আমার একলা পথের সাথি : ১৮

                                        পর্ব-১৭

 পর্ব-১৮

ড. ফরিদা জামান অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ—তা সত্ত্বেও তিনি আমার বইয়ের প্রচ্ছদ দ্রুতই করে দিলেন। চারুকলায় গিয়ে উনার কাছ থেকে প্রচ্ছদ সংগ্রহ করে খানিক সময় মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। অদ্ভুত সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন ড. ফরিদা জামান! বইয়ের ফ্রন্ট-কভার জুড়ে বেহুলা-লখাই মিথের উজ্জ্বল রঙগুলো ব্যবহার করেছেন তিনি। হলদেটে এক নারীমুখের দুই পাশ দিয়ে অজস্র সরীসৃপ লকলকে জিব বের করে উঠে গেছে মাথার দিকে। ড. শাহীনের চট্টগ্রামের ঠিকানায় আমি সেই প্রচ্ছদ পোস্ট করে দিলাম। যথারীতি বইমেলা শুরু হয়ে গেল, কিন্তু আমার বইয়ের কোনো হদিস নাই।


তোমার লেখা নেই! ছি! তোমাকে ছাড়া কী করে নব্বই দশকের সংকলন পূর্ণ হতে পারে?


আমার বইয়ের হদিস না-থাকলে কী হবে, ২০০০-এর বইমেলায় একেবারে শুরুতেই এসে গিয়েছে নব্বই দশকের গল্পের এক সংকলন। এই সংকলনের সম্পাদক রবিউল করিম। তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা ‘ব্যাস’ থেকে গ্রন্থখানি প্রকাশিত হয়েছে। মোটমাট ২২ জনের গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি। যাঁদের গল্প স্থান পেয়েছে ওই গ্রন্থে তাঁরা হলেন—অদিতি ফাল্গুনি, আকমল হোসেন নিপু, আহমাদ মোস্তফা কামাল, খোকন কায়সার, চঞ্চল আশরাফ, জাকির তালুকদার, প্রশান্ত মৃধা, মশিউল আলম, মাসুদুল হক, মাহবুব মোর্শেদ, মির্জা তাহের জামিল, রবিউল করিম, রাখাল রাহা, রাজা শহীদুল আসলাম, রাজীব নূর, রায়হান রাইন, রোকন রহমান, শাহনাজ মুন্নী, শাহাদুজ্জামান, শাহীন আখতার, সাকী মোহাম্মদ ও সাদ কামালী।

একটা দশকের শেষ ঘণ্টা বাজতে না বাজতেই হুড়মুড় করে ‘দশক-ওয়ারি’ সম্পাদনার কাজ যিনি সম্পন্ন করেন, এত বছর বাদে সেই ডিপ্লোম্যাসির কিছুটা হলেও যেন উপলব্ধি করতে শিখেছি। নিজের টলায়মান লেখক অবস্থানকে পাকাপোক্ত করতেই হয়তো ওইসব তড়িঘড়ি সম্পাদনা আকসারই হয়। এবং রবিউল করিমও নিশ্চয়ই তেমনটি অনুভব করেই ওই কাণ্ডটি করে থাকবেন। নইলে একেবারে ২০০০ সাল শুরু হতে না হতেই তিনি কেন আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন নব্বইয়ের অজস্র প্রতাপশালী লেখকদের মাঝ থেকে আধখেঁচড়া এক প্রতিবেদন?

শাহরিয়ার ভাই আমাকে একদিন বললেন, পাপড়ি, রবিউলের ওই সংকলনের দিকে তাকানো যায় না। তোমার লেখা নেই! ছি! তোমাকে ছাড়া কী করে নব্বই দশকের সংকলন পূর্ণ হতে পারে? আমি সত্যি ভাবতেও পারি না তোমাকে বাদ দিয়ে নব্বই দশকের লেখকদের কোনো লিস্ট করা যায়!

