নৃত্যশিল্পীর ইউরোপ ভ্রমণ-কথা

বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইউরোপ ভ্রমণ এখন আহামরি এমন কিছু বিষয় নয়। শিল্পকলার জগতে যারা আছেন তাদের জন্য এটি বরং অধিক সহজসাধ্য। কিন্তু আজ থেকে ছয় দশক আগে ব্যাপারটি বিপরীতভাবেই ছিল বেশি কঠিন। ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগের পর ইসলাম-ভিত্তিক দেশ পাকিস্তানে শিল্পচর্চার বিষয়টিই পরিণত হয়েছিল নিষিদ্ধ এক কাজে। সে চর্চায় নৃত্যের অবস্থান ছিল আরও ভয়াবহ। তেমনই এক দুঃসময়ে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পের গুরুস্থানীয় ব্যক্তি বুলবুল চৌধুরীর [১৯১৯-১৯৫৪ উদ্যোগ ও আয়োজনে গঠিত নৃত্যশিল্পীদল ‘Bulbul Chowdhury and His Troupe’ ইউরোপ ভ্রমণ করে বছরাধিক কালের জন্য। ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভৃতি দেশে বুলবুল চৌধুরীর সহযাত্রী ছিলেন আরো অনেক নৃত্যশিল্পীর সাথে অজিত সান্যালও। আর সে-শিল্পীদলের ইউরোপ ভ্রমণের বয়ান হলো অজিত সান্যালের দুটি গ্রন্থ দুই দেশ দুই মন এবং আলোর পাখিদুই দেশ দুই মন ঢাকা থেকে বেরিয়েছিল ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং বিস্ময়করভাবে নভেম্বর মাসেই গ্রন্থটি দ্বিতীয় প্রকাশ পায়। গ্রন্থটির অলঙ্করণে ছিলেন কামরুল হাসান। আর আলোর পাখি ১৯৯৩ সালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভূমিকাসহ বের হওয়ার কথা ছিল, যা প্রকাশনালয়ের জটিলতার কারণে তখন আলোর মুখ দেখে নি। সম্প্রতি সেটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু বর্তমান লেখকের সৌভাগ্য ঘটেছিল বইটি প্রকাশের আগইে পাণ্ডুলিপি পাঠের।


অর্ধশতকের বেশি পশ্চিম বাংলার বাসিন্দা হয়েও অজিত সান্যাল কোনোদিন ভুলতে পারেন নি তার মাতৃভূমি বাংলাদেশকে।


ফরিদপুরে প্রাচীন ঐতিহ্যিক গ্রাম কোড়কদীর সন্তান অজিত সান্যাল তার মামাবাড়ি চট্টগ্রামে ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কোড়কদীর শতবর্ষ প্রাচীন স্কুল রাস বিহারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে কলকাতায় গণনাট্য সংঘের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন পারিবারিক সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অনুসারী এই সহজ সরল মানুষটি। বড় ভাই অবন্তীকুমার সান্যাল [১৯২৩-২০০৭ এবং ছোট বোন অকাল প্রয়াত সুলেখা সান্যাল [১৯২৮-১৯৬২ সাহিত্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট কৃতির দাবিদার। ১৯৪৫ সালে কলকাতার বুলবুল চৌধুরীর কাছে নৃত্যে অজিতের হাতেখড়ি। ইতোমধ্যে চলতে থাকে পেশা নির্বাচনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ১৯৪৯ সালে বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যশিল্পী সম্প্রদায়ে স্থায়ীভাবে কাজে নিযুক্ত হন অজিত সান্যাল। ১৯৪৫ সালে নৃত্যশিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকেই অজিত সান্যাল বুলবুল চৌধুরীর সাথে নৃত্য প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। দেশাত্মবোধ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি নিয়ে বুলবুল নির্মিত অনেক নৃত্যনাট্যে ছিল তার উপস্থিতি। ১৯৪৫ সালের এই আমার দেশ-এর মতো নৃত্য প্রযোজনায় তিনি ছিলেন সক্রিয়। বুলবুল পরিচালিত পাছে আমরা ভুলে যাই, বন্দিনী ভারত, বীতংস প্রভৃতি নৃত্যনাট্যে কাজের সূত্রে সারা পূর্ববাংলা, পশ্চিম পাকিস্তানসহ ইউরোপ সফর করেন কৃতি এই নৃত্যশিল্পী।

২০১০ সালে বাংলাদেশ সফরকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু প্রতিকৃতির সামনে [বা থেকে অজিত সান্যাল, ভারতের নৃত্যশিল্পী মেহেবুব হাসান এবং বর্তমান লেখক।

দুই দেশ দুই মন বা আলোর পাখি প্রকৃত অর্থে ভ্রমণ-কাহিনি নয়। তিনি প্রকৃত পক্ষে গ্রন্থ দুটিতে তুলে ধরেছেন ভ্রমণকালে নৃত্যশিল্পীদলের মানুষদের মন ও আচরণ। শিল্পীরা যে কত সাধারণ মানুষ, তাদের দৈনন্দিক জীবন যে সাধারণ মানুষদের মতোই সেকথাই তুলে ধরা অজিত সান্যালের অভীষ্ট। তবে গ্রন্থদুটি আসলে পরস্পরের পরিপূরক। ইউরোপে তাদের যে সফর তাকে আশ্রয় করেই গ্রন্থদুটির কাহিনি নির্মাণ। ধারণা হয়, অজিত সান্যাল তার অর্জিত এ অভিজ্ঞতাকে অধিক দক্ষতার সাথে প্রকাশের তাগিতে রচনা করেন আলোর পাখি। সে সাথে আরও উল্লেখ প্রয়োজন তা হলো অজিত সান্যালের অন্য একটি পাণ্ডুলিপি ‘তণ্ডুর পুত্রকন্যা’ যেটি প্রকৃত পক্ষে আলোকপাত করে নৃত্যশিল্পী জীবনে প্রবেশের শুরুর সময়কাল। ‘তণ্ডুর পুত্রকন্যা’তে খুঁজে পাওয়া যায় বুলবুল চৌধুরীর সাথে অজিত সান্যালদের যোগাযোগের প্রথম দিনগুলোকে। অপ্রকাশিত সে পাণ্ডুলিপি বাংলাদেশের নৃত্যজগতের শুরুর দিনগুলোকে আগ্রহীদের সামনে উপস্থাপন করে। ভারতীয় নৃত্যশাস্ত্রের আদি পুরুষ তণ্ডুর নামে উপন্যাসের নামকরণের মধ্য দিয়ে অজিত সান্যাল যেমন সে জগতের মানুষদের বোধ নিয়ে তৈরি করতে চেয়েছেন সাহিত্য, তেমনি তাদের জীবনের বাস্তবতাকে একটি পরাবাস্তব মোড়কে আবৃত করতে চেয়েছেন যেন।

অর্ধশতকের বেশি পশ্চিম বাংলার বাসিন্দা হয়েও অজিত সান্যাল কোনোদিন ভুলতে পারেন নি তার মাতৃভূমি বাংলাদেশকে। আর তাই মাঝে মাঝেই ছুটে আসেন তার প্রিয় বাংলাদেশে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রিদেশিয় এক সাংস্কৃতিক বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। সংবর্ধিত হয়েছিলেন বাংলাদেশ লিটারারি রিসোর্স সেন্টার কর্তৃক। আপ্যায়িত হয়েছিলেন বুলবুল চৌধুরীর নামে সৃষ্ট বাফা কর্তৃক।

২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ লিটারারি রিসোর্স সেন্টারের উদ্যোগে দেওয়া সংবর্ধনায় অজিত সান্যাল, অভিনেতা হাসান ইমাম, খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান ও অন্যান্যরা।

২০১১ সালে বাফার ৬০তম প্রতিষ্ঠাবর্ষে নৃত্যগুরু ও লেখক অজিত সান্যাল বাংলাদেশে আসেন। বাফার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তারুণ্যে টগবগ সেই ঘুঙুরশিল্পী সে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে যেন পরিণত হয়েছিলেন অধিকতর তরুণে।

গত ১২ আগস্ট বর্ধমানের নিজ বাড়িতে অজিত সান্যাল প্রয়াত হয়েছেন। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।

সুব্রত কুমার দাস

সুব্রত কুমার দাস

জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৪; ফরিদপুর। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। পেশায় লেখক। প্রকাশিত বই— ১....বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা