গ্রিক পোয়েট্রি অফিস বাংলাদেশের কবি ও প্রাবন্ধিক সাখাওয়াত টিপুকে ‘ফেলো পোয়েট’ হিসেবে নির্বাচন করে ২০২০ সালে। তারা একটি ‘পোয়েটিক পোর্ট্রেট’ প্রকাশ করে ৬ অক্টোবর ২০২০ সালে। একই সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ‘পেলোপনিসস’ ও ‘কালচার বুক’ পত্রিকায়। এটি নেন গ্রিক কালচার বুকের পোয়েট্রি এডিটর এলিফথেরিয়া থানোবিউ। সম্পাদনা করেন গ্রিক কালচার বুকের পরিচালক ও কবি আদোনিস দি স্কিয়াথাস। সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা তর্জমা উপস্থাপন করা হলো।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
ধরেন, আপনি যখন শিশু ছিলেন, আপনি নিজের মুখোমুখি হয়েছেন, আর অন্যদের কাছে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে, তখন আপনি কী বলবেন? তাতে কি আগের পরিবর্তন টের পান?
সাখাওয়াত টিপু
খুব ভালো! নিজেকে নিজের মুখোমুখি যখন দাঁড় করায় তখন এক নিষ্পাপ শিশুর মুখ ভেসে ওঠে। এটা মূলতই স্মৃতি। স্মৃতি হচ্ছে সেই আয়না, যা কখনো আপন চেহারা দেখাতে প্রতারণা করে না। এটা প্রতিবিম্ব, অভিজ্ঞতার আদল। আমি সেই অবুঝ শিশু যে কিনা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজে নিজে ছড়া কাটতে পারতাম। সেগুলোর হয় তো কোনো অর্থ দাঁড়াতো না। একটা প্রত্যুৎপন্নমতি ব্যাপারের মতো কিংবা ছুড়ে দেওয়া মার্বেল গড়িয়ে যাওয়ার মতো কিংবা বাতাসে ভেসে হারিয়ে যাওয়ার মতো। তবে সেটায় অপূর্ব ভাষা সৃষ্টির নির্মল আনন্দ যাপনের একটা ব্যাপার ছিল। মানে এক অজ্ঞাত ভাষাই আমার পরিচয় তৈরি করেছিল। মানে কথা কিংবা ভাষার অর্থ বোঝার পর আমি বদলাতে থাকি। প্রকৃতির নিয়ম এটাই। হ্যাঁ, আমি নিজেকে যখন নিজের আয়নায় দেখি, সেটা কখনো এতই বিমূর্ত যে অভ্রহীন আয়নার সামনে একজন মানুষ দাঁড়ালে যা হয়, সেটাই। আবার অভ্রওলা আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে প্রশ্ন জাগে, আমি কি এমন ছিলাম? আসলে আমি তো আমি না! অন্য আমি থেকে এই আমিতে এসেছি। অথবা এমনও হতে পারে এই আমি থেকে অন্য আমিতে গেছি। আমি আসলে খেলতে খেলতে ভেঙে যাওয়া টুকরো টুকরো আয়নায় দেখা অসংখ্য আমির সমাহার। আবার টুকরোগুলো জোড়া লাগালে একটা আমিতে রূপান্তর হই। কিন্তু জানা শিশুকালের অনেক কিছু বদলে গেছে আমার। আমি এক নিষ্পাপ শিশু, জানি আমি শুধু শিশু উপাধির এক প্রতীক। যুক্তিহীন জগৎ থেকে যুক্তির জগতে এসেছি। অর্থহীন জগৎ থেকে অর্থপূর্ণ ভাষায় এসেছি। আর সৌন্দর্যের জন্য রূপকের আশ্রয় নিয়েছি। আমির রূপ ভাঙতে ভাঙতে আমরাতে পৌঁছেছি। আমার বদলটা আমরার অচেতনে আছে। আসলে আমি না জানি না, আমি তো আমি না।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
আপনার নিজের কবিতা যখন নিজের কণ্ঠে শোনেন, তখন শুনতে কেমন লাগে?
সাখাওয়াত টিপু
আমি খানিকটা লাজুক প্রকৃতির। দীর্ঘদিন কবিতা পাঠের নানা অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। ভালো কি মন্দ জানি না, কেন জানি কবিতা একা একা মনে মনে পড়ার বিষয় বলে আমার ধারণা জন্মায়। তাই নিজের কবিতা কখনো নিজের কণ্ঠে মনোযোগ দিয়ে শুনিনি। তবে সম্প্রতি কয়েকটি আন্তর্জাতিক পরিসরে কবিতা পাঠ করার সুযোগ হয়। পরে নিজের কবিতাপাঠ শুনে অদ্ভুত এক শিহরণ হয়। মনে হয়েছে, আমি চলতি বাতাসের প্রতিপক্ষ। তাতে নানা স্মৃতি কিংবা ধ্বনির সঙ্গে নানা চিত্ররূপ সামনে আসে। কবিতার অন্তর্গত ঘটনা আর গঠনের সঙ্গে শোনার অনুভূতি পূর্বের অবস্থায় থাকে না। ফলে আমি যা নিজ কণ্ঠে শুনি, কবিতায় মনে হয় আরও গভীর উপাদান থাকে। শোনাটা পরিবেশনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অনেক বেশি পারস্পরিক। তবে একটা ব্যাপার আমি মানি, শোনা কবিতা চেয়ে টেক্সটের কবিতা আরও অনেক গভীর সূক্ষ্ম শিল্প।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
কোন কোন কবি আপনাকে বেশি প্রভাবিত করেছে?
সাখাওয়াত টিপু
আমি অনেকবার এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। তবুও বলি, আমি বেড়ে উঠেছি রাজনৈতিক পরিবারে। তবে কখনো কবি কিংবা সাহিত্যিক হবো সেটা ভাবিনি। কারণ স্কুল জীবনেই আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। ভেবেছিলাম রাজনৈতিক নেতা হবো। তা আর হয়ে ওঠা হয়নি। ছোটবেলায় সবচে বিরক্ত লাগত স্কুলের গৎবাধা পড়াশোনা। কোনো আনন্দ নেই। বৈচিত্র নেই। কিন্তু সাহিত্য, দর্শন, আইনশাস্ত্র আর ধর্মতত্ত্ব আমাকে বেশ টানতো। একটা সময় আমি অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কাছে ফিরে যাই। কাছে যা পাই তাই পড়ি। ভাবলাম, জীবন থেকে সময় চলে যাচ্ছে। কি করব আমি? একটা সময় এসে সাহিত্যের ভেতর ঢুকে পড়লাম। তখন আর সাহিত্য করা ছাড়া অন্য পথ ছিল না। আসলে আমি একটা পথ খুঁজছিলাম, কিভাবে নিজের ভাষাকে মুক্ত করা যায়। চিন্তা প্রকাশের নতুন ধরন কিভাবে রপ্ত করা যায়। কিভাবে নতুন অধরা জগতে পৌঁছানো যায়।
আমার শুরুর দিকে বাংলা প্রাচীন আর আধুনিক কবিদের প্রভাব ছিল। অনেক কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী নাম বলে শেষ করা যাবে না। আমি সব সময় বোঝার চেষ্টা করেছি ভাষা আর চিন্তার পদ্ধতিগত কাঠামো কেমন! তারা কেমন সৌন্দর্যের সন্ধান করছেন। যাতে নিজের একটা নতুন পথ সৃষ্টি করা যায়। প্রথম প্রথম আমার পাঠের প্রক্রিয়া ছিল, পঠিত সাহিত্যকে নিয়ে প্রশ্ন করা? সেটার ভেতরগত দুর্বলতা আর রূপ সন্ধান করা। কোনো কিছুর রূপ একবার জেনে গেলে সেটাতে আগ্রহ এমনিতেই কমে যায়। ফলে নির্দিষ্ট কারো প্রভাবটা সরাসরি কাজ করে নি আমার বেলায়। হয়তো প্রভাবটা কাজ করেছে আনকন্সাসলি। অবে আমার কবিতায় সাহিত্যের চেয়ে দর্শনের প্রভাব বেশি।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
কবির জীবনের জন্য কবিতা সমস্যা, কারণ এটা জীবন চালায় না। পেশাগতভাবে বলেন, আপনি কিভাবে জীবনের মুখোমুখি হন?
সাখাওয়াত টিপু
সত্যিকার অর্থে, আমাদের দেশের বইয়ের বাজার খুব ছোট। ফলে একজন কবির পক্ষে কবিতা দিয়ে জীবন চালানো খুবই কঠিন। অন্যদেশে হয়তো কবি কিংবা লেখকদের জীবন চালানোর সংগ্রাম তেমন নেই। যেটা বাংলাদেশে খুবই কঠিন। লেখক সম্মানি খুবই কম। ফলে একজন কবিকে ভিন্ন পেশা গ্রহণ করতে হয়। পেশাগত ভাবে আমি একজন সাংবাদিক। তবে একটা কথা বলতে হয়, কবিতা ব্যক্তি কিংবা সমষ্টির আত্মাকে মুক্তি দেয়। আর পেশা জীবনকে রক্ষা করে। পেশা ও কবিতার এই বিপরীতমুখী পথ হয়তো কবির নতুন জগত সৃষ্টি করে। আমি অপেক্ষা করছি সেই সময়ের আর পরিস্থিতির, কবিতাই আমার জীবনকে বদলে দেবে।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
কবিতায় আপনি যে ঘটনাবলি লিখেছেন, সেটা কিভাবে আপনার সঙ্গে দেখা করে?
সাখাওয়াত টিপু
আমি কখনো আমার কবিতার মুখোমুখি হতে চাই না। কবিতা নিজেই তার ব্যাখ্যা দেয়। সময়কে অতিক্রম করে। লেখার পর ঘটনা কিংবা কার্যকারণ অনেক বদলে যায়। কারণ বাস্তবতা হয়তো কবিতাকে ভাষা দেয়। কিন্তু কবির ভাষা বাস্তবতার গল্পকে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়। আর সেটা হয়ে ওঠে নতুন গল্পের বাস্তবতা। ভিন্ন কাঠামো, ভিন্ন জীবন, ভিন্ন চিন্তা আর ভিন্ন নন্দনতত্ত্ব।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
অন্য কবির শিল্পের থেকে আপনার শিল্পের আলাদা কোথায়?
সাখাওয়াত টিপু
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হ্য়তো পাঠক ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু একজন প্রকৃত কবি নানা ভাবে নিজেকে অতিক্রম করে। একটা নতুন লেখা তখনই সম্ভব যেখানে নতুন সময়, নতুন চিন্তা, নতুন সৌন্দর্য বোধ কবির ভেতরে কাজ করে। ফলে তার কবিতা, অন্য কবিদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তাই। আমি একটা নতুন বাক্য কিংবা নতুন সৌন্দর্যের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করি। মানে আমার বাস্তবতা কিংবা দেখার দৃষ্টি অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। সেটা ভাষায় হোক, ফর্মে হোক, নন্দনতত্ত্বে হোক কিংবা অন্য কোনো মূর্ত বা বিমূর্ত বাস্তবতায় হোক।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
কবিতা আর সাহিত্যের বিষয়গুলো প্রায়শ বিতর্কের বিষয় আকারে হাজির হয়। আপনার অভিজ্ঞতা কি রকম?
