সোনাপাখি : ৪

৩ পর্বের লিংক

[তৃতীয় পর্বে যা ছিল : বিকাশ এজেন্ট থেকে পাঁচ হাজার টাকার বেশি তুলতে পরিচয়পত্র লাগে। অপহরণকারী হারুন ও মাসুদ দ্বিধায় ভুগছে, তারা কি পাঁচ হাজার করে আদায় করবে নাকি দিশুর বাবাকে পদ্মার চরে টাকা নিয়ে যেতে বলবে? শুভ, দিশু হাতের বাঁধন খুলে ফেলেছে। কিন্তু শরিফা নামে যে মহিলা তাদের পাহারা দিচ্ছে তাকে কি তারা মোকাবিলা করতে পারবে?


পর্ব-৪

দিশুদের বাসার দরজার সামনে তিন-চারজন প্রতিবেশী। নারী ও ছেলেমেয়ে। সবাই আতঙ্কে স্তব্ধ। রিতিকে তাদের কাছে রেখে হাদি লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙছে। তার বাঁ হাতে কানে ধরা মোবাইল ফোন। ডান হাতে সিঁড়ির রেলিং। “হা, আমি ত, এই ত, সিঁড়িতে,” অপর পাশে তার বন্ধু কল রিসিভ করলে বলল সে। “তুই কই? হা, আয়। আমাদের বাসার সামনে আয়। নাখালপাড়ার অন্য বন্ধুদের একটু বল।” কথা শেষ হবার আগেই সিঁড়ি শেষ।

গেটের সামনে একদল নারী-পুরুষ, বাড়িঅলা মুরব্বি, তরুণ-যুবা নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে। শুধু শেলি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে রাস্তার ওপর বসে পড়েছে। কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল ফোনের বাটন চাপাচাপি করছে। তার ওড়নাটা একপাশ থেকে খসে গেছে। চোখের পাতা নড়ছে না। হাদির বুকের ভেতর হুহু করে উঠল। “আম্মু!” সে তাড়াতাড়ি করে তাকে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে। শেলি যেন তা খেয়ালই করল না। মোবাইল ফোনটা কাঁপা কাঁপা হাতে কানের সঙ্গে চেপে ধরে পাথর হয়ে আছে। ‘নাম্বারটি বন্ধ রয়েছে’ শুনে কেটে দিয়ে আবার ফোন করছে। বার বার করছে। তার চোখের সামনে দিশু কাঁদছে আর আম্মু আম্মু করছে, আম্মু-উ-উ-উ, কিন্তু শেলি ছুটে যেতে পারছে না। তার শুধু মনটা ছুটোছুটি করছে। হাদি বুঝতে পারে। সে মাকে জড়িয়ে ধরে রেখে বাড়িঅলার দিকে তাকাল।


দিশু কাঁদছে, ‘আম্মু, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে! আম্মু! ওরা আমাকে…আম্মু-উ-উ-উ!’


বাড়িঅলা চুপ। তার কী করার আছে। হারানোর খবর পেয়েই নিজের ছেলেকে মাইক ভাড়া করতে পাঠিয়েছে। কিন্তু অপহরণের কথা শুনে অসহায় হয়ে পড়ল। এখন র‌্যাব-পুলিশে অভিযোগ দেওয়া ছাড়া কারো মাথায় আর কোনো বুদ্ধি আসছে না। ওদিকে অপহরণকারীরা বলে দিয়েছে, র‌্যাব-পুলিশে গেলে আর ছেলেকে পাবে না।

“তবু,” মাইক আসার পর হাদি বলল, “এলাকায় প্রচার চলানো ভালো। আশপাশে এত এত লোকজন! এর মধ্যে কিভাবে অপহরণ করল বুঝলাম না।”

“আচ্ছা,” বাড়িঅলা কিঞ্চিৎ চিন্তা করে মাইকঅলাকে বুঝিয়ে দেয় কোথা দিয়ে ঘুরবে। কী বলবে। প্রচারে কাজ না হলেও স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়া জরুরি।

“আরেকটা বিষয়,” এক তরুণ বলল, “অপহরণকারীরা যে বিশ-ত্রিশ মিনিটের মধ্যে বিকাশ নম্বর দিতে চাইল, তাদের আর খবর নেই কেন? এক ঘণ্টা ত হয়ে গেল।”

“তাই ত ভাবি,” ভাবতে ভাবতে বাড়িঅলা তার এক উকিল বন্ধুকে ফোন করল। তার কাছে যদি কোনো পরামর্শ মেলে।

মাইকে প্রচার শুরুর আড়াই মিনিটে শেলির মোবাইল ফোনে দিশুর নাম্বার থেকে কল আসে। অপহরণকারী একটা বিকাশ এজেন্টের নাম্বার দিয়ে তিন মিনিটের মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতে বলছে। তারপর শেলিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই লাইন কেটে দিল।

শেলি এরই মধ্যে বাড়িঅলার কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা ধার করে রেখেছে। সে দৌড়ে বিকাশ এজেন্টে গিয়ে দুই মিনিটের মধ্যে পাঁচ হাজার পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু। আসলে কী হতে যাচ্ছে?

তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই চোদ্দ মিনিট পর দিশুর নাম্বার থেকে আবার এসএমএস এল। এবার অন্য একটা এজেন্ট। আবার তিন মিনিটের মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতে বলছে।

কিন্তু পাঠালেও কি নিশ্চয়তা আছে?

তারা জানে, মুক্তিপণ পেয়েও অপহরণকারীরা প্রায় সব শিশুকে মেরে ফেলে। শিশু সামলানো কঠিন কাজ। লুকিয়ে সামলানো আরো কঠিন। নিত্য ধরা পড়ার আশঙ্কা। আবার মেরে ফেললেও মুক্তিপণ আদায় করা যায়! তাতে বরং আরো সুবিধা। শিশু সামলানোর ঝক্কি থাকে না।

শেলি আর চিন্তা করতে পারছে না। তার চোখের সামনে দিশুকে মেরে ফেলছে। আজরাইল দিশুর গলা চেপে ধরেছে। তার দিশু কাঁদছে, ‘আম্মু, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে! আম্মু! ওরা আমাকে…আম্মু-উ-উ-উ!’ শেলি দুহাতে কান চেপে ধরে হাউমাউ করে উঠল, “ও আললা গো, আমি এখন কী করব-ও-ও-!” সে বিকাশ এজেন্টের সিঁড়ির ওপর যেন ধসে পড়ল।

হাদি তাকে ধরেও সামলাতে পারে না। সে মায়ের পাশে বসে। তারপর খানিক চিন্তা করে ৯৯৯ নাম্বারে কল দিয়ে পুলিশের সহায্য চাওয়াই বেটার মনে করে। তবে তার আগে বন্ধুদের দিকে তাকাল।

কিশোর বন্ধুরা ছটফট করছে। বন্ধু শিহাব রাগে-ক্ষোভে দাঁত কিড়মিড় করছে আর এঁড়ের মতো ঘাড় শক্ত করে ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছে। কিছু করতে চায় কিন্তু কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎ করেই দোকানের শাটারে ঘুসি মারলে সবাই কেঁপে উঠল। “সময়-অসময় গুম, খুন, হাইজ্যাক—ভাল লাগে না! ভাল লাগে না!” বলতে বলতে আবার একটা ঘুসি।

বাড়িঅলা বলল, “বাবারা, মাথা ঠান্ডা রাখ।”

“সবার মাথা ত ঠান্ডাই দেখি,” শিহাব মাথা নিচু করে ডানে-বাঁয়ে ঝাঁকাতে লাগল। হয়তো বাড়িঅলাকেই একটা গুঁতো দিয়ে বসবে!

বাড়িঅলা ভয়ে ভয়ে পিছিয়ে দাঁড়ায়।

সেই মুহূর্তে শুভর মা ‘তুমরা আমার শুভরে আইনে দ্যাও গো’ বলতে বলতে দোড়োয় আসল। অপহরণের খবর পাওয়ার পর থেকে দিশেহারার মতো এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে আর চিল্লাচ্ছে, “আমার শুভ পুডিং খাবে। আমি ওর জন্যি পুডিং বানালাম।” সে মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে সবার মুখের দিকে চায়। কোনো সুখবর আসে নি বুঝতে পেরে আবার আরেক দিকে দোড়। তারপর এক জায়গায় থেমে শুভর বাবাকে ফোন।

শুভর বাবা বনানিতে মুদির দোকান চালায়। বন্ধ করে রওনা হয়েছে। হেঁটে আসতে ঘণ্টা খানেক লাগবে। রাস্তায় জ্যাম না থাকলে বাসে দুই মিনিটে আসতে পারত।

“আমরা এভাবে বসে থাকতে পারি না,” কিশোর শিহাব বলল।

“কিন্তু যাব কই? কী করব?”

হাদি তার বাবাকে ফোন করল, “আব্বু, কদ্দূর এসেছ?”

“এই ত! আমি ত—!” বাবা জালাল বায়িং হাউসের মার্চেন্ডাইজার। তার অফিস বনানি। সকালে গেছে গাজীপুরের বংশীতীরে কালিয়াকৈর কারখানায় পোশাক তৈরির কাজ দেখতে। সে যখন ফ্লোরে ফ্লোরে ঘুরে শ্রমিকদের প্যান্ট সেলাই করা দেখছিল আর ম্যানেজারের সঙ্গে দুএকটা কথা বলছিল, সেই সময় শেলির ফোন। তখনই রওনা হয়ে এতক্ষণে কেবল গাজীপুর চৌরাস্তায় আসতে পেরেছে। জেলির মতো জ্যামে আটকা পড়েছে।

“আমি ৯৯৯ নম্বরে কল দিচ্ছি,” হাদি বলল সম্মতির আশায়।

বাবা বলল, সে অলরেডি কল করেছে। পুলিশ হয়তো এখনই এসে পড়বে।

“তাহলে আমরা এখন কী করব?” হাদি ফোনের লাইন কেটে দিয়ে বন্ধুদের দিকে তাকাল।

“আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে পড়া উচিত,” বন্ধু বলল, “শয়তানরা কাছাকাছি আছে, আমি নিশ্চিত। এত শিগ্‌গির তারা কই যাবে?”

কিন্তু আশপাশে এত অসংখ্য গলি যে, সেখানে সাত কিশোর বন্ধু কী করবে বুঝতে পারে না। তার ওপর তারা কেউ একা একজন কোথাও যাওয়ার সাহস পায় না।

হাদি বাড়িঅলা মুরব্বির দিকে তাকাল।

বাড়িঅলা বলল, “তুমরা যা ভাবছ তাতে কোনো লাভ নেই, বাবারা।”

পড়শি তরুণ-যুবারাও র‌্যাব-পুলিশ ছাড়া উপায় নেই বলে মত দেয়। তারা একে একে পা বাড়াতে শুরু করে। তাদের কাজ আছে।

হাদির বন্ধুরা দুই দলে ভাগ হলো। একটা দল শুভ-দিশুকে আটকে রাখা গলি দিয়ে এগিয়ে চলে যায় মসজিদ মোড়ে।

আরেক দলে আছে হাদি। সে আম্মুকে এখানেই থাকতে বলে দুই বন্ধুকে নিয়ে উল্টো দিকে যায়। তারপর খেলার মাঠ ঘিরে রাখা টিনের বেড়ার পাশ দিয়ে আগায়।

শেলি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মসজিদ মোড়সহ আশপাশে নজর রাখার পর বাসার দিকে পা বাড়াল। রিতি কী করছে দেখে আসা দরকার। কিন্তু গেটের সামনে গিয়ে আর নড়ল না। বাসায় গেলে রিতি তাকে ছাড়বে না। সে বরং পাশের বাসায় ফোন করল। সেখান থেকে বলল, রিতি কানছে। কেউ থামাতে পারছে না।

তার কান্না থামানোর জন্য বাসায় যেতে হবে, ভাবতে ভাবতে পা বাড়ায় শেলি, কিন্তু সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সে বরং তার বোনকে ফোন করল। বোন ইডেন কলেজের ছাত্রী। কলেজের হলে থাকে। ঘণ্টা খানেক আগে বের হয়ে রিকশায় এক কিলোমিটার আসতে পেরেছে। তারপর জ্যামে আটকা পড়লে নেমে হাঁটা শুরু করে। এখন কেবল বাংলামটর। হেঁটে আসতে ঘণ্টা দেড়েক লেগে যাবে। জ্যাম না থাকলে বাসে চার মিনিটে আর রিকশায় বিশ মিনিটে আসতে পারত।

শেলি গেটে দাঁড়িয়ে ভাবছিল কী করবে। সেই সময় পুলিশ আসে। এক এএসআই আর তার সঙ্গে এক সিপাই।

ঘটনা শোনার পর পুলিশ শেলিকে নিয়ে মসজিদ মোড়ের দিকে পা বাড়ায়।

মোড়ে দাঁড়িয়ে এএসআই নোট নেওয়ার ফাঁকে শেলি হাদিকে ফোন করল।

হাদি মিনিট চারেকের মধ্যে দোড়োয় আসে। “দিশুকে আমি ফোন করলে সে বলল যে সে মসজিদ মোড়ে। এর নয় মিনিট পরও সে না ফিরলে মা ফোন করে। ফোন বন্ধ পেয়ে প্রথমে মা নিচে নামে। পরে আমি নামি। এইটুকু সময়ের মধ্যে অপহরণকারী তাদের নিয়ে কোথায় চলে যাবে?” হাদি বলছিল। তাকে থামিয়ে দিয়ে দাপুটে চেহারা এএসআই বলল, “তুমি কি ভাবছ পুলিশ জানে তারা কোথায় আছে?”

হাদি বিব্রত হয়।

শেলি বলল, “ওর কথা বাদ দেন, ভাই। ও ছেলেমানুষ।”

হাদি বুঝতে পারে না সে কি অন্যায়টা করল। কিন্তু বইপত্রে সে পড়েছে, পুলিশ হলো রাজা। সবিনয়ে অভিযোগ দেওয়ার বাইরে পুলিশকে কিছু বলতে হলে সাত-পাঁচ ভাবতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জ্ঞানগম্যিতে কুলোয় না। তাই চুপ থাকাই তাদের কর্তব্য। তবু হাদি বলে বসে, “মাইকিং শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অপহরণকারীরা বন্ধ করার হুকুম দিল। এই এক ঘণ্টার মধ্যে তারা দুই দুইটা বিকাশ এজেন্টের নাম্বার দিয়ে দুই দফা টাকা নিল। আমার ধারণা ওই নাম্বারগুলো বেশি দূরের না। তারা কাছাকাছি কোথাও আছে।”

এএসআই নোট নেওয়া থামিয়ে হাদির দিকে তাকাল।

হাদি বলতে যাচ্ছিল, পুলিশের প্রযুক্তি দিয়ে ওই বিকাশ এজেন্টদের শনাক্ত করলে বোঝা যেত অপহরণকারী আসলেই কাছাকাছি আছে কিনা। কিন্তু এএসআই গলা শক্ত করে বলল, “তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”

“ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার।”

“তুমি সব বোঝ এমন মনে করার কোনো কারণ নেই, ওকে?”

“ওকে,” হাদি মাথা নিচু করে ঘুরে দাঁড়াল। তার মনে হচ্ছে না পুলিশ শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারবে। তার কান্না পাচ্ছে। বন্ধু শিহাব হাত মুঠ পাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করল। তার মনে হয় না হাদি অন্যায় কিছু বলে। হাদি হলো তাদের প্রাণপ্রিয় হিরো বন্ধু।

হাদির চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরল। দিশু এখন কোথায়? দিশুকে পাওয়া যাবে ত?

সব শুনে এএসআই তেজগাঁও থানার ওসিকে ফোন করল। ওসি সব শুনে এসআই খায়েরকে ধরল।

খায়ের এই মুহূর্তে তেজকুনি পাড়ায়। সেখানে পিকআপ চাপায় একজন মারা পড়েছে। “এটা দ্রুত শেষ করে আপনি দিশুর কেসটা ধরেন। নাবিস্কো জোনের ক্রিমিনালদের পাকড়াও করেন। বলেন যে শিশুদের নিয়ে ব্যবসা পুলিশ মোটেই বরদাশত করবে না। ডাইরেক্ট ক্রসফায়ার।”

“জি, সার,” খায়ের দ্রুত নোট নিল। বেওয়ারিশ লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন। দুর্ঘটনার কারণ ও বর্ণনা। চালকের নাম-ধাম, ইত্যাদি। তারপর এক সিপাইকে দিয়ে লাশ মর্গে আর দুই সিপাইকে দিয়ে হাতকড়া পরানো চালককে থানায় পাঠাল।

“আপনারা কাজ শেষ হলে আমাকে ফোন করবেন,” খায়ের বলল।


এই শহরের কোথাও কোনো ছন্দ নেই,” শিহাব বলল, “কোথাও কোনো রকম ডিসিপ্লিন নেই।


দুই সিপাই স্যালুট ঠুকলে এসআই খায়ের অন্য এক সিপাইকে নিয়ে মটরসাইকেলে ওঠে। রওনা হওয়ার আগে মোবাইল ফোনের এসএমএস লিস্টে গিয়ে দিশুদের বাসার ঠিকানা নেয় যা এইমাত্র ওসি পাঠিয়েছে। তারপর হেলমেট পরে এক মিনিটের পথ বাইশ মিনিট জ্যাম ঠেলে পৌঁছাল দিশুদের বাসার সামনে।

শেলির কাছে সব শুনতে শুনতে নোট নেয় এসআই খায়ের। এবার যেতে হবে মসজিদ মোড়ে। খায়ের আশপাশে খানিক তাকিয়ে নিয়ে চারটি গলির সব বাড়ির নাম্বার টুকতে টুকতে বলল, “এখানকার কোনো ভাড়াটিয়ার চালচলন সন্দেহজনক মনে হয়?”

“আমরা মাত্র বছর খানেক আগে এখানে আইছি। কাউকে ত চিনি নে, ভাই।”

“আমি এখন থানায় গিয়ে এ এলাকার সব বাড়িঅলাকে ফোন করে ভাড়াটিয়াদের খোঁজখবর নেব। আর আপনারা যদি পারেন ত—যদি লোকজন থাকে তাহলে আশপাশে মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন আর আললা আললা করেন!” কাজটা পুলিশের করা উচিত ছিল। পুলিশ ভালো করত।

মটরসাইকেলে ওঠার আগে খায়ের তেজগাঁও থানার সবচেয়ে বড় অপরাধী, সতের মামলার আসামি, আমির ফকিরকে ফোন করল। তেজগাঁও রেল বস্তি থেকে মুঠোফোনে কল রিসিভ করে আমিরের স্ত্রী হাজেরা বেগম। তার নামেও চারটি মামলা রয়েছে। ইয়াবার দুটি, ফেনসিডিলের একটি। তাছাড়া পুলিশ তাকে এক অপহরণ মামলায় আসামি দেখিয়েছে।

“নাখাল পাড়ার শিশু দুটি কই?” খায়ের এভাবেই শুরু করল।

“খুদার কসম, সার! আমি আর কুনু আকাম করি নাইক্কা। আমি অহন মাইনষের বাসায় বুয়ার কাম করি, সার। আমারে আর মামলায় ফাঁসাইয়েন না, সার। আপনের পায় ধরি, সার।”

“আমির কই?”

“হ্যায় ত সার তিন মাস ধইরা জেলে।”

“ত আপনি অহন সবাইরে ফোন কইরে কন, বাচ্চা দুইটারে যেন শিগ্‌গির ফেরত দিয়া যায়।”

“জে, সার। আমি অহনই সবাইরে ফোন করতাছি। তয় সার, অহন ঘরে ঘরে নতুন নতুন কিরমিনাল জম্মাইতাছে, সার।”

খায়ের আরো চার দাগি আসামিকে ফোন করল।

হাদি বলল, তারা যেসব বিকাশ এজেন্টে টাকা পাঠাচ্ছে তাদের মাধ্যমে পুলিশ কিছু করতে পারে কিনা—এদিকটা যদি আমলে নেওয়া যায়—।

হারুন নোট নিতে নিতে বলল, “ভালো বুদ্ধি। বিষয়টা উপর মহলে জানাব।”

“আর আমরা এখন কী করব?” পুলিশ চলে গেলে হাদি আম্মুর দিকে তাকাল।

শেলি মোবাইল ফোন কানে চেপে অসহায়ের মতো ছটফট করছিল। সে রাস্তার ওপর বসে পড়ল। তার মাথায় কোনো বুদ্ধি আসছে না। সে শুধু অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। সে তাদের বলতে চায়, সে তার সবকিছু বেচে হলেও তাদের যা চাহিদা তা দিয়ে দেবে। বিনিময়ে সে শুধু তার দিশুকে ফেরত চায়। কিন্তু অপহরণকারীরা আর ফোন চালু করছে না। দেড় ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে, তারা আর তৃতীয় কোনো বিকাশ এজেন্টের নম্বরও দিচ্ছে না।

হাদি মায়ের দিকে তাকাতে পারছে না। সে তার বন্ধুদের দিকে তাকাল। ঢ্যাংঢ্যাং করে বেড়ে ওঠা কিশোর বন্ধুরা উশখুশ করছে। শুধু শিহাব দুই হাত মুঠ পাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করছে। সে সবকিছু ভেঙেচুরে একাকার করে ফেলতে চায়। হঠাৎ করে ‘মনডায় কয় যে’ বলতে বলতে বিদ্যুতের খুঁটিতে ঘুসি মারল।

সবাই কেঁপে ওঠে। হাদির চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরল। সে মাথা নিচু করে পকেট থেকে রুমাল বের করে। “আমাদের এখন আশপাশে নজর রেখে ঘোরাঘুরি করা দরকার,” চোখ মুছতে মুছতে বলল সে। কথা বলার সময় তার গলা জড়িয়ে যায়।

শিহাব বন্ধুদের দুইজন করে দলে দলে এদিক-ওদিক পাঠিয়ে দেয়। আর সে নিজে হাদির হাত ধরে, “চল, আমরা একটু ওই গ্যারেজের দিক দিয়ে বস্তির সামনে যাই।”

তারা পা বাড়াতেই শেলি উঠে দাঁড়াল। সে মসজিদ মোড়ের গলিগুলোতেই ঘুরতে চায়। মোড় দিয়ে একবার পশ্চিম দিকে যেতে যেতে দুই পাশের গলিগুলোর দিকে চায় আরেকবার উত্তর দিকে যেতে যেতে। লোকজনকে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে। মাঝেমধ্যে গলির ভেতরে খানিকটা চলে যায়। আবার ফিরে আসে। শুভর মা মাঝে মাঝে ‘আমার শুভরে কিডা নিয়ে গেল, আললা গো’ বলতে বলতে পাগলির মতো দোড়োয় আসে। শেলির মুখের দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে থেকে আবার দোড়োয় চলে যায় বত্রিশ বছর বয়সী জননী। লোকজনকে পাশ কাটিয়ে দোড়োনোর সময় এখনও পথচারীরা তার দিকে চেয়ে থাকে। দোকানিরা এটা আর ভাবতে পারছে না। তাদের কিছু করার নেই।

হাদির বন্ধুরা মোড় থেকে খানিকটা দূরে গিয়ে দলে দলে অলিগলি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আশপাশে তাকাচ্ছে। দিশুকে নিয়ে দেওয়া ফেসবুকে হাদির পোস্টগুলো তাদের চোখের সামনে একের পর এক ভাসতে থাকে। দিশু একটা জ্বলন্ত বাল্ব ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে বাড়ি মেরে ভেঙে ফেলল। কিভাবে আলো জ্বলে দেখবে। খেলনা পিস্তলের বাঁট দিয়ে টিভির কাচ পিটিয়ে ভাঙার চেষ্টা করছে। কোথা থেকে ছবি আসে দেখা চাই। আম্মু রিতিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল। দিশু ফ্রিজের সব খাবার বাইরে রেখে নিজে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। দরজা বন্ধ করলে আলো জ্বলে কিনা দেখবে! অন্য কারো কথায় সে খুশি হতে পারে নি। আর হাদি সেই দৃশ্য চোখে পড়তেই মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধরে ফেলল। সাথে সাথে অনলাইনে।

শিহাব-হাদি লোকজনকে পাশ কাটাতে কাটাতে গ্যারেজ হয়ে বস্তির সামনে যায়। কয়েকটা দোকানের সামনে লোকজনের জটলা। তারা দোকানের টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখছে। হারুন-মাসুদ তাদের সামনেই একটা কাঠের বেঞ্চে বসে চা খেতে খেতে সিগারেট টানছে।

এখানে দাঁড়িয়ে হাদি কিছু বুঝতে পারল না। তিন মিনিট পরে তারা রেললাইনের পাশ দিয়ে পা বাড়ায়। গৃহবর্জ্য ঘাঁটতে ঘাঁটতে দক্ষিণ দিকে যায় আর আশপাশে চায়। ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে সাঁতার কাটার মতো। হাদির নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে নাকে রুমাল চেপে জোরে জোরে নিশ্বাস নেয় আর হাঁ করে সশব্দে শ্বাস ছাড়ে। “তুই ত অসুস্থ হয়ে যাবি,” শিহাব তার হাত ধরল। “তুই বাসায় ফিরে যা। আমি খুঁজে দেখি!”

তাই কি হয় নাকি, হাদি বলে না। সে শুধু শিহাবের হাত চেপে ধরে। তারপর জোরে হেঁটে আরো একটু সামনে একটা আলোকদ্বীপের দিকে চায় যেখান থেকে গান ভেসে আসছে। “ওখানে বোধহয় কনসার্ট হচ্ছে,” বলল সে। “চল দেখি, ওখানে একটু যাই।”

রেললাইনের পাশে মহল্লার একদল তরুণ ব্যান্ড সংগীতের আয়োজন করেছে। শ খানেক কিশোর-তরুণ ছোট একটা কাঠের মঞ্চ ঘিরে জটলা করছে। যেন ধূলিসাগরের তলদেশে একদল দ্বিপদ জলজ প্রাণী। এক তরুণী গান করছে। মাঝখানে ‘তুমি যদি’ শব্দ দুটির ওপর জোর দিলে সবাই হররা করে উঠল।

হাদি-শিহাব ভিড়ের মধ্যে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আরো সামনের দিকে পা বাড়ায়। “এই শহরের কোথাও কোনো ছন্দ নেই,” শিহাব বলল, “কোথাও কোনো রকম ডিসিপ্লিন নেই। হ-য-ব-র-ল বলতে যা বোঝায় তা আছে পুরোপুরি।”

হাদি চুপ। ‘ঢাকার মহল্লা’ নামে একটা লেখার কথা মনে পড়ে তার। ‘সব মহল্লা ইঁদুর উৎপাদনের খামারে পরিণত হয়েছে। বিষাক্ত ধুলো আর ধোঁয়ায় কাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। ঘরে ঘরে শিশুরা অসুস্থ। নারীরা নিজেদের জেলখানায় বন্দি। পুরুষেরা কাজ করতে করতে দিন-রাতের পার্থক্য ভুলে যাচ্ছে—!’

কেন?

হাদি ইন্টারনেটে ঢুকে ‘ঢাকার সমস্যা ও সমাধান’ লিখে সার্চ দিল।

প্রকৃত কারণ খুঁজে পেতে পড়া লাগে অনেক। একটা পড়তে পড়তে আরো অনেক অজানা বিষয়, জটিল সমস্যা হাজির হচ্ছে। হাদির খাওয়ার সময় নেই। নাওয়ার সময় নেই। কিন্তু পড়তে পড়তে দেখা যাচ্ছে, সমস্যা একটা না। চলে আসছে সরকার, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, আন্দোলন, বিপ্লব, ইত্যাদি।

হাদি সব আজই জেনে ফেলতে চায়। আর সে ঠিক করতে চায় সে কি আন্দোলন করবে নাকি বিপ্লব। গণ-আন্দোলন বেটার। অধিক ফলপ্রসূ। বিপ্লবে স্বপ্ন আছে। স্বপ্নের গাছে ফল ধরার নিশ্চয়তা নেই।

‘সবার আগে দিশুকে খুঁজতে হবে,’ হাদি মনে মনে কথা বলছে। ‘দিশু তুই কই। আমরা তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। মা কাঁদছে। শিগ্‌গির ফিরে আয়, ভাইয়া। শিগ্‌গিরই আমরা সব মহল্লায় পুকুর চাই আন্দোলন রাস্তায় নিয়ে আসব!’

আর খেলার মাঠটা যে ওরা নষ্ট করে ফেলল!

তাহলে মাঠ আর পুকুর চাই আন্দোলন, হুম?

হুম!

বড়োরা সবকিছু নষ্ট করে ফেলে কেন, ভাইয়া?

“হ্যালো! হ্যালোও! হ্যালোওও!” হাদির মুঠোফোনে রিং হচ্ছে। তার বাবা কল করছে।

হাদি কল রিসিভ করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “বাবা, তুমি কই?”

বায়ান্ন বছর বয়সী বাবা জালাল উদ্দিন এই মুহূর্তে উত্তরায় বিমানবন্দরের জ্যামটা পার হওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে। বাস যখনই জ্যামে পড়ে তখনই নেমে দৌড়ায়। জ্যাম কেটে গেলে আবার লাফ দিয়ে আরেকটা বাসে ওঠে। এভাবেই চন্দ্রা, চৌরাস্তা, আর টঙ্গীর জ্যামটা সফলভাবে পার হয়ে এসেছে। বিমানবন্দরের জ্যামটা কেটে গেলে আর থাকল বনানি। ‘মাত্র ৫০ কিলো পথ তিন ঘণ্টায় যেতে পারছি না! জীবন আর চলে না!’ সে আপন মনে বিড়বিড় করে।

“হা, বাবা!” হাদি বলল। তার গলা কাঁপছে। কান্না সামলানোর চেষ্টা করছে।


কী ভয়ানক সিস্টেম গড়ে উঠেছে! নগর আন্দোলনে এসব আনতে হবে। গোটা সোশ্যাল সিস্টেমই বদলে ফেলতে হবে।


বাবা হাঁপাতে হাঁপাতে দোড়োচ্ছে আর রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে। দিশু কি সত্যি সত্যি নাই হয়ে যাবে? বাবার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে কান্না উঠে আসছে। কিন্তু কিশোর ছেলের সামনে সে কান্দে কী করে। আত্মসংবরণ করে বলল, “আমি আসছি, বাবা।” তারপর সে আরো আধাঘণ্টায় বনানি পৌঁছায়। এখানে শুরু হয়েছে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকে যত ভেতরে যাবে জট তত বাড়বে। বাবা আর বাসে বসে থাকতে পারে না। রেললাইন ধরে হাঁটলে বাসের আগে যেতে পারবে। আর মাঝে মাঝে দোড়োলে যেতে পারবে আরো একটু আগে।

রাত এগারটা নাগাদ বাসা থেকে বারবার ফোন আসতে থাকায় হাদির বন্ধুরা বিব্রত হয়ে পড়ল। তারা মসজিদ মোড়ে মুদি দোকানটার কোনায় দাঁড়িয়ে উশখুশ করে।

যে শিহাব সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন, সক্রিয় ছিল, তার বাবা এসে সবাইকে বোঝাল, “তুমরা এভাবে খুঁজে কোনো লাভ নেই!” সে দিশুর বাবা-মাকে বলল, “এখন র‌্যাব-পুলিশকে ভালো মতো ধরা যায় কিনা তাই দেখেন।”

কথা যুক্তিসংগত। শেলি বালকদের বলল, “তুমরা থেকে কীবা করবা, বাবারা। তুমরা বাসায় যাও।” বালকরা চলে গেলে সে হাদিকে বলল বাসায় গিয়ে খেয়ে নিতে। কিন্তু হাদি মুদি দোকানের সিঁড়ির ওপর বসল। দিশুকে রেখে সে কিভাবে বাসায় ফেরে। তার আরো মন খারাপ হয় যে, এই বিপদে তাদের প্রতিবেশীরা কেউ পাশে নেই। থাকার কথাও না। ভোর সকাল থেকে রাত দুপুর পর্যন্ত কাজ করতে করতে সবাই কাহিল। তারা নিজেরা বিপদে পড়তে পারে তা তারা জানে। সেই দুশ্চিন্তার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘুমাতে যায়। এখন না ঘুমালে সকালে আর কাজ করতে পারবে না। তখন তাদের সবকিছু অচল হয়ে যাবে।

একদিন কাজ না করলে সব অচল হয়ে যায়! কী ভয়ানক সিস্টেম গড়ে উঠেছে! নগর আন্দোলনে এসব আনতে হবে। গোটা সোশ্যাল সিস্টেমই বদলে ফেলতে হবে। সেক্ষেত্রে আবার…অর্থপদ্ধতি বা বণ্টননীতি হলো… হাদি ওসব আর মনে করতে পারছে না। দিশুর কান্না ভেসে আসছে তার কানের মধ্যে। আম্মু-উ-উ! ভাইয়া-আ-আ! দিশু আলনার ওপর উঠে পড়ি পড়ি করছে। সেটা অবশ্য বছর ছয়েক আগের কথা। হাদির হঠাৎ মনে পড়ল।


৫ পর্বের লিংক 

তারেক খান

তারেক খান

জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫; নড়াইল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : নাকশী হাইস্কুল,...বিস্তারিত