১ পর্বের লিংক
পর্ব- ২
দুপুরে আমি বিছানায় অলস গড়াগড়ি করছিলাম। বড় আপা ঝড়ের মতো এল তার দুই পিচ্চি বিচ্ছু নিয়ে। বিচ্ছু দুইটা সারাবাড়ি কোলাহল করে তন্ন তন্ন করতে লাগল। ভাবখানা এমন যেন তারা গুরুতর কিছু খুঁজে বের করতে চায়। তড়িঘড়ি।
আর বড় আপা ধরল আমাকে, ‘তুই কে রে?’
‘মানে কী?’ আমি হেসে উঠলাম। কিন্তু সে বলল, ‘হাসতে হবে না। কে তুই আগে তাই বল।’
বড় আপা সিরিয়াস। কী বলি। মুখ ভার করে বললাম, ‘জানি না।’
এবার আপা ধরল রুজানাকে, ‘শুনলাম তুই নাকি খুব মজেছিস।’ আমাকে একবার বাঁকাচোখে দেখে নিয়ে আবার রুজানাকে বলল, ‘বাপ বলিস, চাচা বলিস, ভাই বলিস, হাজবেন্ড বলিস, সব রসুনের এক পাছা, বুঝলি? যা বললাম মনে রাখিস, কাজে লাগবে।’
বাপকে বাড়ি ঢুকতে দেখে বড় আপা তার কথাগুলো আবার এবং আরো জোরে বলতে লাগল, ‘বাপ বলিস আর—।’
‘এই আপা, তুমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?’
বাপ বাড়ি ঢুকে থ হয়ে দাঁড়াল। তার মুখ দেখে বুঝতে পারি ইতোমধ্যেই কিছু একটা ঘোঁট পাকাইছে।
শুনেছি মেয়েরা নাকি অবহেলা একদম সহ্য করতে পারে না।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বড় আপা এমনভাবে বাপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল যেন এখনই ফেটে পড়বে। কিন্তু কিছুই না বলে যেমন ঝড়ের মতো এসেছিল তেমনি ঝড়ের মতো চলে গেল। বাপ-মা বা রুজানারা কেউ তাকে ঠেকাতে পারল না।
আমি তাজ্জব হয়ে ভাবি, বড় আপা বাপের সামনে গিয়ে এমন রুদ্রমূর্তি হয়ে দাঁড়াল কিভাবে। আগে ত সে এমন ছিল না। একটু বেশি মেজাজ ছিল, এই যা। কোন পরিস্থিতি তাকে এমন বিদ্রোহী করে তুলল।
আমিও বড় আপাকে ঠেকাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু সে এমন ঘেন্না ভরে হাত ছুড়ল যে আমি একেবারে হতভম্ব। ঘণ্টা খানেক পরে রুজানাকে জিজ্ঞেস করি। মাকে জিজ্ঞেস করি।
কেউ কিছু জানে না।
বড় আপা নাকি মাঝে মাঝেই এমনটা করছে তিনচার বছর ধরে। পাড়ার লোকে বলে হিস্টিরিয়া।
বড় আপা আমার চেয়ে মোটে বছর তিনেকের বড় কিন্তু ছেলেবেলা তাকে ছাড়া আমার চলতই না।
আমার কান্না পাচ্ছে। রাতেও মন খারাপ থাকায় খাবারে ভক্তি হলো না। কিন্তু রুজানার চোখ এড়ায় না, আমি কতটুকু কী খাই কি খাই না।
‘কী ব্যাপার, খাচ্ছেন না যে—?’
আমি চুপ। আমার ত এখন খুব মন খারাপ, তাই না? বড় আপার কী হয়েছে তা আমাকে জানতেই হবে। কালই। আমি গিয়ে সোজা তার পা জড়িয়ে ধরে বলব, ‘আমাকে মাফ করে দাও।’ যদিও আমি নিশ্চিত না আমি কী অন্যায়টা করেছি।
বারো বছর যোগাযোগ না রাখাটাই ত বড় অন্যায়।
তা ঠিক। আমি কেমন করে এমন নিষ্ঠুর হলাম।
ঢাকার ধুলো আর ধোঁয়ার মধ্যে এসি গাড়িতে ডুবোজাহাজের মতো চলার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে ছিলাম?
‘শরীর খারাপ হলো নাকি?’ রুজানা আমার দিকে চেয়ে চিন্তিত, বিচলিত।
আমি চুপ।
রুজানা মন খারাপ করে ফিরে গেল।
আমি আরো দুই দিন বোবা থাকলে রুজানা অস্থির হয়ে যায়। তার বুকের ভিতর থরথর করছে, আমি নিশ্চিত। যে প্রায় অর্ধযুগ ধরে আমার পথ চেয়ে, অবশ্য সে এও বলে, আমি যেদিন ঢাকা গেলাম সেদিনের কথা তার খুব মনে আছে। তারপর থেকে সে নাকি একদিনের জন্যও আমার কথা ভোলে নাই। তাই যদি হয় তাহলে ত পুরো একযুগ। আর যে আমাকে এত আদর-যত্ন করছে, সময় মতো আমার পছন্দসই খাবার-দাবার ইত্যাদির ব্যবস্থা করছে, তাকে আমি এভাবে অবহেলা করলে তার ত মরমে মরে যাবার কথা। শুনেছি মেয়েরা নাকি অবহেলা একদম সহ্য করতে পারে না।
‘সব সময় পূজা চায়?’
‘পুরুষেরা তাদের ভোগও করে আবার পূজারিনি বলে নিন্দেও করে।’
‘ভোগে বাধা দেয় বলে?’
রাত দশটায় আমি ট্যাংরা মাছ আর বেগুন চচ্চড়ি দিয়ে জিরা ধানের ভাত খাচ্ছি আর রুজানা মলিন মুখে দাঁড়িয়ে। কামিজের কোনা খুটছে। ওর প্রতি এখন আমার সহৃদয় না হোক, অন্তত সদয় হওয়া উচিত। কিন্তু আমার বরং রাগ হচ্ছে। মনও খারাপ বটে। কিন্তু এই প্রিয় খাবারটা খেতে খেতে আমি ওকে অবহেলা করি কী করে। আমার লোভনীয় শিং মাগুর কৈ শোল বাচা ট্যাংরা। এর যেকোনো অন্তত একটা একেক বেলা। এসব কেবল দুপুর বারোটার আগে হাটে গিয়ে বসে থাকলে তবেই কালেভদ্রে পাওয়া যায়। সব হাটে সব দিন এসব ওঠেও না। আবার উঠলেও সাথে সাথে উধাও। রুজানার তদারকে উধাও হবার আগেই তার চাকর-বাকররা ধরে ফেলে।
‘কিন্তু কেন এ অবস্থা?’
‘এসব মাছের যে উৎস, মিঠাপানি, ডোবানালা, মানুষ অজস্র জন্ম দিয়ে দিয়ে সবাই মিলে সেসব রাক্ষসের মতো খেয়ে ফেলেছে। তবু তারা আরো জন্ম দেওয়ার নেশায় মত্ত হয়ে আছে।”
‘তারা কি অন্ধ হয়ে গেছে?’
‘না। তারা তাদের বুড়োকালের অবলম্বন সৃষ্টি করছে। আর তাদের জন্য রেখে যাচ্ছে খামারে বিষাক্ত খাবার উৎপাদনের প্রযুক্তি।’
হঠাৎ মনে হলো, রুজানাকে দিয়েই আমি আমার বাপকে মহাজনি বদনাম থেকে রক্ষা করতে পারি। যেহেতু বাপ তাকে আমল দেয়। সেক্ষেত্রে আমার ত হাল ছাড়লে চলবে না। শক্ত হয়ে বোঝাতে হবে যে সে খুব জঘন্য একটা কাজের মধ্যে আছে।
আমি রুজানার দিকে তাকালাম। মাথাটা সামনে ঝুঁকে পড়েছে। চোখ থেকে পানি পড়ছে? তা পড়ুক। কিন্তু সে সম্ভাবনা ক্ষীণ।
‘আমি ভাবতাম যে মহাজনি ব্যবসা বোধহয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এখন দেখছি যে মেয়েরা পর্যন্ত সেখানে আরো ভয়ানক উত্তরসূরি হয়ে আসছে। কী জঘন্য!’ জঘন্য শব্দটা এমন করে বললাম যেন ওর মুখের মধ্যে ঘেন্না ঢেলে দিলাম।
কি ন তু। ও এ কী বলে—! ‘আপনার ধারণা ঠিক না।’
মুখও তুলল দেখছি। একেবারে আমার মুখোমুখি। উমা, এ কী। এই মুখে ত মন খারাপের বালাই নাই। বলে কিনা, ‘মহাজন এখনও অনেক আছে এবং অনেক মহিলা-মহাজনও আছে। প্রায় সব গ্রামের সব পাড়ায় আছে।’
তা থাক। আমি যেভাবে বলেছি তাতে ত তার মরমে মরে যাবার কথা। আমি তার মুখের দিকে অবাক তাকিয়ে। আমার গা-রিরি করা ঘেন্না তাকে একটা ধাক্কা দিলেও তা সামলে উঠেছে।
‘আসলে কি আপনি আমাদের লেটেস্ট অ্যাক্টিভিটিজ অ্যান্ড স্ট্রাটেজিস সম্পর্কে কিছু জানেন?’ বলল সে।
এমন খটোমটো শব্দ তাহলে গ্রামেও এসে পড়েছে!
আমার মুখ ভার হলো। কিন্তু ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখি হাসি হাসি ভাব।
‘আমি এ কদিন চিন্তা করে দেখলাম যে আসলে আপনি ত আমাদের সম্পর্কে কিছু জানেন না। আমি যেসব চিঠিপত্র পাঠাইছিলাম সেসব কিছু পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে না।’
মানে কী। আমার তীব্র ঘেন্না তাকে একটু ধাক্কাও দেয় নি? এ কদিন সে দুঃখিত না হয়ে থেকে শুধু চিন্তা করেছে?
‘যা হোক। আগে আমাদের বিষয়টা আপনার ঠিকঠাক জানা দরকার। যেমন, আমরা এখন এনজিওর চাইতে কম সুদ নিই। আবার কেউ ঋণ নিয়ে মরে গেলে আমরা তা মাফও করে দিই। অবশ্য দুএকটা এনজিওও তা করে। তবে সেজন্য তারা আবার বিমার প্রিমিয়াম নেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সারা বছরের সুদ মাফ করি শুধু আমরাই। কোনো ব্যাংক বা এনজিও তা করে না। আমরা কাগজে হিসেব রাখি, অন্য মহাজনরা তা রাখে না। আমরা তিন বছর পর্যন্ত চক্রবৃদ্ধি সুদ ধরি না।—অতীতে এসব ছিল না বটে, কিন্তু এখন ত আমরা প্রতিনিয়তই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যাতে এটা অত্যাচারের মধ্যে না পড়ে!’
মাল ত আসলেই সাংঘাতিক। দেখা যাক আরো কী বলে।
ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল কিনা, ‘আপনি কী করতে এসেছেন? কে আপনাকে আসতে বলেছে?
‘নতুন করে আর ঋণ দিচ্ছি নে। পুরনো ঋণের টাকা ফেরত পেতে চেষ্টা চলছে। পেলেই সেটা দিয়ে জমি বন্ধক নিচ্ছি। সেই জমি আবার অগ্রিম নিয়ে অন্যের কাছে বছরচুক্তি লিজ দিচ্ছি। এতে সুদের চেয়ে বেশি লাভ হচ্ছে আবার আদায়ও শতভাগ আবার বদনামও হচ্ছে না—।’
‘এ ত আরো ভয়ানক!’ আমি চোখ উলটে তাকালাম, ‘এসব বুদ্ধি তোর না তোর চাচার?’
রুজানা বেটাদের মতো হাহা করছে আর বলছে, ‘মানিকে মানিক চেনে, জানেন ত—।’
‘মানে কী?’
‘চাচাও যা আমিও তা।’
আমার ভালো লাগছে না। ‘তুই এখন যা।’ কিন্তু মা যে এনজিওর কথা বলল, রুজানা ত সেসব কিছু বলল না। সে বরং মন খারাপ করে চলে গেল। তবে পরদিন সকালে আবার আসে। বলে কিনা, আমি যদি বলি ত সে এসব বাদ দেয়।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আমি বললেই বাদ দিবি?’
‘হুঁ!’
‘আমি কে?’ আমি তার মুখের দিকে চেয়ে। তার নির্লিপ্ত পটলচেরা চোখ। করুণ হলে ভাবতে পারতাম, হয়তো এখন তার মনের মধ্যে গুনগুন করছে ‘তুমি যে কে আমার—’ অথবা হাসি হাসি ভাব থাকলে মনে করতে পারতাম যে সে দেখছে আমি কী বলি।
আমি কিছু বুঝতে পারি নে বলে (?) যেমন বিরক্ত হই তেমনি আমার কণ্ঠ রুক্ষ হয়ে ওঠে। তীব্র স্বরে বলে ফেলি, ‘আমি কে?’ তারপর আরো জোরে বলি, ‘কে আমি?’ আর অমনি সেও—ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল কিনা, ‘আপনি কী করতে এসেছেন? কে আপনাকে আসতে বলেছে?’ এখানে থামলে ত চলত। এরপর সে আরো জোরে চিল্লিয়ে কী বলল? ‘চলে যান। আজই চলে যান। এক্ষুনি চলে যান।’
আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। সে আমাকে আমার বাপের বাড়ি থেকে চলে যেতে বলল। তার চিল্লানি শুনে আমার মা-বাপ ছুটে আসে। পাড়ার লোকজন পর্যন্ত আসছে। আর আমি ত থ। হাঁটুভাঙা দ—।
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সে ত বলতে পারত যে ‘আপনার বাপের ব্যবসা কিন্তু বাপ যেহেতু খবর রাখে না সেহেতু আপনি বাদ বললেই ত বাদ হয়ে যায়।’ তা না—। বলে কিনা—। এত অধিকার সে কই পাইছে যে—। হয়তো তার মনের মধ্যে গুনগুন করছে ‘তুমি যে কে আমার—’। তা হোক। ‘আমি চলে যাব।’ সত্যি সত্যি চলে যাব। ‘আজই চলে যাব। এক্ষুনি চলে যাব।’
আমি তৈরি হচ্ছি ঝটপট। এই যে ব্যাগ, এই যে প্যান্ট, শার্ট, এই যে আমি একজন মার্কেটিং অফিসার, ছুটছি অবিরাম। ‘হন্যে কুত্তার মতো।’
‘না, সফল মার্কেটিং অফিসারের মতো। আগামী বিশ বছরে বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়িতে রড-সিমেন্ট পৌঁছে দেবার মহান দায়িত্বপালনকারীর মতো।’ ধানফুল মার্কেটিং লিমিটেডের সিইও বিনয়ী আলি আশরাফ আমার চোখের সামনে। তার মিষ্টি কণ্ঠ প্রতিনিয়ত, ‘এটা না করে তুমি কি অফিসের চিফ ক্লার্ক হতে চাও?’
না। আমি বুনো বনের বাঁদর হতে চেয়েছিলাম। এখন আবার ঢাকায় গিয়ে কী করব জানি না। এই যে আমার বেল্ট, এই যে লুঙ্গি—কি ন তু—আমার হাত থেমে যাচ্ছে কেন। ঢাকা হলো ইঁদুরের স্বর্গরাজ্য। আমি একটা ইঁদুর হয়ে—। ওখানে গিয়ে আমি একটা দারুণ ইঁদুর হয়ে—।
বাপ বারান্দায় রুজানাকে কী পড়াচ্ছে? মা আমার দিকে করুণ চোখে চেয়ে আছে।
মাকে আমি কী বলি। ‘আমি বাড়ি বসে কী করব?’
মা চুপ। বাড়ি এসেছি ধরে দেখছি, মাকে কেমন যেন বোকা বোকা লাগছে। আগে ত এমন ছিল না। হয়তো আগেও এমন ছিল। আমি আরো বোকা ছিলাম। আমার এখন তারচেয়ে বেশি বুদ্ধি হয়েছে?
‘তা এই দুফোরে তুমি কুহানে যাবা? ঢাকার গাড়ি ত রাত্তিরি ছাড়ে।’
তা ত। তাহলে আমি এখন কী করব। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বসে থাকব? তারপর ঢাকায় গিয়ে আমি কী করব।
বাপ এসে মাকে ডেকে নিল।
আমি কি রুজানার সাথে রাগ করেই চলে যাচ্ছি নাকি।
তুমি হয়তো হনুমান হয়ে, শাখামৃগ হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারছ না বলেই চলে যাচ্ছ।
মা আবার ফিরে এল। কী বলে শোনা যাক।
‘বাচ্চা ঝিপুত না বুঝে কী কইছে তাতে অমন রাগ করলি হয় নাকি।’
রুজানা এখনও সেই বাচ্চা ঝিপুতটাই আছে? আমার চাচা-চাচি নৌকা ডুবে মরে গেলে ও আমার বাপ-মার ছোট্ট ঝিপুতটা হয়ে গেল।
‘এভাবে ওর সাথে রাগ করে চলে গেলে বোকামি হয়ে যাবে না?’ মা হাসছে। মা তাহলে অতটা বোকা না। আমি বড় হইছি বলে—আমাকে বুদ্ধিমান ভেবে (?)—আমার সামনে বোকা হবার ভান করে?
আমি ভাবছিলাম রুজানা অন্তত দুই দিন আর আমার সাথে কথা বলবে না। উমা, মাত্র ঘণ্টাকয় পরেই, সন্ধেয় আমার চা খাবার সময় হাজির। অবশ্য নিতান্তই একটা সাদা হাসি দিয়ে ‘সরি’ বলে চলে যায়। আর এই প্রথম, রাতে খাবার সময় আর এল না। আমি ভাবলাম নিতান্তই ‘সরি’ বলাটা কর্তব্য মনে করেছিল। কিন্তু সকালে দেখি সকালটা অন্য সকালের মতো। বলে কিনা, ‘আমি বললাম আর অমনি আপনি চলে যাবেন?’
আমি ত চুপ। রুজানা একেবারে খলখল করে উঠল, ‘আমি কে? কে আমি?’
‘কিরে বাবা, এত হাসির কী হলো?’ আমি একটু একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠছি নাকি?
‘ওকে বাবা ওকে, আর হাসছি নে।’ রুজানা মুখ চেপে ধরে কিন্তু প্রাণের হাসি কি আর হাত চেপে ঠেকানো যায়। হাত গলে বেরিয়ে পড়ল।
তারপর সে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসঙ্গ পাড়ে। সে না থাকলে আমার বাপ এতদিন সব ছেড়ে দিত। একবার নাকি বাপ সব দলিলপত্তর-টাকাপয়সা উঠোনে ফেলে দিয়ে বাড়ি ছেড়েই চলে গেছিল যে এসব দিয়ে কী হবে।
রুজানা বলল, ‘এখন আপনি আপনার সবকিছু বুঝেশুনে নিয়ে আমাকে খেমা দেন।’
‘ত এসব আমার হবে ক্যা। এসব ত বাপের।’
‘আপনার বাপের মানে আপনার না বুঝি?’
‘আমার হলে ত তোরও। তুই ঠেকায় রাখছিস।’
রুজানা চোখ বড় করে তাকাল। খানিক পরে দীর্ঘশ্বাস। ‘নিজের বাপের সম্পত্তি তাই মেয়েরা সব পায় না, আর ত—।’
আমি চেপে গেলাম। কিন্তু রুজানা ফুরফুর করে বলল, ‘একটা বিষয় মনে পড়ল, আইন তৈরির আইন কী?’
রুজানার চোখের দিকে তাকালাম বোঝার জন্য। কিন্তু সাংঘাতিক মেয়ের সম্পর্কে কিছু ধারণা করা ত সাংঘাতিক ব্যাপার।
আমিও ফুরফুর করে বললাম, ‘আইন নিজেই ত আইন। তার আবার—!’ কিন্তু কথা শেষ করলাম না। ঠাস করে মনে হলো এটা একটা সাংঘাতিক প্রশ্ন। মজা করে বললাম, ‘তা হঠাৎ করে আইন খটখটি শুরু হলো কেন?’