সাখাওয়াত টিপু
যে কোনো যুক্তিপূর্ণ আলোচনা কবিতা কিংবা সাহিত্যের জন্য ভালো। ভালো সমালোচনা সাহিত্যকে নতুন রূপে চিহ্নিত করে। আমি ব্যাপারটাকে বিলক্ষণ হিসেবে দেখি। কারণ যে সাহিত্য কিংবা কবিতা পাঠককে নতুন পাঠের অভিজ্ঞতা দেয় না, সেটা কখনো ভালো কবিতা কিংবা সাহিত্য হতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা দারুণ রকমের। আমি ভালো আর মন্দ দুই ধরনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছি। ভালো অভিজ্ঞতা হলো, নিজের চিন্তার নতুন পথ দেখা। আর মন্দ অভিজ্ঞতা হলো, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা। মন্দটাকে আমি এড়িয়ে গেছি সব সময়।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
কবিতা সমকাল ও দীর্ঘকালের বৈশিষ্টযুক্ত। কিভাবে আপনি আপনার কাব্যিক পথ নির্মাণ করেন?
সাখাওয়াত টিপু
প্রথমত একজন কবি একবারই জন্মায়। কবি মাত্রই কবিই, কারণ কবিতাই একজন কবির আপন চিহ্ন। কিন্তু কবিতার যাত্রাপথ অনেক দীর্ঘ। দীর্ঘ যাত্রায় কবি নিজেকে বারবার বদলান। এই বদলটা স্বাভাবিক। সময়, ইতিহাস, রাজনীতি ও বাস্তবতা বদলের মতোই একজন কবি নিজেকে নতুন ভাবে উপস্থাপন করেন। এটাই প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম। তবে, একজন কবি নিজেকে প্রতিনিয়ত অতিক্রম করতে হয়। কারণ নিজে ছাড়া একজন কবির কোনো প্রতিপক্ষ হয় না।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
ভবিষ্যতে, আপনি যে নিজের প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছেন সেটা কোথায় খুঁজে পাবেন?
সাখাওয়াত টিপু
আমি নিজেকে অচেনা পাঠককের কাছে খুঁজে পেতে চাই। আমার কবিতা যাপন আমাকে কোথায় নিয়ে যায়, বলা মুশকিল। মনে হয়, আমি সেই কবিতার বৃক্ষ, যেখানে নানা রঙের পাখি বসবে। সুরে সুরে গান গাইবে। এমন অচেনা প্রকৃতির ভেতর আমি বেচে থাকতে চাই। কবিতা এমন এক রূপক, যা সময় আর দেশকে অতিক্রম করে। সেই অতিক্রমের পথই আমার ভবিষ্যত। আর সবচে সত্য, ফুল ফুটলে মৌমাছি আসবে। কবি ও কবিতা তেমনি এক মধুর ভাণ্ড।
এলিফথেরিয়া থানোবিউ
সময়ের আলোকে টেকসই কবিতাকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
সাখাওয়াত টিপু
ইতিহাস মানে অতীত নয়। মানে বর্তমান। কেননা বর্তমান স্থির নয়। এখন যা বর্তমান, একটু পর সেটা অতীত। বর্তমান মানে অভিজ্ঞতা। তাই কবিতা সর্বদা বর্তমানকে পেছনে ফেলে। ফলে কবিতা মাত্রই ভবিষ্যত। কবিতা টিকে থাকে অভিজ্ঞতার ভাষা ও সময়কে হাজির করার ভেতর দিয়ে। কল্পনা সেখানে সহায়। আর যে কোনো অচেনা চিত্রকল্প মানে ভবিষ্যতের দেখা। নতুন চিত্রকল্প নতুন কবিতার জন্ম দেয়। যাকে আমরা ভবিষ্যত বলি। সত্যিকারের কবিতা যে কোনো সময়ের মুখোমুখি হতে পারে। বা মুখোমুখি হতে বাধ্য। পাঠক সেটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না।