পর্ব- ১
ঢাকায় বারো বছর ধরে ধুলো আর ধোঁয়া খেয়ে আমি আমার পৈতৃক বাড়িতে ফিরে গেলাম।
নড়াইলে নবগঙ্গার তীরে নলদি বাজারের কাছে যেখানে আমাদের বড় একটা বাড়ি আছে। আছে জমিও। কিন্তু বাড়ি আসার প্রথম দিনই আমার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল চাচাত রুজানা।
আমার মা-বাপ দুইজনই তার মহাভক্ত। কথায় কথায় রুজানা। সে ছাড়া যেন তাদের চলেই না।
বাপ-মার ওপর আমার রাগ হয়। আমি কি রুজানার জন্য বাড়ি এসেছি নাকি। কী আছে রুজানার মধ্যে?
বাড়িঘর দেখাশোনা, রান্নাবান্না ইত্যাদি সব তো দক্ষিণ পাড়ার বিধবা সাজেদাই করে। তার বেতনও কি কম। ঝাড়া চার হাজার টাকা মাস শেষে। সাথে খাওয়া-দাওয়া তো আছেই।
বাপ-মার ওপর থেকে আমার সব রাগ গিয়ে পড়ল রুজানার ওপর।
আমি ঘর থেকে বের হলাম। ওকে এখনই শায়েস্তা করব। দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে না। বারান্দা দিয়ে এগিয়ে রাস্তার পাশের ঘরটার দিকে তাকালাম। রুজানা টেবিলের ওপর ঝুঁকে খাতা-কলম নিয়ে ব্যস্ত। নাকি পড়ালেখার ভান করে সে আসলে আমারই ধ্যান করছে? না হলে কিসের লোভে সে বিয়ে না করে বসে বসে আইবুড়ো হচ্ছে, হুম?
আমি খুব মুড নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ঘরটার দুপাশে দেয়ালঘেঁষে দু'সারি চেয়ার আর গোটা দুই লম্বা টেবিল দেখা যাচ্ছে। কাল সারাদিন এখানে দুচারজন করে লোকজন আসতে দেখলাম। রুজানা তাদের সঙ্গে বকবক করল। শুনেছি বাপ নাকি এনজিও খুলেছে। সেসব হয়ে থাকবে।
‘এখানে কারা আসে সারা দিন?’
রুজানা খাতা থেকে মুখ তুলে একটা লাজুক হাসি দিল।
‘ব্যাংকগুলো কী করে? আশা, ব্র্যাক, ঠেঙ্গামারা, ইত্যাদি—এসব এনজিও কী করে? সবাই ত সুদের কারবারই করে, তাই না?’
আমি তার সামনের চেয়ারটায় বসতে পারি। টেবিলে ইংরেজি ভাষার বেশ কটা মার্কেটিংয়ের বই। সব দামি। এগুলো আমি চিনি। যেমন ঢাউস তেমনি নিখুঁত। তার চেয়ারের পাশে ছোট তাকে আরো অনেক বই। পাশেই একটা স্টিলের আলমারি। এতেও কি বই নাকি? আমার অস্বস্তি হয়। মার্কেটিংয়ে আমি অনেক দিন ছিলাম। বিষয়টা আমার একেবারে যেন শত্রু হয়ে গেছে।
আমি শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী পড়িস?’
রুজানা আবার একটা লাজুক হাসি দিল।
ওর হাসি দেখে আমারও হাসি পায়। আমিও হাসি। ‘কী ব্যাপার, তোর কি হাসিরোগ হয়েছে নাকি?’ বললাম বটে, আমার নিজের ওপরই রাগ হতে লাগল। আমি কি এখানে ওর সাথে হাসাহাসি করতে এসেছি নাকি।
আমি আপাতত উঠে পড়লাম। সামান্য একটা হাসিতে আমি ভুলে যেতে পারি না। ভাবলাম আপাতত অন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন, আমার খাবার-দাবার ইত্যাদি এগিয়ে দেওয়ার জন্য রুজানার বিকল্প কাউকে খুঁজতে হবে। ওর আপ্যায়নে মজে গেলে চলবে না। কিন্তু ভাবতে না ভাবতেই রুজানা আমার ঘরে হাজির। ‘কী খবর, জামাইবাবু?’ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। হাসছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম কোথায় খোঁচাটা দিচ্ছে। তবু বলতে হবে, ‘মানে কী?’
‘এক যুগ পরে বাড়ি আসলেন। তাও আবার সারাদিন ঘরে বসে থাকেন। একেবারে জামাই বাবুর মতন।’ রুজানা তার মুখের উপর এসে পড়া কটা চুল কানের উপর দিয়ে পেছনে ঠেলে দিল।
আমি মুখ গোমড়া করলাম। বাড়ি এসেছি সেই বুনো বনে বাঁদর হয়ে ঘুরে বেড়াতে। দৈনিক বিকালে স্বচ্ছতোয়া নবগঙ্গায় ডিঙ্গিনৌকায় বসে বসে মাছ ধরার জন্য। কিন্তু সেসব কিছুই নেই। মাত্র এক যুগেই সব শেষ? নিশ্চয় আগে থেকেই শুরু হয়েছে। আমি খেয়াল করি নাই। আমি ত একটা আহাম্মক, সবাই বলে।
রুজানা বলল, ‘অফিসে গেলেন আবার ফিরে আসলেন। তাই ভাবলাম জামাইবাবু লজ্জা পাইছে নাকি দেখি।’
ওটা তাহলে অফিস।
‘চলেন অফিসে বসি,’ বলল সে।
আমি আমতা আমতা করে উঠে পড়লাম। ভাবলাম, বিয়ে করি বা না করি, এমন মালটা হাতের কাছে পেয়ে ছেড়ে দিই কেন। কিন্তু আমার মাথায় ঝিম ধরে গেল যখন রুজানা বলল, সে আমার বাপের সুদের ব্যবসা তদারক করে।
বাপ তাহলে এখনও সুদের ব্যবসা ছাড়ে নাই। আর রুজানা তার ম্যানেজার! কোনো শিক্ষিত তরুণী এ ধরনের কাজের সাথে থাকতে পারে ভাবতেই আমার ধাঁধা লাগে।
‘আর এনজিওর কথা যে শুনলাম—?’
‘আস্তে আস্তে শোনেন। এত তাড়া কিসের?’ রুজানা হাসল।
আমি জানতাম তরুণ সমাজ মহাজনি ব্যবসার ঘোর বিরোধী। কিন্তু রুজানা বলে, ‘এটা একটা ব্যবসা। কে না ব্যবসা করতে চায়?’ সে উদাহরণ টেনে বলে, ‘ব্যাংকগুলো কী করে? আশা, ব্র্যাক, ঠেঙ্গামারা, ইত্যাদি—এসব এনজিও কী করে? সবাই ত সুদের কারবারই করে, তাই না?’
তা ঠিক। তবু আমার রাগ হয়। ‘তুরা কত পার্সেন্ট সুদ নিস?’ আমি জানতাম মহাজনরা শত পার্সেন্ট পর্যন্ত সুদ নেয়। তারচেয়ে বেশিও নেয় অনেকে। ভাবলাম এ জাগায় তাকে খানিক কষে দেবো। কিন্তু সে বলে কিনা, ‘আমরা কত পার্সেন্ট নিই তাতে কী যায়-আসে? সুদ তো সুদই। জোর করে ত আর নিই না। প্রতিযোগিতার বাজারে কেউ কি আর আমাদের সেধে সেধে বেশি সুদ দিয়ে যায়?’
তাও ত কথা। মাল খুব পাকা দেখছি। কথা বলে কী স্মার্ট ভঙ্গিতে!
কিন্তু তার কথা আমার মোটেও ভালো লাগে না। মনের মধ্যে খচখচ শুরু হলো। তবে তাকে জেরা করার লোভও হচ্ছে। ‘জোর করা মানে কী? কী করলে জোর করা হয়?’ ভাবলাম তাকে খুব সহজেই আটকে দিতে পারব। উমা, সে বলে কিনা, ‘সে তো অনেক কিছুই হতে পারে। এখানে আমরা দেখি যে আমরা ব্যাংক-এনজিওর মতোই ঋণ দিই, সুদ নিই। আমি ত এতে কোনো দোষ দেখি নে।’
‘ব্যাংক-এনজিও আর মহাজন কি এক হলো নাকি?’
এর উত্তরে সে কী বলল? বলল কিনা, ‘সবকিছু এক রকম হয় নাকি?’
কী সাংঘাতিক উত্তর! কিভাবে ওকে আমি পটানোর ধান্দা করব।
আপাতত বলা যাক, ‘আমি যাকে ঘেন্না করি তাকে আমি যুক্তি দিয়ে ভালোবাসতে পারি নাকি?’
কিন্তু এটা নাকি আবেগপ্রবণ মানুষদের কথা, বলল সে।
আমি যা-ই জিগাই, সব উত্তর তার কাছে আছেই। হয়তো আমার আগেও এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে আর উত্তরগুলো তৈরি করেছে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে পড়লাম। কিন্তু সে আমাকে আটকে দিল।
‘ঝম করে উঠে পড়লেন যে? আমি কি অন্যায় কিছু বলেছি নাকি?’ সে প্রশ্ন করার পর উত্তরের জন্য আমার মুখের দিকে চোখ বড় করে চেয়ে রইল।
আমি বললাম, ‘হয়তো ঠিক বলেছিস। প্রতিযোগিতার বাজার। বাজারের দুনিয়া। যুক্তি, বুদ্ধি। তুলনা অনুমান বিশ্লেষণ সিদ্ধান্ত। তোর কথা আমার ভালো লাগছে না। কেনই-বা তুই এসবের মধ্যে যাবি?’
‘কেন যাব না? আমি মেয়ে বলে?’
আমার বিরক্তি লাগে। মেয়ে, ছেলে, নারীবাদ, পুঁজিবাদ... এসব শুনলেই রাগ হয়, অস্বস্তি লাগে। ‘এসব আর বলবি না।’
মহাজনদের বলা হয় জোঁক। কেন আমরা মানুষের ঘেন্না গায় মেখে বেড়াব?’
রুজানা যেন হঠাৎ করেই নীরব হয়ে গেল। তার চোখমুখ ব্যথায় ভরে যাচ্ছে নাকি। কিন্তু, ‘আমি তো মন খারাপ করার মতো কিছু বলি নাই।’
‘না, তা বলেন নাই,’ সে আমার মুখের দিকে তাকাল। সাথে সাথে আবার নামিয়েও নিল। আমাকে বোঝার চেষ্টা নাকি? জিগালাম, ‘কী ভাবিস?’
‘ভাবি—।’
‘কার ভাবি?’ আমি মজা করে হালকা হবার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু সে এমন একটা হাসি দিল, যাকে চিন্তিত হাসিই বলতে হবে, যা আমাকেও চিন্তায় ফেলল। প্রায় এক মিনিট চিন্তার পর বলল, সে বুঝতে পারছে না আমি ঠিক কী বলতে চাচ্ছি।
তা ঠিক। আমি আসলে কী বলতে চাই? আমি জানতাম না মহাজনি ব্যবসা এখনও সদম্ভে টিকে আছে। ‘তুরা যা করছিস এসব কি ভালো কিছু নাকি? লোকে আমাদের মন্দ বলে। মহাজনদের বলা হয় জোঁক। কেন আমরা মানুষের ঘেন্না গায় মেখে বেড়াব?’ আমি বললাম।
রুজানা বলল, সবকিছুর পরিবর্তন হয়। তারাও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটা ভালো অবস্থানের দিকে যাচ্ছে, যাতে মানুষ আর মন্দ না বলে।
কিভাবে? আমি জিগাতে গিয়ে চেপে থাকলাম। জিগালে নিশ্চয় আরো কোনো শক্ত যুক্তি-বুদ্ধির কৌশলে যাবে। তা আমার ভালো লাগবে না।
আমি তার সাথে যুক্তি-বুদ্ধিতে পারছি না বলে?
তাহলে তাই। “আমার যেহেতু ভালো লাগছে না—।”
'এসব বায়বীয় কথাবার্তা ছাড় তো। অ্যানালাইসিস কী বলছে সেইটা দেখাও,' আমার বস হারুন ঢাকার অফিসে আমাকে শাল্টিং দিচ্ছে, 'ভালোলাগা-মন্দলাগা নিয়ে কারবার করতে চাইলে কবি হওগে। মার্কেটিংয়ের চাকরি ছাড়। যুক্তি-বুদ্ধি শাণিত করো।' ফাকিং বুদ্ধি। ফাকিং যুক্তি। 'এটাই লাইফ রে পাগলা, এটাই লাইফ। হোয়াট দ্য ফাকিং লাইফ ইজ?' শাহ ভাই আমার কাঁধে হাত রাখল, 'বি হার্ড টু একজিস্ট।'
আমার অস্বস্তি বাড়ছে। আমি এখন কী করি। আমি বরং আমার ঘরটায় ফিরি এবং খুব চুপচাপ হয়ে পড়ি। এছাড়া আমার আর কীবা করার আছে। আমি বাড়ি এসেছি কারণ দৈনিক বিকালে আমি স্বচ্ছতোয়া নবগঙ্গায় ডিঙ্গিনৌকায় বসে মাছ ধরতে চাই। কিন্তু কোথায় সেই অমৃতধারা। সেখানে এখন মাটির নিচে থেকে পানি তুলে কেবল কিছু ধান চাষ করে হাভাতেরা।