‘বড় আপা মনে হয় এসব নিয়ে খুব ভাবে।’ রুজানা আমার চোখের দিকে তাকাল। ক্যামেরার ক্লিকের মতো। যদিও মজা করে হাসতে হাসতে বলল, ‘বড় আপা কী বলে জানেন? বাপের সম্পত্তিতে ভাইয়ের তুলনায় বোনের দ্বিগুণ অধিকার থাকা উচিত। হা হা হা।’
‘হা হা হা। দারুণ ব্যাপার ত। আমি ত জানতাম যে নারীরা সমান অধিকারের কথা বলে। কিন্তু দ্বিগুণ হবার কারণ কী?’
‘সেটাই ত আপনাকে জিগাচ্ছি। আইন তৈরির আইন কী?’
‘তা বড় আপা কী বলে?’
‘কিছু ত বলে না।’
‘বড় আপা মাঝে মাঝে যখন আসে তখন ঠিক কী বলে? বিশেষত টাকা-পয়সা, আইন, নারীদের অধিকার—এসব বিষয়ে কিছু বলে?’
‘সেটাই ত বুঝতে পারি নে।’
‘সে ত মানুষের ভাষায়ই কথা বলে, তাই না? কেবলই ত বললি যে—।’ আমার মনে হলো রুজানা সব জানে। ভাবলাম তাকে ভালো মতো চাপ দিলে জানা যাবে। কিন্তু সে এড়িয়ে যায়। বড় আপা নাকি পরিষ্কার কিছু বলে না।
‘শুধুই ক্ষোভ ঝাড়ে?’
‘ঠিক তাই।’
‘কিসের ক্ষোভ? কেনই-বা?’
‘বললাম ত যে পরিষ্কার কিছু বলে না। তবে বছর দুই আগে বুটিক ব্যবসার জন্য চাচার কাছে টাকা চাইছিল। চাচা দেয় নি। কিন্তু তারপর ত তাকে শান্তই দেখতাম। বছর খানেক আগে থেকে শুধুই ক্ষোভ ঝাড়ে।’
আমার বিরক্তি লাগছে। রুজানার চোখের দিকে তাকালাম বোঝার জন্য। কিন্তু সাংঘাতিক মেয়ের সম্পর্কে কিছু ধারণা করা ত সাংঘাতিক ব্যাপার। পাড়ার লোক ঠিকই বলে, এমন মেয়ে নাকি তারা জনমে দেখে নাই।
‘শ্বশুরবাড়ির সাথে বড় আপার সম্পর্ক কেমন?’
‘ভালো বলেই ত মনে হয়।’
‘আর দুলাভাইর সাথে?’
‘দুলাভাইকে বাইরে থেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হয় কিন্তু বড় আপা মনে হয় দুলাভাইর সাথে কথা বলতে চায় না। মুখ ভার করে দুএকটা কথা বলতে দেখেছি। হুঁ, হ, না—এমন দুএকটা কথার বেশি বলে না হয়তো।’
আমি নড়েচড়ে বসলাম। ‘এটা ত স্বাভাবিক না। এখানে কিছু একটা আছে নিশ্চয়।’
রুজানা চুপ। আমার চোখের দিকে ক্যামেরার মতো চেয়ে। সে আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছে, আমি নিশ্চিত। আমি জিগালাম, ‘বড় আপা মেজাজ গরম, চিল্লাফাল্লা বা খিটিমিটি করে নাকি?’
‘না।’ রুজানার নিস্পৃহ কণ্ঠ।
আমি কিছু বুঝতে পারি নে বলে অস্বস্তি বাড়ে। তবে পরদিনই আমি বড় আপাকে বুটিক ব্যবসার জন্য টাকা দিতে গেলাম। কিন্তু বড় আপা আমার টাকা নেওয়া ত দূরে, আমার সঙ্গে কোনো কথা পর্যন্ত বলল না। চুপচাপ শুধু খাবার বেড়ে দিল। এটা অসহনীয় কষ্টের। বড় আপাও এমন কোনো কষ্টের মধ্যে আছে, আমি নিশ্চিত। কী সেই কষ্ট? আমার জানা উচিত।