সুঁই

তুই একটি সুঁই দিয়েছিলি, তা এখনো আছে আমার কাছে। বলেছিলি না— নিবি আবার? নিবি তো চেয়ে আকাশ ছেয়ে ভারি অপার মেঘেরা ওড়ে! ঘরের দোরে বৃষ্টি নামে। থমকে থামে একটা-দুটো দমকা হাওয়া। কয়েক মুঠো আয়না-কণা উদ্দীপনা ছড়িয়ে যায় গড়িয়ে যায়। দখিনা দাওয়া ছলকে ওঠে। স্নেহ-প্লাবনে ঝলকে ওঠে নিরঞ্জনা হৃদয়কোণে শালের বনে।

খুব তো মনে পড়ছে আজো— তোমার অই তা থই থই মুখের রঙ। ব্যাকুলা ক্ষণে যখনি সাজো দেখেছি—আঁকা বিকেল-মাখা সুখের রঙ।

শেষবিকেলে নদীটা এলে কণ্ঠ-কাঁপা বেদনা-চাপা কত-না কথা উচ্ছলতা শিশির-ঠোঁটে নিমেষে জোটে। কবিতা করে এই আমাকে। কাঁপন রাখে তেপান্তরে পাতার বাঁকে। যেমন ক'রে আপন মনে দিনযাপনে অভয় ভোরে রঙবাহারি উতলতার মজুদারি করেছে ঘাস খুব দেদার বারোটা মাস।

ঘাসের পাড়ে রোদের ভারে মত্ত আলো মোহ সাজালো। ঘোর নিভৃত ব্যুহের মতো সবিস্তারে ঝুলতে থাকে। ডাকছ কাকে? শালিকটাকে? ধানশালিক, ও তো মালিক ধুলোবালির। ধুলোতে জ্বলে সদলবলে সোনামানিক। আছে তো এর রকমফের। কপাল-ফেরে শহর ছেড়ে এখানে এলি কিছু কি পেলি? কিছু না-খুঁজে চক্ষু বুঁজে আশাতে মেতো হাতটা পেতো। পেতে তো পারো চেলিতে মোড়া মোহর-তোড়া বাতাসা ন’টা ছ’টা জিলাপি কিংবা ধরো এত্ত বড় করলা ঝাঁপি। করলা? সে তো কষ্ট-তেতো।

তেতো রে তেতো, নয়কো সে তো ডহর বিষ। নহর হলো পনেরো-ষোলো রোদের শিষ।

রোদ-নদীতে নদীর জলে চুমকি ফলে। বৈতালীতে নায়ে বাদাম তোলাই ছিল। এসেছিলাম তোমার প্রতি। ছায়ারা দিল মায়ার গতি। তোমার নামে নদীকে ভুলে ডাক দিলাম। পাতারা দুলে কী ধুমধামে চুপে ও নাম করে নিলাম! থাকল পড়ে ক্ষেতের আলে বিচুলি-নাড়া মৌনী সাড়া। আয়েসে-মেলা মধ্যবেলা সদ্য ঝরে এ অন্তরে। তোমাতে খুব দিয়েই ডুব উঁকি দিলাম। নিয়ে নিলাম পিয়ে নিলাম একনিষ্ঠ মোহাবিষ্ট সাধ কী সাকি।

ইচ্ছে—হবে মেঘের পাখি। মাঠেরা তবে ভাবে এসব? থাকে তারা কোন পাহাড়ে? ঝরনাপাড়ে? বন-পাথারে? পাথারে জাগে পথের রেখা ডোল জাঁকাল। সে-অনুরাগে বৃষ্টি এল ঝমঝমিয়ে। যাবে তলিয়ে নষ্ট স্মৃতি? নিকিয়ে ওঠে অধীর প্রীতি। শস্য ফোটে খামারে-ক্ষেতে। আঙিনা পেতে ধান রেখেছে যমুনাবতী।

সরস্বতী সাধ এঁকেছে— এলে কুটুম দেবে হুড়ুম মাখিয়ে ঝাল।

দিঘির ঘাটে বলেছ কাল— যাচ্ছ তুমি মাঠের হাটে। কী মৌসুমি বাতাস বয়! আকাশ হয় নীলাভ নদী। এমন যদি নয়-মলিন প্রতিটি দিন কাটত বেশ, মহানন্দে নানা ছন্দে অনুক্ষণ ছড়াত রেশ উজ্জীবন ভালো লাগার, কষ্টক্লেশ থাকত না তো। দারুণ হতো! ভাবছি—তা তো মনের মতো টানা সতত হবে কি আর? ঠিক তখুনি মেঘ বেগুনি গহিন কালো ছায়া ছড়ালো। মেঘের পিছু আকাশও নিচু। হারিয়ে গেল রুপোলি আলো। ঝাপটা এল ছুটল ঝড়। অনাসৃষ্টি ঘটল শত দুপুরভর। আশারা সব নিমেষে গত। জানালা বেয়ে নীল নীরব ব্যথারা ছেয়ে ছড়িয়ে গেল নিরন্তর। জড়িয়ে এল পাড়া-বিদারী সে-আহাজারি— সর্বনাশের নেই তো বাকি! ধান ডুবল প্রাণ ডুবল। সবি কি ফাঁকি? চাই না ঢের! একটু আশা কেবলি খুঁজি। রূঢ় আঁধারি গূঢ় হতাশা উজায় বাড়ি। উনুনে তবে নবান্নের এ উৎসবে চড়ে না বুঝি ভাতের হাঁড়ি?


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০
অনিরুদ্ধ আলম

অনিরুদ্ধ আলম

জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি, রংপুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক...বিস্তারিত