হোম
কবিতা
করোনা ফুলের বিষ
করোনা ফুলের বিষ
পারা-১ : ভুলে থাকবার দিন
◘
আমাকে ছুঁইয়ো না!
—জন [২০ :১৭
কিছু কিছু
বিষ আছে
কখনোই
এড়ানো যায় না!
কিছু কিছু ফুল ফোটে অধরা জগতে
মহামৃত্যুর ভেতর অঢেল বেদনা তাতে।
কিছু প্রাণ
ঝরে যায়
তাহার হিসেব
মেলানো ভার!
যে মৃত্যু বেহিসেবিই, জাত-বর্ণ-হীন
কী করবে বিষকাঁটা, আর ক’টা দিন!
পারা-২ : শনিবার
◘
আরব বসন্ত নয়, তবুও গুটি মেরে বসে আছ তুমি!
এই ঘর ওই ঘরে যায়, তবু নিচে স্থির হয়ে আছে ভূমি
কোথাও কি ডাকছে কোকিল, দুয়েকটা কাকিনী একাই
ছাদে ছাদে হাহাকার ঘরে কি মানুষ নাকি ভয়ার্ত ফাঁকাই!
দরোজা খোলে না, জানালার ফাঁক দিয়ে ডাকছে চড়ুই
কে আছে বাইরে, তার হাড়ি শূন্য, যেন মহাশূন্যের বড়ুই
অসহায় শব্দ, যেন পলায়নপর জীবন থমকে আছে শ্বাসে
সন্ধ্যা হলেই এমন অচিনা শহরে শুধু ঘোড়া বাদুরেরা হাসে!
বসন্ত কিভাবে গেল, গুটি গুটি পায়ে নাকি চক্ষু দিব্যমান
অহং ভাঙলে কি মানুষ হবে একদিন মুক্ত প্রকৃতিসমান!
পারা-৩ : রবিবার
◘
সূর্যের চৌদিকে রংধনু
অলৌকিক এক আভা হাসছে নিয়ত
মানুষ ভাবছে কেয়ামত
সূর্যের ভেতরে কি এক টুকরো ক্ষত?
কেউ কেউ উদাসীন
কেউ গৃহহীন
কেউ দেখে কহর প্রভাতি
গুজবে গজব নামে
মানুষই ধ্বংস করছে তার সকল নিয়তি!
জীবন খুঁজছে কেউ উহানের রাতে
একা জাগা রাত নৈঃশব্দ্যের রাগে
বিষণ্ন এমন গান শুনেছে কি আগে
এমন নিঃসঙ্গ দিনে দিও না তো চুমু
ভালোবাসা খেয়ে গেছে ঘাতক করোনা!
পারা-৪ : সোমবার
◘
মুখোশ বদলে দিচ্ছে তোমার চরিত্র
অসম দূরত্ব রেখে যেন
চাপা শব্দের ভেতর
লুকিয়ে রেখেছে প্রাণ!
এমন করুণ সময় তোমার আসে নি কখনো আগে
ভয় পাও, স্তব্ধ হও, গোঙাও নৈঃশব্দ্যে
চাপা কান্নার চেয়েও ভারী
তবে তোমার অস্তিত্ব ভরা অজানা অসুখ
নীরস মৃত্যুর কাছে বদলে যাচ্ছে মুখ!
বলো, একা এই সভ্যতায়
কু-আশার চেয়ে অন্ধকার ভালো!
বলো, তোমার আহত হৃৎপিণ্ড ভেদে
বেরুচ্ছে কেবল ক্লেদাক্ত প্রাণের আলো!
জগৎ ঘুমাচ্ছে এখন নিরাপদ তন্দ্রায়, উদ্ভিন্ন
নতুন প্রতীক যেন শতাব্দীর মুখোশের চিহ্ন!
পারা-৫ : মঙ্গলবার
◘
বহুদিন পর মেঘে মেঘে ডাকছে ইগল
গাছে গাছে স্মৃতি নিয়ে ফিরছে পাখিরা
মনুষ্য প্রজাতি নামে তার প্রতিদ্বন্দ্বী নেই
এখন কেবলি তার একা অস্তিত্বের খেলা!
কতকাল এত নীলাকাশ কখনো দেখে নি
ছাদ থেকে ছাদে যে নিত্য অদৃশ্য রূপে
চোখে চোখ রেখে হাসছে বিরল হাসি যেন
খোদার আসন থেকে যে দিয়েছে স্বাধীনতা!
যে তুমি পবিত্র হও ক্ষারে, হাতে হাত মেখে
সুন্দর ত্বকেই দেখা দেয় সেই রক্তাক্ত অন্তর
একা ঘরে তুমি, ভুলে গেছ বিষের তুলনা
উদ্বিগ্ন শরীরে ছেয়ে গেছে বিমূর্ত করোনা!
লেখা আজ বাতাসে একাকিত্বের ইতিহাস
ভালোবাসো ভালোবাসো যতক্ষণ দীর্ঘশ্বাস!
পারা-৬ : বুধবার
◘
সকাল
হঠাৎ কোথাও কোথাও বাজছে সাইরেনের সন্ত্রস্ত ধ্বনি
যেন হৃৎপিণ্ড ভেদ করে চিরকাল ঘুমিয়ে পড়ছে কেউ
কোথাও কাঁদছে রুগ্ণ বাদামি কুকুর বাসি খাদ্যের আশায়
গেট বন্ধ, অথচ জানালা খোলা বাড়িতে কেউ নেই আর
মাঝে মাঝে মসজিদের মাইকে বিহ্বল হাঁকছে মুয়াজ্জিম
কেবল লাশের গাড়ি চলে গেল দূর নৈঃশব্দ্যে, ভেতরে
কালো গ্লাসের গাড়িতে সাদা কাপড়ে মোড়ানে ভেতরে কে ছিল
শিশু, তার মা-বাবা নাকি পরম আত্মীয় কিংবা অন্য অচেনা লোক
আমরা জানি না কিছুই, আমরা পাই নি টের, আমরা বুঝি নি কিছুই
সভ্যতাকে আঙুলি দেখিয়ে যেন কেউ নির্বাক মরছে স্নিগ্ধ ভোরে
দুপুর
এত শব্দহীন সব, বুভুক্ষু লোকের মিছিলও অর্থহীন
গনগনে সূর্যের দিকে কেউ চেয়ে বলে, আসছে সুদিন!
সন্ধ্যারাত
আলো নেই বহুদিন, ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে দুঃস্বপ্নের সুর
সারি সারি কবরের পাশে দল বেঁধে হেঁটে গেল ধূসর ইঁদুর!
পারা-৭ : বৃহস্পতিবার
◘
১
প্রিয়তমা, খুব অসময়ে তোমাকে লিখতে হলো
কখনো তোমাকে আর ছুঁতে পারব কিনা জানি না
অন্তত চিঠির অবুঝ বর্ণমালায় হাত রেখো একবার
চোখে দেখা আর মনে বিচরণ ছাড়া স্পর্শ খুবই কঠিন
এমনকি মানুষের গন্ধ হয়তো অচেনা ঠেকবে আজ
আজ স্পর্শের বাতাস গায়ে লাগলে চমকে ওঠে প্রেম
তোমার কপাল, হাত, ওষ্ঠ, চিবুক সবই অকাল বিমূর্ততার
এখন মৌন থাকার কাল আর বুক চেপে বিরহ তাড়াবার
২
প্রিয়তমা, এখন সময় ঘুরে দাঁড়াবার
জীবন লড়ছে আজ অস্তিত্ব ঠেকাতে
মরবার আগে মরে গেলে
তুমি কি কখনো শর্থহীন ভালোবাসতে!
৩
জানো, আজ অমাবশ্যার রাতে স্বপ্নে জেগেছিল চাঁদ
দিন আসছেই ভালোবাসবার, প্রহরানন্দে কাটবে রাত!
পারা-৮ : শুক্রবার
◘
যদি বেঁচে যাই
মাথা নত করে মাটিতে সটান পা রাখব
অহংকারী দু’পায়ের পাতা শীতল করব
যদি বেঁচে যাই
খাঁচার ময়না ছাড়বার আগেই বলব
কতদিন মুক্ত আদর করো নি তুমি
যদি বেঁচে যাই
কালো আর সাদা বেড়ালের মুখোমুখি হব
শিখে নেব অন্ধকার চোখে আলো রাখার কৌশল
যদি বেঁচে যাই
দরজার ফাঁকে লাল পিঁপড়াকে বলবই
কতদিন তোমাদের খেতে দেই নি মণ্ডামিঠাই
যদি বেঁচে যাই
শিশুর ভয়ার্ত মুখ মুছে দেব সহসায়
যেন সে মা হারানোর কথা ভুলে যায়
যদি বেঁচে যাই
একাকী পূর্ণিমা রাতে আমরা দুজন
প্রাচীন গাছের কাছে জীবনের কথা শুনব
যদি বেঁচে যাই
বোমারু বিমানের খোসা থেকে তুলে নেব
ঝরা রক্তের লোহিত আর শ্বেতকণিকার চিহ্ন
যদি বেঁচে যাই
যত দূর যায়, আকাশে ওড়াব মেঘ
ঘৃণার আঙুল থেকে তুলে নেব ভালোবাসা
যদি বেঁচে যাই
মায়ের কবরে কাঠগোলাপের চারা লাগাবই
যেন বিরহী পাখিরা খুঁজে পায়, ঠাই!
যদি বেঁচে যাই
মানবের পাষণ্ড নির্মমতাকে বলব, না
অধরাকে ধরব মায়া, অচেনাকে চেনা!
পারা-৯ : সমাপ্তির চিহ্ন
◘
আগামীর দিকে যাই, আর রথ ঝুলছে রহস্যে
চিতা থেকে জেগে ওঠে সেই অতীতের ভস্মে!
যিশুর নীলাভ রক্ত লেগে আছে বেদনার দ্বারে
ছিন্ন দুপা, উদ্ভিন্ন মস্তক, সীমান্তের কাঁটাতারে!
পালাবার পথ নেই, ঘিরে আছে অপার আকাশ
কেবল তুমি তো, আশ্রাফুল মন্দাক্রান্ত ভাইরাস!
যদি ভালোবাসো, ফিরে পাবে রহস্যের গতি
মহামন্দায়ও দুলবে প্রাণ আর সহজ প্রকৃতি!
সাখাওয়াত টিপু
জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিল্প-সমালোচক। নিয়মিত...
বিস্তারিত
জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিল্প-সমালোচক। নিয়মিত লিখছেন দেশি-বিদেশি সাহিত্য পত্রিকায়। স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, গ্রিক, স্লোভেনিয়ান, সার্বিয়ান, চাইনিজ, ইংরেজিসহ কয়েকটি এশীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা। ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি মুভমেন্ট [গ্রিস, ২০১৯], সান সালভাদর ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভাল [এল সালভাদর, ২০২০], লা লিবেলুলা ভাগা পোয়েট্রি ফেস্টিভাল [স্প্যানিশ-আমেরিকা, ২০২০], রাইট ফোর ওয়ার্ড পোয়েট্রি নাইট [ওয়েলস, ২০২০], কৃত্য ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি ফেস্টিভাল [ভারত, ২০২০], আমাদা পোয়েট্রি ফেস্টিভাল [এল সালভাদর, ২০২০] ও পাত্রাস ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভালে [গ্রিস, ২০২০] উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর কবিতা। সম্প্রতি তাঁর কবিতা ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত অস্টিন ম্যাকোলির পোয়েটস্ এন্ড প্লেইসেস্ এবং ব্যাক রুম পোয়েট্রি প্রেসের রেবেল পোয়েটস এন্থোলজি-তে অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে তিনি সম্পাদনা করছেন pratidhwanibd.com।
প্রকাশিত বই :
কাব্যগ্রন্থ—
এলা হি বরষা
যাহ বে এই বাক্য পরকালে হবে
শ্রী চরণে সু
বুদ্ধিজীবী দেখ সবে
কার্ল মার্কসের ধর্ম
রাজার কঙ্কাল [২০২০]
পাপ পুণ্য [হাইকু সংকলন]
স্নায়ুযুদ্ধ [২০২২]
প্রবন্ধ—
নভেরার রূপ [২০১৯]
সম্পাদনা—
চাড়ালনামা (নাসির আলী মামুনসহ যৌথ)
আহমদ ছফা: বাছাই জবাব
সম্পাদিত পত্রিকা—
জাতীয় সাহিত্য (ভাষা ও দর্শনের কাগজ)
তর্কবাংলা
ই-মেইল : shakhawat.tipu@gmail.com
(স্বল্প)