শাহরিয়ার ভাইয়ের কথা শুনে আমি মাথা নিচু করে বললাম—

কেউ আমাকে সেরকম লেখক মনে না-ই করতে পারে, তাতে আমি তো সমস্যার কিছু দেখি না, শাহরিয়ার ভাই।

শাহরিয়ার ভাই গলায় বিদ্রূপের হুল ফুটিয়ে বললেন—

তাই নাকি? সাহিত্যের হিসাবনিকাশ জলের মতো এতই তরল মনে করো নাকি?

আমি আর উত্তর দিতে পারলাম না।

রবিউল করিমের ‘ব্যাস প্রকাশনা’র ‘নব্বই দশকের গল্প’ বইটার গায়ের দাম ছিল ১৬০.০০ টাকা। শাহীনুর রহমানের প্রচ্ছদ। প্রকাশকাল, ফাল্গুন ১৪০৬: ফেব্রুয়ারি ২০০০। এবং সে বই আমি সানন্দ চিত্তেই কিনে আনলাম। এবং তা রবিউল করিমের কাছ থেকেই আনলাম। কারণ আমার সতীর্থ-বন্ধুদের লেখা গল্পগুলো আমি খুব ভালো করে পড়ে দেখতে চাই বলে।

‘ব্যাস’ প্রকাশনার ওই বইটির আগাগোড়াতে ছিল যত্নের ছাপ। বোঝা গিয়েছিল, রবিউল করিম বেশ জ্ঞানের নাড়ি টনটনে রেখেই বইটার সম্পাদনা করেছেন এবং তাঁর প্রকাশনা সংস্থাকে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে খাটাখাটুনিও করে চলেছেন।

রবিউল করিমের ‘নব্বই দশকের গল্প’ সম্পাদনার  ঠিক ১০ বছর বাদে খেলাটা আমার হাতেও ঘুরে এসেছিল। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, প্রকৃতি চিরকালই নির্বিকল্প! ফলত আমিও ট্রাম্প বা ওভার ট্রাম্প করার স্কোপ পেয়েছিলাম। আমার হাতেও তখন তাসের তিন-টেক্কা এসে গিয়েছিল। এবং ঠিক আমার নাগালের মাঝেই ছিল তাসের দেশের সাহেব-বিবিদের আলিশান বিত্ত-বৈভবের ঠমকঠামক ।


একটা বই যতখানি খারাপ হলে তাকে একেবারে ‘খারাপ বই’ নিশ্চিন্তে বলা যায়, ঠিক ততটাই খারাপ হয়েছে আমার বইটা।


নব্বইয়ের দশক অতিক্রান্ত হওয়ার প্রায় এক যুগ পরে আমি বাংলা একাডেমি থেকে সম্পাদনা করেছিলাম—‘বাংলাদেশের ছোটগল্প: নব্বইয়ের দশক’। তখন আমিও পারতাম, রবিউল করিমের মতো লেখককে বাদ দিয়ে বা তাঁর সঙ্গীদের অন্তর্ভুক্ত না করে ওই সংকলনটি সম্পাদনা করতে। তাছাড়া রবিউল করিম কোনোভাবেই শাহাদুজ্জামানের মতো ক্ল্যাসিক-লেখক নন, এমনকি রোকন রহমানের মতো তুখোড় লেখকও তিনি নন—ফলত তাঁকে সংকলন থেকে বাদ দিলে কোনো বিপুলাকারের ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হতো না। অর্থাৎ তাঁকে বাদ দিলেও আমার সম্পাদিত বইয়ের কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটত না। কিন্তু আমি তা করি নাই, কারণ আমি বঙ্কিমের ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের সেই বাক্যটা সদাই স্মরণে রেখেছি—তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?

যদিও আমার এই ‘উত্তমতা’ প্রদর্শন করতে করতে নিজের জীবনের কত ১২টা যে আমি বাজিয়েছি, তবুও সেসব কিছুই আমি কোনোদিনই ভ্রুক্ষেপ করি নাই।

বইমেলার ঠিক মাঝামাঝি সময়ে আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’ প্রকাশিত হলো। কিন্তু সদ্য প্রকাশিত বই হাতে পেয়ে আমি প্রচণ্ড মনঃকষ্টে বিদীর্ণ হয়ে গেলাম! নিজের বইয়ের জঘন্য শ্রীখানি অবলোকন করে দুই হাতে চোখ ঢেকে দীর্ঘক্ষণ নীরব হয়ে বসে রইলাম। একটা বই যতখানি খারাপ হলে তাকে একেবারে ‘খারাপ বই’ নিশ্চিন্তে বলা যায়, ঠিক ততটাই খারাপ হয়েছে আমার বইটা। অদিতি ফাল্গুনি গায়েনের পাঠিয়ে দেয়া হার্ডকপি থেকে কম্পোজের কাজ করা হয়েছে চট্টগ্রামে। আমি সেসবের কিছুই জানি না। গল্পগুলোর প্রুফরিডিং করা হয় নাই বললেই চলে। প্রায় প্রতিটা লাইনে লাইনে শব্দ ভুল। যেমন—'বড় বড় হাঁসের ডিম’ হয়ে আছে—‘বগ বগ হাঁসের ডিম’, ‘শিউলিফুল’ হয়ে আছে ‘শিউফুল’—এরকম মারাত্মক ভুলভালে ঠাসা। আঞ্চলিক শব্দগুলোর ২৪টা বেজে যা-তা অবস্থা হয়ে আছে। বই খুলে দেখার পর ‘সাধা লক্ষ্ণী পায়ে ঠেলতে নাই’ এই প্রবাদ আমার কাছে পলকে ধূলিসাৎ হয়ে গেল! নিজের মাথার চুল নিজেই ছেঁড়ার দশা প্রাপ্ত হয়ে আমি ভাবতে লাগলাম—

এইরকম ভুল সিদ্ধান্ত আমি কিভাবে নিলাম? অদিতি ফাল্গুনী গায়েনকে আমি সেরকম ভালো করে চিনি না, জানি না, তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব দূরে থাকুক, সে তো আমার তেমন পরিচিতও নয়—তাঁর কথায় আমি আস্থা রাখতে কেন গেলাম? আমার মাথায় কী তখন কোনো গণ্ডগোল হয়েছিল? 

বইটার ভিতর ও বাইর একই রকম দুর্দশাগ্রস্ত—ড. ফরিদা জামানের যত্নের হাতে এঁকে দেয়া সেই প্রচ্ছদের কিছুই আর অবশিষ্ট নাই! নারীমুখের দুইপার্শ্বের বহু-বর্ণিল সরীসৃপগুলোকে কেটেকুটে একাকার করে প্রচ্ছদ করা হয়েছে। সব রঙ ছাপিয়ে হলুদ রঙের এক বিদঘুটে অবয়ব শুধু দৃশ্যমান!

এমত অবস্থায় আমি যেন কাঁদতেও ভুলে গেলাম। আমার অবস্থা দাঁড়াল ‘অধিক শোকে পাথর’ হয়ে যাওয়ার মতো।

প্রথম গল্পগ্রন্থটির এমন শোচনীয় অবস্থা হওয়া সত্ত্বেও আমি কিন্তু মনের ভুলেও ভাবি নাই, বইটা অন্য কোনো প্রকাশনা থেকে পুনরায় প্রকাশ করা দরকার। ভাবি নাই এজন্য যে, ‘খনা প্রকাশন’ গুচ্ছের টাকাপয়সা খরচ করে আমার বইটা প্রকাশ করেছে। এখন সেই একই বই ফের অন্য কোনো প্রকাশনা থেকে ‘রি-প্রিন্ট’ হলে দুই প্রকাশকই ‘লসের’ কারবারে পড়বে। যদিও আমি এক টাকাও বিনিয়োগ করি নাই এই গ্রন্থের পেছনে—তবুও আমি সজ্ঞানে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই নাই। অথচ এখনকার নব্য-লিখিয়েরা, যারা সাহিত্যের ‘স’ বর্ণটিও এখনো শিখে উঠতে পারে নাই, তারা কত দ্রুতই না কত স্থানে, কতভাবেই না নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে! এক প্রকাশককে অবলীলায় ‘লস’ খাইয়ে অন্য প্রকাশকের দ্বারস্থ হয়। তাদের বিবেকের কোনো কামড়ানি নাই বা শ্লাঘা প্রকাশের লজ্জাও নাই। আছে শুধু কাকে ছেড়ে কাকে ধরে নিজেদের ‘লেখক’ হিসেবে জাহির করার পায়তারা।


‘খনা প্রকাশনের’ বইগুলো রাখা হলো বইমেলার ‘পাঠক সমাবেশের’ স্টলে। কিন্তু কোনো পাঠক খুঁজেও বইটা পেল না।


চারপাশের এতসব ‘পণ্যদের’ ভিড়ে নিজেকে বড়ই অসহায় মনে হয়। বড়ই বেমানান মনে হয়। কিন্তু তবুও আমি আমার পুরাতন আদর্শেই অটল থাকতে চাই। এবং আমি হলপ করে এটাও জানি, আমি হইলাম জলে বাস করা সেই বোকা ‘কুমির’—যে চিরকালই ভেবেছে—Fate Never Ends!

ভাঙাচোরা মন নিয়ে আমি সেই ভুলে-ভরা-বই মাত্র চার-পাঁচজন হিতার্থীর কাছে পৌঁছে দিতে পারলাম। আর ‘খনা প্রকাশনের’ বইগুলো রাখা হলো বইমেলার ‘পাঠক সমাবেশের’ স্টলে। কিন্তু কোনো পাঠক খুঁজেও বইটা পেল না। ড. শাহীন আমাকে জানালেন যে, তিনি নিজে গিয়ে দেখেছেন ‘পাঠক সমাবেশ’ বইগুলো কোথাও ডিসপ্লে করে নাই। অবশ্য তা করার কথাও নয়। ‘পাঠক সমাবেশের’ নিজেদের প্রকাশনার বই তো নয় এটা, তাহলে তারা অযথা কেনই-বা এই বই ডিসপ্লে করতে যাবে? আমি আমার চিরকালের ‘মন্দভাগ্যের’ কথা মনে মনে স্মরণে এনে তুমুল বেদনার ভার সামান্য লাঘব করতে চাইলাম।

দ্বিধা ও অত্যন্ত শরমিন্দিতভাবে একটা বই সাজ্জাদ ভাইয়ের হাতে দিলাম। সাজ্জাদ ভাই বইটা পাশে থাকা ব্রাত্য রাইসুর কাছে দিয়ে বললেন—

রাইসু, বইটার নিউজ করে দিয়েন তো। 

বইমেলা চলাকালীন আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে প্রায় প্রতিটা দৈনিকের পাতা উলটে গেলাম, কিন্তু হায়! কোথাও আমার বইটার নামনিশানাও দেখতে পেলাম না। প্রচ্ছদ ছাপা হওয়া তো সোনার পাথর বাটি! [অথচ আজ আর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নাই কে আমার বইয়ের নাম ছাপল কী ছাপল না! আমার নাম কেউ বলল কী বলল না। সময়ে কতকিছুই যে সয়ে যায় মানুষের! হায়!  

It's really a wonder that I haven't dropped all my ideals, because they seem so absurd and impossible to carry out. Yet I keep them, because in spite of everything, I still believe that people are really good at heart.

                                            [Anne Frank, The Diary of a Young Girl


পর্ব-১৯

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা