করোনার এই নিস্তরঙ্গ দিনগুলোতে অহম ও অশ্রুমঞ্জরি পড়ছি। কিছুটা থেমে থেমে। গ্রামের সন্ধ্যায় যখন একটুও আভা দেখা যায় না, তখন অহম ও অশ্রু’র ভাষা ধীরে ধীরে শিশিরে জাল ফেলতে থাকে, এক অনুক্ত চিত্রদেশে ভীষণ ভাষাহীনতার জগৎ তৈরি করে ফেলে। সংকেতে অথবা গাঢ় কোনো ইঙ্গিতে, এইখানে সকল কথাকলি ভিড় করে আছে, কিন্তু কোথাও তাদের কোনো কলরব চিহ্নিত করা যায় না। যেন সন্ধ্যার মর্মমূল ছিঁড়ে ক্রমে ক্রমে এক বিভূতি দুলে ওঠে, যত স্মৃতি ও ধ্বনি, দিগন্ত ও ধূলি, অহম ও অশ্রুমঞ্জরি। কিন্তু কোনোভাবেই তা করুণ কিংবা কারবালা নয়। বরং নিঝুম, সন্ধ্যার সাঁঝবাতিটির মতো, কলরব থেকে কিছুটা দূরে, নম্র করে রেখেছে তিরতির শিখা। পতঙ্গদের শব্দের চেয়েও নিচু কোনো স্বর এইখানে জীবনের সারবত্তাকে বয়ান করে চলেছে। প্রকৃতির অন্তঃস্থ সুরের কাছে নিজেকে নিকটস্থ করতে চেয়েছে, খোলাসা করতে চেয়েছে এক বিচ্ছিন্ন ‘আমি’কে, যত অবিমৃষ্যকারিতা, অহম ও অশ্রুর উচ্চতাকে।
আর যেখানে পৌঁছাবো আমরা তিনি সেই অলৌকিকতার কথা আমাদের বলে চলেছেন।
যেন অনাবৃত্ত খুরের মধ্যে শব্দগ্রহণ করে কেউ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে শ্লোকবদ্ধ, সামনে রজনী, করুণা, আর বিপুল পরাজয়। [পথ
প্রান্তরের কাছে জমা রাখা আছে তার স্মৃতি আর যাপনের ধন, তাই মধুকূপী ঘাস হয়ে কেবলই ছড়িয়েছে নৈঃশব্দ্যের ঋণ।
আর যত সব হারানো শুশ্রূষা, দীনতা, পুরাতন কথা, ছেঁড়া পাতা, শুকনো পাতা—এইখানে, একবার বেজে ওঠে লুপ্ত গানের সঙ্গে মিশে যেতে যায়, ধূলিতে হারায়। আর যা কিছু হারায়, ফিরেও আসে, আর তখনই মনে হয়, এই সমস্ত ঘটনাবলি আসলে প্রকৃতিরই গুপ্ত কোনো তান, একটিই মহৎ ঐকতান—বাণীহীন সুরের মতো ফেলে রাখে তার আবহসংগীত।
একটা কোঁকড়ানো গমক থেকে কোনো আর্তনাদ, তার বসন বদলে চলেছে। ফলে অদূরে বাতাস বইছে, আর ঊর্ধ্বে, সান্ধ্য স্তব্ধতা ভেঙে যে সুরটি অধোমুখে ঝুলছে, তার পেছনে ধোঁয়ার মত আভাটাকে দেখা যায়। [দীর্ঘ ঝাউয়ের মাথা
অহম ও অশ্রুমঞ্জরি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, সভ্যতার এত বিচিত্র বস্তুরাজিকে আলগোছে সরিয়ে, একজন মানুষ কেন পাতার পতনকে অনুভব করতে চায়? অস্পষ্ট কোনো দিগন্তরাশিকে? স্মৃতি ও ধূলিকে? তার হৃদয় কি গ্রাস করে আছে এক মহানুভবকে? যে মহাকে অনুভব করে সে-সান্ত্বনাকে আনন্দে পরিণত করে আর আনন্দকে সান্ত্বনায়। হয়তো, প্রান্তরের কাছে জমা রাখা আছে তার স্মৃতি আর যাপনের ধন, তাই মধুকূপী ঘাস হয়ে কেবলই ছড়িয়েছে নৈঃশব্দ্যের ঋণ।
কেউ কি তার পানে চেয়েছিল কোনোদিন—ক্ষণকাল—একটি পাতার পাশ দিয়ে কি দ্রুত নেমে আসছে আরো একটি পাতা—শান্ত জলের পরে ওই যেন ডুবে যাচ্ছে সন্ধ্যার অন্ধকার। [অস্তদিগন্তের পানে
ওই দূর নক্ষত্রের ইঙ্গিত থেকে দু’একটি সুর ভেসে ওঠে যেন। যেন কারো হিম সুষুপ্তির তলে তখন হরিৎ কোনো আলোকের আভাস। যে সন্ধ্যা একদিন দুর্বোধ্য ছিল জীবনে আরেকবার ভাষাহীনতার মধ্যে পেলাম তাকে। নিদ্রার আয়োজন থেকে কিছু দূরে। শূন্য পথের পরে ঝরে-পড়া মর্মরিত পাতার মতো। [নিদ্রার আয়োজন থেকে
যখন প্রকৃতির মধ্যেই দেবতার লীলার মর্মতল ঘেঁষে বিপুল মহিমা ও দীনতা, শূন্যতা ও শোভা চির অর্থময়তা নিয়ে পরিব্যপ্ত হয়ে আছে, তখন তার থেকে মর্মমূলটুকু ছিঁড়ে নিলে, জীবনের নিরেট সারমেয়টুকুই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। প্রকৃতিই মৌলিক—এক মিলনাত্মক ব্যঞ্জনার ভিতর দিয়ে প্রকৃতি ও মানুষ সমার্থক হয়ে ওঠে। কবি অনুপম মণ্ডল এই মর্মার্থটুকুকে সঙ্গী করে, নিজের বোঝাপড়া ও যাবতীয় কথাকলি প্রকৃতির তন্ময়তার ভিতরে সেরে নিতে চান। প্রকৃতি এখানে তাই চিরবন্ধন, চির অন্তঃশীল।
অবচেতনের স্তর থেকেই ভাষাকে বইতে দিতে হয় অবিরাম বৃষ্টি পতনের গতিতে।
ধ্বনির পৃষ্ঠদেশ থেকে নেমে সে মেঘেরা, আরো আস্তে, অশোকের ডালপালায় মুড়িয়ে গিয়েছে। ক্ষীয়মাণ, কোন সন্ধ্যারাগরক্তের বিভা পড়েছে জলে। [অপরাহ্ণের ভেতরে
প্রকৃতির মধ্যেই সে দুঃখের সঙ্গে যেমন দুঃখ হয়, তেমনি পাতার সঙ্গে পাতা হয়, ক্ষীয়মাণ তারার সঙ্গে নিজেকে মেলায়। মেলায় এ কারণে, যে পতিত পাতাটির সঙ্গে নিজের একটি ঐক্য খুঁজে পায়, ফলে তার মধ্যে সে নিজেকে হারায়। আর এভাবেই বৃহৎ অথবা একটি ক্ষুদ্র প্রাণের অংশ হয়ে উঠতে চায়। উদারতার সব্বোর্চ মন্থন পায়।
এখানে গাছের ডালে ডালে জড়িয়ে উঠছে আজ আমারই মুখশ্রী বহেরাতলার ঝোপে একটি জোনাকি, অনন্তের বাণীর মতো টিপটিপ করে জ্বলছে। [গানের ডালিখানি
সভ্যতার ভিতরে থেকে সভ্যতার উপাদানগুলোকে ছুঁয়েও না দেখা, এ কেবল কাব্যের স্পর্ধা নয়, কৃতিত্বও বটে। সভ্যতার অবদান কেবল প্র-গতিকে নিশ্চিত করায়, স্বাচ্ছন্দ্যের উপাদান তৈরির লক্ষ্যমাত্রায়, কিন্তু তা মিলনের দিকে কোনো নির্দেশ করে না। ফলে, অনুপমের এই প্রকৃতিপ্রেম, একদিক থেকে প্রযুক্তিযুগের গতিকেও চ্যালেঞ্জ করে। তার যাত্রা জীবনের পশ্চাতে, স্মৃতির অভিমুখে, সাঁই সাঁই গতির বিপরীতে প্রায় স্থবিরতায়।
আর তার ভাষাপ্রসঙ্গে বলা যায় তারই কাব্যের ভাষায়—
দূর, দিকচক্রবালের ওপর, অস্পষ্ট কল্লোলধ্বনি, ও কার? একটা অভ্রকণা মেঘাচ্ছন্ন বাদামবনে, আলাপে, ক্রমশ ঘন হয়ে নামছে।
পাতা পতনের মতো গূঢ় কোনো ভাষা ঠিক এইখানে দীপ্যমান হয়ে আছে। শব্দ ও খণ্ডবাক্য, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা, ভাব ও কল্পময়তার পেলব সংযোজন ঘটিয়ে শব্দেরা কাঁপা কাঁপা পায়ে কবিতায় প্রবেশ করেছে।
যেন আপন নাভিপাত্র থেকে, একে একে ভেসে উঠছে শব্দ। দীপালোকে, তীরের কালো জলে সুষুপ্তি ধুয়ে মুছে চলো তারে দেখি। [বিষাদ
অনুপম সেইসব ঔদ্ধত্যকে ছাপিয়ে শুধু তার অন্তর্নিহিত স্বরূপটি গেঁথে তুলতে চেয়েছে।ভাষার সঙ্গে অনুপমের যেটুকু বোঝাপড়া লক্ষ করা যায় তা ভাষার উপরকার নয়, ওই ভাবের ভেতরকার। যেন ভাব ও ভাষাটি রসের একই ফলগুধারা থেকে স্বতোৎসারিত। ভাষার জন্য তাই আলাদা কোনো পরিশ্রম চোখে পড়ে না। ভাষার কামারশালা এ নির্জন কাব্যকে কোনো সাহায্যই করতে পারে না, আর তার দরকারও পড়ে না। ভাবের নিজ্ঞান জার্নিতে ভাষার সচেতনতা কখনো কখনো কাব্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বলে আমি মনে করি। বরং অবচেতনের স্তর থেকেই ভাষাকে বইতে দিতে হয় অবিরাম বৃষ্টি পতনের গতিতে।
ভীষণ ভাষাহীনতায় যেখানে জড়াজড়ি করে আছে এক চিরকালীন চিরধ্বনি—অন্তরগূঢ় বাসনা।
শিরীষের শাখার ফাঁক দিয়ে, তারাটি, শুধু ভোরের বাতাসে কাঁপছে আর কাঁপছে। [অপরাহ্ণে ভেতরে
করোনার করুণসম একাকিত্বে এই কাব্যগ্রন্থ আমাকে দিয়েছে নির্জন ঘাটের সুধা। এমন দিনে, আমি এমন কাব্যপঙ্ক্তিদের সঙ্গেই সাক্ষাৎ করতে চেয়েছি। যা মনকে শান্ত করে নিয়ে আসবে, নিয়ে যাবে স্থির ধ্রুবলোকে। ভীষণ ভাষাহীনতায় যেখানে জড়াজড়ি করে আছে এক চিরকালীন চিরধ্বনি—অন্তরগূঢ় বাসনা—যা নিজেরই কাছে অজানা।
দিকে দিকে যত কলরব, অনুপম সেইসব ঔদ্ধত্যকে ছাপিয়ে শুধু তার অন্তর্নিহিত স্বরূপটি গেঁথে তুলতে চেয়েছে। যা কোনো না কোনোভাবে জীবনেরই স্পষ্ট নত কোনো কল্লোল।
যে স্বর, অনন্তের কাল ছিঁড়ে ভেসে আসছে যেন পিতৃঋণ থেকে, তার ভেতর প্রতিভাসিত আমাদের স্মৃতি আর বধিরতা।
সেই স্বর আমাদের নিয়ে যাবে কোনদিকে? আর নতুন কোনো গান বাঁধব আমরা? মুহ্যমানতার দিকে, ধবল জ্যোৎস্নার দিকে! [পিতৃঋণ