আমার একলা পথের সাথি : ২০

পর্ব-১৯

পর্ব-২০

ড. শাহীনের আক্রমণাত্মক আচরণে আমি সত্যিই সত্যিই মর্মাহত হয়েছিলাম। আর ড. শাহীনও আমার উপর রাগান্বিত ছিলেন কেন ‘খনা প্রকাশনের’ কোনো প্রশংসাই করা হয় নাই? কিন্তু আমার সেখানে কী বা কতটা দোষ ছিল বা কী করণীয় ছিল? সুব্রত বড়ুয়া বইয়ের আলোচনাই করেছিলেন, প্রকাশনার নয়। এবং একজন সত্যিকার সাহিত্য-বোদ্ধা তো তা-ই করবেন, নাকি? যদিও বই প্রকাশের জন্য একজন প্রকাশক ধন্যবাদার্হ অবশ্যই। কিন্তু কোনো প্রকাশনা নিয়ে ঢালাও আলোচনা কিভাবে সম্ভব? ড. শাহীনই-বা তা চেয়েছিলেন কেন? আজ বহু বছর বাদে এসব লিখতে গিয়ে আমি কিছুতেই সমীকরণ মেলাতে পারি না। প্রকাশকের কথা বলা হয় নাই বলে লেখকের ওপর চড়াও হতে হবে—এমন আজগুবি ঘটনা আমি ছাড়া আর কার সঙ্গেই বা এ পৃথিবীতে ঘটতে পারে? কারণ আমি এ জীবনে কোনোকিছুই স্মুথলি পাব না সেকথা তো চিরসত্য। এমনকি একটা বুনোফুল হাতে পাওয়ার আগে সহস্রবার কাঁটার আঘাত সহ্য করাই তো আমার চিরাচরিত নিয়তি!


দলবাজি না করলে তা ‘প্রথম আলোর’ সাহিত্যপাতাই বা হয় কী করে?


প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির বইমেলার পরে মে/জুন মাসের দিকে প্রথম আলোর শুক্রবারের ‘সাহিত্য সাময়িকীর’ পাতা তখন ‘সেরা ১০ তরুণের বই’ নামে স্পেশাল ইস্যু করত। ওই সংখ্যায় সময়ের তরুণদের মাঝে যারা মোটামুটি ভালো লিখত তাদের নির্বাচিত বইয়ের আলোচনা গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতো। [তার মানে এই নয় যে ওইসব গ্রন্থ নির্বাচন ১০০% শাদা ছিল? দলবাজি না করলে তা ‘প্রথম আলোর’ সাহিত্যপাতাই বা হয় কী করে?

তখন তেমন কোনো মানসম্মত সাহিত্যপাতাও বাজারে ছিল না। আবু হাসান শাহরিয়ার ভাইয়ের ‘খোলা জানালা’ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ‘খোলা জানালার’ পরে শাহরিয়ার ভাই একটা সাহিত্য-টেবলয়েড করতে শুরু করেছিলেন ‘অন্যপ্রান্তর’ নামে [যার উদ্বোধনী সংখ্যায় ‘হরিতকী নির্যাস’ নামে এই অধমের একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। তিন-চার সংখ্যার পরে শাহরিয়ার ভাই সেটাও আর কন্টিনিউ করতে পারেন নাই। [শাহরিয়ার ভাই খুবই অস্থির প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কোনো কিছুতেই থিতু হওয়া তাঁর স্বভাববিরুদ্ধই ছিল। আর ছিল সেই বহুকালের প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো দৈনিক সংবাদের ‘সাময়িকী’।

স্বভাবতই তরুণদের নজর ছিল ‘প্রথম আলোর’ নির্বাচনের দিকে। বইমেলার পরে কোন কোন বইকে তাদের বিবেচনায় সেরা করা হলো এ নিয়ে কৌতূহল থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক।

‘প্রথম আলো’ শুধু তরুণদের বই নিয়েই বিশেষ আয়োজন করত, তেমন নয়। তাদের ছিল ‘সেরা ১০ মননশীল বই’। ছিল ‘সেরা ১০ সৃজনশীল বই’। যারা মননশীল ও সৃজনশীলের বইয়ের লিস্টিতে স্থান পেতেন, তাঁরা বয়স এবং লেখার-কাল তরুণদের চাইতে অগ্রগামী ছিল। ফলত এই ‘সেরা ১০ তরুণ’ নিয়েই সবিশেষ আগ্রহ কম-বেশি সবারই ছিল।

২০০০ সালের বইমেলা শেষ হলে ‘প্রথম আলো’ যখন ‘সেরা ১০ তরুণের বই’ নিয়ে তাদের স্পেশাল ইস্যুটি প্রকাশ করল, আমি বিস্ময় নিয়ে দেখলাম—তাতে আমার বইটিও রয়েছে! লাইনে লাইনে অজস্র ভুলে ভরা, বাজে প্রচ্ছদ সম্বলিত আমার প্রথম গল্পগ্রন্থের আলোচনা করেছেন কবি কামরুল হাসান। অথচ ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে আমার বইয়ের নামটাও ‘প্রথম আলোর’ কোত্থাও ছাপা হয় নাই।

‘প্রথম আলো’ চিরকালই প্রচার-প্রসার ছাড়াও ছোটলোকিতেও সবার সেরা! তারা আমার বইটি ‘সেরা ১০ তরুণের বই’ এর নির্বাচনে রাখার পরেও যতোটা পারা যায় ছোটলোকি করে গিয়েছে। আমার গল্পগ্রন্থ, প্রশান্ত মৃধার ‘কুহক বিভ্রম’সহ আরও দুই-একজনের বইয়ের আলোচনা ছেপেছে একেবারে ১০ বইয়ের শেষ বই হিসেবে। সেরা ১০-এর নির্বাচনে স্থান পাওয়া একটা নিবন্ধের বই ও আরো দুই-একজনের বইকে একই কুমিরছানা বারংবার দেখানোর কায়দায় কত কারসাজিই না করেছে প্রথম আলো! ‘সাময়িকীর’ প্রথম পৃষ্ঠায় নানান ট্রিকস অ্যাপ্ল্যাই করে বইগুলোর প্রচ্ছদ প্রদর্শন করেছে। ‘প্রথম আলোর’ মিত্র যারা তাদের অত্যধিক গুরুত্ব দেবার বিবেচনায় অন্য বইগুলোকে অকারণেই ম্লান করে দিয়েছে। অথচ নির্বাচিত ১০ বইয়ের আলোচনাই সমান গুরুত্ব দিয়ে ছাপা দরকার ছিল। এবং ওইসব বইয়ের প্রচ্ছদ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একই ট্রিটমেন্ট বাঞ্ছনীয় ছিল।

‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’র আলোচক কবি কামরুল হাসানকে তখনো আমি চিনি না। চিনপরিচয়ই হয় নাই, কথাবার্তা দূরে থাকুক। আজও স্পষ্ট মনে করতে পারি, কবি কামরুল হাসান আমার আটটি গল্প ধরে ধরে আলোচনা করেছিলেন। এবং যা কিছু বলেছিলেন, তার প্রায় সবই ছিল পজিটিভ আলোচনা।


জীবনের এসব দীর্ঘশ্বাসমোড়ানো কষ্টকর বিষয়গুলো পাপড়ি রহমান নির্বিকারভাবে তুলে আনেন।


শুক্রবার ১২ মে ২০০০ সালের প্রথম আলোর সাময়িকীর পাতায় কবি কামরুল হাসান বইটির আলোচনায় লিখেছিলেন—

পাপড়ি রহমান আধুনিক ও অন্ধকার জীবনে আলো ফেলা সংশয়হীন এক গদ্য ভাষ্যকার। গদ্য ভাষ্যকার শব্দবন্ধটি অবশ্য খুব সংশয়হীনভাবে লিখতে পারছি না, কেননা তার লেখায় রয়েছে এক কাব্যিক প্রবাহ এবং প্রচুর পদ্যের উৎকলন। লোকগাথা, পুঁথি, প্রবচন, পুরনো কাব্য—এমনি  অজস্র উৎস থেকে তিনি তার গল্পের শরীরে পদ্যাংশ জুড়ে দেন। বইটির প্রধান দুটি গল্পে এসবের ব্যবহার প্রায় সম্পৃক্ত গদ্যের মতো, এসব চরণাংশের দারুণ অন্বয়ও রয়েছে গল্পের প্রেক্ষাপটের  সাথে। বইটির নামগল্প লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রায় লোভী মৌলবীর কুনজর ‘সোন্দর’ ছেনোরা বিবির উপর পড়াকে কাকের চড়ুই পাখির বুক খাওয়ায় ইচ্ছের সঙ্গে চমৎকার জুড়েছেন , যার পূর্বলেখ ওই ছড়াকাটার ভেতর আগেই বুনেছেন। গল্পশরীরে পদ্যের এ মেধাবী সংযোজন পাপড়ি রহমানকে তার দশকের অপরাপর মেধাবী গল্পকারদের প্রায় সমপঙ্‌ক্তিতে এনে দাঁড় করায়। এসবের ব্যবহার ও আখ্যানভাগে  লোকগাথার বিবরণ তার গল্পে একটা পৌরাণিক আবহ তৈরি করে, এক গল্পের ভেতর দিয়ে অন্য গল্প প্রবাহিত করে ।

জীবনের এসব দীর্ঘশ্বাসমোড়ানো কষ্টকর বিষয়গুলো পাপড়ি রহমান নির্বিকারভাবে তুলে আনেন। নির্মোহ অবস্থান তার গল্পগুলোকে শক্তিমান করে তুলেছে। বিষয়বস্তু হিসেবে পাপড়ি রহমান নির্বাচন করেন বহমান জীবনের বহুমাত্রিক বিষয়াদির সরল ও জটিল দুধরনের প্রতিপাদ্যই।

… পাপড়ি রহমানের লেখায় মেয়েলিপনা নেই। যে বিষয়ে তিনি লিখেন, সে বিষয়ে তার অবলোকন প্রায় নিখুঁত। যখন গাছগাছালির প্রসঙ্গ আসে তাদের নাম তিনি ঠিক ঠিক বলে দেন, সেসব বৃক্ষের ডালে যেসব পাখি বসে তাদের বর্ণনাও নিখুঁত। অর্থাৎ তার গল্প বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর বিখ্যাত গল্প ‘বনের রাজার’ প্রায় অবসেসিভ ফল ও ফলবৃক্ষের বর্ণনার একটা দূরাগত প্রভাব এখানে দুর্নিরীক্ষ্য নয়। …

… লক্ষ করি, লেখকের প্রায় প্রতিটি গল্পই করুণ সমস্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়: তার কলম অশ্রুতে ভরপুর। নিজের রুগ্‌ণ স্বাস্থ্য নিয়ে বিব্রত, রাফিজার মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ আলাউদ্দিন গরু মোটাতাজা করার ওষুধ খেয়ে মৃত্যুবরণ করে, অন্ধ সমাজের ভণ্ড দণ্ড কাঁধে প্রিয় স্ত্রীকে নিয়ে আরব আলী গ্রাম ত্যাগ বাধ্য হয়, আলী আসগর পৌষের প্রভাতে চলে যায় চলন্ত বাসের তলায়, স্টেশনের পাগলী মা-কলা শিকার হয় গণ-ধর্ষণের, সন্ধার আবছা অন্ধকারে পুকুরে ভেসে ওঠে নিষ্পাপ খুকি মিঠুর লাশ। প্রতিটা গল্পেরই পরিণতি করুণ ও নিষ্ঠুর।

পাপড়ি রহমানের গল্পের ভাষা নিরেট বর্ণনা আর ইঙ্গিতময় প্রহেলিকার মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করে। সেদিক থেকে তিনি যেমন তার পূর্ববর্তী গল্পকারদের থেকে স্বতন্ত্র, তেমনি নব্বই দশকের কুজ্‌ঝটিকাময় গল্পসমূহ থেকেও দূরে। তবে ষাটের ও আশির শক্তিমান গল্পকারদের একটি প্রত্যক্ষ প্রভাব তার মধ্যে রয়েছে। প্রধান নদীদের এড়িয়ে তাকে বেছে নিতে হবে নিজস্ব জলপ্রবাহটি…।

২০০০ সালের মে মাসের নির্বাচিত ১০ তরুণের বইয়ের মাঝে ছিল টোকন ঠাকুর, মারজুক রাসেল, রহমান হেনরী, সাঈদ হাসান দারা, সরকার আমিন, প্রশান্ত মৃধা, খলিল মজিদ, অদিতি ফাল্গুনী গায়েন প্রমুখের বই।


পাপড়ি রহমান আর প্রশান্ত মৃধা এমন কোনো মেধাবী লেখক নয়। যারা আলোচনা করেছেন, তারা খামাখাই আলোচনার নামে তাদের অতিশয় স্তুতি করে গেছেন।


‘সেরা ১০ তরুণের বই’ সংখ্যাটি প্রকাশিত হবার পর আমি একদিন প্রথম আলোতে গেলে অদিতি ফাল্গুনী গায়েনের সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। আমি আমার স্বভাবজাত সৌজন্য-হাসি দিয়ে তার কুশল জানতে চাইলাম। সে-ও এল কথা বলার জন্য। ‘সেরা ১০ তরুণের বই’ নিয়ে কথা শুরু হতেই অদিতি গলায় উষ্মা ঢেলে বলল—

আপনার যা পাবার তা তো আপনি পেয়ে গেছেন, আর কী চাই?

তার কথা শুনে আমি বেশ হতচকিত হয়ে পড়লাম। মানে কী? আমি কী পেয়েছি? বা আমার কী পাওয়ার কথা ছিল? অন্যের কণ্ঠের এরকম উষ্মা আমি জন্ম থেকেই দেখে আসছি। বলা নাই, কওয়া নাই আমার ঘাড়ে উষ্মার ঝাল ঝাড়তে আমি অনেককেই দেখেছি। ফলে অদিতির আচরণে প্রাথমিকভাবে ধাক্কা খেলেও আমি মোটের উপর অবাক হই নাই।

ঘটনার ওখানেই ইতি ঘটল না। দিন কয়েক বাদে দেখি প্রথম আলোতে সাংবাদিক রাজীব নূরের এক প্রতিবাদলিপি ছাপা হয়েছে। সেই প্রতিবাদে ভাষ্য ছিল—

পাপড়ি রহমান আর প্রশান্ত মৃধা এমন কোনো মেধাবী লেখক নয়। যারা আলোচনা করেছেন, তারা খামাখাই আলোচনার নামে তাদের অতিশয় স্তুতি করে গেছেন। পরের হপ্তায় কে যেন রাজীব নূরের সেই প্রতিবাদলিপির বিরোধিতা করে আরেক প্রস্ত মামলা ঠুকে দিল প্রথম আলোর পাতায়। মানে রাজীব নূরের পরশ্রীকাতরতার দিকে আঙুল তুলে ধরল।

আমি সেসব পড়ে মনে মনে হেসে ছিলাম। আমাদের প্রথম গল্পের বই নিয়ে সামান্য আলোচনার জন্য এইরকম প্রতিবাদ! বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার বা আনন্দ পুরস্কার পেলে পরশ্রীকাতরদের মাঝ থেকে হয়তো দুই/চারটা সুইসাইডের কাণ্ড ঘটে যেতে পারে। বা লাঠিয়াল বাহিনীর রোষের মুখেও আমাদের পড়তে হতে পারে। আজ সত্যি তাদের জন্য আমার করুণাই হয় । অন্যের সামান্য ভালো যারা দেখতে বা শুনতে নারাজ, তারা দেশের দশের জন্য কী বা কতটুকু উপকার করতে পারবে তাহলে? নিজের মাঝে নির্বাণ লাভ না হলে ভালো কিছু লেখাও তো প্রায় অসম্ভবই। আমার কাছে তেমনটিই মনে হয়।


পর্ব-২১

 

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা