সতিরিয়াস পাস্তাকাসের কবিতা

একটি আপেল-কাটা! কেউ বসেছিল এখানে আপেল কামড়ে। তারপর বিচ্যুত হলেন তিনি, একদিন ইতিহাসে নথি হলো এথেন্সের তিনটি মৃত্যু। কেউ একজন অন্য কোনো স্থানে হারিয়ে যাওয়ার আগে সিগারেটের লেজ রেখেছিলেন। অথচ ইতিহাসে লেখা : আপেল-কাটা, বিদীর্ণ দেহ, ছাই। *** আমি একার জন্য টেবিল পাতলাম আমার জন্য, টিভি চালু করলাম বসে পড়লাম, যাতে বেঁচে যায় পুঁজিবাদ আমরা আমাদের জন্য সকল কিছু ত্যাগ করলাম! ফোন ডাকে, তুমি জিজ্ঞাসিলে : যদি আসতে পারো তুমি। তুমি আসবে, আমি টিভি বন্ধ করলাম। ওঠো, পুঁজিবাদে রক্ত ঝরছে আর মারা যাচ্ছে। আমি বলেছিলাম, আমি টেবিলক্লথ বদলে ছিলাম। আমি দুয়ের জন্য টেবিল পাতলাম। *** তোমাকে দেখতে হবে অবশ্য সিগারেট থেকে ছাই ঝরছে পেছনে অবনত চাঁদোয়া ভেতরে সুশোভিত মনোহর গাছপালা দ্যুতি ছড়াচ্ছে সকাল চারটায় ছিলাম জেগে আবার সারারাত অবিরাম বৃষ্টির ভেতর, এক বোতল ওউজু আর অসংখ্য সিগারেটে, সবকিছু অবশ্য চোখ এড়ায় নি তোমার, লেখার নিছক পাদটীকা আমার নিজের রাতের জন্য, একটি অভিজ্ঞান আর ভাষ্য অগণিত সব ক্ষতির জন্য; যে হেরেছে সে সবই হেরেছে শেষ নাগাদ ঘুমও হারাল তার। নোট: গ্রিসের সুস্বাদু দামি মদ ‘ওউজু’। *** আমি আমার দেহ হারানোর আগে আমি আমার মন হারিয়েছি—আবার: আমি আমার মন হারানোর আগে আমি আমার দেহ হারাচ্ছি—শুরু থেকে ফের: আমি আমার মন হারালাম। আমি আমার দেহ হারালাম । আবার শুরুতে ফিরে যাই: আমি আমার দেহ হারালাম। আমি আমার মন হারালাম হাত হতে এক রাতে আমাকে প্রস্তাব করেছিল কম্পিত মাংস। *** এক পাতাল, এক তারা ‘কখনই’ কিংবা ‘সর্বক্ষণ’ দুয়ের ভেতর দুই অন্ধকার। গাড়িগুলো ছুটছে ওরোপোসের দিকে, চলো বলি ইরেত্রিয়ার দিকে, নিশাগমকালে ঠিক মে’র আগে, এক মহিলার ছায়া পড়েছিল পরে আসা মহিলার দিকে: তবে গতি ভাগ করা যাক ছায়াতেই আলো ভাগ করবার মতো । মাথা ঝিম ধরা কিলোমিটারে, মাইনে উড়িয়ে, অবিকল মাতালের মতোই আর বারবার মদের দোকানি মাপছিল।

ছবি : জ্যাক হার্শম্যান ও সতিরিয়াস পাস্তাকাস তারান্তো, ইতালি, সেপ্টেম্বর ২০১৯

অনুবাদকের ভাষ্য :

প্রখ্যাত গ্রিক কবি সতিরিয়াস পাস্তাকাসের জন্ম গ্রিসের লরিসা শহরে, ১৯৫৪ সালে। তিনি পড়াশোনা শেষ করেছেন রোমের স্পিনোজা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ওষুধশাস্ত্রে। উচ্চতর শিক্ষা নেন মনোবিজ্ঞানে। কবি, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও মনোবিজ্ঞানী সতিরিয়াস ২০০১ সালে ইতালির ভেরেনায় প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব কাব্য একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য। তিনি ইতালির ধ্রুপদী কবি উমবার্তো সাবা, সান্দ্রো পেনা, পাওলো পাসিলিনি, আলফান্সো গাতো ও ভিত্তোরিও সেনেরির কবিতা অনুবাদ করেন গ্রিক ভাষায়। এবং ধ্রুপদী গ্রিক কবিদের কবিতাও অন্যভাষায় অনুবাদ করেছেন তিনি।

সতিরিয়াসের বইয়ের সংখ্যা অসংখ্য। অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা। কবির সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয় বিশ্ব কবিতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে। এক্সিটিরিয়ান উদ্যোগে অনলাইন কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। নানা দেশের কবিরা কবিতা পড়েছেন সেই অনুষ্ঠানে। তিনি খুব সানন্দ্যে আমাকে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সিসিতীয়’ পাঠান। ‘ফুড লাইন’ নামে গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন বিখ্যাত বিট কবি জ্যাক হার্শম্যান ও আগেলোস সাকিস। অনুবাদকৃত কবিতাগুলো তার বিখ্যাতগ্রন্থ ‘সিসিতীয়’ [ফুড লাইন থেকে নেওয়া হয়। ২০১২ সালে গ্রিক ভাষায় প্রকাশিত হয় এটি।

কী আছে সতিরিয়াসের কবিতায়? প্রথমত মনে হতে পারে প্রাত্যহিকতার স্বভাব ভরা। কিন্তু শুধু তা নয়, তিনি ঐতিহাসিকতাকে বস্তুর ভেতর সহজে প্রবেশ করিয়ে দেন। সেটা নিছক প্রাত্যহিক বস্তুর ভাব নয়, মর্মবেদনার সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার এক অপূর্ব স্মৃতির সঞ্চারণ। তিনি এমন এক প্রতীকী ভাষার সন্ধান করেছেন, ইতিহাস, রাজনীতি ও সমকালীন ভাষ্যে অনন্য রূপ নিয়েছে সেটা। প্রিয় বন্ধু-কবি সতিরিয়াসের ‘ফুড লাইন’ পড়তে গিয়ে আমি নতুন এক ব্যঞ্জনাময় কবিতার সন্ধান পেলাম। সানন্দে সহযোগিতার জন্য সতিরিয়াস পাস্তাকাস, জ্যাক হার্শম্যান ও আগেলোস সাকিসের কাছে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

সাখাওয়াত টিপু

সাখাওয়াত টিপু

জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিল্প-সমালোচক। নিয়মিত...বিস্তারিত