একগুচ্ছ প্রপঞ্চের পদ্য

প্রশ্রয়

তুমি তো এলে! রুপার পাখি, পাখির প্রশ্রয় সাঁজোয়া প্রাণে অধীর হয়ে বিলাবে রাঙা বেলা তরল নীল গোলাপফুল আকাশে নয়ছয় বাগানবাড়ি এখানে ভুলে খেলে না ছেলেখেলা। নীরবতা কি কাকতাড়ুয়া? দু’বাহু মেলে রাখে সর্ষেক্ষেতে তুলেছে ফণা হলুদ রেখা আরো আলোরা যদি বধির হবে, নদীর পিছুডাকে পেছন ফিরে তাকায় কেন?—ভাবতে তুমি পারো! বাতাস দেবে স্বপ্নবোধ। হৃদয়ে পাল তুলে প্রার্থনার মতন ঋজু গাছেরা মেলে ছায়া! শশার স্বাদ ধুলোতে আঁকা। ওতেই হেলেদুলে বৃষ্টি নামে। উজাবে মনে স্নিগ্ধতার কায়া। প্রতীক্ষা কি বোতামহীন জামার সংশয়? মোটেও নয়। দুয়ার খুলে রেখেছি বাড়িময়!

কাঁটাতার

ঝিমিয়ে-পড়া কাঁটাতারের মতন নিশ্চুপ সুরম্য যে বটের কায়া পুষেছে মায়াপাখি সেখানে নীল আলোর দহ রমণী-অভিরূপ ভগ্নাংশে বেলা-অবেলা করছে মাখামাখি। সোনার বাটি মাজতে-বসা ছায়ারা আনচান— মননে মেঘ বর্গী হয়ে পিছু-না আর ছাড়ে! ব্যাকুলতা কি শাকের স্নেহ? ঢাকবে পিছুটান? মাছের ন্যায় কিছু তো শোক হৃদয়ে ঘাই মারে। এখানে কোনো বয়সী তাঁবু দৃশ্যহীন জাগে? ক্লান্ত আমি। কোথায় যাব? খুঁজছি কুশি উম নিরঙ্কুশ বৃষ্টি এল শুশুক-অনুরাগে আমার চুলে জলজ পোকা থাকে না নিজ্ঝুম। সঙ্গোপনে হাওয়ারা দিল এগিয়ে বটপাতা একলা আমি ফিরছি বাড়ি বানিয়ে তাতে ছাতা!

মধ্যাহ্নে

বুকের নীল মধ্যাহ্নে কেউ কি আজো আছে— স্নানের নানা বৃষ্টিজুড়ে এঁকেছে লুকোচুরি? তথাপি হয়ে অহর্নিশ থাকব তার কাছে নাটাই তুমি। ঘুড়ি কি আমি? কারো কি হৃদে উড়ি? রঙের গাঢ় মৌমাছিরা আলোর মৌচাকে ছায়ার পাঁকে পিছলে পড়ে। স্বীকার করি খুব— বিষয়ী শ্বাস দ্বিখণ্ডিত ঘাসের চোরাবাঁকে জানি না আজো তোমাতে ভুলে কখন দিই ডুব। কিছু তো গ্লানি মুদ্রাদোষে হৃদয়ে কেলাসিত কে যেন পাশে নিয়ত থাকে। আমাকে জানে ভালো দৃশ্যহীন অস্তিত্বে শুধু সে সংবৃত ভুল করে কি আমাকে বুঝি চেনাল কত আলো? নদীর মতো লাস্যময়ী অলস সাড়া থেকে একটি কেউ আমাকে ক্ষণে হননে দেয় রেখে!

যদি

গেলাসে এক টুকরো হিরে। করবে জলপান? এসেছ যদি, একটুখানি জিরাও অন্তত! তুফান মনে বইছে ক্ষণে প্রবল টানটান? বাইরে দ্যাখো—ঝড়ের খোঁপা বাতাসে বিব্রত। মহাশ্বেতা আলোরা যেন বেড়াতে গেল দূরে নদীর তীরে আঁধার নামে ছড়ানো বিবসনা চোরাঘূর্ণি বিষণ্নতা হোক-না থুত্থুড়ে খেলাচ্ছলে হলেও সুখ তুলুক তার ফণা! আমার কিছু নক্ষত্র দীপ্ত-জাঁদরেল— তোমাকে দেব। আঁজলা ভরে ইচ্ছেমতো নিও! ইসটিশান ছেড়েছে বুঝি শেষবেলার মেল? মটরশুঁটি ক্ষেতের মতো শরীরী মায়া দিও। প্রেমের নয়া ইশতিহার তোমাকে নিবেদিত সাজিয়ে দিক জলোচ্ছ্বাস সৃজনে উন্নীত!

মহাকাব্য

বাতাবি বই জলজ খাতা মেঘের পুস্তকে কে কোন কবি কালিদাসের নামেই লিখেছিল মহাকাব্য? কুয়াশাস্নানে বাতাস লকলকে! লোকালয়ের মতন নদী বেলাতে উঁকি দিল। তোমার-দেয়া ব্যক্তিগত নদীকে আজো আমি পাঠাই দূরে সাগরপাড়ে। শামুক পায়ে পায়ে অতিক্রান্ত রোদ্রে ছোড়ে গতির পাগলামি! নৈঃশব্দ্য বৃক্ষবেশী পথের ডানেবায়ে। শব্দহীন লহরী-লীলা সাঁঝের সিনাজুড়ে শুকতারাকে আগলে রাখে। বিবাগী কিছু কিছু অস্থিরতা পরান্তক! প্রবাসে ঘুরে ঘুরে নির্বিশেষে ঝরাপাতার নিয়েছে তারা পিছু। পাতাতে কারো ফিরে আসার ধ্বনিরা ঘরমুখো একটা তুমি ডহর বুকে নিয়ত ডাকাবুকো!

স্বপ্নাহত

পৃথিবী পোড়ে। সবাক ওড়ে জলের দাবানলে গাছের ছায়া আরণ্যক হোক-না পথে পথে বিশালদেহ তরল স্নেহ ভগ্নাংশে জ্বলে নাচছে সোঁদা গন্ধগুলো ধুলোর শাদা রথে। বাতাসে ঝুঁটি বাঁধে নি বুঝি ঝড়ের সজীবতা? ঝরাপাতার মতন স্মৃতি বসেছে গোল হয়ে স্বপ্নাহত বালক আমি। সাজাই আশালতা গিরিখাতের কিনারে দেখি—নদীটা যায় বয়ে। হৃদয়পুরে জাহাজডুবি বিষণ্নতা ভাসে আকাশে মৃত মেঘের নানা নম্র কঙ্কাল কাল্পনিক মাছির ত্রাস মিশছে প্রশ্বাসে ফড়িঙ হয়ে নায়ের বুকে কাটাই কালাকাল। পৃথিবী থেকে পৃথিবী দেখি গাছের বিশ্বাসে শেকড় হয়ে শেকড় ছোঁব। থেকো তো তুমি পাশে।

হরিণাভ

ও পথে গাঢ় আকাশ গেছে অনেকখানি দূরে পড়শি ছায়া শিখছে এসে মায়ার ব্যাকরণ মেঘের মতো কালো মহিষ বেড়ায় মাঠে ঘুরে নীল পাহাড়ে কখন যাবে? জানিও দিনক্ষণ। একাকিত্ব কি হরিণাভ? হলফ করে বলি— রাজাধিরাজ আয়েসে পাড়ি দিয়েছি কারো মনে জলের ঘোড়া পাথারে গাঁথে ফেনিল অঞ্জলি সহজ আলো হৃদয়জুড়ে মেতেছে পার্বণে। অআকখরা কাকলী বেশে বাতাসে দিল ডুব বাল্মীকির বৃষ্টিগুলো রোদ্রে ছিল আঁকা নিষ্করুণ দুয়ারে কেন আমাকে ডাকো খুব? আবিষ্কারে তোমাকে রাখি। স্বপ্ন ওতে মাখা। তুমি কি কোনো দিগন্তের বিরতিহীন রেখা? গেলেই কাছে, গেছ তো দূরে! হবে কি আরো দেখা?
অনিরুদ্ধ আলম

অনিরুদ্ধ আলম

জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি, রংপুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক...বিস্তারিত