাডীয় কবিতার যাত্রা। ১৬২৮ সালে রবার্ট হেইম্যান [১৫৭৫-১৬২৯ লন্ডন থেকে কুয়োডলিবেটস নামের যে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন সেটিই তো প্রথম কানাডীয় কাব্যপ্রয়াশ! অথবা ধরা যাক ১৭৬৯ সালে প্রকাশিত ফ্রান্সেস মূর ব্রুকের [১৭২৪-১৭৮৯ দ্য হিস্ট্রি অব এমিলি মন্টেগু সেটিই তো প্রথম কানাডীয় উপন্যাসের উদাহরণ যেটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল! বিংশ শতাব্দীর শক্তিমান কবি রবার্ট সার্ভিসও [১৮৭৪-১৯৫৮ কিন্তু ভিন্নদেশে জন্ম নেওয়া এক লেখক। যেমনটি আমরা দেখলাম আধুনিক কানাডীয় কবিতার শক্তিমান কণ্ঠ আর্ভিং লেইটনের [১৯১২-২০০৬ ক্ষেত্রেও—তিনি এসেছিলেন রুমানিয়া থেকে। গত শতাব্দীর শুরুর বছরগুলোতে যে কথাসাহিত্যিকের কথা ক্যানলিটের প্রবক্তারা এখনও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন সেই হ্যারল্ড ল্যাডো [১৯৪৫-১৯৭৩ তো এসেছিলেন ক্যারিবীয় থেকে এবং সবই লিখেছিলেন ক্যারিবীয় জীবন নিয়ে। কানাডায় জীবনীমূলক উপন্যাসের অগ্রগণ্য যে লেখক সেই ক্যারল শীল্ড [১৯৩৫-২০০৩ নিজেও এসেছিলেন অন্য দেশ থেকে।

গত ১৮ মার্চ ২০১৮-তে টরন্টো আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিতে বিএলআরসি আয়োজিত বিশ্ব কবিতা দিবসের আয়োজনে কানাডার ভূতপূর্ব পার্লামেন্টারি পোয়েট লরিয়েট কালো বংশোদ্ভূত জর্জ এলিয়ট ক্লার্কের সাথে বাঙালি কবি ও লেখকবৃন্দ।

বর্তমান প্রবন্ধ শেষ করার আগে আবারও ‘কানাডীয় লেখকের সাথে আড্ডা’ অনুষ্ঠানের উল্লেখ করতে চাই। গত ৩ ফেব্রুয়ারি উল্লিখিত বিএলআরসি আয়োজিত আড্ডার অতিথি লেখক ছিলেন কবি ও সম্পাদক জিম জনস্টোন। জিমের উদ্দেশে উপস্থিত এক বাঙালি লেখকের প্রশ্ন ছিল ‘কানাডায় আমাদের লেখার বিষয় কী হওয়া উচিত?’ জিম কালক্ষেপণ না করেই বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার কথা লিখবে। তোমার কথাই হবে কানাডীয় সাহিত্য।’ জিমের কথার প্রতিফলন সারা কানাডীয় সাহিত্যে। প্রত্যেকে তাদের নিজেদের কথা লিখেছেন—নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধের কথা। আর সেসব কিছুকে একত্রিত করে কানাডীয় ভূখণ্ডে যে সাহিত্য নির্মিত হয়েছে সেটিই কানাডীয় সাহিত্য। আর তাই কানাডীয় সাহিত্যে পাওয়া সম্ভব পৃথিবীর সকল জনগোষ্ঠীর লেখকের চেতনার প্রতিফলন। হয়তো সে কারণেই ২০১৮ সালের মার্চে সিবিসি আয়োজিত ‘কানাডা রিডস’-এ বিজয় মুকুট ছিনিয়ে নিতে পেরেছে মার্ক সাকামাতোর লেখা আত্মজীবনীমূলক বই ফরগিভনেস। লেখক সে বইতে তার পিতামহ ও মাতামহের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রাপ্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের এবং জাপানিদের কথাকে তুলে ধরলেও পুরস্কার পেতে কোনো কষ্ট হয় নি আলবার্টা নিবাসী জাপানি বংশোদ্ভূত এই লেখকের।

কানাডার সাহিত্যজনেরা সকল কানাডীয় রচিত সাহিত্যকে উদার চিত্তে গ্রহণের এই ঔদার্য দেখিয়েছেন বলেই কানাডার সাহিত্য বর্তমানে সারা পৃথিবীর সাহিত্যের প্রতিচ্ছবি। বিশ্বসাহিত্যের সকল ঐশ্বর্যকে কানাডীয় সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর সম্ভব বলেই কানাডীয় সাহিত্য ক্রমে হয়ে উঠছে বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে নজরকাড়ার। হয়তো সে কারণেই গত ১৮ মার্চ ২০১৮-তে টরন্টো আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরিতে বিএলআরসি আয়োজিত বিশ্ব কবিতা দিবসের আয়োজনে কানাডার ভূতপূর্ব পার্লামেন্টারি পোয়েট লরিয়েট জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক বলেন, ‘কানাডা হচ্ছে বহু সংস্কৃতি এবং বহু জাতির আবাস ভূমি, সুতরাং এর সাহিত্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এবং সমৃদ্ধিময়।’

সুব্রত কুমার দাস

সুব্রত কুমার দাস

জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৪; ফরিদপুর। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। পেশায় লেখক। প্রকাশিত বই— ১....বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা