পর্ব- ৬
আমি বাড়ি আসার মাস খানেক পর এক সন্ধ্যায় গ্রামের বাজারে গেলাম।
আগেই শুনেছি দোকানে দোকানে রঙিন টিভি দেখতে দেখতে লোকজন চা-বিড়ি খায়।
কার দোকানে বসব ভাবার সময় আনোয়ার তার দোকান থেকে বের হলো। কারণটা অনুমান করে আমি কিঞ্চিৎ বিরক্ত। এর আগে একেবারে বাড়ি বয়ে বুঝিয়েছে, রুজানাকে আমার বাপ-মার খুব পছন্দ। নানাভাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছে, এটা হলে সত্যিই খুব ভালো হয়। কিন্তু আজ সে এ কী বলে, ‘কী চিন্তাভাবনা করলে বাপু। গ্রামে ত বদনাম হয়ে গেল।’
‘কেন, কী হয়েছে?’ আমি আকাশ থেকে পড়লে আনোয়ার ধরে ফেলল, ‘কী আর হবে। এক বাড়ি থাক। যহন-তহন মিলামিশা কর। লোকে দেখে না? কত জন কত কথা কয়।’
‘তাই নাকি?’
‘তা না ত কী? গ্রামের লোকজন ত মনেই করে যে তুমাগে ইয়ে হয়ে গেছে। কেবল ঘোষণাটা বাকি।’
আমি পাতালে চলে যাচ্ছি। ‘আমার কানে ত এমন কিছু আসে নি।’
‘তা তুমার কানে কীবা আসে।’
তবে ঠাস করে মনে হলো এটা আমার বাপের চালাকি। আনোয়ার আমার বদনাম নিয়ে কথা কবে বিশ্বাস হয় না। আমি নিজে ভোঁদাই হলেও বাপ ত মোড়ল। এত সাহস আনোয়ারের থাকার কথা না।
এসব ভাবনা বাদ দিয়ে ভোগে মন দাও। ভোগেই মুক্তি।
আমি এখন রুজানাকে ভোগ করতে যাব?
তারচেয়ে শিরিনা সহজ। সে না বলে না।
কিন্তু সে এটা চায় না।
“সত্যিই বাল তুমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। কে ‘না’ বলে আর কে ‘হ’ বলে তাতে তুমার কী। তুমি দেখ যে তুমি পাচ্ছ কিনা।”
নিউ ইয়র্ক থেকে শিমুলগাঁও অবধি সব জাগায় নারীরা সমান নির্যাতিত।
ত রুজানা ত আছেই। হোক সে অনেক দিন পরপর। হয় ত। এতদিন পরপর আমি খুশি না তা ত সে জানেই। নিশ্চয় আমাকে খুশি করার জন্য সে এটা করে না।
সে নিজেইবা এক-দেড় মাস পরপর খুশি হয় কিবায়।
তাহলে রুজানা এটা কেন করে। আবার মুখে এ প্রসঙ্গে একটা মুক্তধ্বনিও উচ্চারণ করে না। কেসটা কী। ইদানীং বরং বিয়েত সব মহিলার সাথে বেশিবেশি গপ্প করছে। গ্রাম ছাড়িয়ে পাশের গ্রামেও স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হলে সেখানে গিয়ে খুঁটেখুঁটে কথা বলছে। কী কথা শত চেষ্টায়ও কিছু জানা যাচ্ছে না। আমাকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছে না?
‘এসব আপনার ভালোা লাগবে না।’
‘আমার কী ভালো লাগবে কী খারাপ লাগবে তা ত আমি জানি, তাই না?’
‘আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি জানেন?’ রুজানা এমন ভঙ্গিতে বলে যেন আমি একটা গর্দভ, নাকি সে আমার আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দিতে চায়।
আমি তার ভঙ্গি দেখে চুপ মেরে থাকি। কিন্তু সে বলে, ‘সেদিন কি রফির পোয়াতি বউ সত্যি সত্যি খাট থেকে পড়ে গেছিল?’
তার প্রশ্নের ঢঙে আমি নিশ্চিত হতে পারি অন্য কিছু ঘটেছিল। সেটা আসলে কী এবং এখন কেন সে প্রসঙ্গ তা চিন্তা করে আমার বিরক্তি লাগছে।
‘রফির বউ নিজে যখন বলেছে যে পড়ে গেছিল তখন আমরা আর কী ভাবব?’
রুজানা মুখে খিল এঁটে দিল। প্রসঙ্গটা মাঠে মারা পড়লেও আমার আর কিছু করার নাই। কিন্তু আমার চিন্তা স্রোতের মতো এগিয়ে যাচ্ছে। বারবার রফির বউ রফির বউ করার নিশ্চয় একটা উদ্দেশ্য আছে। বিষয়টা খোলাসা করা জরুরি।
এ মুহূর্তে রুজানা তার অফিসে একা। একটা বইয়ের মধ্যে ডুবে আছে। কেউ না থাকলে হয় হিসেবের খাতা নয় বই তার সাথি। ইদানীং দেখি সব সময় গদ্যকাহিনি পড়ে। তাও আবার কী ধরনের কাহিনি? প্রেম, বিয়ে, দাম্পত্য, ইত্যাদি। নগ্ন জীবনের নানা রকম ফিরিস্তি। এসব পড়ে সে কী বুঝতে চায় কে জানে।
অনেক দিন হলো কথা বলতে হলে আমাকেই তার কাছে যেতে হচ্ছে। একটা চেয়ার টেনে সামনে ঝুঁকে বসলাম আর একটা হাসি।
‘রফির বউর আসলে কী হইছিল?’
‘ওসব জেনে আপনার কোনো লাভ নেই।’
‘কেন?’
‘আপনি বড়জোর একজন রফি বৈ ত না।’
কথাটা আমার চোখের ভেতর চক্কর দিয়ে উঠল। রফিকে সবাই সজ্জন ব্যক্তি বলেই জানে। হাইস্কুলের মাশটের হিসেবে সুনাম আছে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। আমিও সজ্জন বৈকি!
যাহোক। ‘বড় দুলোভাইও কি বড়জোর একজন রফি নাকি?’
রুজানা কড়াৎ করে তাকাল, আমি খেয়াল করলাম।
‘বড় আপার সমস্যা কিছু বুঝতে পারলি?’
‘বড় আপা তার সমস্যার সমাধান করে ফেলবে খুব শিগ্গিরই।’
‘সমস্যাটা কী?’
‘হিস্টিরিয়া!’ রুজানা যেন দাঁতে দাঁত চেপে বলল। কিসের ক্ষোভ তা আমার মাথায় ধরছে না। আমিও ওর শেষ দেখতে চাই। আমাকে মেজাজ দেখানোর মজা দেখাব। ‘বাপকে বলে দিছি আমি বিয়েতে রাজি আছি।’ আমার রাগ হতে লাগল।
রুজানা সাথে সাথে চোখ তুলল বটে, সেখানে বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ আমি ভেবেছিলাম সে একটা হাসি দেবে। ভেবেছিলাম সে মজা করে বলবে, পাত্রীটা কে। কিন্তু সে যেন একেবারে ভিজে গেল। এমন প্রতিক্রিয়ার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তবু বললাম, ‘কী ব্যাপার, কিছু বলার নাই?’
রুজানা চুপ।
‘সমস্যাটা কী? আমি ত জানতাম যে তুই রাজি আছিস। আসলে রাজি না থাকলে বল, আমি না করে দিচ্ছি।’
রুজানা উঠে দাঁড়িয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। তার ঠোঁট দুটো মৃদু কেঁপে উঠল। তার মানে সে কিছু বলতে চায় না। আমাকে কিছু বলা নিরর্থক?
রুজানা নিরিবিলি বের হয়ে যাচ্ছে অফিস থেকে। কথা বলার আর কোনো পরিবেশ নেই।
আমি কোথায় ভুল করছি। আমার কী করা উচিত। “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ...!” আমার কী জ্ঞান দরকার। আমার ত মাথায় কিছু ঢুকছে না।
এসব ছাইভস্ম চিন্তার কোনো মানে হয় না। এসব ছেড়েছুড়ে ঢাকা যাও।
আমাকে আরো বেশি করে বেচার কৌশল খুঁজতে হবে?
এই দুশ্চিন্তার মধ্যে শিরিনাকে দেখলাম ঘরের কোণে বসে চুপচাপ কাঁদছে। আমি বিস্মিত। শিরিনা কাঁদতে পারে তা যেন ভাবাও যায় না। যাহোক, কারণটা জিজ্ঞেস করতে হলো, ‘কী হয়েছে বল ত?’
খানিক চাপাচাপি করার পর শিরিনা বলল, ‘নিউ ইয়র্ক থেকে শিমুলগাঁও অবধি সব জাগায় নারীরা সমান নির্যাতিত। আমার ভালে লাগে না।’
আমার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এল। শিরিনার মনে এই বোধ কেন এল? তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরে। তার একটুও ভালো লাগে না, বলল সে। তার গলা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। তবে একটু পরে ওড়নায় চোখ মুছে গিটারে ধীরলয়ে টুংটাং শুরু করে। আর মুখে আবার সেই মৃদু মৃদু হাসি। মলিন হাসিটা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। একটু পরে নাচের টিচার এলে সেও বাচ্চাদের সাথে নাচ শেখে আর হাসতে হাসতে বলে, ‘হাত-পাউ শক্ত হয়ে গেছে। বুড়োকালে কি আর নাচ শেখা চলে। তবু যদি কিছুটা হয়। না হলে নাই।’
‘কিন্তু বুড়োকালে নাচ শেখার শখই-বা হলো কেন?’
‘বাঙালি একটা জড় জাতি। মজা করতে জানে না। খালি খায় আর করে।’
কিন্তু আমি ভাবছি নারী নির্যাতনের অনুভূতি ওর মধ্যে কেন এসেছে। আমি এর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। রুজানার মধ্যেও নিশ্চয়।
রুজানা তিনদিন অফিসে আসছে না। ঘর থেকেই বেরোচ্ছে না। বাপের মন খারাপ। মার মন খারাপ। মা-বাপ দুজনই সময়-অসময় তার ঘরে যাচ্ছে-আসছে। বাপ একা অফিস সামলাতে গিয়ে বিরক্ত। এ নিয়ে আমার কোনো বিকার নাই।
রুজানা রাজি হলে কি আমি তাকে সত্যি সত্যি বিয়ে করব নাকি।
আমি জানি না। আমি আমাকে চিনি না।
চারদিন পরে আমাকেই যেতে হলো রুজানার ঘরে। সৌজন্য বলে কথা। ‘আমি আর কোনো উৎপাত করব না, কথা দিলাম। আর যা করেছি তার জন্য লজ্জিত,’ বললাম অবনত হয়ে। কিন্তু রুজানা মুখ তুলে বলল, ‘আপনি কোনো দোষ করেন নাই।’
রুজানার চোখের নিচে কালি পড়েছে। চারদিনেই সে অনেকখানি শুকিয়ে গেছে।
‘কী হয়েছে শেয়ার করতে পারিস ত। আমি ত কোনো উপকারও করতে পারি, নাকি পারি নে?’
রুজানা মলিন হাসে কিন্তু চুপ। তার মানে আমি কোনো উপকার করতে পারি নে? তাহলে আমি এখন কী করব।
রুজানা আরো কদিন চুপ থাকে। তারপর শিরিনা তাকে সারিয়ে তুলল যেন, ‘তুমি এ রকম করে থাকলে আমার খুব মন খারাপ হয়। তুমিই ত বল, খাবার আর কাজের সাথে রাগারাগি নেই। তাহলে—!’
‘রাগ করি নাই।’
আমার হাজবেন্ড আমাকে রেপ করেছে।
‘মান করেছ?’ শিরিনা হেসে ফেলল। রুজানাও তড়িঘড়ি হাসে। ‘ওকে বাবা ওকে। কাল থেকে অফিস করব।’ রুজানা অনেক দিন পর হাসল বটে, অফিসও শুরু করল। কিন্তু আমি আরো চিন্তায় পড়ছি। ইদানীং আর বিরক্ত হচ্ছি না। শুধুই চিন্তা করছি। ভাবতে পারছি বিষয়টা বিয়েকেন্দ্রিক। কিন্তু শিরিনার নির্যাতনের বোধটা আবার গোলমাল পাকাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করতে পারি, ‘শিক্ষিত, প্রভাবশালী সমাজে নারীরা কিভাবে নির্যাতিত?’
ওরা কোনো উত্তর দিল না। আমারও ধারণায় আসছে না। তবু বললাম, ‘আমেরিকায় ত শুনি নারীরা স্বাধীন।’ কিন্তু শিরিনা বলল, ‘তাহলে শোনেন, আমেরিকার এক গপ্প কই। কদিন আগে এক নারী আদালতে গেছে ডিভোর্স চাইতে। ত আদালতের পুরুষ বিচারক তাকে কী বলল?’
‘কী বলল?’
“আপনি আপনার হাজবেন্ডকে ডিভোর্স দিতে চান কেন?”
‘ত—?’
‘আর বাদী নারী কী বলল? “আমার হাজবেন্ড আমাকে রেপ করেছে।” ব্যস। আদালতের পুরুষ বিচারক মুচকি হেসে আবেদন বাতিল করে দিল। আর পত্রিকাঅলারা সেই খবর এমন রসিয়ে ছাপল যেন খুব মজার বিষয়।’
আমি চমকে উঠলাম। ভাগ্যিস আমিও হাসতে গিয়েও চুপ থেকেছি। আমার বরং পত্রিকার অসংখ্য প্রতিবেদনের কথা মনে পড়ে। ‘নারীরা নাকি ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ না কিন্তু সেটা কি শতভাগ? শয়তান লোক সব জাগায় আছে কিন্তু সেটা কত ভাগ?’
‘শয়তান লোক নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?’ শিরিনা হাসছে। ওও কি রুজানার মতো বুদ্ধিমতী হয়ে যাচ্ছে নাকি।
আমার আবার বিরক্তি লাগছে। ‘নিউ ইয়র্ক থেকে শিমুলগাঁও অবধি নারীরা কিভাবে সমান নির্যাতিত, বল।’ আমি খানিক চাপ দিলাম। কিন্তু শিরিনা হাসে আর বলে, ‘ছেলেরা এটা এত বেশি চায় কেন?’
‘কিসের মধ্যে কী।’
‘মমতাজ তার চোদ্দতম সন্তানটি জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছিল।’
‘আবার কিসের মধ্যে কী। সে যাহোক, তোদের ত আর সে দুশ্চিন্তা নেই। এখনকার স্বাস্থ্যবিজ্ঞান—।’
‘শাজাহানের হেরেমে আরো অসংখ্য সুন্দরী ছিল।’
‘বেটা একটা লম্পট ছিল?’ শিরিনার উপর আমার আরো বেশি রাগ হতে লাগল। আমি কিছু বুঝতে পারছি নে বলে?
তবে।
ওরা কি নির্দিষ্ট কোনো লকহোলে চাবি ঘুরাচ্ছে নাকি তালা-চাবি ওলট-পালট করে ফেলেছে। ‘আচ্ছা বল ত তুই কোথায় নির্যাতিত হইছিস?’
‘আমি কি বলেছি যে আমি নির্যাতি হইছি?’
‘তাহলে এসব বলছিস কেন?’
‘আগেকার রাজারা একটা বউ প্রেগন্যান্ট হলে আরেকটা সুন্দরী ধরে এনে বউ বানাত, তাই না?’
‘এসব কেন বলছিস তাই আগে বল।’
‘কিন্তু অন্যদের একটা বউ নিয়েই খুশি থাকতে হয়।’
‘হা হা হা।’
হা হা করার আলাদা মাজেজা আছে তা ইদানীং বেশ বুঝি। কিন্তু এই মুহূর্তে শিরিনা রফির বউর কথা বললে আমার মাথা ঠান্ডা হয়ে গেল। যদিও শিরির চাবিটা ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছি না। আমি তাহলে কী করব। রফির বউ, বউটা রফির একটা, একমাত্র বউটা—। সে কি তাহলে মধ্যরাতে সত্যি সত্যি খাট থেকে পড়ে যায় নি?
‘একটা শিক্ষিত, স্মার্ট তরুণী মধ্যরাতে খাট থেকে এমনি এমনি পড়ে গেল?’
আমি চুপ।
‘এবং ঘটনাটা কখন ঘটল?’
‘কখন?’
‘রফি যখন বাজারে আড্ডা দিয়ে রাত বারটায় বাড়ি ফিরল, তারপর।’
‘মানে কী—?’ আমার গলা কেঁপে ওঠে আর শিরি আমার চোখের দিকে অপলক চেয়ে। আমার মাথা সত্যি সত্যি ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। আমি কি ওদের সঙ্গলোভ ত্যাগ করে আবার একা হয়ে যাব নাকি।
‘রফির আরেকটা বউ থাকলে নিশ্চয় ওই বউটাকে খাট থেকে পড়তে হতো না,’ শিরি মোটা স্বরে হাসে আর বলে, ‘অবশ্য সেই বউটাও প্রেগন্যান্ট হলে কী হতো তা আর জানা যাচ্ছে না। সবাই ত আর রাজা না যে ইচ্ছে করলেই একের পর এক নতুন বউ ধরে নিতে পারে।’
‘রফির বউ তার হাজবেন্ডকে রেপ করতে বাধা দিয়েছিল?’
শিরি চুপ।
‘এ কারণে সে তাকে খাট থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল?’
শিরি চুপ।
সবাই কি রফি নাকি? কিন্তু আমার কথায় কেউ কান দেয় না।
তাহলে কী দাঁড়াল?
ভাবা যাক। আমাকে আরো ভাবতে হবে। নারীবাদী চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকায় রফির বউ হয়তো ওদের একটা শক্ত ধাক্কা দিয়েছে। এটা বিশেষ দুশ্চিন্তার কিছু না।
ভাবতে হলে কি চার দেয়ালে আটকা পড়তে হয় নাকি।
আমি কি তাই পড়েছি নাকি।
তা না ত কী। সারাদিন খালি পায়চারি। দুপুর হয়ে গেল, এখনও সকালের নাশতা খাও নি।
তা ত। এখনই খেতে হবে।
মা কতবার ডাকল শুনতে পাও নি?
পায়চারি বাড়ছে। রুজানাকে কিছু জিজ্ঞেস করা যায় না? এসব ছাইভস্ম বাদ দিয়ে মার্কেটিংয়ের প্রসঙ্গ তোলা যাক। যদিও সেটা খুব কঠিন। সে যেভাবে গদ্যকাহিনির মধ্যে ডুবে আছে। তবু। ‘কী ব্যাপার, ইদানীং মার্কেটিং ছেড়ে সাহিত্যভস্ম নিয়ে মজলি নাকি?’
রুজানা মজা পায়। সাহিত্যভস্ম তাকে মজা দেয়। হেসে হেসে বলে, ‘মানে কী—? সাহিত্যের ভস্ম নাকি যা সাহিত্য তাই ভস্ম?’
‘হবে একটা কিছু।’
‘সাহিত্য এসব ছাইভস্ম আবিষ্কার করতে শেখায় আর মার্কেটিং অফিসাররা বেচার ধান্দায় থাকে, তাই না?’
‘কী জানি কী। তা কী আবিষ্কার করতে শিখলি বল ত শুনি?’
‘শুনবেন?’ রুজানা একটা বই খুলে আমার দিকে ঝুঁকে বসল।
‘বল।’
‘না, থাক।’ বইটা আবার বুজিয়ে পিছনে ঝুঁকে চেয়ারে হেলান দিল।
কথা বলতে মজা লাগছিল কিন্তু আমি তার হাত থেকে বইটা টেনে নিতেই বিপত্তি। বইয়ের পাতা উলটে উলটে যেখানে মার্কার দিয়ে হাইলাইট করা সেখানে পড়তে শুরু করি নিজের অজানতেই। স্ত্রী গর্ভবতী হবার পর স্বামীর পরকীয়ার বর্ণনা।
নির্যাতন হয় সেটাই ত তারা আমলে নেয় না। তাকে বরং বিধান মেনে বৈধ বলে চালায়, অধিকার বলে গণ্য করে।
আমার বিরক্তি লাগে কিন্তু আরো কটা বইয়ের পাতা উলটাই। হাইলাইট করা অংশগুলো পড়ে দেখি। স্ত্রীর বয়স বাড়লে বা বিয়ের কিছুদিন পরে গৃহকর্মী, গণিকা, শালি, সহকর্মী—। আর স্ত্রীদের উপর দৈহিক নির্যাতনের বর্ণনা।
আবার আমার অস্বস্তি বাড়তে লাগল। তবু বললাম, ‘ত এখান থেকে তুই কী আবিষ্কার করলি তা ত বুঝলাম না।’
রুজানা চুপ। এই চুপ করার অভ্যাসটা ওর সাম্প্রতিক। কারণ কী। আমাকে বলে কোনো লাভ নাই?
আমাকে এখন হিসেব করে বের করতে হবে, রফির পোয়াতি বউকে যেদিন মধ্যরাতে হাসপাতালে যেতে হলো সেদিন হাসপাতালে গিয়ে তার সাথে অল্প একটু কথা বলার পর একটু একটু এবং হাসপাতাল থেকে যেদিন ফিরে এল সেদিন তার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলার পর রুজানা একেবারে চুপ মেরে গেল। তবু বলতে পারি, ‘সবাই কি রফি নাকি?’
‘ভাবছি,’ রুজানা ভাবছে।
‘মানে কী ?’
‘কোনো একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য সবার বেলা এক রকম হতে পারে না?’
‘যেমন—?’
‘সব প্রাণী গ্রহণ-বর্জন করে।’
‘কিন্তু রফিরা ত শুধু একটা প্রাণী না, রফিদের ত বুদ্ধি আছে।’
‘বুদ্ধির ত প্রকার আছে, নাকি নেই?’
‘ত—?’
‘বুদ্ধির একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য সবার বেলা এক রকম হতে পারে না?’
আমি তার মুখের দিকে অবাক তাকিয়ে।
‘ভুল বললাম নাকি?’
‘সবাই নির্যাতন করে?’
‘যাতে নির্যাতন হয় সেটাই ত তারা আমলে নেয় না। তাকে বরং বিধান মেনে বৈধ বলে চালায়, অধিকার বলে গণ্য করে। নিজেদের মহৎ করে তোলার জন্য আইন বানায়, সারাদিন আইন রক্ষায় কাজ করে, আর রাতে বাসায় ফিরে—!’ রুজানা থেমে গেল। আমার চোখের দিকে তার অবাক করা চোখ। ‘বাসায় ফিরে কী করে?’
রুজানা চুপ।
আমি যা ভাবছি সে তা-ই বলবে আমি নিশ্চিত, তবু তার মুখে শুনতে চাই। এতে সে হয়তো আমাকে শঠ ভাবছে। গাধা মনে করারও কারণ রয়েছে। তবু, ‘সমস্যাটা কী, নির্দিষ্ট করে বলবি ত।’
‘তাহলে কি আপনি তা সমাধান করে দেবেন নাকি?’ রুজানা হাসতে চেষ্টা করল কিন্তু সে যেন ইদানীং আর সহজে হাসতে পারে না।
আমি বললাম, প্রকৃত সমস্যা চেষ্টা থাকলে একদিন না একদিন সমাধান হবেই। সে আমিই করি আর যে-ই করুক।