আসন্ন ম্যান বুকার পুরস্কার ও কানাডা প্রসঙ্গ

এবছরের আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার ম্যান বুকার ঘোষিত হবে ১৬ অক্টোবর। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হবে শর্টলিস্ট। কানাডার সাহিত্য পাঠকদের মধ্যে ম্যান বুকার সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে আগ্রহের অনেকগুলো কারণ রয়েছে।

প্রথমেই বলে রাখা দরকার এবছর চলছে ম্যান বুকারের পাঁচ দশক পূর্তি। সে উপলক্ষে কর্তৃপক্ষ গত পঞ্চাশ বছরের পুরস্কৃত পঞ্চাশটি বই থেকে দশকওয়ারি মোট পাঁচটি শ্রেষ্ঠ বইকে নির্বাচন করেন। পরে পাঠকদের ভোটে ঘোষণা করা ম্যান বুকার সুবর্ণজয়ন্তী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের নাম। গত জুলাই মাসে ঘোষিত এই লেখক হলেন কানাডার অবিসংবাদিত কথাকার ও কবি মাইকেল ওনডাতজী। অনন্য সেই পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসটি হলো মাইকেলের দ্য ইংলিশ পেইশেন্ট। শ্রীলংকান বংশোদ্ভূত পঁচাত্তর বছর বয়সী মাইকেল ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো পুরস্কারটি লাভ করেছিলেন। সুবর্ণজয়ন্তী বুকার পুরস্কারের রেশ কাটতে না কাটতেই ২০১৮ সালের বুকার পুরস্কারের লংলিস্ট নিয়ে ঘোষণাটি এসে যায় সর্বসমক্ষে। এতে দেখা যাচ্ছে মাইকেল ওনডাতজীর সর্বশেষ উপন্যাস ওয়ারলাইট অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইতঃপূর্বে যারা বুকার পুরস্কার পেয়েছেন তাদের মধ্যে শুধু ওনডাতজীই এই তালিকায় ভুক্ত হয়েছেন।


একটি উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ অনুবাদকর্মের জন্যে এখন দেওয়া হয় ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার।


এবছর বুকার পুরস্কারের জন্যে সর্বাধিক বই জমা পড়েছিল। জমাকৃত ১৭১টি বই থেকে মোট তেরটি বইকে লংলিস্টে রাখা হয়েছে। স্বাগতিক দেশ যুক্তরাজ্যের মোট ছয়টি বই রয়েছে এই তালিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে তিনটি। কানাডার অন্য আর যে একজন ঔপন্যাসিক এবার প্রতিযোগিতায় রয়েছেন তিনি ইসি এডুগান। তার উপন্যাসের নাম ওয়াশিংটন ব্লাক। উল্লেখ করা প্রয়োজন ইসির নাম ২০১১ সালে আরও একবার উঠেছিল। সেবার তার উপন্যাস হাফ ব্লাড ব্লুজ শর্টলিস্টে উঠেছিল। বলে রাখা প্রয়োজন এবারই প্রথমবারের মতো একটি গ্রাফিক উপন্যাসকে বিবেচনার জন্যে পুরস্কারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উপন্যাসটির নাম সাবরিনা। আমেরিকার শিকাগো শহরের বাসিন্দা নিক ডারনাসো এই উপন্যাসের লেখক। তবে উপন্যাসটির প্রকাশক হলেন কানাডার মন্ট্রিয়লের ড্রন অ্যান্ড কোয়ার্টারলি নামের প্রকাশনা সংস্থা। একটি কাব্যোপন্যাসকেও এবার তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সেটি হলো স্কটল্যান্ডের কবি রবিন রবার্টসনের দ্য লং টেক

গত জুলাইতে লন্ডনে ম্যান বুকার সুবর্ণজয়ন্তী পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন কানাডীয় ঔপন্যাসিক মাইকেল ওনডাতজী।

এ পর্যন্ত কানাডীয় অন্য আরও যে দুজন লেখক বহু আকাঙ্ক্ষিত এই পুরস্কারটি পেয়েছেন তারা হলেন মার্গারেট অ্যাটউড [২০০০, দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন এবং ইয়ান মার্টেল [২০০২, লাইফ অব পাই। এর আগে মার্গারেটের নাম উঠেছিল ১৯৮৯ [ক্যাট’স আই, ১৯৯৬ [আলিয়াস গ্রেস এবং ২০০৩ [অরিক্স অ্যান্ড ক্রেইক সালে। তবে এর বাইরেও ২০১৩ সালে পুরস্কারটি পেয়েছিলেন ইলেনর ক্যাটন যিনি প্রকৃতপক্ষে কানাডায় জন্মগ্রহণকারী লেখক। এছাড়া শর্টলিস্টে বহুবার অন্যান্য কানাডীয় লেখকের নাম উঠেছিল। তাদের কয়েকজন হলেন মর্ডেকাই রিচলার [সেইন্ট আরবাইন’স হর্সম্যান, ১৯৭১, সলোমন গুরস্কি ওয়াজ দেয়ার’, ১৯৯০, ক্যারল শিল্ডস [আনলেস ২০০২, দ্য স্টোন ডায়েরিজ, ১৯৯৩, এলিস মানরো [দ্য বেগার মেইড, ১৯৮০, রহিনতন মিস্ত্রি [সাচ অ্যা লঙ জার্নি ১৯৯১, ফ্যামিলি ম্যাটারস ২০০২, অ্যা ফাইন ব্যালান্স ১৯৯৬, মেডেলিন থিয়েন [ডু নট সে উই হ্যাভ নাথিং, ২০১৬ এবং এমা ডনোগ [রুম, ২০১০।

এ প্রসঙ্গে আরও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, বুকার পুরস্কার বলতে আসলে যুক্তরাজ্যেও ম্যান গ্রুপের অর্থায়নে দুটি পুরস্কার বোঝায়। প্রথমটি হলো ম্যান বুকার প্রাইজ যেটি নিয়ে এতক্ষণ আমরা কথা বললাম। এই পুরস্কারটি শুরু হয় ১৯৬৯ সালে। পুরস্কারপ্রাপ্তকে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড অর্থসম্মানী দেওয়া হয়। শুরুতে এই পুরস্কারটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমূহ এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং বইটি যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হবার শর্ত ছিল। ২০১৩ সাল থেকে ওই শর্তটি পরিবর্তন করে যে কোনো দেশের ইংরেজি ভাষায় লেখা উপন্যাসে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্য পুরস্কারটি হলো ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এটি দেওয়া হয় ২০০৫ সাল থেকে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে একজন কথাসাহিত্যিকের সামগ্রিক অবদানের ওপর। প্রতি দুই বছরে এটি একবার দেওয়া হতো। এই পুরস্কারটির আর্থিক মূল্য ছিল ষাট হাজার পাউন্ড। তবে ২০১৬ সাল থেকে এটির শর্ত পরিবর্তন হয়েছে। একটি উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ অনুবাদকর্মের জন্যে এখন দেওয়া হয় ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার। অর্থমূল্য বর্তমানে পঞ্চাশ হাজার। মূল লেখক ও অনুবাদকের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।


সাম্প্রতিক সময়ের কানাডীয় উপন্যাস শক্তিশালী একটি ধারা। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বিস্ময়উদ্রেককারী উপন্যাস কানাডীয়রা লিখে থাকেন।


২০০৯ সালে কানাডীয় সাহিত্যিক এলিস মানরোকে ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০০৭ সালেও এলিসের নাম একবার উপস্থাপিত হয়েছিল। সেবার তার সাথে আরও ছিলেন মার্গারেট অ্যাটউড ও মাইকেল ওনডাতজী। যদিও মার্গারেটের নাম আরও আগে ২০০৫ সালে, পুরস্কারটির শুরুর বছরেই, প্রস্তাবিত হয়েছিল। জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, ২০১৮ সালে ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে মে মাসে

২০০৯ সালে ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন কানাডীয় লেখক এলিস মানরো।

সাম্প্রতিক সময়ের কানাডীয় উপন্যাস শক্তিশালী একটি ধারা। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বিস্ময়উদ্রেককারী উপন্যাস কানাডীয়রা লিখে থাকেন। আর তাই কানাডার লেখক-পাঠকদের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। দেশের প্রধান পুরস্কারগুলো ঘোষণার সময়ে যেমন পত্র-পত্রিকায় চলতে থাকে অনেক সংবাদ-প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটে না। পত্র-পত্রিকার সাথে সাথে টেলিভিশনগুলোতেও পুরস্কার নিয়ে চলতে থাকে অনেক আলোচনা, সাক্ষাৎকার। বুকার পুরস্কার নিয়েও দেশজুড়ে এখন তেমনটি চলছে। সবার প্রত্যাশা এবার সুবর্ণজয়ন্তী বুকারের হাত ধরে পুরস্কারটি চলে আসুক কানাডাতেই।

সুব্রত কুমার দাস

সুব্রত কুমার দাস

জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৪; ফরিদপুর। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। পেশায় লেখক। প্রকাশিত বই— ১....বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা