পর্ব-৪
কনকের আলো
কালো আর হালকা-পাতলা গড়নের চশমাপরা যে ছেলেটা সিটে কাত হয়ে ঘুমিয়ে ছিল তার নাম কনক। তার বাবা ছিল আমলা। লোকটার নেশা ছিল টাকা আর ক্ষমতার সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ানো। ইউএনও, এডিসি, ডিসি এইসব চেয়ার ঘুরতে ঘুরতে জীবনের এগারো আনা কেটেছে দেশের প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে। তাই ভালো স্কুলে পড়ার জন্য কনকরা মায়ের সাথে ঢাকায় থাকত। মায়ের অত সময় ছিল না সন্তানকে মমতা দিয়ে তুলুতুলু করে লালন-পালনের। তারা বড় হয়েছে অফুরন্ত বৈভবের মাঝে চাকর-বাকর আর কাজের বুয়ার কোলে-কাঁখে। মা কী সব সমিতি-টমিতি আর নির্যাতিত মহিলাদের নিয়ে কাজ করত। তাই তার সময় কাটত বাইরে বাইরে। মুঠভরা টাকা আর এক পৃথিবী-সমান ব্যস্ততা নিয়ে সে বকবক করতে করতে বেরিয়ে যেত দুপুরে; শরীরে একশ মণ ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরত রাত দশটা-এগারোটায়। তাই সত্যি বলতে কনকরা ঢাকাতে মায়ের সাথে নয় থাকত চাকর-বাকর ড্রাইভারদের সাথে। তাদের জীবন ছিল যা চাই তা পাই। তাই তারা প্রেম ও মমতার রসহীন ভূমিতে, অবৈধ বিত্তের বিষাক্ত পুষ্টিতে বিষফলের মতো বেড়ে উঠেছিল। তাদের জীবন ছিল মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়-নীতির তোয়াক্কাহীন, বুনো জন্তুর মতো আমিত্মের অহংকার সর্বস্ব।
কনকদের নামে-বেনামে ঢাকায় ছিল অসংখ্য ফ্ল্যাট, ব্যাংকে টাকার পাহাড়। তাই কলেজে উঠার পর মায়ের মতো ভাই-বোনও বাইরে বাইরে শুধু দিন নয় রাত কাটাতেও শুরু করে। তাদের মধ্যে বুঝি একটা অলিখিত সন্ধিই ছিল যে কেউ কারো ব্যক্তিজীবনে নাক ঘঁষবে না। মাঝে মাঝে বাবা বাসায় এলে চারজনে দেখা হতো খাবার টেবিলে। টুকটাক আলাপের মাঝে সবাই সাধ্যমতো নিজেকে লুকিয়ে রাখত সুস্বাদু খাবারে বোঝাই টেবিলের আনাচে-কানাচে।
মা তো কুকুরি, বোনটাও তাই, পেট খালাস করতে গ্যায়া অক্কা পাইছে। দ্যাখো খারাপ টাকা কী জিনিস!
প্রায় আশি কেজি ওজনের ভোগসর্বস্ব কনকের ছাত্রজীবনটা ছিল নামকাওয়াস্তে। ঘরে লেখাপড়ার কোনো পরিবেশই ছিল না। একজন বই নিয়ে বসেছে তো আরেকজন হাই ভলিয়মে ইংরেজি পপমিউজিক ছেড়ে দিয়ে তালে তালে নাচতে শুরু করেছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ার সুবাদে ইংরেজিটা একটু ভালো পারে। স্কুলে-বাড়িতে, বন্ধুদের আড্ডায় সবখানে লন্ডন, নিউইয়র্ক নিউইয়র্ক ভাব। কথা বলে ইংরেজিতে, গান গায় ইংরেজিতে, স্বপ্ন দেখে ইংরেজিতে, মুভি দেখে হলিউডের, কথায় কথায় প্রেতাত্মার মতো সিট! সিট! করে চেঁচিয়ে ওঠে, চাকরবারককে গালি দেয়, বিচ, বাস্টার্ড, ফাকিং...। বাংলা, বাংলাদেশ, বায়ান্ন, একাত্তর, শেখ মুজিব, রবীন্দ্র-নজরুল, অমর একুশে... এইসব শুনলে তাদের হাসাহাসি, কাশাকাশি এতটাই বেড়ে যেত যেন এইটা কোনো দেশ না, বাঙালিরা কোনো মানুষ না, সব ফকিরনিরগোষ্ঠী।
শ্রম-মেধা-মননহীন জীবনে শুধু খাও-দাও, হাউ-ঘাউ। তাই শুধু টাকার জোরে প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কনক সনদের নামে কলাপাতা কিনে এনেছে। ১৪২২ বাংলা নববর্ষের উৎসবে বাংলা একাডেমির গেটের উপচেপড়া ভিড়ে দাঁড়িয়ে কনকরা দিনভর মেয়েদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করে দেশজুড়ে ছি ছি ফেলে দিয়ে ছিল। তারপর গলা পর্যন্ত মদ আর মাংস গিলে, একটা প্রাডো গাড়ি নিয়ে, বন্ধুদের সাথে সারারাত কনক্রিটের অরণ্যে ধাবড়িয়ে বেরিয়েছে। পরেরদিন দুপুরে বাসায় ফিরে এসে শুনে, ধানমন্ডির একটা অভিজাত ক্লিনিকে অবৈধ গর্ভপাত করতে গিয়ে, ছোট বোনটা রক্তক্ষরণে মারা গেছে। তার পরের সপ্তাহেই কনকের বাবা গ্রেফতার হয় দুর্নীতির মামলায়। টিভি চ্যালেনগুলোতে এই সংবাদ ফলাও করে প্রচার হচ্ছিল। কনক কিচ্ছু জানত না। তারা তিন বন্ধু একটা গাড়ি নিয়ে উত্তরায় আরেক বন্ধুর বাসায় গিয়েছিল। বন্ধুর বাবা জাঁহাবাজ লিডার। তলে তলে উত্তরা আর টঙ্গীর মাদক ব্যবসার শেঠ। সেখান থেকে গলাতক বোতল টেনে আর গরম গরম মুরগির গ্রিল চিবিয়ে এসেছে। বন্ধুরা তাকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। তার বাবার গ্রেফতারের সংবাদে মা গেটে তালা দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। তাই ফুটপাতের দোকানগুলোর সামনে তাকে দেখে আশপাশের প্রতিবেশীরা ভিড় জমায়। কেউ কেউ তাকে শুনিয়ে উঁচু গলায় বলছে, ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজটা জেলে; মা তো কুকুরি, বোনটাও তাই, পেট খালাস করতে গ্যায়া অক্কা পাইছে। দ্যাখো খারাপ টাকা কী জিনিস!
একজন বকের মতো গলা বাড়িয়ে পানের পিকটা ফেলে বলে, এই দেশে কিস্সু হবে না, কিছুদিন ওএসডি থেকে, তদবির টতবির করে দেখবেন জাগার মাল জাগায় চলে এসেছে।
অঢেল অর্থ, ক্ষমতা আর কুরুচির চারণভূমিতে বেড়ে ওঠা কনকের জন্য এইসব পথুয়া ঘেউ ঘেউ তেমন কিছু ছিল না। মদের বোতল আর মেয়ে বন্ধু নিয়ে সে-ও তো প্রায়ই নরক গুলজার করে। কিন্তু সেদিনের কয়েকটা বুলেট মন্তব্য শুনে তার নিজেকে কেন জানি মানুষ ভাবতে ঘৃণা লাগে। দুই কান শাঁ শাঁ করছে। কে যেন একটা আচানক থাপ্পড়ে থামিয়ে দিয়েছে দুনিয়াটা! এখন পৃথিবীর সব মানুষ তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে নিয়ে কানাকানি করছে, হাসাহাসি করছে, দ্যাখ দুর্নীতিবাজের পোলা, দ্যাখ নষ্ট মায়ের পোলা, দ্যাখ শালারপুতের বোনটা পেট খসাইতে গ্যায়া ক্লিনিকে মারা পড়ছে।
অসাড় শরীরটা টানতে টানতে কনক এসে ফুটপাতে ওঠে। পৃথিবীটা আজ কত মলিন! কত নোংরা! জীবনটা আজ কত কুৎসিত! সারা দুনিয়া চষে বেড়ালেও আজ মনের দুঃখ বলার মতো একজন বন্ধু নাই। কনক মাথা নুয়ে অচেনা পৃথিবীর এক অন্তহীন পথ ধরে হাঁটতে থাকে। শরীরের নোংরা-কুৎসিত অঙ্গগুলো রঙচঙে পোশাক, পাউডার দিয়ে পথবেশ্যারা যেমন সাজায় তেমনি সন্ধ্যায় মহানগরী রঙিন আলোতে ঝিকমিকিয়ে উঠলে সে, তেজগাঁওয়ের গলির একটা সস্তা হোটেলে রুম ভাড়া নিয়ে নিজেকে পরিচিত পৃথিবী থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
গলার তিন ভরি ওজনের সোনার চেনটা বেচে দিয়ে কনক মাসখানেক এখানেই কাটায়। নোংরা হোটেলের প্রায় আলো-বাতাসহীন অন্ধকার রুমে সে সারাদিন শুয়ে শুয়ে ভাবত : কী করে, কত সহজে আত্মহত্যা করা যায়। মাঝে মাঝে হোটেলের ঝাপসা আয়নায় চোখ পড়লে সে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত। ঘন কালো চুলগুলো কুঁকড়া কুঁকড়া। নাকটা খাড়া হলেও ছিদ্র দুইটা একটু বড় বড়। গায়ের রঙ কালো হলেও চামড়ায় চকচকে লাবণ্য। ঠিক তার মায়ের বন্ধুর সাথে হুবহু...। এইসব ভাবার সময় কনক আজো এর পরে আর ভাবতে পারে না, কোনোদিনই ভাবতে পারে না। আচ্ছা খুব ছোটকালে তার যখন নিউমোনিয়া হয়েছিল তখন কেন সে মরল না? মরণ কারো কারো জন্য বন্ধু। মরণে মুক্তি মিলে!
তুমি এক স্বৈরিণী মায়ের পাপিষ্ঠ সন্তান বলেই জানো না ভালোবাসা কী।
কনক ঘামে ভেজা হোটেলের চটচটে বিছানা থেকে নেমে পড়ে। মাথাটা ঘুরছে। একদিন-দুইদিন পর পর রুম থেকে বের হয় সে। চোরের মতো নিজেকে আড়ালে আড়ালে রেখে ভাত খাওয়ার জন্য পাশের হোটেলে যায়। বড় বড় সসপ্যানে রাখা ভাত-তরকারির উপর ভনভন করে মাছি উড়ছে। ভাগাড়ের মতো গন্ধ উঠছে পাশের ড্রেন থেকে। হোটেলের নোংরা, নড়বড়ে চেয়ার-টেবিল দেখলেই উদগারে উদগারে পেটের আঁতভুঁড়ি উল্টে আসতে চায়। কয়দিন আগেও কনক এইরকম একটা স্থানে বসে ভাত খাওয়া তো দূরে থাক পেশাব পর্যন্ত করে নি। গরুর চনার মতো লিকার আর কনডেন্সড মিল্কের শরবতে শুকনা রুটি ভিজিয়ে কোনোমতে গিলে সে দৌড়ে বেরিয়ে আসে।
তো কনকের চেহারাটা মা-বাবা এমনকি পূর্বপুরুষদের কারো সাথেই মিলে না! তবে কি তার শরীরে অন্যকারো রক্ত? মায়ের জীবন-যাপনের গতিবিধি আর তার নিজের চেহারার গড়ন-গাড়ন মনে সন্দেহের বিষ ঢুকিয়েছিল সেই বয়ঃসন্ধি কালেই। মাঝে মাঝে তাদের বাসায় সেনাবাহিনীর এক জেনারেল আসত। লোকটা নাকি তার মায়ের কলেজ জীবনের বন্ধু। সেই দূরস্মৃতি ঘেঁটে আজও কনক যতটুকু উদ্ধার করতে পারে তাতে তার চেহারার দশ আনাই লোকটার সাথে হুবহু মিলে যায়! এই এক চিন্তা তাকে সারা জীবন কুরে কুরে খেয়েছে। পাগলা কুকুরের মতো তাড়া করে নিয়ে গেছে নরকের শেষ চৌকাঠে।
এই আবিষ্কারের পর একদিনও কনক শান্তিতে ছিল না। একটা রাতও ভালো করে ঘুমাতে পারে নি। ছুটিতে বাবা বাড়ি এলে সে বাবার কাছ থেকে দূরে দূরে পালিয়ে থাকত। লোকটাকে না পারত ঘৃণা করতে, না পারত সহ্য করতে। করুণা! করুণা! সবচে বেশি করুণা হতো তার নিজের জন্য। কিসের লেখাপড়া? কিসের ভালো ছেলে হয়ে ওঠা? যার জন্মটাতেই কুকুরের লালা জড়ানো তার আর কিসে ভালো, কিসে মন্দ?
সস্তা হোটেলটার নোংরা আর আবছা অন্ধকার রুমের ঝাপসা আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে দেখতে কনক প্রায়ই বিরবির করে নিজেকে শোনাত, তুমি এক স্বৈরিণী মায়ের পাপিষ্ঠ সন্তান বলেই জানো না ভালোবাসা কী। তোমার হৃদয় মাতৃস্নেহের আলোহীন, মহত্বহীন তাই তুমি হয়েছ লম্পট আর নির্বোধ ভোগী। আজ তোমার সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা আছে; হয় এই বেজন্মা অস্তিত্বের বিনাশ, না হয় প্রায়শ্চিত্ত।
কিসে প্রায়শ্চিত্ত হবে তার? টাকার গৌরবে কত মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। কত মেয়ের জীবন-যৌবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। মানুষ যে মানুষ, মানুষের হৃদয় বলে যে একটা জিনিস আছে এই কথাই তো সে এই সেদিন সন্ধ্যায় টের পেয়েছে! টের পেয়েছে জীবনে টাকাই সব না। আরো কিছু লাগে। দেহটার যেমন ভাত লাগে, কাপড় লাগে, ঘর লাগে, বিছানা লাগে, অসুখ হলে ওষুধ লাগে। তেমনি মনেরও অনেক কিছু লাগে। মনের সেই খোরাক টাকা দিয়ে মিলে না। মনের জন্য মন লাগে। মায়ের মন, বাপের মন আর বোনের মমতাভেজা মনের মাটিতে ভালোবাসার ঘর-বিছানা-বালিশ না পেলে মানুষের মনটা বাঁচে না।
এইভাবে দুই মাসে কনকের ওজন পনেরো কেজি কমে গেল। মনে মনে কঠিন পণ ছিল আত্মহত্যার। এইসময় একটা এনজিওতে সাধারণ মানের একটা চাকরি হয়ে যাওয়ায় তখনকার মতো আত্মহত্যাটা মুলতবি হয়ে যায়। দুই দিন আগে-পরে তাকে তো গলায় দড়ি পরতেই হবে। তার আগে বিলাতি কুকুরের নকল খোলসটা ফেলে দিয়ে, সাধারণ মানুষের মাঝে অতি সাধারণ হয়ে মিশে যেতে চায় সে। চাকরির সুবাদে মনপুরা, হাতিয়া, সন্দীপ ঘুরে ঘুরে তিন বছর পর যখন সে গফরগাঁয়ের চরালগীতে এসে কাজে যোগ দেয় তখন দেহ-মনে সত্যি সত্যিই কনক এক নতুন মানুষ। পায়ে আড়াইশ টাকার সেন্ডেল, পরনে ফুটপাতের জিন্স-টি-শার্ট, চরাঞ্চলের রোদে পোড়া কটকটা কালো আর খেটে খাওয়া শক্ত সামর্থ্য এক তরুণ। লাফাঙ্গা দাড়ি, মেদ ও দম্ভহীন কনকের চিকন গোঁফ আর চশমার আড়ালে নিরাসক্ত, বিষণ্ন চোখ দুইটা দেখলে তার মা-ই এখন তাকে চিনতে পারবে কিনা সন্দেহ।
লোকটা কি কনকের থেঁতলানো দেহটার উপর দিয়েই মেয়েটার কাছে যাবে?
বাসটা উলটে পড়ার পর ঘুমন্ত কনক দুই সিটের মাঝে আটকা পড়ে দাপুত-দুপুত করে অসংখ্য ছেঁচা খেয়েছে। তার কপাল-মাথা আর নাকের চারপাশেই অনেকগুলো ছোট ছোট জখম। কিন্তু কোনোটাই মারাত্মক নয়। ডান পায়ের নিচের দিকে পেন্টটা ছিঁড়ে গেছে। হাঁটুর নিচ থেকে চামড়া ছিঁড়ে কুকুরের জিবের মতো ঝুলছে। আরো অনেকের সাথেই কনকের অজ্ঞান, অসাড় দেহটা বাসের পাটাতনে পড়েছিল। গুটিকয় মানুষের ছোটাছুটি, উত্তেজিত গলার হাঁকডাকে তার চেতনা ফিরে আসে। আহতদের রক্তে বাসটা ভেসে যাচ্ছে। জানালার ভাঙাকাঁচ আর সিটের নিচে অনেকেই চাপা পড়েছে। কনকের কাছ থেকে একটু দূরে আভার ফাটা মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। মেয়েটার সামনের দিকে জামাটা ছিঁড়ে গেছে। সোনার পাতলা চেনটা গলা থেকে পাটাতনের দিকে ঝুলছে। জ্ঞান ফিরে আসার পর কনক বাসের পাটাতনে পড়ে এইসব এক নজরে দেখে। তারপর চোখ যায় এইমাত্র বাসে ঢোকা ন্যাংটিকাছা মানুষগুলোর দিকে। ওরা এসেই খুঁজে খুঁজে মানিব্যাগ আর মেয়েদের শরীর হাতড়ে গয়নাগাটি নিচ্ছে। ওদের সাথেরই একজন মাঝবয়সী কৃষক ধমকে ওঠে, এইতা কী করছ, আগে মানুষগুলানরে হাসপাতালে পাঠা।
এই ভয়াবহ দুঃসময়ে এইসব দেখার জন্য কনক একটুও রেডি ছিল না। তবু এই পাপিষ্ঠ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সে জেনেছে, ভালোই বলো আর মন্দই বলো মানুষ সব পারে।
কনক মরার মতো পড়েছিল। তার শরীরের সবখানে আগুনের লহর! এর মাঝেই নড়াচড়া করে সে বুঝে ফেলেছে যে তার হাত-পা ভাঙে নি! কিন্তু মুগুর দিয়ে কে যেন তার সারাটা দেহ থেঁতলে দিয়েছে। চারপাশের এই মৃত্যুপুরিতে সে বেঁচে আছে! একবার সে আত্মঘাতী হতে চেয়েছিল আর এখন মরতে মরতেও বেঁচে গেল! নিষ্ঠুর নিয়তির হাত থেকে বারবার ফিরে পাওয়া এই তুচ্ছ জীবনটার কাছে তার বুঝি আজ অনেক ঋণ হয়ে গেল। এই চরম অনুভবের মাঝে সে দেখে তার পাশে পড়ে থাকা ভয়ংকরভাবে আহত, অজ্ঞান মেয়েটার দিকে একটা লোক ছুটে আসছে। মানুষটার চোখ রক্তাক্ত মেয়েটার দিকে নয় তার গলার সোনার চেনটার দিকে। লোকটা কি কনকের থেঁতলানো দেহটার উপর দিয়েই মেয়েটার কাছে যাবে?