অ্যালান কুর্দি ও সিরীয় শরণার্থীদের জীবনকথা

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে সারা পৃথিবীতে যে ছবিটি কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে এবং আলোড়িত করেছে সেটি হলো সমুদ্রতটে পড়ে থাকা সিরীয় শিশু তিন বছরের অ্যালান কুর্দির মৃতদেহ। সমুদ্রপথে তুরস্ক থেকে ই্উরোপের উদ্দেশ্যে পলায়নরত অ্যালানের বাবা হলেন কানাডীয় লেখক টিমা কুর্দির ভাই আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু অ্যালান, অ্যালানের মা রেহান, রেহানের আরেক ছেলে গালিব কেউই রক্ষা পান নি। যে ছবিটি সারা পৃথিবী চোখের জলে দেখেছে সেটিতে অ্যালানের গায়ে যে টি-শার্টটি ছিল, যে ছোট্ট জুতোজোড়া ছিল নরম পায়ে সেগুলো লেখক টিমাই কিনে দিয়েছিলেন ওই ঘটনার বছরখানেক আগে। টিমার চোখে দেখা সিরীয় শরণার্থীদের জীবন, জীবন বাঁচাতে দেশত্যাগ, নতুন দেশে নতুন স্বপ্নের সাথে বসবাস ইত্যাদি নিয়ে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের লেখক রচনা করেছেন দ্য বয় অন দ্য বিচ : মাই ফ্যামিলি’জ স্কেপ ফ্রম সিরিয়া অ্যান্ড আওয়ার হোপ ফর অ্যা নিউ হোম। গত এপ্রিলে প্রকাশিত এ গ্রন্থটির প্রকাশক সাইমন অ্যান্ড স্কুসটার।

২০১১ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ বারের মতো টিমা দামাসকাস গিয়েছিলেন পরিবারের মানুষদের সাথে দেখা করতে। এরপর সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হলে লক্ষ লক্ষ মানুষের মতো টিমার ভাই আবদুল্লাহর পরিবারকেও সিরিয়া ত্যাগ করতে হয়। তুরস্কের ইজমিরে আশ্রয় নেন তারা। যেখান থেকে উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে তাদের গন্তব্য গ্রিসের উপকূল। সর্বশেষ ভরসাস্থল কানাডা। এমনটিই স্বপ্নে ছিল যেটির বাস্তবায়ন হবে না আর কোনোদিন।

কানাডা থেকে টিমা তার ছোটভাই আবদুল্লাহকে পাঁচ হাজার ডলার পাঠিয়েছিলেন পরিবারের সবার আসার খরচ হিসেবে। আবদুল্লাহও প্রতিদিনই ভাবতেন রওনা হবার কথা, কিন্তু প্রতিদিনই নতুন কোনো কারণ সামনে দাঁড়িয়ে তার যাত্রাকে ঠেকিয়ে দিত। শেষমেষ ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট ভ্যাঙ্কুভার সময় সন্ধ্যা ৭টায় টিমা তার ভাইয়ের শেষ ক্ষুদে বার্তা পান ফোনে। লেখা ছিল : God willing, we’re leaving tonight. তুরস্কে তখন ১ আগস্ট সকাল। এরপর আবদুল্লাহ আবারো যোগাযোগ করেন ওই স্মাগলারের সাথে যিনি তার পরিবারকে সমুদ্র পার করতে সাহায্য করবেন। এরপর কী হলো? সেসব কথাই অনেক দরদ দিয়ে বলেছেন টিমা তার সদ্য প্রকাশিত এই গ্রন্থে।

‘দ্য বয় অন দ্য বিচ’ গ্রন্থের লেখক টিমা কুর্দি।

বইটি বাজারে আসার ঠিক আগে-আগে ভ্যাঙ্কুভার সান পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে টিমা বলেন : আমি বারবার তাকে মেসেজ পাঠাচ্ছিলাম। ‘কোথায় তোমরা?’, ‘কী হয়েছে?’ মেসেজগুলোর কোনো উত্তর আসে নি। টিমার ভাষায়: ‘All my messages were sent to the bottom of the Mediterranean Sea.’ [১৩ এপ্রিল, ২০১৮ ওই দুঃখকে ভুলতেই টিমার এই বই রচনা। তিনি বলেছেন : ‘If you go inside my heart, I don’t wish this on anyone. I don’t eat. I don’t sleep. My life has changed completely. That’s why this book. It has given me so much healing.’

দ্য বয় অন দ্য বিচ মোট তিনটি পর্বে বিন্যস্ত। প্রতিটি পর্বে রয়েছে পাঁচটি করে অধ্যায়। অর্থাৎ মোট পনেরোটি অধ্যায়ে শেষ হয়েছে বইটি। প্রতিটি অধ্যায়ের একটি করে উপশিরোনাম থাকলেও, পর্ব তিনটির জন্য তেমনটি করা হয় নি। অধ্যায়-উপশিরোনাম দিয়ে যেমনভাবে স্পষ্ট হয় ওই অধ্যায়ের বিষয়, পর্ব-নাম না থাকায় অস্পষ্ট লাগে ওই পর্বে লেখক আসলে কোন বিষয় বা সময় বা চরিত্রকে প্রাধান্য দিলেন।

‘দ্য বয় অন দ্য বিচ’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ।

প্রথম অধ্যায়টি ভীষণ চিত্তাকর্ষক। হয়তো এমন তথ্য বর্তমান আলোচকের না-জানা থাকায় সেটি বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। তবে মানতেই হবে টিমা সেটিকে উপস্থাপন করেছেন অনেক স্বাদু গদ্যে। অধ্যায়ের শুরুতেই তিনি বলেন : ‘দামাস্কাসে সর্বত্র বেলিফুল ফোটে। প্রতিটি কোনায় কোনায় এমন করে বেলিফুল ফুটে থাকে যে তার গন্ধে বাতাস সবসময় মৌ-মৌ করে। সারা দামাস্কাস-জুড়ে বেলিফুলের এমন প্রাচুর্য যে শহরটির ডাকনাম হলো ইয়াসমিন আর-সাম অর্থাৎ জেসমিন বা বেলিফুলের শহর’ [অনুবাদ বর্তমান আলোচকের। সেই বেলিফুলের চারা টিমা কুর্দি নিয়ে এসেছিলেন তার বর্তমান শহর কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। সে-চারা কষ্ট করে বাঁচলেও গন্ধটা যেন কিছুতেই দামাস্কাসের বেলির মতো হয় না। পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন, এই না-হওয়ার ভেতরেই আসলে লুকিয়ে আছে শেকড়-ছেঁড়ার বেদনা, নতুন মাটিতে অভিবাসী মানুষের ফেলে আসা সংস্কৃতিকে আশ্রয় করার প্রচেষ্টা, ব্যর্থতার মধ্যেও সুখ খোঁজার প্রয়াস।

দ্য বয় অন দ্য বিচ বইতে আছে অ্যালানদের কথা, অ্যালানের বাবা আবদুল্লাহর মতো সিরিয়ার অন্য শরণার্থীদের কথা। সবকিছু ঘটে যাবার পরের কথাও রয়েছে বইটির বেশ অংশ জুড়ে। নতুন আশা নিয়ে কানাডায় শরণার্থীদের যে স্বপ্ন-নির্মাণ সেসবের কথাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

গ্রন্থের মূল অংশটি শুরুর আগে একটি মুখবন্ধ দিয়েছেন টিমা কুর্দি। সেখানে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন দেশের বাড়ি সিরিয়ায় তাদের পারিবারিক বলয়ের কথা—যে পরিস্থিতিতে আবদুল্লাহ সিরিয়া ছেড়ে চলে যান স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে। এরপর থেকে তাদের সেই যে দোলাচল! কবে সমুদ্র পার হবেন। রওনা হবেন ইউরোপের উদ্দেশ্যে। এবং সবশেষে কেমন করে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়! পুরো বইটি পড়তে, বইয়ের মানুষগুলোকে সহজে চিনে নিতে পাঠকের যাতে অসুবিধা না হয় সে জন্যে লেখক শুরুতে একটি ফ্যামিলি-ট্রি দিয়ে রেখেছেন। ভৌগোলিক অবস্থান বোঝার অসুবিধা দূর করতে তিনি সে-অঞ্চলের একটি মানচিত্রও দিয়েছেন। কিন্তু বইটিতে একটি অসুবিধাও রয়েছে। মাঝে মাঝেই তিনি আরবি হরফে কিছু শব্দের ব্যবহার করেছেন যেটি আরবি-না-জানা পাঠকের জন্যে দুর্বোধ্য। রোমান হরফ ব্যবহার করে ওইসব আরবি শব্দকে উপস্থাপন করলে এবং সেটির অর্থ পাশে মার্জিনে বা বইয়ের শেষে একটি গ্লোসারিতে যুক্ত করলে সম্ভবত সেটি অধিক যুক্তিসংগত হতো।

অ্যালানের ফুফু দ্য বয় অন দ্য বিচ গ্রন্থের লেখক টিমা কুর্দি ও অ্যালানের বাবা আবদুল্লাহ কুর্দি। ছবি : দ্য গার্ডিয়ার পত্রিকা থেকে সংগৃহীত।

বইটি পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝেই মনে হয়, লেখক কানাডা সরকারের শরণার্থী নীতি ইত্যাদি নিয়ে রাজনৈতিক নেতার মতো ভাষ্য দিয়েছেন। শরণার্থী-বান্ধব পার্টি হিসেবে লিবারাল নাকি কনজার্ভেটিভ ভালো সে-বিতর্কও তুলেছেন তিনি। আর তার ফলে একটি সুখপাঠ্য জীবনকথার অনুভব থেকে পাঠক বঞ্চিত হন। বর্তমান আলোচকের দৃষ্টিতে সে-ভাষ্যটি এড়িয়ে যদি হৃদয়-মথিত মানবিক ওই বৈশ্বিক বোধটিকে আশ্রয় করেই পুরো বইটি টিমা রচনা করতেন, তাহলে সেটি অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী হতো।

একথা স্বীকার করতেই হবে, অ্যালান কুর্দির ছবি গণমাধ্যমে না-আসা পর্যন্ত সিরিয়ার যুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিপন্নতা বিশ্ববাসী অনুধাবন করতে পারেন নি। অ্যালানের আত্মাহুতির ছবি নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বকে—আর তার পরিণতিতেই হাজার হাজার শরণার্থী আশ্রয় পায় উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে। শুধু কানাডাতেই এ পর্যন্ত এসেছেন পঞ্চাশ হাজারের বেশি গৃহহীন সিরীয় মানুষ। বইটি প্রকাশের পর সিটিভি নিউজের সাথে এক সাক্ষাৎকারে টিমা বলেন : ‘I am really hoping our prime minister will talk to other leaders to work towards peace and bring a political solution to actually end the war in Syria.’ [৩০ এপ্রিল, ২০১৮

টিমা কানাডাতে এসেছিলেন ১৯৯২ সালে। সম্প্রতি অ্যালান ও গালিবের স্মরণে ভাই আবদুল্লাহকে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন কুর্দি ফাউন্ডেশন। চেষ্টা করছেন শরণার্থীদের জন্যে কাজ করতে। লিখেছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ-কোটি যুদ্ধ-ক্লিষ্ট মানুষের অশ্রুগাঁথা। দুঃখকে ধারণ করেছেন, পরিণত করেছেন শক্তিতে।

কানাডায় আশ্রয়প্রাপ্ত পঞ্চাশ হাজারের বেশি সিরীয় শরণার্থীর প্রথম দলকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে স্বাগত জানান কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ছবি : সিবিসি

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কানাডার গ্রন্থজগতে সিরীয় প্রসঙ্গ এবারই প্রথম নয়। দ্য বয় অন দ্য বিচ প্রকাশের আগে ফেব্রুয়ারিতে বাজারে এসেছে এক কিশোরীর চোখ দিয়ে দেখা উপন্যাস সাদিয়া। উইনিপেগের পুরস্কারপ্রাপ্ত ইয়ং অ্যাডাল্ট লেখক কলিন নেলসনের এই উপন্যাসে প্রধান চরিত্রকে আমরা দেখতে পাই হিজাবের জন্যে বিব্রত হতে, আবার সাদিয়ার বন্ধু সিরীয় শরণার্থী মারিয়ামকে দেখি হিজাব ছুড়ে ফেলে প্রতিবাদ করতে, কানাডীয় সংস্কৃতির সাথে একীভূত হতে।

আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গত এপ্রিলেই প্রকাশিত হয়েছে কানাডীয় আরেক লেখক আহমেদ দানী রামাদান রচিত গ্রন্থ দ্য ক্লোথসলাইন সুইং। সিরিয়া থেকে লেবানন, লেবানন থেকে তুরস্ক, তুরস্ক থেকে কানাডার পথে এক শরণার্থীর যাত্রাকে চিত্রিত করেছেন আহমেদ। কিন্তু আহমেদের বইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি সে যাত্রাপথের সাথে সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন আরও অনেক কিছুর—সেখানে ঢুকে পড়েছে মুখ্য চরিত্রের শৈশব-কৈশোর, সে-বয়সের যৌন উপলব্ধি ইত্যাদি অনেক কিছু। ২০১৪ সালে সিরিয়া থেকে কানাডায় শরণার্থী হিসেবে আসা আহমেদের এটি প্রথম উপন্যাস হলেও এর আগেই তার ছোটগল্প ও অনুবাদের বই প্রকাশিত হয়েছিল।

অভিনন্দন টিমা কুর্দি, অভিনন্দন আপনাকে ভাইপোর জন্যে এমন ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্যে। অভিনন্দন এমন প্রাঞ্জল একটি গ্রন্থ উপহার দেবার জন্যে।

সুব্রত কুমার দাস

সুব্রত কুমার দাস

জন্ম ৪ মার্চ ১৯৬৪; ফরিদপুর। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। পেশায় লেখক। প্রকাশিত বই— ১....বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা